somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঘুরনা দিলাম ইটালি : ৩ পিসার কাইত হইয়া যাওয়া টাওয়ার দর্শন

২২ শে মে, ২০০৭ রাত ৮:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পিসা রেল স্টেশন
পিসার স্টেশনে নেমে প্রথম যে কাজ করা দরকার ছিলো সেটা হলো একটু ওজন কমিয়ে সাফ সুতরো হওয়া । একটু খুজতেই টয়লেট/বাথরুম পাওয়া গেলো । দরজা দিয়ে ঢুকতেই দেখি ব্যাপক সাজগোজ করে এক খালাম্মা বসা । কাউন্টারের বা পাশে বাথরুম ডানদিকে টয়লেট । ১ টাকা করে লাগবে । সময় কম বলে টয়লেটটাই সারার প্লান হলো । ১ টাকা ইওরোপ স্টান্ডার্ডে একটু বেশী । টাকা দিয়েই ঠিক করলাম পুরোটাই উসুল করতে হবে । ছোটকাজ থেকে শুরু করে শেভ করা কোনটাই বাদ দিলাম । মোটামুটি ২০ মিনিট ব্যাপক রুপচর্চার পর বেরোলাম সবাই । বেসিনে শেভ করতে করতে খালাম্মা ঘাড় ঘুরিয়ে বেশ অসন্তুস্ট চোখে দেখছে আমি কি করি । তা দেখুক, ১ টাকা দিছি । সেটা উসুল করা নিয়ে কথা ।
ওখান থেকে বের হয়ে ব্যাগ রাখার একটা বন্দোবস্ত করতে গিয়ে দেখলাম লকার সব নষ্ট । ব্যাগ জমা দিতে হবে একটা কাউন্টারে । সেখানে প্রতি টুকরা লাগেজ বেসিসে টাকা দিতে হবে । বড় ব্যাগ ছোট ব্যাগ সবই এক দাম । ৭ জনে প্রায় ২৫ টাকা দিয়ে গজগজ করতে করতে স্টেশন থেকে বের হলাম । স্টেশনে লকার থাকলে দুটো বড় লকারে গাদাগাদি করে জিনিসপত্র রাখা যেত । পরে টের পেয়েছি মামুরা লকারে কম লাভ বলে লকার উঠিয়ে দেবার প্লান করেছে । ডাকাতি আর কারে বলে ।

পিসার টাওয়ার
ইটালির কোন জায়গা দেখতে যাবার আগে সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি যেটা নিতে হয় সেটা হলো শহরটা সম্পর্কে যত লিটারেচার পাওয়া যায় সেটা পড়ে ফেলা । বই না পেলে শহরে পৌছেই টুরিস্ট শপগুলোতে গিয়ে বই কিনে ফেলা উচিত । আর দরকার ম্যাপ । বড় শহরগুলোতে ওটা মাস্ট ।

পিসা শহরটা একেবারেই ছোট । মানুষজন ওখানে যায় শুধু ঐ টাওয়ারটা দেখতে । টাওয়ারটা একটা ঘেরা জায়গার মধ্যে । স্টেশন থেকে হাটা দুরত্বের ঐ জায়গার টুরিস্টদের পথ বাতলানো সবচেয়ে কার্যকরী টিপস দিয়েই পৌছানো সম্ভব । এ্যাডভাইসটা হলো 'ইন ইটালি, অলওয়েজ ফলো দি ট্যুরিস্টস' ।সবচেয়ে বেশি লোক যেদিকে যাচ্ছে সেদিকেই মিনিট ১০-১৫র রাস্তা এগোলেই পিসার টাওয়ার দেখা যাবে।

প্লেস অফ মিরাকল
এই বিখ্যাত পিসার টাওয়ারটা যে যায়গায় অবস্থিত সেজায়গাটার নাম 'প্লেস অফ মিরাকল'। পিসার মূল আকর্ষণ চারটি মধ্যযুগীয় স্থাপত্য এই প্লেস অফ মিরাকলেই অবস্থিত । পিসার হেলানো টাওয়ার ছাড়াও এখানে রয়েছে একটা ক্যাথেড্রাল (নাম দুমো), একটা সিমেট্রি (নাম ক্যাম্পোসানটো) ও একটা ব্যাপিস্ট্রি । পিসার টাওয়ারটা ক্যাথেড্রালের বেল টাওয়ার হিসেবে ব্যবহার হতো ।

দুমো
দুমো নামে পরিচিত ক্যাথেড্রালের নির্মানকাজ শুরু হয় ১০৬৪ সালে । এর পরের কয়েক শতক ধরেই এর নানারকম পরিমার্জন পরিবর্ধন চলে । আমরা এখন এটার যে চেহারা দেখি সেটা ১৬ শতকের প্রথম দিক তৈরী । পিসার টাওয়ারের মতো এটাও একটু কাত হয়ে দাড়িয়ে আছে । শ্বেতপাথরের এই চোখ ধাধানো স্থাপত্য ঘিরেই মিরাকল প্লেসের বাকি স্থাপত্যগুলো বানানো ।

