কিছুদিনের মধ্যেই হুজুরের বাড়াবাড়ি সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল এবং আমি ফাঁকিবাজির ধান্ধা শুরু করলাম। আমি লক্ষ্য করলাম আব্বা সোয়া চারটা নাগাদ বাসা থেকে বেরিয়ে যান এবং আমার দায়িত্ব ছিল সিপারার প্রথম 12 টা সুরা পড়া। দু'য়ে দু'য়ে চার মিলাতে সময় লাগলো না। 12 টা সুরা ঠা ঠা মুখস্ত করে ফেললাম। যাকে বলে "মুখস্ত, ঠোঁটস্ত, হেপজো, ঝরঝরা" (আমার এক স্কুলের শিক্ষক এই কথা বলতেন)। হুজুর পড়ানো শুরু করলে আমি ধীরে-সুেসহ পড়া শুরু করতাম। যাকে বলে দেখেশুনে ব্যাট করা...পুরা জাভেদ ওমর স্টাইল।আব্বা বাসা থেকে বের হলেই চালু হয়ে যেত মুখস্তবিদ্যার এক্সপ্রেস ট্রেন, যাকে অ্যাডাম গিলক্রিস্টের ব্যাটিং বলা যায়। আর ফলাফল 5 মিনিটের মধ্যে কঙ্খিত মুক্তি।
হুজুর যে চেষ্টা করেন নি তা নয়, কিন্তু আগ্রহ যার নেই তাকে দিয়ে জোর করে কিছু করান খুবই কঠিন। তারপর পাত্র যদি হয় আমার মত সেয়ানা ঘুঘু, তাহলে তো কথাই নেই। এখানে একটা বিশ্লেষন দরকার, তা হলো শুধু শুধু একটা অর্থহীন কিছু থেকে শিক্ষালাভ করা আমার স্বভাবের বাইরে। আরবী পড়ে গেলাম, কিন্তু এক বর্ণ বুঝলাম না, এ জাতীয় অশিক্ষা লাভ আমি কখনই করিনি । আরেকটা কথা, জীবনে যখন মনে হয়েছে আমাকে অর্থহীন কিছু শেখান হচ্ছে, আমি কখনও শেখার চেষ্টা করি নি।
যেমন- বানরের তৈলাক্ত বাঁশে উঠার গাণিতিক সমস্যা। মানুষ আর বানরের বুদ্ধিমত্তা মোটামুটি কাছাকাছি। আমার ধারণা ছিল ও এখনও আছে যে বানর তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে উঠার প্রচেষ্টা কখনই করবে না। দু'একবার করে ওই বাঁশ ছেড়ে দিয়ে ভাববে "এই বাঁশে উঠলাম না।দেশে কি বাঁশের অভাব পড়েছে?" আরও একটা তাজ্জব ব্যাপার হলো কে সেই ব্যক্তি, যার কাজ নেই বাঁশে তেল মাখাতে যাবে?বলাইবাহুল্য এ জাতীয় গাণিতিক সমস্যা সমাধানে আমরা চেষ্টার অনেক ত্রুটি থাকত। আর আমার পিতৃদেব এই প্রাপ্ত সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিরাশি সিককার চড়-থাপ্পড় দিতে কার্পণ্য করতেন না। যাই হোক একইভাবে বাংলা ব্যকরণ ছিল আমার দু'চোখের বিষ। আমি কখনই ব্যকরণ পড়ার মানে খুঁজে পাই নি। এরকম অজস্র উদাহরন আছে আমার শিক্ষাজীবনে।
সংগীত চর্চার শুরুটা অবশ্য খারাপ ছিল না। আমার দৌড় ছিল ছড়া গান পর্যন্তএবং এই বিদ্যা আমার মন্দ লাগত না। কিন্তু ঘন ঘন শিক্ষক বদল আমার এই বিদ্যাশিক্ষার উপর অনীহা ধরিয়ে দিল। নতুন সংগীত শিক্ষক এসেই বলতেন আগে যা কিছু শিখেছি সব নাকি ভুল। তাই আবার সা রে গা মা থেকে শুরু করতে হবে। এসময় আমার বদ্ধ ধারণা জন্মে যায় যে আমাদের দেশের সংগীত শিক্ষার কোন স্ট্যান্ডার্ড নেই। যে যার মত শিখায় ও নিজেকে জাহির করার চেষ্টা করেন। তবে ব্যাপারটা যে বাংলাদেশে শুধু সংগীতের জগতে সীমাবদ্ধ নয় তা বোঝার মত জ্ঞান আমার তখনও হয় নি।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।







