পিসার স্টেশনে নেমে প্রথম যে কাজ করা দরকার ছিলো সেটা হলো একটু ওজন কমিয়ে সাফ সুতরো হওয়া । একটু খুজতেই টয়লেট/বাথরুম পাওয়া গেলো । দরজা দিয়ে ঢুকতেই দেখি ব্যাপক সাজগোজ করে এক খালাম্মা বসা । কাউন্টারের বা পাশে বাথরুম ডানদিকে টয়লেট । ১ টাকা করে লাগবে । সময় কম বলে টয়লেটটাই সারার প্লান হলো । ১ টাকা ইওরোপ স্টান্ডার্ডে একটু বেশী । টাকা দিয়েই ঠিক করলাম পুরোটাই উসুল করতে হবে । ছোটকাজ থেকে শুরু করে শেভ করা কোনটাই বাদ দিলাম । মোটামুটি ২০ মিনিট ব্যাপক রুপচর্চার পর বেরোলাম সবাই । বেসিনে শেভ করতে করতে খালাম্মা ঘাড় ঘুরিয়ে বেশ অসন্তুস্ট চোখে দেখছে আমি কি করি । তা দেখুক, ১ টাকা দিছি । সেটা উসুল করা নিয়ে কথা ।
ওখান থেকে বের হয়ে ব্যাগ রাখার একটা বন্দোবস্ত করতে গিয়ে দেখলাম লকার সব নষ্ট । ব্যাগ জমা দিতে হবে একটা কাউন্টারে । সেখানে প্রতি টুকরা লাগেজ বেসিসে টাকা দিতে হবে । বড় ব্যাগ ছোট ব্যাগ সবই এক দাম । ৭ জনে প্রায় ২৫ টাকা দিয়ে গজগজ করতে করতে স্টেশন থেকে বের হলাম । স্টেশনে লকার থাকলে দুটো বড় লকারে গাদাগাদি করে জিনিসপত্র রাখা যেত । পরে টের পেয়েছি মামুরা লকারে কম লাভ বলে লকার উঠিয়ে দেবার প্লান করেছে । ডাকাতি আর কারে বলে ।
পিসার টাওয়ার
ইটালির কোন জায়গা দেখতে যাবার আগে সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি যেটা নিতে হয় সেটা হলো শহরটা সম্পর্কে যত লিটারেচার পাওয়া যায় সেটা পড়ে ফেলা । বই না পেলে শহরে পৌছেই টুরিস্ট শপগুলোতে গিয়ে বই কিনে ফেলা উচিত । আর দরকার ম্যাপ । বড় শহরগুলোতে ওটা মাস্ট ।
পিসা শহরটা একেবারেই ছোট । মানুষজন ওখানে যায় শুধু ঐ টাওয়ারটা দেখতে । টাওয়ারটা একটা ঘেরা জায়গার মধ্যে । স্টেশন থেকে হাটা দুরত্বের ঐ জায়গার টুরিস্টদের পথ বাতলানো সবচেয়ে কার্যকরী টিপস দিয়েই পৌছানো সম্ভব । এ্যাডভাইসটা হলো 'ইন ইটালি, অলওয়েজ ফলো দি ট্যুরিস্টস' ।সবচেয়ে বেশি লোক যেদিকে যাচ্ছে সেদিকেই মিনিট ১০-১৫র রাস্তা এগোলেই পিসার টাওয়ার দেখা যাবে।
প্লেস অফ মিরাকল
এই বিখ্যাত পিসার টাওয়ারটা যে যায়গায় অবস্থিত সেজায়গাটার নাম 'প্লেস অফ মিরাকল'। পিসার মূল আকর্ষণ চারটি মধ্যযুগীয় স্থাপত্য এই প্লেস অফ মিরাকলেই অবস্থিত । পিসার হেলানো টাওয়ার ছাড়াও এখানে রয়েছে একটা ক্যাথেড্রাল (নাম দুমো), একটা সিমেট্রি (নাম ক্যাম্পোসানটো) ও একটা ব্যাপিস্ট্রি । পিসার টাওয়ারটা ক্যাথেড্রালের বেল টাওয়ার হিসেবে ব্যবহার হতো ।
দুমো
