somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অতি মুল্যস্ফীতি - জার্মানীতে যা ঘটেছিলো!!

০৪ ঠা এপ্রিল, ২০১৫ বিকাল ৩:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১৯২২-২৩ সালে জার্মানিতে হাইপার ইনফ্ল্যাশন হয়েছিল। সেই সময়ে চোরেরা নাকি ছালাভর্তি টাকা মাটিতে ফেলে দিয়ে শুধু ছালাটাই চুরি করত। সেই সময়ের ঘটনা। এক বাবা মৃত্যুর আগে তার দুই ছেলের জন্যে প্রচুর টাকা ব্যাঙ্কে রেখে যান। বড় ছেলে ছিল খুবই নিষ্ঠাবান, বুদ্ধিমান এবং বৈষয়িক। বাপের দেয়া অর্থের পুরোটাই সে দীর্ঘমেয়াদী আমানত হিসাবে ব্যাঙ্কে রেখে দেয় এবং নিজে কঠোর পরিশ্রম করে যা উপার্জন করে তার একটা বিরাট অংশ ভবিষ্যতের জন্যে জমাতে থাকে। বার্ধক্যে যাতে গ্রামে একটা বড়সর বাড়ি করে আরাম আয়েসে থাকতে পারে সেই লক্ষ্যে কোন রকম অপচয় থেকে সতর্ক থাকে। অন্য দিকে ছোট ভাই ছিল ভীষণ অপচয়কারী। মদ মেয়ে আনন্দ হৈ হল্লোড় নিয়েই ছিল তার জীবন। বাপের দেওয়া অর্থ খুব দ্রুতই শেষ হয়ে যায়। নিজের জীবনে তেমন কোন উপার্জন নাই, সঞ্চয়ও নাই। এমন সময় আসল হাইপার ইনফ্ল্যাশন। দেখা গেল বড় ভাইয়ের জমানো সমস্ত টাকা দিয়েও ছোট ভাইয়ের ব্যাক ইয়ার্ডে ফেলে রাখা খালি মদের বোতলগুলি কেনা সম্ভব না।

কি সঞ্চয়ী কিংবা সাবধানী লোকেরা নিজেদের অজান্তেই নিজেদের ক্ষতি করে যাচ্ছে?

এই গল্পের আলোকে আপাততঃ তাই মনে হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে কোন দেশে সঞ্চয়ের পরিমাণ কমে গেলে সে দেশে বিনিয়োগ কমে যাবে আর বিনিয়োগ না থাকলে চাকরি বাকরি তথা অর্থনৈতিক উন্নতির কোন সম্ভাবনাই থাকে না। ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা শিল্প প্রতিষ্ঠার জন্যে উদ্যোক্তাদের নিজস্ব সম্পদই যথেষ্ট না। এজন্য চাই ব্যাঙ্কঋণ। আর ব্যাঙ্কঋণের বৃহত্তর অংশই হচ্ছে সঞ্চয়কারীদের আমানত। ছোট ভাইয়ের মত অপচয় করলে ধার দেয়ার মতো প্রচুর টাকা ব্যাঙ্কের হাতে থাকত না। ব্যাঙ্কঋণের অভাবে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগ হাতে নিতে পারত না এবং চলমান শিল্প কিংবা ব্যবসার উৎপাদন ক্ষমতা বজায় রাখা ও সম্প্রসারণ সম্ভব হত না। তার মানে হচ্ছে নতুন কোন চাকরি সৃষ্টি হত না এবং আগে যাদের চাকরি ছিল তারাও চাকরি হারাতে বাধ্য হত। বলাই বাহুল্য, বেকার লোকদের উপার্জন থাকে না আর উপার্জন না থাকলে সঞ্চয়ও থাকে না। আবার সঞ্চয় না থাকলে বিনিয়োগ থাকে না। এইভাবে দেশ একটা অপূর্ণ নিয়োগ (আন্ডার ইমপ্লয়মেন্টের) বৃত্তের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। পূর্ণ সম্ভাবনায় বিকাশ লাভ করা আর সম্ভব হয় না।

