মাঝে মাঝে মনে হয় আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল প্রবাস জীবন বেছে নেয়া। অথচ আর দশজনের মত আমার কখনই উন্নত দেশে উন্নত জীবন যাপনের স্বপ্ন ছিল না। আমি সবসময় চেয়েছিলাম নিজের দেশে একটা সাধারণ জীবন যাপন করতে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে আজ সে স্বপ্ন মৃতপ্রায়। তবে আশা রাখি একদিন ফিরে যাব বাংলাদেশে। জানি না সে পথ কত খানি। আর তাই হারিয়ে খুঁজি নিজেকে।
আমার শৈশব আর কৈশোর কেটেছে বাঁধনছাড়া স্বাধীনতা ও আনন্দের মাঝে। মা-বাবা দু'জনেই চাকরিজীবি হওয়াতে আমার স্বাধীনতার মাত্রাটা সমবয়সী বন্ধুদের কাছে ছিল ঈর্ষনীয়। স্কুলের বছর শেষে ছুটির দিনগুলোতে যখন আর সব সহপাঠীরা নতুন ক্লাসের অঙ্ক বই শেষ করতে বা নতুন নতুন ট্রান্সলেশন শিখে ইংরেজির ভান্ডার সমৃদ্ধ করতে ব্যস্ত থাকত, আমি তখন থাকতাম খেলাধুলায় মগ্ন। তবে আমার পিতৃদেব যে শিশু স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন তা নয়। কিন্তু আমার শিক্ষার প্রতি চরম অনীহা দেখে তার ধারণা হয়েছিল যে লেখাপড়া বোধহয় আমাকে দিয়ে হবে না। তাই উঠতে বসতে শোনা লাগত "তোকে দিয়ে কিছু হবে না। তোকে বলদ কিনে দিই, গ্রামে গিয়ে চাষবাস কর" । বলাইবাহুল্য আমি এই ঘটনা খুব রসিয়ে রসিয়ে বন্ধুদের বলতাম। আমার কথা শু েন একবার আমার বন্ধু রুশোর খুব মন খারাপ হলো। জিজ্ঞাসা করতে জানাল যে ওর পিতৃদেব নাকি হালের বলদও কিনে দেবেন না যা আমার পিতৃদেব দিতে সম্মত হয়েছেন। তাই সে ব্যাপারটা নিয়ে খুবই চিন্তিত ছিল। বলাইবাহুল্য এ ঘটনা শোনার পর রুশোর জন্য আমাদের বন্ধুমহলের দুশ্চিন্তা অনেক বেড়ে গেল। আর হালের বলদ কেনার টাকা যোগাড়ের ব্যাপারে যাবতীয় কুবুদ্ধি তাকে আমরা দিয়ে যেতে লাগলাম।
আব্বা বাসায় আসতেন দুপুর আড়াইটায়। খাওয়া-দাওয়া সেরে ঘন্টাখানেক ঘুম দিতেন। তারপর চলে যেতেন টেনিস খেলতে। বাসায় আসতে আসতে সন্ধ্যা 7টা। সন্ধ্যা 7টা থেকে 9টা ছিল আমার দিনের সবচেয়ে ডিসিপ্লিনড সময়। পড়াশুনার নাম করে বই বের করে চিৎকার করে বাড়ি মাথায় করতাম। আর বেশিরভাগ দিন পড়াশুনার নামে চলত ছোটবোনের সাথে খুনসুটি।
আব্বা ব্যস্ত থাকতেন বড়বোনকে নিয়ে। আমার বড়বোন বরাবরই ক্লাসের প্রথম সহানটা দখল করে রাখতেন। ওর এই সাফল্যে আমরা ছোট দুই ভাইবোন খুবই খুশি ছিলাম কারন 7 টা থেকে 9টা আব্বা ওকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। আমি এজন্য আমার আব্বাকে দোষারোপ করি না। উনি ধরেই নিয়েছিলেন যে উলুবনে মুক্তা ছড়িয়ে লাভ নেই। তবে স্বীকার করতে িদ্্বধা নেই আমার বড়বোনের কাছে আমি প্রচন্ড ঋণী। কারণ সিংহভাগ সময়ে আব্বার বড় স্টিম রোলার ওকেই হজম করতে হতো আর আমাদের ছোট 2 ভাইবোনের উপর চলত মিনি স্টিম রোলার। বড়দের যে অনেক ছাড় দিয়ে চলতে হয় এ শিক্ষা আমি সেসময়েই পেয়েছি।
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জানুয়ারি, ২০০৭ সন্ধ্যা ৭:০৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।







