বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্র-নজরুল পরবর্তী পর্যায়ে সুকান্তের আবির্ভাব স্মরণীয়। সুকান্তের কবিতায় বিষয় ও বক্তব্যের বহুমাত্রিকতা একটি নতুন সম্ভবনার ইঙ্গিত দেয়। সুকান্ত ভট্টাচার্য বুর্জোয়া রাজনীতির প্রভাব বলয় ভেঙ্গে নতুন সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে নিবেদিত থেকে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন, সমাজচেতনা ও মূল্যবোধের জাগরণে নিবেদিত থেকেছেন।
স্বল্প আয়ুর এই কবি পৃথিবীতে চলমান ঘটনা আর রাজনীতিতে সচেতন ছিলেন। কাব্যচর্চার সময় তাঁর খুব দীর্ঘ না থাকলেও তাঁর কবিতা পাঠকের কাছে আগ্রহ সঞ্চার করেছে। গবেষকরা তাঁর কবিতা থেকে নতুন নতুন দিক ও বিষয়কে আবিষ্কার করেছেন। কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়নি তাঁর কবিতা। প্রতিনিয়ত সুষমা ও ব্যঞ্জনায় পুষ্ট হয়ে মাধুর্যমন্ডিত হয়েছে। সমসাময়িক কবিদের কাব্যশক্তি পাঠককে আকৃষ্ট করেছিল। সেই কবিরা মানবিক মূল্যবোধ ও আশা নিরাশার দোলাচলে আন্দোলিত হয়ে কবিতাকে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখেছেন। কিন্তু সুকান্তের কবিতা বাস্তবের জগতে প্রবেশ করে জীবনের সুন্দর দিক, পৃথিবীর রূপ রহস্য ও মানবিক কল্যাণ বন্দনায় ব্যাপৃত। জীবন দর্শনজাত তাঁর কবিতায় ব্যঙ্গ বিদ্রূপ, দেশীয় ঐতিহ্য ও সমাজ চেতনার উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়।
বলা যেতে পারে সুকান্ত একটি আধুনিক কাব্যভাষার সৃষ্টি করেছেন। এখানেই অন্য কবিদের থেকে তার স্বতন্ত্রতা। তিনি গণমানুষের মুক্তির প্রেরনা সৃষ্টিতে মগ্ন ছিলেন। তাঁর প্রতিবাদী কন্ঠ বাঙ্গালী পাঠককে আকৃষ্ট করে রেখেছে সেই কারনেই। যেহেতু একজন প্রগতিশীল কবি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহ থেকে বিচ্যুত নন। সেহেতু চলমান ঘটনাপ্রবাহ ও ভবিষ্যৎকে তিনি প্রত্যক্ষ করেন সচেতনভাবে। খুব কাছে থেকে দেখা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা সুকান্তের কবিচিত্তকে আলোড়িত করে। দেশেদেশে বিক্ষোভ, নিরন্ন মানুষের হাহাকার ও প্রতিবাদ কবিতায় তুলে ধরে সুকান্ত নতুন ধারার কবিতা রচনা করেন। শিশু সুকান্তের সমাজের দুঃখগাঁথা সেইসব কৈশোরিক অনুভূতি ব্যক্ত হয়েছে অনেক কবিতায়। ছেলেবেলাতেই তিনি লিখছেন- 'বল দেখি জমিদারের কোনটি ধাম/জমিদারের দুই ছেলে রাম শ্যাম/রাম বড় ভাল ছেলে পাঠশালা যায়/শ্যাম শুধু ঘরে বসে দুধ ভাত খায়।' এই পোড়া দেশে ঘরে বসে যে দুধভাত খাওয়া যায় না, অভাব এসে দাঁড়িয়ে থাকে দরজায়, বিরূপ প্রকৃতি আর শোষণ বঞ্চনা মানুষের প্রতিরোধ শক্তি সঞ্চার করে, মানুষ প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠেন- সেটা কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে। ক্রমেই বন্ধুদের সান্নিধ্য ও বামপন্থী রাজনীতিবিদদের বক্তব্য, বিবৃতিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে সুকান্ত কবিতায় বিদ্রূপ ও বিপ্লবী চেতনাকে ধারণ করেন। তাঁর কবিতায় স্বজাতি ও স্বদেশের বিচিত্র রূপ চিত্রিত হয়েছে। তাঁর সৃজনশীলতা পাঠকমহলে তাকে স্বতন্ত্র অবস্থানে নিয়ে গেছে। কিশোর বয়স থেকে লেখালেখি করলেও সুকান্তের কাব্যপ্রতিভার বিকাশ ঘটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে। বিদেশীশক্তিগুলির দোর্দণ্ড প্রতাপ, মৃত্যুর বিভীষিকা, অসম প্রতিযোগিতা তার কবিচিত্তকে রক্তাক্ত করে। তার থেকেই উঠে আসে কবিতা- 'কেঁদেছিল পৃথিবীর বুক/গোপন নির্জনে/ধাবমান পুঞ্জ পুঞ্জ নক্ষত্রের কাছে/পেয়েছিল অতীত বারতা/মেরুদন্ড জীর্ণ তবু বিকৃত ব্যথায়/বার বার আর্তনাদ করে/আহত বিক্ষত দেহ মুমূর্ষু চঞ্চল/তবুও বিরাম কোথা ব্যাগ্র আঘাতের।' আবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকরের কবিতা সুকান্তকে আকৃষ্ট করেছিল। রবিঠাকুরের কবিতার মাঝে মুক্তির পথ খুঁজে পেয়েছিলেন। লিখেছিলেন- 