..................................
কামালের মনটা ভালো নেই আজ। কাজে অনেক সমস্যা যাচ্ছে। যে ম্যাকডোনালডসে কামাল কাজ করে তার শিফট ম্যানেজারের সাথে আজ বিশাল ঝামেলা হয়েছে। ডেভিড সরাসরি জানিয়ে দিয়েছে যে কামালকে আগামী সপ্তাহ থেকে 5 ঘন্টার বাড়তি শিফট করতে হবে, তা না হলে ম্যানেজারের কানে ব্যাপারটা যাবে। ভীষন চিন্তায় আছে কামাল। তিনটা কাজের মধ্যে এই একটা কাজই সে ট্যাক্সে করে। বাকিগুলো ক্যাশে।ছাত্র হিসাবে সাপ্তাহিক 20 ঘন্টার বেশি ট্যাক্সে করা যায় না। ম্যাকডোনালডসের 9 ঘন্টার শিফট করে সে সপ্তাহে 2 দিন। আরও 5 ঘন্টা বাড়তি মানে 23 ঘন্টা কাজ করতে হবে সপ্তাহে। ম্যাকডোনালডসের মত কোম্পানি ক্যাশে কাজ করায় না। সব মিলিয়ে বিশাল ফাঁপর।
চিন্তা করতে করতে ড্রাইভওয়েতে গাড়ি ঢুকালো কামাল।লককর ঝককর মাকর্া 1986 সালের ফোর্ড লেজার। তিনটা কাজে যাওয়া পাবলিক ট্রান্সপোর্টে সম্ভব না। তাই কিছুদিন আগে অনেক ভেবেচিন্তে এই গাড়িটা কিনেছে। মূল্য মাত্র 1500 ডলার ছিল। প্রায় ভেঙ্গে পড়ার দশা গাড়িটার। তবে চলছে এবং আরও কিছুদিন চলবে।মুশকিল হলো এখানে গাড়ির রানিং কস্ট অনেক বেশি। তেলের বাড়তি দাম তো আছেই। তার উপর আছে বয়স 25 এর কম হওয়ার যন্ত্রনা। ইনশু্যরেন্স বেশি দিতে হয়, আবার গাড়ির রেজিস্ট্রেশনেও 350 ডলার বাড়তি দিতে হয়। আসলে গাড়ি কেনার পর থেকেই সে তৃতীয় কাজটা শুরু করেছে। কষ্ট হয় তবে গাড়িতে উঠলে কষ্ট দূর হয়ে যায়।
সিড়িতে উঠার সময় কামালের মনে পড়ল আজ জাকিরের রান্নার কথা। ব্যাটা আগের 2 দিন রান্না করেনি। একথা বললেই কৈফিয়ত দেয়া শুরু করে। এই তো গত বুধবার রান্না করে নি। কামাল চেপে ধরাতে বলেছিল পর পর 2 দিন রান্না করে দেবে এই সপ্তাহে। পর পর 2 দিন জাকির রান্না করবে এটা কামাল আশা করে না। করবে কেন? সংসারী গার্লফ্রেন্ড থাকলে খাওয়া নিয়ে কোন চিন্তা করতে হয়? শালার কপালটা ভালো। ভিসা এক্সপায়ার হয়ে গেছে 6 মাস আগে এখনও ধরা পড়েনি। আর কিছুদিনের মধ্যেই নাকি গার্লফ্রেন্ডকে বিয়ে করে রেসিডেন্সির এ্যাপ্লাই করবে। "ব্যাটা লুইচ্চা! বউ দেশে রেখে এখানে মেয়ে নিয়ে ফুর্তি করে।" মনে মনে গালি দিল কামাল।
সদর দরজা খুলেই কামাল বুঝতে পারে জাকির রান্না করেনি। রান্না করলে ঘ্রান আসার কথা। আর তাছাড়া জাকিরের কাজ শেষ হয় 6 টায়। এখন বাজে সাড়ে সাতটা। সেই হিসাবে এখনও রান্নাঘরে জাকিরের থাকার কথা। টেলিফোনের তার জাকিরের ঘরে গেছে দেখে কালাম বুঝল জাকির ফোনে দেশে কথা বলছে। "হারামজাদা, রাতে পিরিত করিস গার্লফ্রেন্ডের সাথে, আর ফোনে বউয়ের সাথে।" আবার গালি দিল কামাল। সে কিছু বলতে পারে না জাকিরের স্বেচ্ছাচারিতার বিপক্ষে। কারন বাসা জাকিরের নামে। কামালের নামে নয়। তাই বাড়ি ছাড়লে কামালের ছাড়া লাগবে। এই বাজারে জাকিরকে সপ্তাহে এক রুমের জন্য মাত্র 100 ডলার দেয়া লাগে। এটা যে কেউ লুফে নেবে। ডিম ভাজি আর লেবানিজ রুটিই ভরসা। ডিম ভাজি খেতে খেতে গত 1 বছরে মুখে কড়া পড়ে গেছে। তাও বিপদের বন্ধু ডিম। দীর্ঘশ্বাস ফেলে রান্নাঘরের দিকে রওনা দেয় কামাল।
চার
...................................
