আমি দিদার, চিটাগাং হেল্প ক্যাম্পেইন এ জয়েন করার জন্য গত ১৯ তারিখে সকাল ১১ টায় চট্টগ্রাম পৌছাই। চাচার বাসায় বউ, বাচ্চা আর ব্যাগেজ রেখে ১২:৩০ এর দিকে সামির (ব্লগার এবং বুয়েট ছাত্র, হেল্প ক্যাম্পেইনের অন্যতম সহযোগী) সাথে দেখা করি অলংকারে। শুরু হয় খুবই চ্যালেন্জিং একটি দিন।
কয়েকদিন ধরে চলছিল টানা বৃষ্টি। জিইসি তে প্রায় ২-৩ ফুট পানিতে ১কিলোমিটারের মত হেটে, প্রায় ২-৩ কিলোমিটার ট্রাকে করে এবং আরো অনেক পথ হেটে আমরা প্রথমে যাই ক্যান্টনমেন্ট এরিয়াতে।
প্রথমে কাইচ্চাকোনায় আকলিমার বাসায়। ভুমিধসে বাবাহারা মেয়েটি বাসায় ছিলনা।হাসপাতালে গিয়েছিল মার (ভুমিধসে আহত) সেবা করতে। আমরা তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে কিছু সময় আলাপ করে, হাসপাতালে (সি এম এইছ) গেলাম। মেয়েটি এখনো কাজে যোগ দেয়নি। আমরা তাকে বুঝালাম যে, যে ক্ষতি তার হয়ে গেছে, তা পূরন হবার নয়। বরং তার চেষ্টা করতে হবে বাকী জীবনটা যেন অনেক ভালো, সুন্দর থাকতে পারে। তাকে খুব শীঘ্রই স্বাবলম্বী হয়ে উঠার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। অর্থনৈতিক, মানসিক দুই ভাবেই তাদের স্বাবলম্বী হতে হবে। তারা যদি জীবন যুদ্ধে জয়ী হয়, তবেই আমাদের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা, সময়, পরিশ্রম সব সার্থক হবে।
মেয়েটি আমাদের বলল যে, সে তার সাধ্যমত চেষ্টা করবে, সৎ থেকে অনেক বড় হতে। সে আগামী মাসে কাজে যোগ দেবে বলেও জানাল।
এর পর আমারা গেলাম ফাহিনুর ও জান্নাতের বাসায়, লেবু বাগানে। ফাহিনুর কাজে যোগ দিয়েছে জানাল। আমরা খুব খুশী হলাম। কিন্তু, জান্নাত কে দেখলাম এখনো মানসিক দিক দিয়ে খুব খারাপ আছে। স্বামী ও সাত ভাই বোনকে কয়েক মিনিটের মধ্যে চোখের সামনে মরে যেতে দেখে কে এক মাসে সুস্থ হয়ে উঠতে পারে? আমরা বেশ কিছু সময় কাটালাম তাদের বাসায়। তার দুই বছর বয়সী ছেলেকে দেখে আমার শুধুই আমার ছেলের কথা মনে পড়ছিল। এতো দুর্ভাগ্যের বোঝা নিয়ে ছেলেটি জীবনে বড় হতে পারবে কি? জান্নাতকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম, তার দুই বছর বয়সী ছেলেকে একটি সুন্দর জীবন দেবার দায়িত্ব, তার জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেন্জ। ছেলের জন্য এই চ্যালেন্জে তার জয়ী হতেই হবে। ছেলেকে ভালোভাবে পড়াশুনা করিয়ে খুব বড় মানুষ বানাতে হবে। তবেই হবে তার জীবনের সার্থকতা। তবেই হবে আমাদের কষ্টের সার্থকতা।
জিইসিতে হুমায়ুন এদের সবার তুলনায় ভালেই আছে। বাসা ভাড়া করেছে। কাজে যোগ দিয়েছে। বাবা ও ভাইয়েরা মোটামুটি সুস্থ হয়ে উঠেছে। হুমায়ুনের বাবা বর্ষার সময় ব্যবসা বন্ধ রাখেন, অন্য তেমন কাজও করেননা। আমি তাকে বললাম তার পরিস্থিতিতে এটা খুব এক্সপেন্সিভ। ছেলেদের পড়াশুনার ব্যাপারে আমার তাকে কিছু উদাসীন মনে হলো। আমি তা নিয়েও তাকে বললাম। আমি এও বললাম যে, আপনার ছেলেদের মা মারা গেছে। এখন আপনি ওদের মা, আপনি ওদের বাবা। তাই আপনার দায়িত্ব এখন অনেক বেশী। আশাকরি তিনি বুঝতে পেরেছেন।
জিইসির আরেকটি পরিবার, পাখি সেদিন কুমিল্লা কসবায় ছিল, তার স্বামীর চল্লিশা করতে। তাই তার সাথে আমাদের দেখা হয়নি। আমরা তার পরিবারের অন্যান্যদের সাথে কিছু সময় আলাপ করি। পরে পাখির সাথে আমার ফোনে আলাপ হয়। সে আমাকে অভিযোগ জানায় যে, মূলত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ডাক্তারদের অবহেলায় তার স্বামী মারা যান। ব্লিডিং বন্ধ হচ্ছিলনা বলে ডাক্তারদের জানালে তারা জবাব দেন, "আমরা কি তোমাদের চাকর যে, তোমাদের কথামতো বারবার দোড়াতে হবে?" পাখিকে মনে হলো মানসিক বিপর্যয় অনেকখানি কাটিয়ে উঠেছে। সে জানালো যে বাসা ভাড়া করেছে। আমি তাকে প্রমিজ করলাম, খুব তাড়াতাড়ী আমাদের আরেকটি টিম তার সাথে দেখা করবে।
কিছু কমন ব্যাপার ছিল:
১. আমরা সবাইকে কিছু অর্থ সাহায্য দিলাম।
২. সবাইকে বললাম যে, এই অর্থ খুব সামান্য, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা করে কাজে লাগালে হয়তো এই টাকায়ও অনেক বড় কিছু করা সম্ভব।
৩. সবখানেই আরো কিছু লোক আমাদের সাহায্য চাইল। আমরা বললাম যে, আমাদের সামর্থ্ খুব সীমিত। আমরা অবশ্যই আরো বেশী লোককে সাহায্য করতে চাই। এই লোকগুলো সফল হলে তবেই আমরা আরো বড় আকারে এই ধরনের ক্যাম্পেইন করার মনোবল পাব। তাই সবাইকে দোয়া করতে বললাম যেন, এই ফ্যামিলিগুলো সফল হয়।
সবশেষে সামিকে অনেক ধন্যবাদ জানালাম। সামি না থাকলে আমার জন্য খুব কষ্ট হয়ে যেত। তাকে বললাম যে, আমি অনেককে জানি যারা এধরনের কাজে সাহায্য করতে চায়। কিনতু নিজে সারাদিন পরিশ্রম করা, সময় দেয়া, এই আবহাওয়ায়, সেটা খুব কম লোকই করতে পারে। সামি সেই অল্প কিছু লোকদের একজন। সারাদিনের অসম্ভব ক্লান্তির মাঝেও এই মহৎ উদ্যেগে জড়িত হতে পারার গর্ব নিয়ে দুজনে নিজ নিজ বাড়ী ফিরলাম।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