সমস্যাটা কোথায়? মূল্যস্ফীতির কারণে টাকার মান কমে যায়, তাতে সঞ্চয়কারী কিংবা লগ্নিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে সঞ্চয় না করলে দেশের ক্ষতি হয়।

অনেকটা তাই, তবে ঠিক তাও না। এসব ব্যাপারে হয় এসপার, নয় উসপার বলে কিছু নাই। সব সময়েই একটা ব্যালান্স মেইন্টেইন করতে হয়। ইটস এ ম্যাটার অব ডিগ্রি কিংবা স্থান কাল মাত্রার ব্যাপার। মনে রাখতে হবে, জার্মানির ব্যাপারটা সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল না, ছিল অতি-মাত্রার মূল্যস্ফীতি। যার ফলে জার্মানদের ট্র্যাডিশনাল উইজডম বা সনাতন অভিজ্ঞতার আলোকে যে সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল তা তখন ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। যদিও সে অবস্থার জন্যে সঞ্চয়কারীরা নিজেরা দায়ী ছিল না। সরকার যদি টাকা ছাপানোর ব্যাপারে নিজের হাতে লাগাম দিতে পারত তাহলে মূল্যস্ফীতির লাগামও হাতের মুঠোয় থাকত।

তবে হাইপার-ইনফ্ল্যাশন আর মৃদু-ইনফ্ল্যাশনের তফাৎ কীভাবে বুঝব?

প্রথমে বুঝতে হবে মূল্যস্ফীতি কী জিনিস! মনে রাখতে হবে জিনিস-পত্রের উচ্চমূল্যের নাম মূল্যস্ফীতি নয়। অর্থনীতিতে দ্রব্যমূল্যের সাধারণ স্তর (যখন যে অবস্থায় আছে তার একটা স্ন্যাপ-শট) যখন উল্লেখযোগ্যভাবে ক্রমাগত বাড়তে থাকে তখনই তাকে মূল্যস্ফীতি বলা হয়। মনে করো, অস্ট্রেলিয়ায় এক কেজি চালের দাম ১ ডলার আর বাংলাদেশে একই মানের এক কেজি চালের দাম হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ান ডলারে ৫০ সেন্টস। অর্থাৎ অস্ট্রেলিয়ায় চালের দাম বাংলাদেশের তুলনায় ২ গুণ। তা সত্বেও বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির হার অস্ট্রেলিয়ার তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে; যদি আগের তুলনায় বাংলাদেশে চালের দাম বেশি বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। মূল্যস্ফীতি হল একটা সময়ের দ্রব্যমূল্যের সাধারণ স্তরের সাথে আরেকটা সময়ের দ্রব্যমূল্যের সাধারণ স্তরের তুলনা; একটা দেশের সাথে আরেকটা দেশের দ্রব্যমূল্যের তুলনা না।

আরও খোলাসা করে বললে, মনে রাখতে হবে মূল্যস্ফীতি একটা সামগ্রিক অবস্থা পরিবর্তনের নাম। কোন বিশেষ বস্তুর দাম বহুগুণ বেড়ে গেলেও সামগ্রিক অবস্থার খুব বেশি পরিবর্তন নাও হতে আরে। মনে করো, একজন লোক তার সাপ্তাহিক খরচ একশ টাকার মধ্যে এক টাকার মরিচ কেনে আর পঞ্চাশ টাকার চাল কেনে। ধরে নাও চালের দাম বাড়ল শতকরা দশ ভাগ আর মরিচের দাম বাড়ল শত ভাগ। এখন অন্যান্য সব জিনিসের দাম অপরিবর্তনীয় থাকলে সামগ্রিক ভাবে মূল্যস্ফীতি হবে শতকরা ছয় ভাগ মাত্র। চালের জন্যে পাঁচ ভাগ আর মরিচের জন্যে এক ভাগ। অর্থাৎ কোন জিনিসের দাম যে হারে হ্রাস-বৃদ্ধি হবে সামগ্রিক সুচক বা মূল্যস্ফীতির হ্রাস-বৃদ্ধি হবে ভোক্তার বাজেটে সেই জিনিসের গুরুত্ব অনুসারে। বিভিন্ন দেশের ভোক্তার বাজেটে বিভিন্ন দ্রব্যের গুরুত্ব বিভিন্ন রকম। কাজেই বিভিন্ন দেশে স্ব স্ব দ্রব্য-সামগ্রীর দাম একই হারে বাড়লেও বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতির হার একই রকম হবে না।

