উনবিংশ শতাব্দীর আগে ১০ লক্ষাধিক মানুষের শহর ছিল একমাত্র রোম। আর এখন এই ধরনের শহরের সংখ্যা পৃথিবীতে নয় নয় করে সাড়ে চারশ’র বেশি। রাষ্ট্রসঙ্ঘের তরফে বলা হচ্ছে অচিরেই এই সংখ্যাটা হাজারে পৌছে যাবে। আসলে আধুনিক নগরায়নের সাথে সাথে গ্রাম থেকে গঞ্জ, গঞ্জ থেকে ছোট শহর, ছোট শহর থেকে বড় শহরের দিকে মানুষ চলে যাচ্ছে। এই যাওয়ার ব্যাপারটা অতি বাস্তব। ঐতিহাসিক বাস্তবতায় এটাকে মেনে নিতেই হবে। এটা চিরদিনই ছিল, এখন ক্রমশঃ বাড়ছে আধুনিক নগরায়নের কারনে। এটাকে বলা যেতে পারে গ্রাম থেকে শহরে উত্তরন। রাষ্ট্রসংঘ একটি প্রতিবেদনে বলেছে, ‘পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি মানুষ অচিরেই বাস করবে শহরে। এখনো পর্যন্ত এই সংখ্যাটা অর্ধেক পেরোয়নি। কিন্তু, যেভাবে মানুষ নগরমুখী হচ্ছে, খুব দ্রুত সেই জায়গায় পৌছে যাবে।’ যে কথাটা নির্মম হলেও সত্যি, তা হল- এখনই শহরবাসী মানুষের এক-তৃতীয়াংশ বাস করে বস্তিতে। গ্রাম থেকে স্রোতের মতো চলে আসা মানুষেরা শহরে যখন ভীড় করছে, তখন সেখানে তাদের উপযুক্ত বাসস্থান কোথায়? পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশের শহরেই এত মানুষের বাসস্থান একসাথে করা সম্ভব হয়ে উঠছে না। ফলে অল্প জায়গার ভিতরেই গাদাগাদি করে বাস করতে হচ্ছে মানুষকে। তৈরি হচ্ছে বস্তি। আইনি-বেআইনি এইসব বস্তির পরিকাঠামো, উপযুক্ত বিদ্যুতায়ন, নিকাশীব্যবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিকাঠামো প্রায় নেই বললেই চলে। একেবারেই আবর্জনাময়, পুঁতিগন্ধময়, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করতে বাধ্য হয় লাখ লাখ মানুষ।
আসলে সমাজ বিকাশের সাথে সাথে, শিক্ষা ও জীবনযাপনের মানোন্নয়নের সাথে সাথে গ্রামের কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থা ভেঙ্গে যাচ্ছে। কৃষিতে লাভ থাকুক আর নাই থাকুক, কৃষি নিয়ে যত কথাই বলা হোক না কেন, কোন কৃষকই তার পরবর্তী প্রজন্মকে আর কষক বানাতে চায় না। কেউ মানুন আর নাই মানুন, একজন কৃষক বা কৃষিশ্রমিক চান তার পরবর্তী প্রজন্ম লেখাপড়া শিখে অন্ততঃ একটি চাকরী বা ব্যবসা করুক। সরকারী না হোক, বেসরকারী কোম্পানীর অসংগঠিত শ্রমিক হলেও ভালো। তবু চাষাবাদ বা কৃষিকাজ? নৈব নৈব চ। প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে কৃষির কি হবে? চাষাবাদের কি হবে? এইসব নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজী নয় কৃষকেরা বা কৃষিশ্রমিকেরা। সোজা কথায় দুনিয়া জুড়েই কৃষি থেকে মুখ ঘোরাচ্ছে কৃষকেরা। নতুন করে আর কেউ এই পেশায় আসছে না। ফলে সেইসব কৃষি পরিবার ভীড় জমাচ্ছে শহরের দিকে। দলে দলে শহরে আসা সেইসব