'এখনো আমার মনে তোমার উজ্জ্বল উপ্সথিতি/প্রত্যেক নিভৃত ক্ষণে মত্ততা ছড়ায় যথারীতি।' আর মানবতাবাদ ও বিদ্রোহের সম্মিলন? ভয়াবহ মন্বন্তর, ফ্যাসিস্ট শক্তির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সুকান্ত জ্বলে ওঠেন, অত্যাচারের বিরুদ্ধে উচ্চকিত হয় তাঁর কন্ঠ। কবিতায় প্রতিবাদকে তুলে ধরেন ক্ষোভের সাথে- 'অবাক পৃথিবী। অবাক করলে তুমি/জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি/অবাক পৃথিবী। আমরা যে পরাধীন/অবাক, কি দ্রুত জমে ক্রোধ দিন দিন।' তার প্রতিবাদ আরও ধ্বনিত হয়- 'বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারিদিকে/আমি যাই তার-ই দিনপঞ্জিকা লিখে/এত বিদ্রোহ কখনো দেখিনি কেউ/দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ।' ঠিক একইভাবে কলম, চারাগা্ সিগারেট প্রভৃতি সামান্য বিষয়গুলোও কবির কাছে নতুন ব্যঞ্জনা নিয়ে ধরা দিয়েছে। আপন বক্তব্যে দুঃখী মানুষের আত্মকাহিনীতে লেখা কবিতা হয়ে যায় বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনাময়- 'রানার ছুটেছে তাই ঝমঝুম ঘণ্টা বাজছে রাতে/রানার চলেছে খবরে বোঝা হাতে রানার চলেছে, রানার/রাত্রির পথে পথে চলে কোন নিষেধ জানে না মানার/দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছোটে রানার-'। পাঠকরা রানার-এর জীবন কাহিনীতে একাত্ম হয়ে যায়। রোমাঞ্চিত হতে হয় বর্ণণার দক্ষতায়। জীবন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে যারা কবিতা রচনা করেন তারা চরিত্রের সঙ্গে মিশে যান। সুকান্ত তাদেরই একজন। সত্যি বলতে, একটি প্রবন্ধে সুকান্তের কথা লিখে শেষ করা বাতুলতা মাত্র। সুকান্তের লেখাগুলোকে নিয়ে মনে হয় অনন্তকাল লিখে গেলেও শেষ করা যাবে না।
কিন্তু দুঃখের হলেও সত্য, এমন কবির জন্মদিন বা প্রয়াণদিনে এই সময়ের বাঙ্গালীরা যেন উদাসীন। পাশাপাশি দুই দেশে জাতীয় কবি রবীন্দ্র-নজরুল যতটা প্রাধান্য পেয়েছেন সরকার বাহাদুরের কাছে, সুকান্তের জন্য জোটেনি তার ছিটেফোঁটাও। এমনিতে নানা ভাষাভাষী দেশে একজন বাঙ্গালী কবি হিসাবে ভারতে সুকান্ত চিরকালই ব্রাত্য। কিন্তু বাংলাদেশে? সেখানেও যেন সেই বঞ্চনারই পুনরাবৃত্তি। পাঠ্যপুস্তক থেকে স্মরণ অনুষ্ঠান, সরকারি উদ্যোগের অবহেলা আগের মতোই। যে কবি জীবদ্দশায় বাঁচার অধিকার পাননি, একটু খাদ্য, চিকিৎসার সুযোগ পাননি, সুযোগ পাননি নিজের একটা কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের- স্বাধীন ভারতে, স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁর প্রয়ানের পরেও কেন থাকবে সেই একই অবহেলা? কেন সুকান্তের নামে হবে না পুরস্কার? সরকারী অনুষ্ঠান, আকাদেমি, ছুটি ঘোষণা, ডাকটিকিট কেন হবে না সুকান্তের নামে? যখন যারা ক্ষমতাসীন হবেন, কেবল তাঁদের দলের প্রয়াতদের নামেই কেন থাকবে একের পড় এক প্রকল্প? এগুলোর অবসান জরুরি। নইলে আগামী প্রজন্ম আমাদের কি ক্ষমা করবে?
সুখের কথা, বাংলাদেশে ফরিদপুরের কোঠালিপাড়ায় সুকান্তের পৈতৃক বাড়ি অধিগ্রহন করে ৬৪ লক্ষ টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা হয়েছে। ভারতে সুকান্তের নিজ হাতে গড়া 'কিশোর বাহিনী' এখনো কাজ করে যাচ্ছে ছোটদের নিয়ে। বাংলাদেশে আছে 'সুকান্ত সংসদ'। এছাড়াও আছে সুকান্তকে নিয়ে দুই দেশেই নানা সংগঠন, বেশকিছু মানুষ। তারাই যা ভরসা। কিন্তু ভারতে এখনো অধিগ্রহন করা হয়নি সুকান্তের 'জন্মভিটে' বা নিজ হাতে গড়া বন্ধ হয়ে থাকা 'গ্রন্থাগার' বা সেই বিখ্যাত বাড়ি, যেখানে তিনি জন্ম দিয়েছেন অনেক কবিতার, সেই বেলেঘাটার '৩৪ হরমোহন ঘোষ লেন এর বাড়ি'টি। সুকান্ত অনুরাগীরা দুই দেশের সরকারের কাছে এই দাবিপূরণের প্রত্যাশা করে। প্রত্যাশা এই কারনেই, কারন সুকান্ত বলে গেছেন- 'নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার'।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