দুমো নামে পরিচিত ক্যাথেড্রালের নির্মানকাজ শুরু হয় ১০৬৪ সালে । এর পরের কয়েক শতক ধরেই এর নানারকম পরিমার্জন পরিবর্ধন চলে । আমরা এখন এটার যে চেহারা দেখি সেটা ১৬ শতকের প্রথম দিক তৈরী । পিসার টাওয়ারের মতো এটাও একটু কাত হয়ে দাড়িয়ে আছে । শ্বেতপাথরের এই চোখ ধাধানো স্থাপত্য ঘিরেই মিরাকল প্লেসের বাকি স্থাপত্যগুলো বানানো ।
দুমোর স্থাপত্য একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে এখানে ঘন্টা জিনিসটা নেই । যেটা খ্রিষ্টিয় প্রার্থনাগৃহের একটা অপরিহার্য অংশ । এর কারন এটা হতে পারে যে এটা বানানোর সময় একটা মিশ্র আর্কিটেকচারাল স্টাইল অনুসরন করা হয়েছে । এটা রোমান, মুসলিম ও বাইজেন্টাইন স্হাপত্যের একটা মিশ্রন । নির্মাতারা ঘন্টা বসাতে ক্যাথেড্রালের পাশে একটা টাওয়ার বানানোর সিদ্ধান্ত নেন যেটা পরে পিসার টাওয়ার নামে পরিচিতি পায় । এখানে এসব গুরুত্বপূর্ন ধর্মীয় সিদ্ধান্তে শিল্পীদের প্রভাব লক্ষনীয় । আরেকটা বিষয় যেটা খেয়াল করলে দেখা যায় সেটা হলো চার্চের ভেতর অন্য ধর্মের দেবতাদের প্রতিকৃতি । যাজকের বক্তৃতা মঞ্চের থিম প্যাগান দেবতা হারকিউলিসের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত । আমার জানার খুব ইচ্ছা তখনকার যাজকরা এটা জানতেন কিনা । যদি জেনে থাকেন তাহলে বলতে হবে শিল্পের খাতিরে তারা ব্যাপারটাকে ছাড় দিয়েছিলেন । হাজার বছর আগে এধরনের আচরন নিশ্চিতভাবে ইটালিয়ানদের অন্য সভ্যতা থেকে আলাদা করবে ।
পিসার টাওয়ার
আগেই বলছি এ টাওয়ারটা ক্যাথেড্রালের ঘন্টা বাজাতে ব্যবহার হতো । টাওয়ারের চুড়ায় মোট সাতটা ঘন্টা রয়েছে । টাওয়ারটা ঠিক কখন হেলতে শুরু করে সেটা বিষয়ে আমার কাছে কোন তথ্য না থাকলেও এটা জানা গেছে যে ইটালির স্বৈরশাসক মুসোলিনি তার মিলিটারী বুদ্ধির প্রয়োগ টাওয়ার হেলা রোধ করতে প্রয়োগ করেন । তাতে ফল যেটা হয়েছে সেটা হলো টাওয়ারটা মাটিতে বেশ খানিকটা দেবে গেছে ।
মুসোলিনির পর কোন ম্যাসিভ রিস্টাকচারিঙের কাজ নব্বুই দশকের আগে পর্যন্ত শুরু হয়নি । শুরু না হওয়ার একটা কারন হতে পারে এ বিষয়ে কাজের অনভিজ্ঞতা । রিস্টাকচারিঙের কাজ গোটা নব্বুইয়ে দশক ধরে চলে । এই পুরো দশক দর্শনার্থিদের জন্য টাওয়ারে ওঠা নিষিদ্ধ ছিলো ।
ব্যাপিসট্যারি
বারোশো শতকে শুরু হয়ে প্রায় দুশো বছর ধরে নির্মান করা পিসার ব্যাপিসট্যারি ইটালির সর্ববৃহৎ ব্যাপিসট্যারি । চার্চ বা ক্যাথেড্রালের সাথে থাকা এসব স্থাপনাগুলো খ্রিষ্টিয় ধর্মাবলম্বিদের ধর্মে দীক্ষা দেবার কাজে ব্যবহার করা হয় । পিসার ব্যাপিসট্যারির একটা বৈশিষ্ট্য হলো ঘরের মাঝখানে দাড়িয়ে শব্দ করলে অদ্ভুৎ সুন্দর একটা প্রতিধ্বনী হয় । রেকর্ড করে ইউটিউবে তুলে দিয়েছি । ইচ্ছা হলে দেখতে পারেন । আরোও একটা আজব ব্যাপার হলো এখানে মেঝেতে একটা কবর আছে । কোথাও লেখা নেই ওটা একটা কবর ।