দ্রব্যমুল্য যদি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তখন মানুষ ধীরে ধীরে তাদের আয়ের পরিমাণ বাড়িয়ে নিতে সমর্থ হয়। বিনিয়োগকারীরা লাভের আশায় অধিক বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়। দেশের সামগ্রিক অবস্থার উন্নতি হয়। কিন্তু দ্রব্যমূল্য যদি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে তাহলে দেশের শ্রমিক শিক্ষক কর্মচারীরা তাদের আয় বাড়াতে সমর্থ হয় না। কারণ আয় যত না বাড়ে তার চাইতে বেশি দাম বেড়ে যায়। ফলে এসব মানুষ আগের তুলনায় গরিব হয়ে পড়ে, তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে সমর্থ হয় না। (ধীরে ধীরে বাড়াটাকে বলা যায় মৃদু-ইনফ্ল্যাশন আর লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়াটাকে বলা যায় হাইপার-ইনফ্ল্যাশন)। কিন্তু দুই পরিস্থিতিতেই এক শ্রেণীর মানুষ জিনিসপত্রের দাম যে হারে বাড়ে তার চেয়ে বেশি হারে তাদের আয় বাড়াতে সক্ষম হয়। সাধারণতঃ ব্যবসায়ীরা এ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। মূল্যস্ফীতির সময়ে এই শ্রেণীর মানুষরা লাভবান হয়। কিন্তু জিনিসপত্রের দাম যখন ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়তে থাকে তখন ব্যবসায়ীরাও খেই হারিয়ে ফেলে। শিল্প কিংবা ব্যবসার পরিকল্পনা ঠিকমত করার সুযোগ থাকে না। কোন ব্যবসায়ে কত টাকা মূলধনের দরকার তা ঠিক করাও সম্ভব হয় না। কোনো বিনিয়োগ শুরু করার পর আর শেষ করা যায় না।

জার্মানিতে ১৯২৩ এর অতি-মূল্যস্ফীতিতে শিশুরা টাকা নিয়ে খেলেছে। এ সময় ৪.২ ট্রিলিয়ন জার্মান মার্কের বিনিময়ে মিলত ১ মার্কিন ডলার।

জার্মানীতে যখন হাইপার-ইনফ্ল্যাশন চলছিল তখন বাজার দর এত দ্রুত বাড়ছিল যে অনেক জায়গায় রোজ দুইবার করে বেতন দেওয়া হত এবং দুইবারই আধা ঘণ্টা করে ছুটি দেওয়া হত যাতে টাকা পাওয়ার সাথে সাথেই শ্রমিকরা বাজারে গিয়ে জিনিসপত্র কিনে নিতে পারে। বিকেল কিংবা পরদিনের জন্যে অপেক্ষা করার মানেই হচ্ছে ‌ওই টাকায় যা কিনতে পারবে তার চেয়ে অনেক কম কিনতে পারা।

