
জিয়া সত্যিই মুজিব হত্যা থেকে শুরু করে পরবর্তি ডামাডোলের অনেক কিছুই নিজ হাতে করেন নাই। কিন্তু এর সব কিছুই তিনি জানতেন। তিনি জানতেন যে, সেটা ঘটতে যাচ্ছে এবং তিনি হয়ত ঠিক করে রেখেছিলেন যে, ঘটে তো ঘটুক। অথবা তিনি হয়ত এর চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়েই ছিলেন বরাবর। অর্থাৎ তিনি ইচ্ছা করলে তা ঠেকাতে পারতেন। কিন্তু তা তিনি কেনইবা করতে যাবেন? এমনিতেই দেশের ততকালীন বিসৃংখলায় তিনি ছিলেন বিরক্ত এবং মুজিব সরকারকে সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি আরো সময় দিতেও মনে মনে প্রস্তুত ছিলেন না।
কেননা, সামরিক লোকজনের চিন্তা তো থাকে বন্দুকের মত। কেউ বিসৃংখলা করছে, তাকে গুলি করে ফেলে দিলেই তো হয়, সব মুহুর্তেই ঠান্ডা। তার জন্য বছরের পর বছর সময় নেওয়া কেন? কিন্তু রাজনীতি করতে গেলে যে অত সহজে সব কিছু ঠিক করে ফেলা যায় না, তা তো সামরিক লোকদের বোঝানো কঠিন। কারন, আজ যে ব্যক্তি বিসৃংখলা করছে, সে ব্যাক্তিই হয়ত গত ২০ বছর ধরে আমার পাশে থেকে সীমাহীন পরিশ্রম করে আমাকে ক্ষমতায় বসতে সাহায্য করেছে। তাই তার বিচার করা কি অতই সহজ একজন কৃতজ্ঞ মানুষের পক্ষে। যাহোক, এসব নিয়ে জিয়া তখন ছিলেন খুবই বিরক্ত।
আর তার পর এল রাষ্ট্রের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হবার নীল হাতছানী, যেটা কোটিতে একজনও উপেক্ষা করতে পারবে কিনা তা নিয়ে আমার এক কোটিগুন সন্দেহ আছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি হলে তো ক্ষমতায় যাওয়ার নেশায় অস্থির হয়ে আরো বেরাছেরা করে ফেলতাম। কিন্তু জিয়া পাকিস্তানের আইএসআই'র পরিকল্পনা, স্বাধীনতা বিরোধিদের মাধ্যম হয়ে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা, ফারুক রশিদদের আক্রশকে তার সঙ্গে একীভূত করা, কর্নেল তাহেরকে সেনাবাহিনীর ঐক্য নষ্টের সুযোগ দেওয়া ইত্যাদি কাজগুলি এত নিখুত ভাবে, ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পর্যবেক্ষন করেছেন এবং হয়তবা এগুলির সমন্বয়ও করে দিয়েছেন সব কিছুর ধরা ছোয়ার আড়ালে থেকে যার প্রসংশা আমি না করে পারি না।
বাংলাদেশে হেনরি কিসিঞ্জার টাইপের নেতা থাকলে জিয়াই ছিলেন। এবং একটি দেশের রাজনীতিকে এগিয়ে নিতে গেলে, তাতে যে শুধু আবেগই না, কুটনীতিরও প্রয়োজন আছে, বাঙ্গালীদের জিয়াই তা দেখিয়েছেন এবং শিখিয়েছেন। একটু লক্ষ্য করে দেখুন, মুজিবের হত্যাকান্ড থেকে জিয়ার ক্ষমতায় আসীন হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেকটি ঘটনা একই সুত্রে গাঁথা। পর্যবেক্ষন করলে যে কারো কাছে এটা পরিস্কার হয়ে যাবে যে এর প্রত্যেকটি ঘটনা জিয়ার জানা ছিল এবং এর পিছনে জিয়ার ইঙ্গিত বা যোগসাজস বা হাত ছিল। অথচ কোথাও তার হাতের বা পায়ের ছাপ নেই। কত দূরদর্শি মানুষ ছিলেন তিনি। কত বুদ্ধিমান?
