ছিটমহল। আপাত দৃষ্টিতে নিরীহ এই পাঁচ অক্ষরের শব্দটি শুনেছেন অনেকেই। কিন্তু দেখেছেন, এমন মানুষ হাতেগোনা। সেই হাতেগোনা মানুষদের আমি একজন। অনেক আগে সামান্য সময়ের জন্য সেই দেখায় কোন অনুভুতি ছিল না, কারন তখন এর ইতিহাস ও সমস্যার কথা জানা ছিল না। কিন্তু জানার পরে আর যাবার সময় ও সুযোগ হয়ে ওঠেনি। সম্প্রতি ছিটমহল বিনিময় চুক্তিকে কেন্দ্র করে ছিটমহল আবার উঠে এসেছে প্রচার মাধ্যমের আলোয়। তবুও সেই আলোর দেখা এখনও শত যোজন দূরেই রয়ে গেছে ছিটমহলের মানুষদের। কয়েক পুরুষের সেই আলোর প্রতীক্ষা আরও কতকাল বয়ে বেড়াতে হবে, এ প্রশ্নের জবাব দেবে সময়। তবুও আসুন জেনে নিই ছিটমহলের ইতিহাস, সমস্যা ও সমাধানের পথ।
তখন মোঘল আমল। পাল রাজবংশের পতনের পর ত্রয়োদশ শতাব্দীতে কামরূপ রাজ্য ভেঙ্গে পূর্বাংশে অসম ও পশ্চিমাংশে কামতা রাজ্যের উদ্ভব ঘটে। কামতা রাজ্য প্রথমে খেনদের শাসনাধীনে ছিল। পরে ১৪৯৪ সালে আলাউদ্দীন হুসেন শাহ তাদের বিতাড়িত করে শাসনক্ষমতা দখল করে। কিন্তু সামন্তদের উপর তিনি প্রভুত্ব বিস্তারে অসমর্থ হলে ১৫১৯ সালে বিশ্ব সিংহ তাঁকে পরাজিত করে কোচ রাজবংশের পত্তন ঘটায়। এরপরে মোগল সম্রাট আকবরের সময়ে কোচ রাজ্য সাময়িকভাবে ভাঙ্গাগড়ার মধ্যে দিয়ে গেলেও এই সময় থেকেই কোচবিহার একটি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী রাজ্য হিসাবে পরিণত হয়। কখনো কখনো মোগল, ভুটান, ব্রিটিশদের সাথে বিবাদ-সন্ধির মধ্যে দিয়েই কোচবিহার রাজ্য তাঁর স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখে। বিশ্বসিংহের পরবর্তী বংশধর নর, লক্ষ্মী, বীর, প্রান, মোদ, বাসুদেব, মহেন্দ্র, রূপ, উপেন্দ্র, দেবেন্দ্র, ধৈর্যেন্দ্র, রাজেন্দ্র, ধরেন্দ্র, হরেন্দ্র, শিবেন্দ্র, নরেন্দ্র, নৃপেন্দ্র, রাজরাজেন্দ্র, জিতেন্দ্র, জগদ্দিপেন্দ্রনারায়ণ ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত স্বাধীনভাবে রাজত্ব করতে পেরেছিল। শেষদিকে কয়েক বছর কোচবিহারকে ব্রিটিশরা "প্রিন্সলি স্টেট' হিসেবে ঘোষণা করে। ব্রিটিশরা এই দেশ ছেড়ে চলে যাবার পরে কোচবিহার ভারতের সাথে যুক্ত হয়। তারপরে সেটি পশ্চিমবঙ্গের একটি জেলা হিসাবে পরিচিতি লাভ করে।
ছিটমহলের ইতিহাসের সাথে এই কোচবিহারের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। মোগল আমলে কোচবিহার রাজ্যের দক্ষিনে রংপুরের কিছু এলাকা আকবরের সেনাপতি মানসিংহ দখল করে নিজেদের অধীনে নিয়েছিল। এই রংপুরের রাজাদের সাথে কোচবিহারের রাজাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকেই বিবাদ অ ক্ষমতা জাহিরের লড়াই ছিল। বলা হয়, সেই সময় তিস্তা নদীর পাড়ে উভয় রাজাদের মধ্যে দাবা ও তাস খেলার প্রতিযোগিতা চলতো। প্রতিযোগিতার পুরষ্কার বা বাজি হিসাবে রাখা হতো এক টুকরো কাগজ, যাতে লেখা থাকতো নিজ নিজ রাজ্যের কোন একটি এলাকার নাম। বিজয়ী রাজা সেই এলাকার দখল নিত। কখনো কখনো ঋণ পরিশোধের কারনেও কিছু কিছু এলাকা দিয়ে দেওয়া হতো। এভাবেই একটি রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন বা ছিটকে যাওয়া এলাকাগুলি অন্য রাজ্যের অধীনে চলে যায়। পরবর্তীতে যেগুলি ছিট এলাকা বা ছিটমহল বলে পরিচিতি লাভ করে।
এতে করে সেইসব ছিটমহলের বাসিন্দাদের সেই আমলে খুব বেশি অসুবিধার কোন কারন ছিল না। কিন্তু সমস্যার সৃষ্টি হয় ব্রিটিশ রাজত্বের অবসানে দেশ বিভাজনের পরে। যখন রংপুর চলে যায় পূর্ব পাকিস্থানে এবং কোচবিহার চলে যায় ভারতে। সমস্যার শুরু এখানেই। এই সমস্যা হবে জেনেই ব্রিটিশরা কিন্তু কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল। তারা "রেডক্লিফ কমিশন' গঠন করে দেশবিভাজনের সীমানা নির্ধারণের কাজ করেছিল। কিন্তু রেডক্লিফের অদূরদর্শিতা, উভয় দেশের রাজাদের স্বার্থ, স্থানীয় জমিদারদের লোভ, তৎকালীন কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও হিন্দু মহাসভার নেতৃত্বের নিকটস্থ চা বাগান মালিক ও ভূস্বামীদের প্রতি স্বজনপোষণ করতে গিয়ে সীমানা নির্ধারণের কাজটি সঠিকভাবে হতে পারেনি। ফলে একদিকে যেমন স্থানীয় মানুষের সাথে আলোচনা ছাড়াই তাদেরকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে অন্যদেশে, অপরদিকে ছিটমহল এলাকাগুলির মানুষেরা হয়ে গিয়েছেন নিজভুমে পরবাসী। সমস্যার শুরু সেখানেই।