শহরের নামকরা দোকানগুলি ডিসপ্লে শেলফগুলিতে যে দাম লেখা থাকে তা বদলাতে বদলাতে হিমশিম খেয়ে যেত। পরে তারা আর দামের ট্যাগ বদলাত না। আগের দামের ওপর একটা করে গুণক বসিয়ে দেওয়া হত। মনে করো, দাম লেখা আছে ১০০০ আর গুণক হচ্ছে ২, তাহলে জিনিসের দাম দিতে হবে ১০০০ X ২ = ২০০০।

১৯২৩ সালে লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেক পাঠানোর জন্যে যে পোস্টাল স্ট্যাম্প ব্যবহার করা হত তার দাম ছিল ইন্স্যুরেন্সের টাকার অঙ্কের চেয়ে বেশি। যুদ্ধের ঠিক আগে ১৯১৩ সালে জার্মানিতে বন্ধকি সম্পত্তির মোট মূল্যমান ছিল ১০ বিলিয়ন ইউ এস ডলার। ১৯২৩ সালে সেই সম্পত্তির দাম কমে কমে দাঁড়ায় এক ইউ এস পেনিতে।

এটা কী করে সম্ভব? কী করে একটা দেশ এমন অবস্থায় পৌঁছাতে পারে?

রাজস্বনীতির কথা বললে বলা যায়, যুদ্ধকালীন অর্থনীতিতে একটাই শুধু নীতি থাকে আর তা হচ্ছে যুদ্ধ জয়ের নীতি। জয়ের উন্মাদনায় নিজের দেশে ও শত্রু দেশে উভয় দেশেই প্রবল বেগে উৎপাদন বাড়ে। কিন্তু সেই উৎপাদন জিনিসপত্রের দাম কমাতে সাহায্য করে না। বরং যুদ্ধসামগ্রী মাত্রই প্রথমতঃ নিজে ধ্বংস হয় দ্বিতীয়তঃ অপরকে ধ্বংস করে।

হাইপার-ইনফ্ল্যাশন শুরুর আগেই জার্মান মার্কের পতন শুরু হয়েছিল।প্রথম মহাযুদ্ধের গোড়াতে জার্মান সরকার আইন করে মার্ক থেকে সোনায় রূপান্তর (Convertibility) নিষিদ্ধ করে দেয়। অর্থাৎ টাকা ছাপানোর জন্য তখন আর কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের স্বর্ণ মজুত রাখার দরকার হত না। লাগামহীন ভাবে টাকার অঙ্ক বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে প্রথমতঃ চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতি এবং দ্বিতীয়তঃ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিজনিত কারণে মূল্য বৃদ্ধি হচ্ছিল। তদুপরি ১৯২১ সালে ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে মিত্রশক্তি জার্মানির ওপর যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি বাবদ ১৩২ বিলিয়ন গোল্ড মার্কের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিল। জার্মানির হাতে ছিল কাগজের মার্ক এবং যথেষ্ট স্বর্ণও ছিল না হাতে। বাধ্য হয়েই জার্মানি তখন খোলা বাজারে ডলার কিনতে শুরু করল আর ডলারের দাম হু হু করে বাড়তে লাগল। প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে জার্মান মুদ্রায় আমেরিকান ডলারের দাম ছিল ৪.২ মার্ক। যুদ্ধ শেষে ১৯১৯ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৬.৭ মার্কে দাঁড়ায়। কিন্তু মাত্র দুইবছরের মাথায় ১৯২১ সালের প্রথম দিকে তা আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৬০ মার্ক হয়ে যায়। অর্থনীতিবিদরা এ অবস্থাকেও মোটামুটি স্থিতিশীল হিসাবেই ধরে নেন। কিন্তু ১৯২১ সালের নভেম্বর মাসেই এক আমেরিকান ডলারের দাম বেড়ে যায় ৩৩০ জার্মান মার্কের সমান এবং ১৯২২ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে ৮০০ মার্কের সমান। এই সময় থেকে মোটামুটি এক বছরের মাথায় ১৯২৩ সালের নভেম্বর মাসে আমেরিকান এক ডলারের সমান ছিল ৪,২১০,৫০০,০০০,০০০ মার্ক। এই সময় থেকে জার্মানির বাজারে ডলার তথা বিদেশী কারেন্সি বেচাকেনা বন্ধ হয়ে যায় কারণ জার্মান মার্ক বস্তুতঃ এক টুকরা অর্থহীন কাগজে পরিণত হয়ে পড়েছিল।

