কি বলব, ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। বাংলাদেশের আপামর মানুষের কাছে অত্যন্ত লজ্জিত একজন ভারতবাসী হিসাবে। গতবছর বাংলাদেশে গিয়েছিলাম "ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী সাইকেল র্যালী" তে। আমরা সাধারন বাঙালি ভারতবাসী। আমাদের তেমন কোন ক্ষমতাই নেই, তবুও আমাদের কাছে পেয়ে বিভিন্ন আলোচনা সভাগুলোতে বাংলাভাষী মানুষেরা বারবার বলছিলেন পানি-চুক্তির বিষয়ে। আমরা বলেছিলাম, ভারত বাংলাদেশের বন্ধু; মুক্তিযুদ্ধেও পাশে ছিল, পানি-চুক্তিতেও পাশে থাকবে। বাংলাদেশের কোন ক্ষতি হয়, এমন কাজ কখনই ভারত করবে না। তাই খুব আশাবাদী ছিলাম, এবারে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরে অনেকগুলি সমস্যার সমাধান হবে। সবই ঠিক ছিল, দুই দেশের মৈত্রীর একটা সুন্দর সুযোগ এসে গিয়েছিল। কিন্তু, তীরে এসে তরী ডুবে গেল এক বঙ্গভাষী উচ্চাকাঙ্ক্ষী, অপরিণত, অস্থিরমস্তিস্ক, দায়িত্বজ্ঞানহীন মহাম্মদ-বিন-তুঘলকের সিদ্ধান্তের জন্য। যার নাম মমতা ব্যানাজী। তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীও বটে।
এমনটা তো নয় যে, এই চুক্তির খসড়া হটাৎ করে তৈরি হয়েছে। পানি-চুক্তির দাবিও যেমন দীর্ঘদিনের, তেমনি চুক্তির আলোচনাও চলেছে দীর্ঘদিন ধরেই। অনেকগুলি প্রযুক্তিগত, ভূগোলগত সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়কে সামনে রেখেই এই চুক্তির খসড়া তৈরি করেছিলেন দুই দেশের বিভাগীয় সচিব ও মন্ত্রীমণ্ডলীরা। ভারতে কংগ্রেস-বিজেপি উভয় জোটেরই মমতা ব্যানাজী মন্ত্রীমণ্ডলীর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য দীর্ঘকাল ধরেই। ফলে তিনি বিষয়টি কিছুই জানতেন না, এমনটা ঠিক নয়। আর না জেনে থাকলে সেটা তাঁরই ব্যর্থতা। আর এখন তিনি ভারতের একদিকে কেন্দ্রের, আরেকদিকে রাজ্যের- দুই ক্ষেত্রেরই মহাশক্তিশালী ক্ষমতাধর নেত্রী। তিনি এই সেদিনও বেনাপোল সীমান্তে বলে এলেন, বিভিন্ন চুক্তি সম্পাদনা করতে প্রধানমন্ত্রীর সাথে বাংলাদেশে যাচ্ছেন। বাংলাদেশিরাও ওনাকে সীমান্তে ভিড় করেছিলেন দেখতে। দুই দেশের প্রচারমাধ্যমেও তাঁর বক্তব্য প্রকাশিত হল গুরুত্ব দিয়েই। কিন্তু ঠিক চুক্তির দুদিন আগে বাগড়া দিয়ে বসলেন- "এই চুক্তিতে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষতি হবে, তাই আমি বাংলাদেশ সফরে যাব না"। বিব্রত, হতাশ, ব্যথিত হলেন দুই দেশের শীর্ষনেতা থেকে সাধারন মানুষ। উৎফুল্ল, উল্লসিত হল দুই দেশের মৈত্রীবিরোধী, সাম্প্রদায়িক শক্তি। পানি-চুক্তি চলে গেল বিশ বাও জলে। ফলে এবারের দুই দেশের চুক্তিপর্বটি থেকে গেল অসম্পূর্ণ।