ক্যাম্পোসানটো
কাম্পোসানটোকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর কবরস্হান । অসাধারন কারুকার্যময় স্মৃতিসৌধ, দেয়ালে ফ্রেসকোর কাজ দেখলে মুগ্ধ হতেই হয় । কিংবদন্তি অনুযায়ী আর্চবিশপ উবাল্ডো ১১ শতকে জেরুজালেমের যে পাহাড়ে যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয় সেই পাহাড় (গলগোথা নামে পরিচিত) থেকে ৫টি জাহাজে ভর্তিকরে মাটি নিয়ে আসেন পিসার অধিবাসীরা যাতে করে পবিত্র মাটিতে সমাধিস্থ হতে পারেন । পরের শতকে শিল্পী জিওভানি ডি সিমোনি সমাধিস্থলটিকে সৌন্দর্যমন্ডিত করার কাজে হাত দেন । চারপাশের দেয়াল, ফ্রেসকোর অনেকগুলোই সিমোনির করা । ১৭শতক পর্যন্ত এখানে মৃতদেহ সমাধিস্ত করা হতো । সমাধিস্থলটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন বম্বিঙের কারনে খুব ক্ষতিগ্রস্থ হয় ।
যাই হোক, কাহিনীতে ফেরা যাক । প্লেস অফ মিরাকলে পৌছাতে ১০-১৫ মিনিট লাগবে । পুরনো শহরের মধ্যে দিয়ে হেটে ওখানে গেলে শ্বেতপাথরের শিল্পকর্মগুলো দেখলে থমকে দাড়াতে হয় । সবাই থমকে দাড়ায়ও । তারপর সবাই ছবি তোলার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে । আমার পরামর্শ হলো ছবির চিন্তা বাদ দিয়ে প্রথমেই খোজ করা উচিৎ টিকেট কোথায় পাওয়া যায় । ছবি তোলার সময় পরে পাওয়া যাবে যথেষ্ট । গেট দিয়ে ঢুকে হাতের ডানদিক দিয়ে একটু আগালেই টিকেট পাওয়া যাবে । সবগুলো স্থাপনা ঘুরতে গেলে ১৮/১৯ ইওরো লাগে । এর মধ্যে পিসারা টাওয়ারের টিকেটের সাথে একটা সময়ও দেয়া হবে । জায়গার অপ্রতুলতা ও অন্যান্য কারনে একবারে ২০-২৫ জনকে ২০ মিনিটের জন্য উপরে উঠতে দেয়া হয় । এজন্য উপরে ওঠার জন্য নির্দিষ্ট সময়ে লাইনে গিয়ে দাড়াতে হয় ।
পুরো জায়গাটা ঘুরতে দুপুর পর্যন্ত লাগবে । আসার সময় গেট থেকে বের হয়ে জোর গলায় আওয়াজ দেবেন বাংলায় 'বাঙ্গালি কেউ আছেন?' সাড়া পাবেন । গেটের সাথেই দুটো দোকান প্রবাসী বাংলাদেশীরা চালান । তাদের কাছ থেকেই স্যুভনির কিনতে বলি । নিশ্চিতভাবেই আপনার খরচ করা টাকাটার একটা বড় অংশ দেশে ফেরত আসবে । আমরা সুশীলরাই বিদেশে খরচপাতি যা করি । অসুশীলরা কষ্ট করে যা রোজগার করে তার বেশীরভাগই দেশে পাঠায় ।
ছবি দেখুন
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে মে, ২০০৭ রাত ৯:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




