ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকা, সংক্ষেপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সাম্প্রতিককালে সারা পৃথিবীতে যাদের দাপট অবিসংবাদিত। দেশটির সম্পর্কে সারা পৃথিবীর মানুষেরই কৌতুহলের অন্ত নেই। ভালোমন্দ নানা কাহিনী নিয়েই আমেরিকা। দেশটির চোখধাঁধানো উন্নতি, জৌলুস, আভিজাত্য, সাফল্য নিয়ে যেমনি সুনাম আছে, তেমনি আছে যুদ্ধবাজ, যুদ্ধাপরাধ, আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী নীতি নিয়েও বদনাম। ইদানীং সেখানকার আর্থিক বিপর্যয়, বেকারী, তীব্র মন্দা নিয়েও ইদানীং নানা কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু আমেরিকার মানুষের ব্যাক্তিগত নিরাপত্তা ও আভ্যন্তরীন ব্যাক্তিগত সন্ত্রাস নিয়েও ইদানীং কিছু প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। যার জন্য খুব সহজেই দায়ী করা যেতে পারে আমেরিকার বন্দুক সংস্কৃতিকে।
বিশ্বজুড়ে আধিপত্য বজায় রাখতে গিয়ে দেশে দেশে লক্ষ লক্ষ সেনার সমাবেশ ঘটানো, আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত হওয়া, সীমাহীন সামরিক অস্ত্র মজুত করার বিষয়টি আমেরিকার জাতীয় নীতি। সেই বিষয়ে নানা লেখা, নানা কথা অনেকদিন ধরেই শোনা যায়। কিন্তু আমেরিকার সাধারন মানুষের অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে আমরা কতটুকুই বা জানি। আসুন জেনে নিই সেই কাহিনী।
আমেরিকার অস্ত্রসজ্জার জাতীয় নীতির সাথে সাযুজ্য রেখেই সেখানকার নাগরিকেরাও হয়ে উঠেছেন আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত। যার ফলে সেখানে বেড়েই চলেছে অসংখ্য অপরাধের ঘটনা। ব্যক্তিগতভাবে বন্দুক ব্যবহারের বিষয়টি আমেরিকার নাগরিকদের কাছে গৌরব ও আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ঠিক একইভাবে বন্দুক ব্যবহারের বিষয়টি এখন সেই দেশের আভন্তরীন নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। আর এই বন্দুক ব্যবহারের অধিকার আমেরিকার নাগরিকদের দিয়েছে সেদেশের সংবিধানই। এটা তাদের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকারও বটে। আর পাচঁটা দেশের নাগরিকদের হাতে যেমন আকছার মোবাইল ফোন হাতে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়, আমেরিকার নাগরিকেরা ঠিক তেমনভাবে বন্দুক নিয়ে ঘুরে বেড়ান। যেটা শুনলে সারা পৃথিবীর মানুষ একটু অবাকই হবেন। একজন শিক্ষক বন্দুক হাতে স্কুলে যাচ্ছে, ছাত্রও যাচ্ছেন বন্দুক হাতে। অফিসে যেতে বন্দুক, বাজারে যেতেও বন্দুক, বেড়াতে যেতেও বন্দুক। বিয়েবাড়ী থেকে নাইট পার্টি, চার্চ থেকে পার্লামেন্ট সব জায়গায় আমেরিকার নাগরিকদের বন্দুক ছাড়া চলাচল ভাবাই যায়না। সোজা কথায়, আমেরিকার জীবন সংস্কৃতির অঙ্গই এই বন্দুক সংস্কৃতি। বন্দুক ছাড়া আমেরিকানদের ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, সমাজ জীবন ভাবাই যায়না। পৃথিবীর সবচেয়ে সশস্ত্র সমাজ বলে যদি আমেরিকানদের অভিহিত করা হয়, সেটা একেবারেই অত্যুক্তি হবে না।
