ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-১
তথাকথিত মুসলমানরা একটি বিষয়ে অর্থহীন গর্ব করে। এই অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে গর্ব করতে গিয়ে তাদের নিজেদের অজান্তেই কুফরী করে থাকে। কোনো হারাম কাজ করে গর্ব প্রকাশ করার অর্থ হচ্ছে নিজেকে লা’নত পাওয়ার উপযুক্ত করা। বিষয়টি হচ্ছে- “সঙ্গীতে এবং কুস্তিতে মুসলমানগণ শ্রেষ্ঠ।” নাঊযুবিল্লাহ!
বাস্তব সত্য হচ্ছে- হারাম বিষয় বাদ দিয়ে সমস্ত প্রয়োজনীয় বিষয় যেমন বিজ্ঞানে, সমরবিদ্যায়, আদর্শে, বুদ্ধিতে, প্রজ্ঞায়, বিচক্ষণতায়, সম্পদে মুসলমানগণ শ্রেষ্ঠ। কিন্তু কাফির-মুশরিকরা অপ্রয়োজনীয় একটি বিষয়ের ফিকির মুসলমানদের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে। এর নেপথ্য কারণ অনেক দীর্ঘ।
মূর্তি আর বাদ্যযন্ত্রসহ সঙ্গীত ধর্মীয় অনুষঙ্গ হিসেবে হিন্দু ধর্মে মিশে আছে। আর ইসলাম এসেছে মূর্তি এবং বাদ্যযন্ত্র ধ্বংস করতে। বাদ্যযন্ত্রসহ হোক বা বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই হোক- পবিত্র দ্বীন ইসলামে হারাম সঙ্গীতের কোনো স্থান নেই। হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম, হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম, হযরত ইমাম মুজতাহিদ, ছূফী, দরবেশ রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা কখনো সঙ্গীত চর্চা তো দূরে থাক, সঙ্গীতের পাশ দিয়েও হাঁটেননি। অথচ আজকে বিশ্বের অনেক মুসলিম দেশে মুসলমানগণের মধ্যে সঙ্গীত চর্চা শুরু হয়েছে। নাঊযুবিল্লাহ!
আমাদের ভারত উপমহাদেশে ইসলাম এসেছে হযরত ছাহাবায়ে আজমাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম এবং বিশিষ্ট মুজাদ্দিদ, ছূফী-দরবেশ এবং হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের মাধ্যমে।
এদেশের মুসলমানগণের মাঝে সঙ্গীত চর্চা প্রবেশের নেপথ্যে রয়েছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক গোষ্ঠী, হিন্দু সম্প্রদায় এবং বিভ্রান্ত শাসকশ্রেণী। আমরা পর্যায়ক্রমে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।
ইতিহাসের ধুম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-২
৭ম শতকের মুজাদ্দিদ, সুলতানুল হিন্দ হযরত খাজা গরীবে নেওয়াজ রহমতুল্লাহি আলাইহি (৫৩৬-৬৩৩ হিজরী) এবং ৮ম শতকের মুজাদ্দিদ, মাহবুব-ই ইলাহী হযরত নিযামউদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি (৬৬০-৭৪৫ হিজরী) ভারতের মাটিতে তাশরীফ নিয়ে আছেন। উনাদের মাজার শরীফ প্রাঙ্গনে ঢোল, তবলা, হারমোনিয়াম বাজিয়ে ছূফী নামধারী একটি বিশেষ বাতিল শ্রেণী কাওয়ালী পরিবেশন করে। এরা নিজেদের চিশতিয়া খান্দানের অনুসারী বলেও দাবি করে থাকে। তাদের এই আচরণে মুসলমানগণের মধ্যে প্রধান দুটি ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। একদল ভাবছে হয় তো প্রকৃতই এই মহান মুজাদ্দিদদ্বয় রহমতুল্লাহি আলাইহিম বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে কাওয়ালী শুনতেন তাই তার ধারাবাহিকতা এখনো বিদ্যমান (নাঊযুবিল্লাহ), অপর দলটি কুরআন শরীফ এবং সুন্নাহ শরীফ-এর দলীলে এসব গায়ক-বাদকদের কাফির ফতওয়া দিচ্ছে এবং মাজার শরীফ যিয়ারতে বাধা এমনকি প্রকৃত ছূফী সম্প্রদায়ের প্রতিও বদআক্বীদা পোষণ করছে। ইনশাআল্লাহ আমরা পর্যায়ক্রমে আলোচনা করবো যে-
১। প্রকৃতই কী উনাদের পক্ষে হারমোনিয়াম তবলাসহ কাওয়ালী শোনা সম্ভব ছিল?
২। যদি সম্ভব না হয়ে থাকে তবে উনারা এবং অন্যান্য ছূফী দরবেশগণ কী শুনতেন?
৩। উনাদের শানে এই বিকৃত তথ্য উপস্থাপনের প্রকৃত কারণ কী?
৪। এই সাজানো মিথ্যা ইতিহাস প্রকাশের নেপথ্যে কারা এবং তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী?
