টিকেট কেনার মেশিনগুলো নিয়ে আমার কিরকম যেন একটু ভয়-ভয় ভাব আছে । যেসব টিকেট অটোমাটগুলো থেকে ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে টিকেট কেনা যায় সেগুলোতে সমস্যা নেই । কিন্তু সমস্যা হলো যেগুলোতে নগদ টাকা দিতে হয় । আমার কেন যেন মনে হয় ব্যাটা টাকা খাবে কিন্তু কাজ করবে না । বাংলাদেশে খুব বেশি পরিমান ঠক খাওয়াতে হয়তো এরকম অবস্থা ।ফ্লোরেন্সে অটোম্যাটগুলো থেকে আমার করিৎকর্মা সহযাত্রিরা কি করে যেন টিকেট কেটে ফেললো । টাইমটেবিল দেখে যানা গেলো ট্রেনে করে পিসা যেতে প্রতি ঘন্টায় ট্রেন আছে । একটা ১ ঘন্টা ৮/১০ মিনিট আরেকটা দেড় ঘন্টার মতো লাগে । আগে আসবে বলে দেড় ঘন্টা সময়ের ট্রেন ধরাটাই ঠিক হলো ।
যাই হোক, আমাদের অবাক করে ট্রেন সময়মতো হাজিরও হলো । যথারীতি লক্কর ঝক্কর ট্রেন । রাতজাগা ক্লান্ত শরীরটা কোনমতে টেনে তুললাম ট্রেনে । দুলকি চালে ট্রেন চলতে শুরুও করলো ।একটু পর দেখলাম ট্রেনের স্পিড টেনেটুনে বাংলাদেশের মেইল ট্রেনের মতো । জার্মান ট্রেনে কত তাড়াতাড়ি পৌছানো যেত এরকম ধুনপুন আলাপ আলোচনা করতে ঘন্টাদেড়েক পুরো হবার আগেই সবাই উঠে গাটরি বোচকা নিয়ে রেডি হলাম ।ট্রেনের এ্যানাউন্সমেন্ট সিস্টেম নষ্ট । ঠিক স্টেশন আবার মিস করে না বসি । তো সময় পার হয়ে যায় ট্রেন থামার নাম নেই । দরজার পাশে এক পান্ক ছেলে/মেয়েকে (বুঝি নাই আসলে সে ছেলে নাকি মেয়ে) দেখে ইংরেজীতে পিসার কথা জিজ্ঞাসা করাতে সে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতেই আমাদের আশ্বাস দিলো যে পিসা সামনেই ।
দাড়িয়ে থাকতে থাকতে পা ব্যথা তবুও পিসার দেখা নেই । পাঙ্কুরে আবার জিগায় পিসার কি খবর ? সেও বলে সামনেই ! পুরা দুরের তালগাছ দেখানোর কিচ্ছা । চারপাশের সিন সিনারি খুব আশাপ্রদও না । পিসার মতো জায়গার শহরতলী নিশ্চয়ই সেইরকম কিসিম হবে বলে ধারনা করেছিলাম । কিন্তু কোথায় কি ? পুরা গা-গেরাম । পুরান ঢাকার মতো পলেস্তারা খসা বাসা বাড়ি ।মাইলের পর মাইল ক্ষেত খামার । তাও আবার সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, অস্ট্রিয়ার মতো সৌন্দর্যসচেতন ক্ষেত খামার না । দেশের মতোই অগোছালো, মোটেও-আকতে-সহজ-ছবির-মতো-দেখতে-না এরকম ক্ষেত খামার । আস্তে আস্তে এক একটা স্টেশন পার হয়, আমাদেরও টেনশন বাড়ে । কয়েকটা স্টেশন দেখলাম এত ছোট যে ট্রেনের শেষ মাথা থেকে স্টেশনের নামটারও নাগাল পাওয়া যাচ্ছিল না । স্টেশনের নাম ভালো করে দেখার জন্য সবাই ট্রেনের মাথার দিকে রওনা দিলাম ।মাথার দিকে গিয়ে আবার জানালা দিয়ে উকিঝুকি । মনের কোনায় কিঞ্চিত সন্দেহ পিসা ছেড়ে আসলাম না তো ? সন্দেহ দুর করতে এদিক ওদিক তাকাতেই এক লোকরে দেখলাম মন দিয়ে বই পড়ছে । পাঙ্কের থেকে যারা বই পড়ে তারা বেশি বিশ্বাসযোগ্য ধারনা করে জিজ্ঞেস করলাম পিসা কি সামনে ? ভদ্রলোক বললেন হা এইতো সামনেই । কাহাতক আর সামনে সামনে শোনা যায় । ট্রেন এমনিতে ততক্ষনে ৪৫ মিনিট লেইট ।
