১৯৭৫ সন।
কয়েকদিন ধরে বিরামহীন বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির মাত্রা এতই প্রবল যে ফসলের মাঠে কোমর পরিমান পানি জমে গেল। তখন ধানের মৌসুম, সব ধান পানির নিচে ডুব সাঁতার দিচ্ছে।
বন্যার আবির্ভাব সুনিশ্চিত হলো, যার বদৌলতে ধান সহ সব ফসলে পচন ধরলো। দেশের সরকার ঠিক সময়ে ধান আর গম আমদানি করতে পারলোনা।
যশোর জেলার প্রত্যন্ত এক ভদ্র পল্লির শেষ সীমানায় এক বিধবা, তার দুই ছেলে এবং চার মেয়ে বিবর্ন তালপাতার ঘরে কোন রকম মাথা গুজে থাকে।
পিতৃহীন বাড়ির বড় ছেলের নাম নাজিরুদ্দিন সরদার। পড়ালেখায় ছেলেটা ভালো নয়, বেশ ভালো। ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় হুট করে পড়ালেখা ছেড়ে দিলো। এই ভেবে "গরীবির ছাওয়ালের পড়ালেহা দিয়ে হবে কি, আগে পেট বাচানু লাগবে না!"
বাড়ির প্রথম ছেলে, মায়ের খুব আদরের। "ছোট বেলা তার মা তাকে মাথায় রাখেনি উকুনে খাবে বলে, মাটিতে রাখেনি পিঁপড়াতে খাবে বলে, সব সময় বুকের পাঁজরের সাথে মিশিয়ে রেখেছেন।"
সময়টা এখন খুব খারাপ। জমিতে ফসল নাই, ঘরে চাল নাই। বাড়ির সবাই ভুখা। মানুষ এখন কারো বাড়িতে ভাত চায় না, চায় ভাতের মাড়। ভাত চাওয়ার মত দুঃসাহস কেউ দেখায় না।
চার পাশে শুধু একটা কথাই প্রতিধ্বনিত হয় "ভাত দে!" "ভাত দে!" "ভাত দে!" "ভাত দে!"
ভাতের অভাবে নাজিরুদ্দিনের মা আর তার দুই বোন মারা গেলো। নাজিরুদ্দিনের চোখ দিয়ে দু ফোটা পানিও পড়লো না। শুধু ছেলেটা ভাত খাওয়া ছেড়ে দিলো।
এরপর থেকে সবাই তাকে নশু নামে ডাকে। কেনো ডাকে সে নিজেও জানে না। কোনো বাড়িতে কোন অনুষ্ঠান হলে সে একটা মাটির মালশা নিয়ে হাজির হয়। সবাই আনন্দের সাথে তাকে খাবার দেয়।
গ্রামের পিচ্চি পিচ্চি ছেলেমেয়ে গুলো তাকে দেখলেই ডাক দেয় "এই নশু বিড়ি খাবি?" নশু তার কালো দাঁত বের করে হাসে।
নশু সেই খাবার গুলো নিয়ে যায় তার মায়ের জন্য। মা নিশ্চই না খেয়ে আছে। তার না হয় ভাত লাগে না, কিন্তু মাতো ভাত না খেয়ে থাকতে পারে না।
নশু গভীর মমতায় তার মায়ের কবরে ভাত ঢেলে দেয়। আর কবরের মাটিতে হাত বুলাতে বুলাতে বলে "মা দেখ, তোর জন্যি ভাত নিয়ে আইছি। খা মা, ভাত খা।"
তখন নশুর চোখ দিয়ে অশ্রুধারা নেমেছিলো কিনা কেউ তা খেয়াল রাখেনি।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে ডিসেম্বর, ২০১৫ রাত ১১:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