প্রত্যেকটি মানুষেরই ভুল হয় এবং নিজে সেটা বুঝতে পারে না কেননা বুঝতে পারলে তো দুনিয়ায় কেউ ভুলই করত না। আমি বলব, জিয়াও একটি ভুল করেছিলেন তা হল, ক্ষমতার একটা পর্যায়ে এসে বাংলাদেশের রাজনীতি ও এদেশের অধিকাংশ মানুষ অনেকটা তাঁর নিয়ন্ত্রনে চলে এসেছিল। অন্তত তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বা প্রচন্ড আন্দোলন সংগ্রাম করার এনার্জি তারা হারিয়ে ফেলেছিল। একজন দক্ষ বা ঝানু কুটনীতিক হিসাবে তখন তিনি ছোট একটি বেঈমানী করলেই সারা জীবনের জন্য নেতার নেতা হয়ে যেতে পারতেন। আর তা হল, বলতে গেলে তখন এদেশের প্রায় সবাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ। আর মুজিবকে যে জিয়াই কৌশলে হত্যা করেছেন সেটা মানুষ মনে মনে বুঝত। তার উপর আবার জিয়া দেশের সর্বময় ক্ষমতা দিয়ে দিলেন স্বাধীনতা বিরোধিদের হাতে। সবকিছু নিয়ে স্বাধীনতার পক্ষের মানুষেরা যারা সংখ্যায় তখন প্রায় ৭০-৮০%, তারা জিয়ার উপরে নাখোশ ছিল। যদিও পরবর্তীতে জিয়া ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকৃত করে করে মানুষের হাতে ক্ষমতা দিয়ে দিয়ে অনেক মানুষকে তার দিকে টেনে নিতে পেরেছিলেন, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তখনও ছিল না খোশ।
কিন্তু যখন তার কেন্দ্রীয় ক্ষমতা সামরিক বাহিনী ও পরবর্তিতে তার সঙ্গে যুক্ত হওয়া মানুষের দ্বারা মোটামুটি প্রায় পাকা পোক্ত, তখন তিনি স্বাধীনতা বিরোধিদের সঙ্গে একটা ডিগবাজি মারলেই হয়ে যেতো। যেমনটি তিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে করেছিলেন, তেমন একটা ডিগবাজি স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গে দিয়েই, রাজাকার কয়েকজনকে সুলে চড়িয়ে, ভারতের সঙ্গে আর একটু গরম ভাবে হাত মিলালেই সেদিন স্বাধীনতার পক্ষের মানুষ অর্থাৎ দেশের বেশিরভাগ মানুষ জিয়ার দিকে ঝুকে পড়ত। কেননা, মুজিব যেকোন ভাবেই হোক নেই এ কথাই তখন সত্যি, মুজিব আর ফিরেও আসবে না সেটাও সত্যি, আবার যাদের দ্বারা দীর্ঘ নয় মাস সীমাহীন নির্যাতন সহ্য করে এবং সীমাহীন ত্যাগ তিতিক্ষা সহ্য করে তারা সবে মাত্র স্বাধীনতার মুখ দেখেছে, সেই রাজাকারদের আস্ফালনও তারা সহ্য করতে পারছিল না। তাই স্বাধীনতার পক্ষে কেউ বিশেষকরে জিয়া একটু কথা বললেই তারা (স্বাধীনতার পক্ষের মানুষ) যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেতো।
কিন্তু জিয়া তা করলেন না। অবশ্য ভয়েই করলেন না, পিছে আইএসআই এবং স্বাধীনতা বিরোধীরা যে কায়দায় মুজিবের মত লোককে বিনাশ করে দিল, সেই কায়দা না আবার তার পিছনে প্রয়োগ করে বসে। তার চেয়ে যেভাবে চলছে, চলুক না। কিন্তু আমার ধারনা, চোখ পালটি দিলেও তার তেমন কিছুই হত না। প্রয়োজনে সেনা বাহিনীকে আর একটু খাইয়ে নিলেই হত। ভারত এবং সাথে সাথে রাশিয়া তো পিছনে থাকতই। আর দেশের বেশিরভাগ মানুষ পিছনের চলে আসলে, সেটাওতো একটা শক্তি।
যাহোক, Leader I like you very much.

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