কিন্তু কেন এমনটা করলেন মমতা ব্যানাজী? মনে রাখতে হবে, তিনি এমন একটি দলের শীর্ষনেত্রী, যেখানে তিনিই প্রথম ও শেষ কথা বলেন। তিনি কেবলমাত্র একটি রাজ্যের ক্ষমতায় আসীন হবার জন্য ভারতের জাতীয় কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে নতুন দল গঠন করেছিলেন। তাঁর জন্য চরম সাম্প্রদায়িক বিজেপি, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, শিবসেনার সাথে জোট গড়ে মন্ত্রিত্বেও গিয়েছিলেন। হাজার হাজার মুসলিম-খ্রিস্টান নিধনকারী গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা-ফুল পাঠাতেও তিনি দ্বিধাবোধ করেননি। আবার কট্টর সন্ত্রাসী মাওবাদীদের বা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাথে হাত মেলাতেও তিনি কুণ্ঠিত হন না। পুনরায় কংগ্রেসের সাথে জোট গড়তেও তাঁর কুণ্ঠা হয়না। মুসলিম দরদী হতে আজান কিমবা রোজা পালনের ভেক ধরতেও তিনি ওস্তাদ। বলা যেতে পারে, ভারতের এক অস্থিরমতি, সকাল বিকালে দলবদলে পারদর্শী এক রাজনীতিক।
আর ইতিহাস কি বলে? মনে পড়ে, নয়ের দশকে যখন দুই দেশের ভিতরে ছিটমহল বিনিময় হয়েছিল, বা যখন গঙ্গার পানি-চুক্তি হয়েছিল- তখন বিজেপির সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে তিনি তাঁর বিরোধিতা করেছিলেন। সমাবেশ হয়েছিল সীমান্তে। জিগির তোলা হয়েছিল হিন্দুত্তের নামে। সেই চুক্তি রুপায়নকারী শ্রদ্ধেয় জ্যোতি বসুকে কটূক্তি করে তাঁর দলের সমর্থকেরা বলতেন- "বাংলাদেশের তাঁবেদার মোহাম্মদ জ্যোতি বসু বাংলা থেকে দূর হটো"। এই ইতিহাস কি কোনদিন মুছে ফেলা যাবে?
আজ পশ্চিমবঙ্গের থেকে যখন বামশাসনের অবসানে মমতা ব্যানাজী ক্ষমতায় এলেন, ভারত-বাংলাদেশের একটা অংশ উৎসাহিত হয়েছিলেন। কিছুদিন আগে আওয়ামী লীগের সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে মমতা ব্যানাজীর পরিবর্তনের উদাহরনের প্রসঙ্গ এনে আনন্দিত হতে দেখে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থীদের পরাজয়ে বাংলাদেশের বামপন্থীদের ঠেস দেওয়া খুব সহজ, কিন্তু মমতা ব্যানাজীর উত্থানে বাংলাদেশের কত বড় ক্ষতি হচ্ছে, সেটা আশা করি সচেতন বাংলাদেশিরা বুঝবেন। পশ্চিমবঙ্গের শান্তি বজায় থাকাটা বাংলাদেশের পক্ষে কতটা নিরাপদ, সেটা যেমন ঠিক। তেমনি, পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশ বিরোধী শক্তি ক্ষমতায় থাকলেও বাংলাদেশের পক্ষে তা ক্ষতিকর।
আপামর ভারতবাসী কিন্তু কখনোই বাংলাদেশের শত্রু নয়। বাংলাদেশে এবার একটা অংশ ভারতবিরোধী জিগির আরও জোরালো করে তুলবেই। সেটা সামলাতেও হবে বাংলাদেশ সরকারকে। আসুন আমরা সবাই মিলে এই পানি-বণ্টন চুক্তি নিয়ে শত্রুদের মুখোশ খুলে দিই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