যাই হোক, মিনিট দশেক পরে হঠাৎ একজনের নজরে পিসার কাইত হওয়া টাওয়ারটা নজরে পড়লো ।বুঝলাম ঠিক পথেই এগোচ্ছি । হঠাৎ দেখি একটা স্টেশন আসছে ।নাম দেখলাম পিসা এস রোজোরে । হমম, স্টেশনের নামের সাথে পিসা শব্দটাও আছে । ভদ্রলোকরে আবার জিজ্ঞেস করি, পিসা যেতে যে স্টেশনে নামতে হবে সেটা কতদুর ? তিনি বললেন এখানেই আমাদের নামা উচিত । ট্রেন না আমাদের নিয়ে ছেড়ে যায় এ চিন্তায় ধুপধাপ করে নেমে পড়লাম । নেমে একটু ধাতস্ত হয়ে দেখি দুরে পিসার কাইত হওয়া টাওয়ার দেখা গেলেও সেটা পাশের গ্রামের তালগাছের মতোই দুর । স্টেশনে কোন টিকেট কাউন্টার দেখলাম না যে কাউরে জিজ্ঞেস করবো এটা সত্যিই পিসা কিনা । েস্টশনের ওয়েটিং রুমে কোন জনমানুষ নেই । স্টেশনে মামুদের রুমে গিয়ে দেখলাম সেখানে শুধুমাত্র মামুরাই ঢুকতে পারবে এরকম একটা নোটিশ সাটা । ঘুরাঘুরি করে আশেপাশে দেখলাম কয়েকজন শ্রমিক কাজ করছেন । গিয়ে ইশারা ইঙ্গিতে ইংরেজী ডয়েশ বাংলা মিশিয়ে জিজ্ঞেস করলাম দুরের ঐ উচা টাওয়ারটায় কিভাবে যায় ।ইটালিয়ানে ওরা যা বললো সেটার মানে কিছুই না বুঝলেও এটা বুঝলাম যে আমাদের রেললাইন ধরে অর্থাৎ ট্রেনে যেতে হবে । ট্রেনের পড়ুয়াটা যে আমাদের ভুল ইনফরমেশন দিয়ে ভুল স্টেশনে নামিয়ে দিয়েছে সেটা বুঝলাম । ট্রেন এমনিতে এক ঘন্টা লেইট । তার ওপর ভুল স্টেশনে নেমে পরের ট্রেনের জন্য বসে থাকা । মেজাজ কঠিন বিলা হয়ে গেলো । পরের ট্রেন কখন ছাড়বে সেটা খুজতে গিয়ে দেখি এ্যারাইভালের টাইমটেবিল আছে, ডিপারচার নাই ।দেড় ঘন্টার জার্নিতে এক ঘন্টা লেট করে যেখানকার ট্রেন সেখানকার ট্রেনের টাইমটেবিল দেখে কোন ভরসা আসলো না ।এরপর যে ট্রেন আসবে সেখানে সেটাতেই যা আছে কপালে মনে করে উঠে বসবো প্লান করে প্লাটফর্মে এসে দাড়িয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম । বসে থাকতে থাকতে বিরক্ত হবার আগেই একটা ট্রেন এলে সেটাতে চড়ে বসলাম । এরপর মিনিট পাচেক পরেই নিজেদের পিসা ট্রেন স্টেশনে আবিস্কার করলাম ।শুরু হলো ঘুরনা ইটালিয়া । বই পড়ুয়া সহযাত্রিরে সবাই যার যার স্টকের সবচেয়ে গভীর গালি দিয়ে স্টেশনে ঢুকলাম ।
পরের পর্ব : পিসা
ছবি : সেই স্টেশনের নাম । ভুল করেও কেউ ওখানে নামবেন না ।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই মে, ২০০৭ বিকাল ৫:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




