১৯৬৫ সালের এপ্রিলে পাকিস্তান গুজরাটের কচ্ছের জলাভূমিতে কঞ্জরকোট নামের একটি ভারতীয় সেনা ছাউনি দখল করে নেয়ার পর পাকিস্তানে আক্রমণ করার দাবী নিয়ে তীব্র আভ্যন্তরীণ হাঁকডাকের প্রেক্ষিতে আইনসভায় দাঁড়িয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী বলেছিলেন, ভারত সুবিধাজনক সময়ে কঞ্জরকোটের বিপর্যয়ের প্রতিশোধ নেবে। সেই 'সুবিধাজনক সময়' আসে পাঁচ মাস পর সেপ্টেম্বরে, যখন ভারত লাহোর সংলগ্ন আন্তর্জাতিক সীমা অতিক্রম করে পাকিস্তান আক্রমণ করে।
২০০১ সালের এপ্রিলে পদুয়া ও বড়াইবাড়ীতে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে লিপ্ত হয়েছিলো বাংলাদেশ ও ভারত। পদুয়ায় বিনা রক্তপাতে ফয়সালা হলেও বড়াইবাড়ীতে ভারত প্রচুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পড়ে ছিলো ১৬ জন বিএসএফ সৈন্যের লাশ, পশ্চাদপসরণের সময় যাদের নিয়ে যেতে পারেনি সহযোদ্ধারা। সেই ঘটনার পরও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জোর দাবী উঠেছিলো ভারতে। সরকারী এমপি শত্রুঘ্ন সিনহা পীলখানায় বোমাবর্ষণের দাবী পর্যন্ত করেছিলেন। সেই সময় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী কোন সুবিধাজনক সময়ের কথা উল্লেখ না করলেও ৯ বছরের মধ্যে পীলখানা রক্তাক্ত হয়েছিলো।
উপরের কথাগুলো এজন্য লেখা, কারণ ১৮ তারিখ ভারত শাসিত কাশ্মীরের উরিতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি ব্রিগেড পর্যায়ের সেনা ছাউনিতে কাশ্মীরী স্বাধীনতাকামীদের আক্রমণে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ষষ্ঠ বিহার রেজিমেন্ট ও দশম ডোগরা রেজিমেন্টের ১৯ সৈন্য মারা যাবার প্রেক্ষিতে ভারতে আবার তীব্র হয়েছে প্রতিশোধের দাবী। অবস্থানগত গাম্ভীর্য ভুলে ভারতের বাংলাভাষী সাবেক প্রধান সেনাপতি জেনারেল শংকর রায় চৌধুরী ভারতকেও একটি আত্মঘাতী স্কোয়াড গঠন করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়ার দাবী করেছেন। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর আভ্যন্তরীণ প্রেস্টিজ ইস্যুও আছে। ডোগরা ও বিহার রেজিমেন্ট ঐতিহ্যবাহী। বিশেষত, ডোগরা রেজিমেন্টের জন্ম ১৮৭৭ সালে। ১৯৪৭ সালের পর থেকে দায়িত্ব পালন করা ভারতীয় প্রধান সেনাপতিদের মধ্যে কমপক্ষে দুইজন ডোগরা রেজিমেন্টে কমিশন পাওয়া অফিসার ছিলেন।
১৯ জন সৈন্যের নিজ গ্যারিসনে মৃত্যু অবশ্যই সেনাবাহিনীর অফিসার, জওয়ানদের জন্য একটি স্পর্শকাতর বিষয়। নিহতদের মধ্যে কমিশন্ড অফিসার কয়জন জানিনা, তবে স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনা সেনাবাহিনীতে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে, যা ভারত সরকারকে বাধ্য করবে সুবিধাজনক কোন সময়ে পাকিস্তানে আক্রমণ করতে। বিগত বছরগুলোতে ভারতীয় সেনারা কাশ্মীরে নিজ ঘাঁটিতে শিরোচ্ছেদের শিকার পর্যন্ত হয়েছে, কিন্তু ভারত পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারেনি। এই ক্ষোভগুলোর বিস্ফোরণ ঘটলে নরেন্দ্র মোদী নিজেকে একজন যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী হবার ঝক্কি থেকে চাইলেও বাঁচাতে পারবেন না।
এই সমস্ত বিষয় চির বৈরী এই দুই দেশের মধ্যে একটি ছোটখাট যুদ্ধের সম্ভাবনাকে তীব্র করে দিয়েছে। তবে এর প্রকৃতি কি হতে পারে, তা হুট করে বলা যায়না। হতে পারে পাকিস্তানের ভেতর কোন সেনা ছাউনি, অথবা পাবলিক প্লেসে আত্মঘাতী বোমা হামলা ঘটতে পারে। কিংবা জিম্মি সংকটের মতো বিচ্ছিন্ন আক্রমণও হতে পারে, যেগুলোর ব্যাপারে জেনারেল চৌধুরী বলছেন। অথবা কারগিল বা সিয়াচেন যুদ্ধের মতো স্বল্প মাত্রার কোন যুদ্ধ লেগে যেতে পারে দুই দেশের মধ্যে। যুদ্ধটা ভারতের মান বাঁচানোর জন্য হলেও বরাবরের মতো এতে কোন ফলাফল হবেনা। অমীমাংসিত যুদ্ধবিরতি কাশ্মীর সংকটের একটি স্থায়ী পরিণতিকে আরো কয়েক বছরের জন্য পিছিয়ে দেবে, যাতে লাভ ভারতের।
অনলাইনে যারা ইতোমধ্যেই কল্পনার রশির লাগাম হারিয়ে উরিতে ভারতের বিপর্যয়ের প্রেক্ষিতে গজওয়া-ই-হিন্দ, এমনকি মালহামার শিশুতোষ ফানুশ নির্মাণ করে চিন্তা জগতের সর্বনাশ করেছেন, সম্ভবত তারা আবার হতাশ হবেন। কারণ তাদের কল্পনার ফানুশ যতোই ফুলেফেঁপে উঠুক না কেন, এই মুহূর্তে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে কোন অলআউট বা ডিসাইসিভ ওয়ারের সম্ভাবনা নেই বলেই মনে হয়। তবে ছোটখাট যুদ্ধ হতে পারে...।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৬ সকাল ৯:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




