আমরা সাধারনতঃ রবীন্দ্রনাথের সাদাকালো ছবি দেখতেই অভ্যস্থ। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের যে কিছু রঙ্গীন ফোটোগ্রাফ আছে, সে বিষয়ে আমরা বেশীরভাগ মানুষই অবগত নই। কোন পত্রপত্রিকাতেও রবীন্দ্রনাথের কোন রঙ্গীন ছবি এখনো দেখা যায় না। বিশ্বভারতীর প্রকাশিত কোন বইপত্রে এখনো কোন রঙ্গীন ছবির দেখা পাওয়া যায়নি। যেটুকু দেখা যায়, সেগুলি সবটাই পরবর্তীকালে হাতে আকা বা তৈরী করা। কয়েকমাস আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুটি রঙ্গীন ছবি দেখেছিলাম একটি বিদেশী ওয়েবসাইটে। কৌতুহলবশতঃ খোঁজখবর করতেই ওয়েবসাইট ঘেঁটে পেয়ে গেলাম বেশ নতুন কিছু তথ্য। সেগুলি তুলে ধরলাম পাঠকদের জন্য।
বিগত শতাব্দীর প্রথমার্ধে ফোটোগ্রাফ বা ছবি তোলার ব্যাপারটাই ছিল রীতিমত ব্যয়বহুল। আর সেটা শুধু আমাদের দেশে নয়, সারা পৃথিবীতেই। ফলে সেটা ছিল কেবলমাত্র বিত্তজনেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ১৮২০ সাল থেকে একটানা প্রচেষ্টা চালানোর পরে ফ্রান্সের যোশেফ নিপসি ১৮২৫ সালে প্রথম একটি প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি তুলেছিলেন। সেই ছবিটি তুলতে সময় লেগেছিল প্রায় ৮ ঘন্টা। তারপরে অনেক গবেষনার ভিতর দিয়ে ছবি তোলার ক্যামেরা বানিজ্যিকভাবে বাজারে এসেছিল ১৮৮৮ সালে। এর ঠিক পরেপরেই চলমান ছবি বা চলচ্চিত্র ধারনের ক্যামেরাও বাজারে এসেছিল। তবে তখনো পর্যন্ত সবটাই ছিল সাদাকালো ছবি তোলার পদ্ধতি। অপরদিকে ছবি তোলা নিয়ে গবেষনা দেশে দেশে চলছিলই। ক্যামেরা বাজারে আসার অনেক আগে ১৮৬১ সালে বিজ্ঞানী ম্যাক্সওয়েল ঙ্গীন ছবি তোলার পদ্ধতি আবিস্কার করলেও রঙ্গীন ছবি তোলার ক্যামেরা বাজারে এসেছিল বিগত শতাব্দীর শুরুতে ১৯০৭ সালে। কিন্তু সেইসব ক্যামেরা আমাদের পিছিয়ে পড়া এইসব দেশে এসেছিল আরো অনেক পরে। সেইসময় সাদাকালো ছবি তোলাটাই যেখানে ছিল স্বপ্ন, সেখানে রঙ্গীন ছবির কথা ভাবা আমাদের এইসব দেশে ছিল নেহাতই কষ্টকল্পনা।
তবুও কিছু মানুষ সারা পৃথিবীতেই থাকেন, যারা ইতিহাস সৃষ্টি করে যান। ফ্রান্সের আর্লবার্ট কান ছিলেন এমনই একজন মানুষ। ১৯০৯ সাল থেকে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত ‘আর্কাইভস অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামে একটি প্রকল্প তিনি শুরু করেছিলেন, প্রচুর অর্থ ব্যয় করে তিনি সারা পৃথিবীর বিভিন্ন ধরনের ছবি তুলে সেগুলি সংরক্ষন করার কাজ শুরু করেছিলেন। নিজের বাড়ি, বাগান ও ষ্টুডিওতে ধারনকৃত সেইসব ছবি আজও অমূল্য সম্পদ। সেই প্রকল্পের অঙ্গ হিসাবে ১৯২১ ও ১৯৩০ সালে দুই দফায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ফ্রান্সে আমন্ত্রন করে নিয়ে গিয়েছিলেন আর্লবার্ট কান। সেখানেই তোলা হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাদাকালো, রঙ্গীন কিছু ছবি। তোলা হয়েছিল নির্বাক কিছু সাদাকালো চলচ্চিত্রও। আর্লবার্ট কানের বাগানে তোলা সেইসব ছবি আমাদের কাছে একেবারেই অপরিচিত, অচেনা, অজানা। ১৯২১ সালে তোলা আর্লবার্ট কানের গোলাপী-সাদা ফুল আর সবুজ পাতার বাগানে তোলা আমাদের চিরচেনা পোশাকের রবীন্দ্রনাথকে দেখলে সত্যিই অবাক হতে হয়। আর একটি ছবিতে রবীন্দ্রনাথের সাথে আছেন, পরিবারের দুইজন মহিলা। সম্ভবতঃ সপরিবারেই ফ্রান্সে গিয়েছিলেন তিনি। এইসব ছবি আর্লবার্ট কানের মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। কিছু প্রকাশ করা হয়েছে তাদের ওয়েবসাইটেও। কিন্তু যেহেতু ওয়েবসাইটটি ফরাসী ভাষায়, সেহেতু সেগুলি আমাদের দৃষ্টির অগোচরেই রয়ে গিয়েছে।
আর আর্লবার্ট কানের উদ্যোগে তোলা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নির্বাক চলচ্চিত্রটির ইতিহাস আরো আকর্ষনীয়। মোট ৪ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের নির্বাক চলচ্চিত্রটি ১৯২১ আর ১৯৩০ সালে দুই বারে তুলে পরে একত্রিত করা হয়েছিল। দীর্ঘ ৯ বছরের ব্যবধানে দুই দফায় তোলা চিত্রগ্রাহকও ছিলেন পৃথক দুইজন। ক্যামেলি সাউভাগেত ও রজার দুমেজ নামক দুইজন ফ্রান্সের বিখ্যাত ফোটোগ্রাফারকে দিয়ে এই নির্বাক চলচ্চিত্রটি ধারন করা হয়েছিল। প্রায় শতবর্ষ আগের তোলা সেইসব রঙ্গীন ছবি, নির্বাক চলচ্চিত্রগুলি অমূল্য সম্পদ। সেগুলি আসা উচিত প্রকাশ্যে, রবীন্দ্রপ্রেমীদের জন্য, সাধারন মানুষের জন্য। প্রচারমধ্যমের মাধ্যমে সেইসব ছবি ছড়িয়ে পড়ুক সবার ঘরে ঘরে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