দুমোর স্থাপত্য একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে এখানে ঘন্টা জিনিসটা নেই । যেটা খ্রিষ্টিয় প্রার্থনাগৃহের একটা অপরিহার্য অংশ । এর কারন এটা হতে পারে যে এটা বানানোর সময় একটা মিশ্র আর্কিটেকচারাল স্টাইল অনুসরন করা হয়েছে । এটা রোমান, মুসলিম ও বাইজেন্টাইন স্হাপত্যের একটা মিশ্রন । নির্মাতারা ঘন্টা বসাতে ক্যাথেড্রালের পাশে একটা টাওয়ার বানানোর সিদ্ধান্ত নেন যেটা পরে পিসার টাওয়ার নামে পরিচিতি পায় । এখানে এসব গুরুত্বপূর্ন ধর্মীয় সিদ্ধান্তে শিল্পীদের প্রভাব লক্ষনীয় । আরেকটা বিষয় যেটা খেয়াল করলে দেখা যায় সেটা হলো চার্চের ভেতর অন্য ধর্মের দেবতাদের প্রতিকৃতি । যাজকের বক্তৃতা মঞ্চের থিম প‌্যাগান দেবতা হারকিউলিসের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত । আমার জানার খুব ইচ্ছা তখনকার যাজকরা এটা জানতেন কিনা । যদি জেনে থাকেন তাহলে বলতে হবে শিল্পের খাতিরে তারা ব্যাপারটাকে ছাড় দিয়েছিলেন । হাজার বছর আগে এধরনের আচরন নিশ্চিতভাবে ইটালিয়ানদের অন্য সভ্যতা থেকে আলাদা করবে ।

পিসার টাওয়ার
আগেই বলছি এ টাওয়ারটা ক্যাথেড্রালের ঘন্টা বাজাতে ব্যবহার হতো । টাওয়ারের চুড়ায় মোট সাতটা ঘন্টা রয়েছে । টাওয়ারটা ঠিক কখন হেলতে শুরু করে সেটা বিষয়ে আমার কাছে কোন তথ্য না থাকলেও এটা জানা গেছে যে ইটালির স্বৈরশাসক মুসোলিনি তার মিলিটারী বুদ্ধির প্রয়োগ টাওয়ার হেলা রোধ করতে প্রয়োগ করেন । তাতে ফল যেটা হয়েছে সেটা হলো টাওয়ারটা মাটিতে বেশ খানিকটা দেবে গেছে ।
মুসোলিনির পর কোন ম্যাসিভ রিস্টাকচারিঙের কাজ নব্বুই দশকের আগে পর্যন্ত শুরু হয়নি । শুরু না হওয়ার একটা কারন হতে পারে এ বিষয়ে কাজের অনভিজ্ঞতা । রিস্টাকচারিঙের কাজ গোটা নব্বুইয়ে দশক ধরে চলে । এই পুরো দশক দর্শনার্থিদের জন্য টাওয়ারে ওঠা নিষিদ্ধ ছিলো ।

ব্যাপিসট্যারি
বারোশো শতকে শুরু হয়ে প্রায় দুশো বছর ধরে নির্মান করা পিসার ব্যাপিসট্যারি ইটালির সর্ববৃহৎ ব্যাপিসট্যারি । চার্চ বা ক্যাথেড্রালের সাথে থাকা এসব স্থাপনাগুলো খ্রিষ্টিয় ধর্মাবলম্বিদের ধর্মে দীক্ষা দেবার কাজে ব্যবহার করা হয় । পিসার ব্যাপিসট্যারির একটা বৈশিষ্ট্য হলো ঘরের মাঝখানে দাড়িয়ে শব্দ করলে অদ্ভুৎ সুন্দর একটা প্রতিধ্বনী হয় । রেকর্ড করে ইউটিউবে তুলে দিয়েছি । ইচ্ছা হলে দেখতে পারেন । আরোও একটা আজব ব্যাপার হলো এখানে মেঝেতে একটা কবর আছে । কোথাও লেখা নেই ওটা একটা কবর ।

ক্যাম্পোসানটো
কাম্পোসানটোকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর কবরস্হান । অসাধারন কারুকার্যময় স্মৃতিসৌধ, দেয়ালে ফ্রেসকোর কাজ দেখলে মুগ্ধ হতেই হয় । কিংবদন্তি অনুযায়ী আর্চবিশপ উবাল্ডো ১১ শতকে জেরুজালেমের যে পাহাড়ে যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয় সেই পাহাড় (গলগোথা নামে পরিচিত) থেকে ৫টি জাহাজে ভর্তিকরে মাটি নিয়ে আসেন পিসার অধিবাসীরা যাতে করে পবিত্র মাটিতে সমাধিস্থ হতে পারেন । পরের শতকে শিল্পী জিওভানি ডি সিমোনি সমাধিস্থলটিকে সৌন্দর্যমন্ডিত করার কাজে হাত দেন । চারপাশের দেয়াল, ফ্রেসকোর অনেকগুলোই সিমোনির করা । ১৭শতক পর্যন্ত এখানে মৃতদেহ সমাধিস্ত করা হতো । সমাধিস্থলটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন বম্বিঙের কারনে খুব ক্ষতিগ্রস্থ হয় ।