মানুষেরা যেভাবেই হোক ঠিক কাজ জুটিয়ে নিচ্ছে। রাজমিস্ত্রী, গাড়ির চালক, রিক্সা চালক, বিভিন্ন কলকারখানার শ্রমিক, ছোটখাটো ব্যবসা- এইসব নানা ধরনের পেশায় যুক্ত হয়ে পড়ছে। আর তখনই তাদের মাথা গোজার জায়গা নিয়ে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। আবার উপযুক্ত জায়গা কিনে বাড়ি বানানো সেইসব মানুষদের পক্ষে অসম্ভব। ফলে সরকারী পড়ে থাকা জায়গা, রেলের ও বিভিন্ন কোম্পানীর পড়ে থাকা জায়গা, নদী ও রাস্তার পাশের সরকারী জায়গা, ব্যক্তিগত পতিত জায়গাতে কোনমতে রাত্রিবাসের ব্যবস্থা করে নিচ্ছে। স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ত্ব, সরকার সাধারনতঃ এইসব বসবাসের ক্ষেত্রে প্রথম দিকে বাধা দেয় না। ফলে এইসব আবাসক্ষেত্রগুলি ক্রমশঃ বস্তিতে রূপান্তরিত হয়ে যায়। দিনে দিনে বস্তির পরিসর বাড়ে বই কমে না। কিন্তু বস্তির পরিসর বাড়লেও কোনকালেই বস্তিবাসীরা নগরায়নের উন্নয়নের লেশমাত্র ছোঁয়া পায় না। আর যেখানে বস্তিগুলির জমির মালিকানা কোন ব্যক্তি, সেখানে সমস্যা হয়ে ওঠে আরো প্রবল। জমির মালিক চেষ্টা করে যায় বস্তিবাসীদের উৎখাত করতে। বিভিন্ন সময়ে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে, ভয় দেখিয়ে, নাশকতা সৃষ্টি করে আগুন ধরিয়ে বস্তিবাসীদের সর্বস্বান্ত করে জায়গার দখল নেবার চেষ্টা করে। ফলে বস্তিবাসীদের লাঞ্ছনার শেষ থাকে না।
যে কোন দেশে যখন কোন আধুনিক নগরায়ন হয়, তখন তার লক্ষ থাকে উন্নত সড়ক নির্মান,শপিং মল নির্মান, শিক্ষা-সংস্কৃতি-বিনোদন কেন্দ্র নির্মান, নিকাশী ব্যবস্থা নির্মান, উড়ালপুল নির্মান, বহুতল আবাসন নির্মান ইত্যাদি ইত্যাদি। আর এখানেই সমস্যা তৈরি হয়। ব্রাত্য থেকে যায় শহরের বস্তি, যেখানে বাস করে সেই শহরের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ। যেহেতু বস্তিগুলো বেআইনি দখলীকৃত জমির উপরে তৈরি, সেহেতু নানা ধরনের আইনী জটিলতায় উপেক্ষিত থেকে যায় সেখানকার উন্নয়ন। নগরজীবনের ভোগবিলাস, সৌন্দর্যায়ন, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য যতই তৈরি হোক না কেন, সেটা আর পরিকল্পিত নগরায়ন হয় না। শহরের একদিকে রঙ্গীন আলোর হাতছানি, বহুতলের বিলাস বৈভব- আরেকদিকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে একসাথে গাদাগাদি করে পশুর মতন জীবনযাপন সেই শহরের মানবিকতাকে লুঠ করে।