আমেরিকান সরকারের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সেদেশের নাগরিকদের হাতে আছে প্রায় ২৫ কোটির কাছাকাছি বন্দুক। এটা সরকারী আইনি লাইসেন্সধারী বন্দুক, বেআইনী ব্যবহার করা বন্দুকের হিসাব এখানে ধরা হয়নি। তার মানে প্রায় অর্ধেক পরিবারের হাতেই অন্ততঃ একটি করে বন্দুক আছে। জেনিভা’র ‘গ্র্যাজুয়েট ইন্সটিটিউট অফ ইন্টারন্যশনাল স্টাডিজ’ তাদের ২০০৭ সালে করা ‘স্মল আর্মস সার্ভে’ রিপোর্টে বলেছে, ‘আমেরিকার প্রতি ১০০ জন মানুষ পিছু ৯০ টি করে বন্দুক আছে।’ এই সমীক্ষা হয়েছিল সরকারী বিভিন্ন রিপোর্ট এর ভিত্তিতে। আর এই রিপোর্ট প্রকাশের পরে আমেরিকার সরকার কোন প্রতিবাদ না জানানোর ফলে ধরেই নেওয়া যায়, এই সমীক্ষায় আমেরিকার সরকারের কোন আপত্তি নেই।
সারা পৃথিবীতে ব্যক্তিগতভাবে মানুষের হাতে বন্দুক আছে প্রায় ৯০ কোটি। যার মধ্যে আমেরিকানদের হাতেই আছে প্রায় ৩০ কোটি। আবার সারা পৃথিবীতে প্রতি বছর তৈরী হয় প্রায় ৯০ লক্ষ বন্দুক। যার মধ্যে আমেরিকানরাই কিনে নেয় ৪৫ কোটি। এত বন্দুক আমেরিকানদের হাতে, যা ভাবাই যায় না। এত বন্দুক আর কোন দেশের মানুষ ব্যবহার করে না। ব্যক্তিগত বন্দুক ব্যবহারের নিরিখে আমেরিকার পরেই আছে ভারত, চীন, জার্মানী, ফ্রান্স, পাকিস্থান, মেক্সিকো, ব্রাজিল ও রাশিয়া। কিন্তু এইসব দেশের নাগরিকদের ব্যবহৃত বন্দুকের সংখ্যা খুবই কম।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, গৃহযুদ্ধরত আরবের দেশগুলো, আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতেই বুঝি ব্যক্তিগত বন্দুক বেশী ব্যবহার হয়। বাস্তবে সেটি একেবারেই ভূল। যেসব দেশে দিনরাত সংঘর্ষ লেগেই আছে, যেমন নাইজেরিয়া- সেখানেও ব্যক্তিগত বন্দুকের সংখ্যা হাতে গোনা। কিন্তু কেন আমেরিকানদের এত বন্দুক ব্যবহারের রীতি?
আসলে বন্দুকের মালিকানার ব্যপারটি অর্থনৈতিক শ্রীবৃদ্ধির সাথে জড়িত। খরচ করার মতো অতিরিক্ত টাকা থাকলে তবেই তো তিনি অস্ত্র কিনবেন। তাই আমেরিকার সচ্ছ্বল, অগাধ সম্পদের মালিক, যারা নিজেদের জীবনে প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তারাই বন্দুক কেনেন। আর এই সংখ্যাটা আমেরিকাতে খুবই বেশী। নিজেদের জীবন ও সম্পদ রক্ষার জন্য তারা বন্দুক ব্যবহার করেন। ভোগবিলাসের জন্য যেমন টাকা দরকার, আবার সেই টাকা ও সম্পদকে রক্ষা করার জন্যও তাদের বন্দুক দরকার। অপরদিকে, যারা সারাদিন নিজেদের জীবনযাপনের জন্য উদয়াস্ত পরিশ্রম করতে থাকেন, তাদের টাকা ও সম্পদ কম। তাদের বন্দুকের প্রয়োজনও নেই, আবার কেনার সামর্থ্যও নেই। তাই অন্যান্য দেশগুলোতে বন্দুক সংস্কৃতি আমেরিকার থেকে অনেকাংশেই কম। বৃহৎ ধনতান্ত্রিক পুজিবাদী আমেরিকার সমাজে প্রাচুর্য ও টাকার জোরে জীবন ধারনের ন্যুনতম চাহিদার বাইরে এমন কিছু পন্য ও পরিষেবা হাজির হয়, যা আভিজাত্য বা গৌরবের প্রতীক। তাদের ব্যক্তিগত গাড়ী, বিলাসবহুল বাসস্থান, দামী মদ্যপান, যথেচ্ছ যৌনাচার এগুলো স্ট্যাটাস সিম্বল। বন্দুক রাখার ব্যপারটিও তেমনই স্ট্যাটাস সিম্বল। বলা যেতে পারে অতিরিক্ত মর্য্যদার প্রতীক।