৫। সামা কী এবং বর্তমানে তার প্রয়োজনীয় কতটুকু ইত্যাদি।
ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৩
ভারতের আজমীর শরীফ-এ শুয়ে আছেন ৭ম হিজরী শতকের মুজাদ্দিদ, সুলত্বানুল হিন্দ, খাজা গরীবে নেওয়াজ রহমতুল্লাহি আলাইহি (৫৩৬-৬৩৩ হিজরী) এবং দিল্লীতে রয়েছেন ৮ম হিজরী শতকের মুজাদ্দিদ, মাহবুব-ই-ইলাহী হযরত নিযামুদ্দিন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি (৬৬০-৭৪৫ হিজরী)। এই মহান মুজাদ্দিদদ্বয় সুন্নতের অনুসরণে হামদ-নাত-ক্বাছীদা শুনতেন এবং সামা শরীফ-এর মাহফিলের আয়োজন করতেন। আজকে উনাদের মাযার শরীফ প্রাঙ্গনে আয়োজিত কাওয়ালী অনুষ্ঠান দিয়ে উনাদের সামা শরীফ শোনার বিষয়টি যেমনি উপলব্ধি করা সম্ভব নয়, তেমনি কিছু কিতাবী ইলম দিয়ে মুজাদ্দিদগণ উনাদের পরিচয় পাওয়া সম্ভব নয়। তবুও আমরা মুজাদ্দিদগণ উনাদের উপর কিছুটা আলোচনা করবো যাতে বোঝা যায় উনাদের পক্ষে কাওয়ালী শোনা কী আদৌ সম্ভব ছিল কিনা। যদিও এ রকম ধারণা করাও আদবের খিলাফ কিন্তু আমাদের লেখার স্বচ্ছতা এবং সাধারণের উপলব্ধিকে শানিত করার লক্ষ্যেই এই চেষ্টা।
হাদীছে কুদছী শরীফ-এ রয়েছে, যা আবূ দাউদ শরীফ-এ বর্ণিত রয়েছে যে, “প্রত্যেক হিজরী শতকের শুরুতে মহান আল্লাহ পাক তিনি একজন মুজাদ্দিদ পাঠাবেন, যিনি দ্বীনের তাজদীদ করবেন।” একজন মানুষ কষ্ট সাধনা করে ওলীআল্লাহ হতে পারেন কিন্তু মুজাদ্দিদ হিসেবে আসা মানুষের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল নয়। মুজাদ্দিদগণ উনারা বিশেষভাবে মনোনীত। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যে দ্বীন রেখে গেছেন, মুজাদ্দিদগণ উনারা এর প্রকৃত ওয়ারিছ। উনারা হুবহু সেই দ্বীনকে আবার জাগরিত করেছেন, করে যাচ্ছেন এবং করবেন। সামান্য কমও নয়, বেশিও নয়।
ইতিহাসের ধূম্রজালে হালাল সামা বনাম হারাম সঙ্গীত-৪
হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের যুগের পর প্রথম মুজাদ্দিদ হিসেবে আসেন হযরত ইমাম আবূ হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহি। এভাবে ৭ম হিজরী শতকের মুজাদ্দিদ ছিলেন সুলত্বানুল হিন্দ খাজা গরীব নেওয়াজ রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং ৮ম হিজরী শতকের মুজাদ্দিদ ছিলেন মাহবুব-ই ইলাহী হযরত নিযামুদ্দীন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি। হাদীছ শরীফ-এ রয়েছে, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন, “আমি প্রেরিত হয়েছি বাদ্যযন্ত্র ও মূর্তি ধ্বংস করার জন্য।” সুতরাং মুজাদ্দিদগণ উনারা কিভাবে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে কাওয়ালী শোনার বা গাওয়ার অনুমতি দেবেন? এসব বলা এবং ভাবাও চরম পর্যায়ের বেয়াদবি ও কুফরী। উনাদের অন্তরের পবিত্রতা সাধারণের উপলব্ধির বাইরে। কিন্তু যারা নফসের অনুসরণ করে তারাই অবলীলায় বলতে পারে- ভারতে শুয়ে থাকা এই মহান মুজাদ্দিদদ্বয় উনারা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে সামা, কাওয়ালী শুনতেন। নাঊযুবিল্লাহ!
মুজাদ্দিদগণ উনারা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সুন্নতের আমল করেন এবং সেই সময়ের অবলুপ্ত সুন্নতগুলোকেও জিন্দা করার চেষ্টা করেন।
ক্বাছীদা শরীফ শোনা, লেখা, পাঠ করা, শোনার আয়োজন করা, উৎসাহ দিয়ে লিখানো সবই খাছ সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি মসজিদে নববী শরীফ-এ একটি আলাদা মিম্বর শরীফ বানিয়ে দিয়েছিলেন যেখানে বসে বিশিষ্ট ছাহাবী হযরত হাসসান বিন ছাবিত রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি ক্বাছীদা শরীফ পরিবেশন করতেন এবং পাশের মিম্বর শরীফ-এ বসে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওযা সাল্লাম তিনি তা শুনতেন এবং কখনো আওড়াতেন। মূলত, ৭ম এবং ৮ম হিজরী শতকের মুজাদ্দিদগণ উনারা সেই সুন্নতের হুবহু অনুসরণে ক্বাছীদা বা সামা শরীফ শোনার আয়োজন করতেন। যা সম্পূর্ণ শরীয়তসম্মত এবং খাছ সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