এই সমস্যা থেকে কোন দেশই বা মুক্ত? পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত বলে গর্ব করা খোদ আমেরিকার পেন্টাগনের খুব কাছেও আছে বস্তি। আছে খোদ লন্ডনেও। কেনিয়ার নাইরোবিতে আছে বৃহত্তম কিবেরা বস্তি। ভারতের বানিজ্যিক রাজধানী মুম্বইতে আছে বিখ্যাত ধারাভি বস্তি। ব্রাজিল ও জ্যামাইকাতেও আছে অনেক বড় বড় বস্তি। বাংলাদেশের ঢাকা বা কলকাতার বস্তিগুলোও খুবই অস্বাস্থ্যকর। চীনের বেইজিং এর বস্তি বা সোভিয়েতের মস্কোর বস্তি সরকারীভাবে উচ্ছেদ হলেও সেখানে সরকার তাদের উপযুক্ত বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছে, যা অন্যান্য দেশগুলো করতে পারেনি।
রাষ্ট্রসংঘের সংজ্ঞা অনুসারে, ‘বস্তি হল কোনো শহরের ভগ্নদশাগ্রস্থ এলাকা, যার বৈশিষ্ট্য হল নিম্নমানের বসতবাড়ি, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং স্থায়ী নিরাপত্তার অভাব।’ রাষ্ট্রসংঘের মতে, ‘জনসংখ্যার বৃদ্ধির কারণে বস্তিবাসীদের সংখ্যা দিনে দিনে বৃদ্ধি পেয়েছে। সারা বিশ্বে বর্তমানে ১০০ কোটি মানুষ বস্তিতে বাস করেন। ২০৩০ সালে এই সংখ্যা ২০০ কোটি হয়ে যেতে পারে।’ সাধারণভাবে বস্তি বলতে শহরের সেই সব অঞ্চলকেও বোঝায় যেগুলি একসময় শহরের সমৃদ্ধ অঞ্চলের পাশে ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে সেখানকার বাসিন্দারা আরো ভালো যায়গাতে চলে যাবার পরে সেগুলি গ্রাম থেকে কাজের জন্য আসা মানুষদের বাসভূমিতে পরিণত হয়েছে। উন্নয়নশীল বিশ্বে বস্তির এই চিত্রটিই সুপরিচিত। অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে বস্তি তৈরি হলেও সেই অধিবাসীদের অনেকেই তাঁদের বাসস্থানকে বস্তি আখ্যা দেওয়ার ঘোর বিরোধী। তাঁদের মতে, এর ফলে শেষ পর্যন্ত তাঁরা উচ্ছেদের সম্মুখীন হতে পারেন। অনেক গবেষকও রাষ্ট্রসঙ্ঘের ‘বস্তিহীন শহর’ নির্মানের প্রচারাভিযানের তীব্র সমালোচনা করেন। কারণ এর ফলে বস্তিবাসীরা ব্যাপক হারে উচ্ছেদের সম্মুখীন হতে পারেন। বস্তির বৈশিষ্ট্যগুলি বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চল ভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়। তবে সাধারণত অতি দরিদ্র ও সামাজিক অনগ্রসর শ্রেণীর মানুষেরাই সাধারনতঃ বস্তিতে বাস করেন। বস্তির বাড়িগুলিও বিভিন্ন ধরনের হয়। কোথাও সেগুলি অবিন্যস্ত কুটিরের মত, কোথাও বা স্থায়ী পাকা ইমারত। অধিকাংশ বস্তিতেই পরিষ্কার জল, বিদ্যুৎ, শৌচাগারের সুবিধা ও অন্যান্য মৌলিক পরিষেবার অভাব দেখা যায়। এই ধরনের বস্তিগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো সেখানে বসবাসের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, মৌলিক সেবাগুলো পাওয়া যায় না, অনেক মানুষ সেখানে গাদাগাদি করে বসবাস করে এবং হিংস্রতা ও নিরাপত্তাহীনতায় থাকে। আবার এই রকম এক অবস্থার মধ্যে বসবাসকারী বস্তিবাসী মানুষগুলো বেঁচে থাকার জন্যে দিনরাত কাজও করে যায়। সেখানেই তাদের সন্তানদের গড়ে তোলে। অথচ এই মানুষগুলোর অধিকার রক্ষায় সেইসব