
দ্বীপ সরকার এর "শহর" কবিতার পর্যালোচনা
মোঃ রেজাউল করিম"শহর" কবিতাটি আধুনিক নাগরিক জীবনের এক নিপুণ ও সাহসী প্রতিকৃতি। কবি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে শহরের জটিলতা, দূষণ, এবং নৈরাশ্যকে শব্দে ধরেছেন, কিন্তু তার চিত্রকল্পের গভীরতা এই আপাত-নেতিবাচকতাকে অতিক্রম করে এক মর্মস্পর্শী সত্যের উন্মোচন করেছে। আধুনিক নাগরিক জীবনের নিপুণ ও সাহসী প্রতিকৃতি। কবিতাটি নাগরিক জীবনের গতানুগতিক চিত্র এড়িয়ে এর জটিল, অন্ধকার দিক (দূষণ, নৈরাশ্য, আগ্রাসন) তুলে ধরেছে, যা আধুনিক কবিতার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। 'সাহসী' কারণ এটি শহরের মোহ বা সৌন্দর্য না দেখিয়ে সরাসরি এর ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে কথা বলছে। জটিলতা, দূষণ, নৈরাশ্যকে শব্দে ধরা, কিন্তু চিত্রকল্পের গভীরতা নেতিবাচকতাকে অতিক্রম করে সত্যের উন্মোচন করেছেযৌক্তিকতা: প্রথম অংশে কবিতার থিম (নেতিবাচকতা) তুলে ধরা হয়েছে, যা কবিতার লাইনে স্পষ্ট (যেমন: 'খুনী হাওয়া', 'কংক্রিটের ধূলোয়'

। দ্বিতীয় অংশটি গভীর। চিত্রকল্পের গভীরতা নেতিবাচকতাকে অতিক্রম করে কারণ কবি কেবল অভিযোগ করছেন না, বরং এই অবস্থার ভেতরের মানবিক সত্য এবং বিলুপ্তিকে তুলে ধরছেন। এটি কেবল 'খারাপ' বলার চেয়ে অনেক বেশি - এটি একটি গভীর উপলব্ধি। "শহরের সব হাওয়া, হাওয়া নয় / ট্র্যাফিক লাইটগুলোর মতো কিছু হাওয়া খুনী" - উপমাটির মাধ্যমে শহরের কৃত্রিমতা ও আগ্রাসন প্রকাশযৌক্তিকতা: এটি একটি শক্তিশালী ও যৌক্তিক পয়েন্ট। 'হাওয়া'কে ট্র্যাফিক লাইটের সাথে তুলনা করা অত্যন্ত আধুনিক ও প্রতীকী। ট্র্যাফিক লাইট কৃত্রিম, নিয়ন্ত্রণমূলক এবং যান্ত্রিক। এই উপমাটি স্পষ্ট করে যে শহরের বাতাস আর প্রাকৃতিক বা জীবনদায়ী নেই; এটি এখন যান্ত্রিক নিয়মের মতো নিয়ন্ত্রণমূলক ও ক্ষতিকর ('খুনী'

, যা আগ্রাসীভাবে জীবনকে গ্রাস করে। কংক্রিটের ধূলোয় মানুষের 'নীল নীল প্রাণী' হয়ে যাওয়া" এবং "আকাশজুড়ে, চিলের গণগণে হাঁক" পাঠককে শহুরে বাস্তবতার অন্য স্তরে নিয়ে যায়যৌক্তিকতা: দুটি চিত্রকল্পই চরম প্রতীকী। 'নীল নীল প্রাণী' (রোগ, বিষণ্নতা বা ভিনগ্রহের প্রাণীর মতো বিচ্ছিন্নতা) এবং 'কংক্রিটের ধূলো' - এই দুটি শব্দ শহরের বিচ্ছিন্নতা ও অস্বাভাবিক পরিবেশ তুলে ধরে। 'চিলের গণগণে হাঁক' (সম্ভবত তীব্র ও কর্কশ) পরিবেশের কোলাহল ও নির্মমতাকে বোঝায়, যা পাঠককে পরিচিত শহরের চেয়ে আরও বেশি এক 'ভয়াবহ' বাস্তবতার মুখোমুখি করে। মূল শক্তি নিহিত জীবনবাদী পর্যবেক্ষণে: "সেখানে নিরীক্ষাধর্মী বুদ্ধরা মরে যাচ্ছে" - কেবল হতাশা নয়, বরং মননশীলতা বিলীন হওয়ার প্রতি সংবেদনশীলতা এবং জীবনবোধের তীব্র আকাঙ্ক্ষাযৌক্তিকতা: এই ব্যাখ্যাটি কবিতার গভীরতম মর্মকে ধরেছে। 