ছিটমহলের বাসিন্দাদের জীবন এক কথায় দুর্বিষহ। বাংলাদেশের ভিতরে আছে ভারতের ১১১ টি ছিটমহল, আর ভারতের ভিতরে রয়েছে বাংলাদেশের ৫১ টি। এই ১৬২ টি ছিটমহলের বাসিন্দাদের শুধুই আছে "নেই' এর গল্প। মোট ২৪২৬৮ একরের এই ছিটমহল গুলিতে মোটামুটি অধিবাসী এক লক্ষ সত্তর হাজার। যার এক লক্ষ ভারতবাসী। বাকি সত্তর বাংলাদেশী। তাঁদের জন্য কোন দেশের সরকারের কোন পরিষেবা নেই। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাস্তা, পানীয়, বিদ্যুৎ, সেতু, হাটবাজার, পুলিশ প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা, ভোটাধিকার, কর্মসংস্থান, কিছুই নেই। আছে শুধু ছয় দশক ধরে তীব্র বঞ্চনা, সরকারী প্রতিশ্রুতি, চোরাকারবারি, মাদকপাচার, সীমান্ত সুরক্ষা বাহিনীর অত্যাচার আর অশিক্ষা। প্রায় নব্বই শতাংশ মানুষ এখানে নিরক্ষর। বলা যেতে পারে এই ছিটমহলগুলি যেন দুই দেশের "ফিলিস্তিন'।
তাহলে কি এই ছিটমহলবাসীদের সমস্যার কোন সমাধান নেই? সমাধান আছে। সেই লক্ষ্যে ১৯৫৮ সালে হয়েছিল ভারত পাকিস্থানের মধ্যে নেহেরু-নুন চুক্তি। কিন্তু ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এক আদেশের কারনে তা বাস্তবায়িত হতে পারেনি। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে ১৯৭৪ সালে হল ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি। কথা ছিল, দুই দেশের পার্লামেন্টে ছিটমহল বিনিময়ের বিষয়টি পাস করানো হবে। বাংলাদেশে পাস হলেও ভারতে সেটি করানো যায়নি। ফলে সমস্যা সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। আবার ১৯৯২ সালে নরসিমা রাও-বেগম খালেদা জিয়া চুক্তি সম্পাদন করলেন। তাতেও কোন সুরাহা হয়নি। বিগত কয়েক বছর ধরে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলতে থাকে। বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় কমিটি আন্দোলন শুরু করে। শেষ পর্যন্ত গতবছর দুই দেশের সরকার কিছুটা ঐক্যমত্যে পৌঁছায়। সেইমতো দুই দেশের আধিকারিকেরা জমি জরিপ করে সীমানা নির্ধারণ ও ছিটমহল বিনিময়ের দিকে অগ্রসর হয়। এবছর ৬-৭ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদ এই বিষয়ে চূড়ান্ত চুক্তি করবেন বলে ঠিক হয়। পাশাপাশি আরও বিভিন্ন বিষয়ে চুক্তিও ছিল এই সফরের মধ্যে। কিন্তু জলঘোলা হতে শুরু করে "তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি' নিয়ে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি চুক্তি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে বাংলাদেশ সফর বাতিল করেন। ফলে বহু প্রতীক্ষিত এই সফরের পানিবণ্টন চুক্তির পাশাপাশি অন্য চুক্তিগুলিও চলে যায় বিশ বাঁও জলে। দিনের পর দিন অন্ধকারে পড়ে থাকা ছিটমহলের মানুষগুলো আলোর ক্ষীণ রেখার দেখা পেয়েও ডুবে যায় তীব্র হতাশার অন্ধকারে।
শেষ পর্যন্ত কি হবে, তা ছিটমহলের বাসিন্দারা তো জানেই না, জানে না দুই দেশের সাধারন মানুষ থেকে আমলা, রাজনৈতিক নেতারাও। কেউ জানে না আর কতকাল কাটাতে হবে ছিটমহলের অবরুদ্ধ জীবন। চারিদিকে যখন মানবাধিকার নিয়ে এত হইচই, চারিদিকে যখন শিক্ষা, পানীয়, বিদ্যুৎ, রাস্তা, সুষ্ঠু প্রশাসনের উন্নয়ন নিয়ে এত কথার ফুলঝুরি, তখন আমাদের পাশেই, নিজভুমে পরবাসী হয়ে, আমাদের মতোই বাংলাভাষী এক লক্ষ সত্তর হাজার মানুষের অমানবিকভাবে বাঁচা নিয়ে আমরা আর কতদিন চুপ থাকব? এই প্রশ্ন প্রতিবেশী দুই দেশের সবার কাছেই। আসুন, আর নয়, দীর্ঘ ছয় দশকের অন্ধকার, অবরুদ্ধ যন্ত্রণার নিরসনে আমরা সবাই সোচ্চার হই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