যাই হোক, কাহিনীতে ফেরা যাক । প্লেস অফ মিরাকলে পৌছাতে ১০-১৫ মিনিট লাগবে । পুরনো শহরের মধ্যে দিয়ে হেটে ওখানে গেলে শ্বেতপাথরের শিল্পকর্মগুলো দেখলে থমকে দাড়াতে হয় । সবাই থমকে দাড়ায়ও । তারপর সবাই ছবি তোলার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে । আমার পরামর্শ হলো ছবির চিন্তা বাদ দিয়ে প্রথমেই খোজ করা উচিৎ টিকেট কোথায় পাওয়া যায় । ছবি তোলার সময় পরে পাওয়া যাবে যথেষ্ট । গেট দিয়ে ঢুকে হাতের ডানদিক দিয়ে একটু আগালেই টিকেট পাওয়া যাবে । সবগুলো স্থাপনা ঘুরতে গেলে ১৮/১৯ ইওরো লাগে । এর মধ্যে পিসারা টাওয়ারের টিকেটের সাথে একটা সময়ও দেয়া হবে । জায়গার অপ্রতুলতা ও অন্যান্য কারনে একবারে ২০-২৫ জনকে ২০ মিনিটের জন্য উপরে উঠতে দেয়া হয় । এজন্য উপরে ওঠার জন্য নির্দিষ্ট সময়ে লাইনে গিয়ে দাড়াতে হয় ।

পুরো জায়গাটা ঘুরতে দুপুর পর্যন্ত লাগবে । আসার সময় গেট থেকে বের হয়ে জোর গলায় আওয়াজ দেবেন বাংলায় 'বাঙ্গালি কেউ আছেন?' সাড়া পাবেন । গেটের সাথেই দুটো দোকান প্রবাসী বাংলাদেশীরা চালান । তাদের কাছ থেকেই স্যুভনির কিনতে বলি । নিশ্চিতভাবেই আপনার খরচ করা টাকাটার একটা বড় অংশ দেশে ফেরত আসবে । আমরা সুশীলরাই বিদেশে খরচপাতি যা করি । অসুশীলরা কষ্ট করে যা রোজগার করে তার বেশীরভাগই দেশে পাঠায় ।


ছবি দেখুন
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে মে, ২০০৭ রাত ৯:৩৩
৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'মাহাথিরনোমিক্স'- মালয়েশিয়াকে যেভাবে নিজ পায়ে দাঁড় করালো (পর্ব - ১)

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৬ শে জুন, ২০২৬ রাত ১২:৪৭



আমাদের প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া গেলেন। এটা খুব ভালো এক মুভ ছিলো। সারা বিশ্বকে একটি বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু, সারা বিশ্বে মালয়েশিয়াকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার অগ্রনায়ক মাহাথির মোহাম্মদের সাথে তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

গোসাইপুর ১৯৭১

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৬ শে জুন, ২০২৬ ভোর ৪:৫০



জুন মাসের পড়ন্ত বিকেল, ভ্যাপসা গরমে আগন্তুক ঘেমে একাকার। গায়ে ময়লা হাফ শার্ট আর নীল ফুলপেন্ট। শার্টের রঙ কোনো এক সময় হয়তো সাদা ছিলো, ময়লা হতে হতে এখন প্রায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিউইয়র্কের ডায়েরী: ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া থেকে লং-আইল্যান্ড

লিখেছেন কাছের-মানুষ, ২৬ শে জুন, ২০২৬ ভোর ৫:৫৪


আমাদের সামার ভেকেশন চলছে এখন। প্রায় তিন মাসের ছুটি। এই ছুটিতে বসে না থেকে নিউইয়র্কের একটি ন্যাশনাল ল্যাবে জয়েন করলাম ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি হিসেবে! গবেষণা করে যে পৃথিবীকে উদ্ধার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ মোহমায়া

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৬ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৪৬



খরস্রোতা নদীও একসময়
ক্ষীণ নালায় পরিণত হয়
কালের পরিক্রমায়,সময়ের চাহিদায় ।
তবু আশা বেঁধে রাখি।

ফিরবে সব আগের মত
চলবে জীবন অবিরত
কোন একদিন।


হারানো মুহুর্তরা কি সত্যিই  ফিরে আসে?
শত ব্যস্ততায়- মায়ের মত... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন্তব্যে অনন্য রাজীব নূর

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৬ শে জুন, ২০২৬ রাত ১০:৩২



অনন্য রাজীব নুর মন্তব্য বেলায়
পাওয়া ও দেওয়ায় লক্ষ করে পার
সম্মুখে এগিয়ে চলে গন্তব্যে অপার
প্রতিটি পোষ্টের ক্ষেত্রে তার আছে টান।
মন তার দোলে চলে আনন্দ ভেলায়
ব্লগেতে নিশ্চুপ দেখে পোষ্ট... ...বাকিটুকু পড়ুন

×