দেশের সরকার তাদের দায়িত্ব পালন করতেও ব্যর্থ। সেখানে নানা ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও ঘটে। এছাড়াও তারা সবসময় পুলিশের জোরজুলুমের ভয়ে শংকিত থাকে। এইসব বস্তিবাসীদের বসবাসের প্রয়োজনীয় আইনী কাগজপত্র না থাকার জন্য নানা সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হয়। যেকারণে তাদের জোরপূর্বক উচ্ছেদের ঘটনাও ঘটে। এমনকি সরকারি কাগজপত্র ছাড়া বস্তি এলাকাগুলোতে বাস করে বলে সেখানকার বাসিন্দাদের অনেকেরই ভোটের অধিকার পর্যন্ত থাকে না।
বিভিন্ন দেশের সরকার তাদের নিজ নিজ দেশে বস্তি সরিয়ে শহরের উন্নয়ন ঘটাতে, সৌন্দর্য বাড়াতে বস্তিবাসীদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ ঘটায়। এই ধরনের উচ্ছেদের ঘটনাও বেড়েই চলেছে। সাধারনতঃ সব দেশেই বস্তিগুলোতে মেয়েরাই বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে। সেখানকার পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় সুবিধার অভাব তাদেরকে যৌন আক্রমণ ও নিপীড়নের শিকার হতে হয়। বস্তিবাসীদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব থাকায় তাদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মারাত্মক ধরনের অবনতি ঘটায়, যা সামাজিক পরিবেশকে সরাসরি প্রভাবিত করে। অপরাধী চক্র ও মাদক চক্র বস্তিতে খুবই সক্রিয় থাকে।
এই দেশে, এই বাংলাতেও বস্তি সমস্যা যথেষ্টই আছে। মুম্বইতে ৫৪ শতাংশ, ফরিদাবাদে ৪৭ শতাংশ, মিরাটে ৪৪ শতাংশ, পুনাতে ৩৯ শতাংশ, লুধিয়ানাতে ২২ শতাংশ, দিল্লীতে ১৮ শতাংশ, কলকাতাতে ৩২ শতাংশ, হাওড়াতে ১১ শতাংশ, শিলিগুড়িতে ১২ শতাংশ মানুষ বস্তিতে বাস করেন। কলকাতার রাজারহাটে নতুন নগরায়নে সেই সমস্যার কিছুটা সমাধান করার একটা প্রচেষ্টা হয়েছিল। সেখানে বহুতলের ভিতরেই বস্তিবাসীদের পূনর্বাসনের ব্যবস্থা হয়েছিল। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত সকলকেই একই এলাকায় পরিকল্পিতভাবে রাখার সেই প্রচেষ্টা ভালো উদ্যোগ সন্দেহ নেই। আর এটা শুধু এক রাজারহাট দিয়ে হবে না। কলকাতার আশেপাশের এলাকাগুলোতে ফাকা জায়গা বেছে নিয়ে এই ধরনের পরিকল্পিত নগরায়ন ঘটাতে হবে। যেখানেই নগরায়ন হবে, সেখানেই বস্তিবাসীদের বসবাসের উপযুক্ত ব্যবস্থা সরকারকেই করে দিতে হবে। নতুন নতুন নগর বানাতেই হবে। নইলে শহরে ছুটে আসা এত মানুষের জায়গা কোথায় হবে? তাই নগরায়ন হোক, উন্নত শহর হোক, বিলাসবহুল ইমারত হোক। পাশাপাশি থাকুক বস্তিবাসী মানুষদের জন্য উপযুক্ত বাসস্থানের ব্যবস্থাও। আর এটা শুধু কলকাতা, দিল্লী বা মুম্বই নয়, ঢাকা থেকে লন্ডন সব শহরের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