'বুদ্ধরা মরে যাচ্ছে' শুধু খারাপ খবর নয়। এটি ইঙ্গিত দেয় যে শহরের যান্ত্রিক ও আগ্রাসী জীবনে চিন্তা, মননশীলতা ও গভীর দর্শন টিকে থাকতে পারছে না। এটি বিলীন হয়ে যাওয়ার প্রতি কবির গভীর দুঃখ ও সংবেদনশীলতা। হতাশার আড়ালে এই মননশীলতার আকাঙ্ক্ষাই হলো জীবনবোধের তীব্রতা। পষের পরাগে, ফুটছে রক্তের ঝিলমিল" বা "কেউ কেউ, দুঃখবাদী আইনজীবী" - দৈনন্দিন জীবনের মধ্য থেকেও প্রাণশক্তি ও মানবিক সংগ্রামের ইঙ্গিতযৌক্তিকতা: এই চিত্রকল্পগুলো স্ব-বিরোধী (Oxymoron-এর মতো) এবং তাই জীবনবাদী। 'পষের পরাগে' (শুষ্কতা/মৃত্যুর প্রতীক) 'রক্তের ঝিলমিল' (প্রাণ/সংগ্রামের প্রতীক) ফোঁটা ইঙ্গিত করে যে, চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও জীবন ও সংগ্রাম চলমান। 'দুঃখবাদী আইনজীবী' - পেশাগত নৈরাশ্য সত্ত্বেও ন্যায় বা কাজের প্রতি তাদের চলমান দায়বদ্ধতা (সংগ্রাম) প্রকাশ করে। এটি যান্ত্রিকতার মাঝেও মানবিক অস্তিত্বের সুক্ষ্ম স্পন্দনকে ফুটিয়ে তুলেছে। শেষের দিকে "ব্যস্ততা ফেরে শাটারের শব্দে-বিপনীতে" - সব নৈরাশ্য সত্ত্বেও জীবন তার নিজস্ব ছন্দে চলমানযৌক্তিকতা: এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপসংহার। কবিতাটি নৈরাশ্য দিয়ে শুরু হলেও, শেষ পঙক্তিটি ইঙ্গিত করে যে শহর একটি স্থির সত্তা। সব ধ্বংস বা হতাশার মাঝেও, শাটার খোলে এবং বন্ধ হয়, ব্যবসা চলে - অর্থাৎ, জীবন তার নিজস্ব অভ্যস্ততা (Routine) ও ছন্দে চলমান, যা স্থিতিশীলতার এক ইঙ্গিত বহন করে। শব্দচয়ন, আধুনিক উপমা এবং গভীর জীবনবোধের কারণে বাংলা কবিতার চমৎকার সংযোজনযৌক্তিকতা: এটি পূর্ববর্তী সব পয়েন্টের সারসংক্ষেপ। ব্যবহৃত শব্দ (যেমন: খুনী হাওয়া, কংক্রিটের ধূলো, নীল নীল প্রাণী), উপমা এবং জীবন-মৃত্যু-সংগ্রামের প্রতি কবির অনুসন্ধানী দৃষ্টিই কবিতাটিকে গতানুগতিকতা থেকে আলাদা করে এবং বাংলা কবিতায় তার স্থান সুদৃঢ় করে। কবিতার মূল শক্তি নিহিত রয়েছে এর জীবনবাদী পর্যবেক্ষণে। কবি যখন লেখেন, "সেখানে নিরীক্ষাধর্মী বুদ্ধরা মরে যাচ্ছে", তখন এটি কেবল হতাশার চিত্র নয়, বরং শহরের পরিবেশেও যে মননশীলতা ও গভীরতা অবশিষ্ট ছিল, তার বিলীন হয়ে যাওয়ার প্রতি এক গভীর সংবেদনশীলতার প্রকাশ। এটি হতাশার মোড়কে এক জীবনবোধের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। সবমিলিয়ে, "শহর" কবিতাটি তার শব্দচয়ন, আধুনিক উপমা এবং গভীর জীবনবোধের কারণে বাংলা কবিতার এক চমৎকার সংযোজন। এটি কেবল শহরের সমালোচনা নয়, বরং এর প্রতিটি অলি-গলিতে লুকিয়ে থাকা জীবনের প্রতি এক মায়াময় এবং অনুসন্ধানী দৃষ্টি।
কবি ও কথাসাহিত্যক
কুষ্টিয়া..
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৪