বিছানায় উঠে ফোনে ডায়াল করা শুরু করল জাকির। ভালো লাগছে না আজকে। শরীরটা খারাপ। কিন্তু ফোন করতে হবেই। বিরক্তিকর। কল্পনার সাথে কথা বলতে ইদানিং ভালো লাগে না। অল্পতেই খিটিমিটি লেগে যায়। আর মাত্র কয়েকটা দিন , তারপর মিলি ও সে আলাদা হয়ে যাবে।কল্পনার সাথে এই মেকি ভালোবাসার খেলাও তখন আর খেলতে হবে না। ফোন বাজছে ও পাশে। ফোন ধরেছে কল্পনা।
কল্পনা: হ্যালো
জাকির: হ্যালো। কেমন আছো?
কল্পনা: এই তো চলে যাচ্ছে। তুমি কেমন আছো?
জাকির:আছি কোন রকম।
কল্পনা: কোনরকম কেন? তোমার তো ভাল থাকার কথা। স্বপ্নের দেশে আছো।
জাকির:এই তো শুরু করে দিলে। আমি কি খারাপ থাকতে পারি না? শরীর খারাপ হতে পারে না?
কল্পনা: শরীর খারাপ নাকি? জ্বর হয়েছে নাকি? ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলে?
জাকির:নাহ সময় পাই নি।
কল্পনা: এত কি ব্যস্ত থাক যে ডাক্তারের কাছে যাবার সময় থাকে না?
জাকির:দেখ এখানে জীবনটা আলাদা। চাইলেও সব সময় সব হয় না। কতবার তোমাকে বলেছি একথা।
কল্পনা: আসলে তোমার কোনকিছু হয়নি। খামাখা ঢং করছ।
জাকির: ঢং? আমি? পারও তুমি। এজন্য মাঝে মাঝে মনে হয় ফোন করব না। আম্মার শরীর কেমন আছে?
কল্পনা: এহ..। ন্যাকামী রাখ। মায়ের শরীরের খবর জেনে কি লাভ? মা মারা গেলে তো তুমি বেঁচে যাও।
জাকির:কি উলটা-পালটা কথা বলছ? আসলে মাথাটা তোমার গেছে।
কল্পনা: হ্যাঁ। আমরা তো পাগলের গুষ্টি। মাথা তো আমাদের যাবেই। বিয়ে করে বউ রেখে গেছ আজকে 2 বছর। একবারও কি আসার কথা চিন্তা করনি?
জাকির: দেখ, আমি তোমাকে বার বার বলেছি আমার পক্ষে এখন আসা সম্ভব নয়। তুমি এসে পড় বরং।
কল্পনা: আমি কিভাবে আসব? মাকে কে দেখবে? একবারও কি তোমার ইচ্ছা করে না একেবারে চলে আসতে? আমার জন্য কি তোমার কোন ভালোবাসা নেই।
কাঁদতে শুরু করে কল্পনা। জাকির আস্তে করে ফোনটা রেখে দেয়। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। কম্বলটা টেনে নেয় জাকির। বৃষ্টির দিনে ঘুমানোর মজাই আলাদা।
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