আমেরিকার এই বন্দুক সংস্কৃতির ব্যপক প্রসারের ক্ষেত্রে বন্দুক উৎপাদন কোম্পানীগুলোর ভূমিকাও অনস্বীকার্য। তারা নিজেদের মুনাফার জন্য সরকারকে বন্দুক ব্যবহার আইনী করতে প্রভাব খাটায়। বন্দুক ক্রয়-বিক্রয়ের কঠোর আইনকে শিথিল করতে সরকারকে প্ররোচিত করে। সাহিত্য, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র, বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বন্দুক ব্যবহারের জন্য মানুষকে উৎসাহিত করে। যুবসমাজকে বোঝানো হয় যে, বন্দুক হল এডভেঞ্চারের প্রতীক, হিরোইজমের প্রতীক।
আমেরিকা যতই নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ বলে জাহির করুক, যতই বলুক মুক্ত গনতন্ত্রের প্রতিভূ, যতই উন্নত-আধুনিক-সভ্য বলে প্রচার করুক, বাস্তবে আমেরিকানরা যথেষ্টই তার বিপরীত। আর বিপরীত বলেই তারা নিরাপত্তার অভাব বোধ করে, ব্যক্তিগত বন্দুক ব্যবহার করে হিংস্র হয়ে ওঠে। গত কয়েক দশকে একের পর এক আমেরিকান ব্যক্তিগত বন্দুক ব্যবহার করে অসংখ্য নিরপরাধ মানুষকে খুন করেছে। যেগুলি বড় বড় ঘটনা, সেগুলি প্রচারমাধ্যমের দৌলতে প্রকাশ্যে এসেছে। অনেক ঘটনা চাপা পড়ে গিয়েছে, জানতে পারেনি বিশ্ববাসী। আমেরিকায় প্রতিদিন গড়ে ১০ জন বাচ্চা ব্যক্তিগত বন্দুকের গুলিতে মারা যাচ্ছে। বছরে ১৬ হাজার আমেরিকান নিজের বন্দুকের গুলিতে আত্মহত্যা করছে। ১৯৬১ সালে প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি হত্যার পর থেকে এই ধরনের ঘটনা ঘটেই চলেছে। ১৯৬৬ সালে টেক্সাসে ১৪ জন, ১৯৮৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়াতে ২১ জন, ১৯৮৬ সালে ওকলাহামারে ১৪ জন, ১৯৯১ সালে টেক্সাসে ২৩ জন, ১৯৯৯ সালে কলম্বাইনে ১২ জন, ২০০৬ সালে পেনসিলভানিয়াতে ৫ জন, ২০০৭ সালে ভার্জিনিয়াতে ৩২ জন, ২০০৮ সালে নর্দান ইলিনয়ে ৬ জন, ২০০৯ সালে টেক্সাসে ৭ জন, ২০১০ সালে ভার্জিনিয়াতে ৫ জন নিরীহ ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, সরকারী কর্মচারীকে হত্যা করা হয়েছে
ব্যক্তিগত বন্দুক ব্যবহার করে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই হত্যাকারী নিজেও আত্মঘাতী হয়েছে।
এর থেকে একটা জিনিস পরিস্কার, আমেরিকায় সাধারন মানুষের নিরাপত্তা যথেষ্ট নেই। সরকার সেই নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ বলেই নাগরিকেরা বন্দুক আর আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছে। আমেরিকার তীব্র বেকারী, কাজ হারানো, বিপুল বৈভবের মাঝে তীব্র হতাশা, যথেচ্ছ যৌনাচার, বেলেল্লাপনা, মদ্যপান আমেরিকানদের কি তাহলে নিরাপত্তাহীন ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে? একদিকে বাইরের সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের হামলা, আরেকদিকে ঘরের ভিতরে বন্দুকরাজ- সবে মিলে সত্যিই কি সুখে আছেন বারাক ওবামা? ওয়াল স্ট্রীট আন্দোলনের যা গতিপ্রকৃতি, তাতে মনে হয়না সুখে আছেন ওবামা এবং আমেরিকানরা। দেখাই যাক, ভবিষ্যতই বলবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