কোনো গ্রহণযোগ্য রিজার্ভ না থাকার কারণে জার্মান কারেন্সি বিদেশে তার গ্রণযোগ্যতা আগেই হারিয়ে ফেলেছিল। বিদেশী পাওনাদাররা তখন তাদের পাওনা পণ্যজাত দ্রব্যাদির মাধ্যমে পেতে চায় এবং এই উদ্দেশ্যে ফ্রান্স ও বেলজিয়াম জার্মানির রাড় অঞ্চল [Ruhr] দখল করে নেয়। রাড় ছিল কয়লাসমৃদ্ধ অঞ্চল এবং এই অঞ্চল থেকে তখন তারা কয়লা আমদানি শুরু করে। বিদেশীদের এই অবিমৃষ্যকারীতায় জার্মান জণগণ চরম অপমান ও ক্ষোভে জ্বলতে থাকে। এই দখলের প্রতিবাদে জার্মানির রাড় অঞ্চলে ব্যাপক ধর্মঘট শুরু হয়। ধর্মঘটিদের হাতে রাখার জন্যও সরকারের আরো টাকা ছাপানো ছাড়া গত্যন্তর ছিল না।

প্রথম মহাযুদ্ধে যে সব দেশ জার্মানির বিপক্ষে ছিল সে সব দেশে হাইপার-ইনফ্ল্যাশন হয়নি। কারণ, প্রথমতঃ যুদ্ধে সে সব দেশ বিজয়ী হয়েছিল। ফলে তাদের কোন যুদ্ধের খেসারত দিতে হয় নি। দ্বিতীয়তঃ এসব দেশে মুদ্রানীতির সাথে সাথে রাজস্ব-নীতিও কাজে লাগানো হয়েছিল। ফ্রান্সে এই সময়ে প্রথমবারের মতো আয়কর চালু করা হয়, ফলে জার্মানির মতো সেখানে বেপরোয়া ভাবে টাকা ছাপানোর দরকার হয় নি। আয়করের আধ্যমে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা কিছুটা কমিয়ে রাখা হয়েছিল। ফলে মূল্যস্ফীতিও জার্মানির তূলনায় অনেকটা কম ছিল।

অতি মাত্রায় মূল্যস্ফীতির আরেকটা কারণের প্রতি খুব জোর দেয়া যায়, আর তা হচ্ছে টাকার velocity of circulation [বছরে কত বার কোন দেশে মুদ্রা বিক্রয়ের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার হয়ে থাকে]। কোন অর্থনীতিতে টাকা কত দ্রুত হাত বদলায় তার ওপরও নির্ভর করবে দ্রব্যসামগ্রীর দাম কত দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। জার্মানরা যখন বুঝতে পারল টাকার মূল্যমান দ্রুত কমে যাচ্ছে তখন তারা যত দ্রুত সম্ভব টাকা খরচ করতে লাগল। তার মানে যারা কোন দ্রব্য কেনার ব্যাপারে আরও দুয়েক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে পারত তারাও তখনই হাতের জঞ্জাল বিদায় করার জন্যে উঠেপড়ে লাগল। অন্যদিকে বিক্রেতারা বর্তমান বাজার দামে বিক্রি করতে নারাজ। আরো দাম বাড়বে সেই বিশ্বাসে পণ্যসামগ্রী দোকান থেকে সরিয়ে গোপনীয় স্থানে মজুদ করা শুরু করল। মোটকথা জার্মান কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের (রাইচবাঙ্ক) ইস্যুকৃত ডয়েসে মার্কের ওপর জনগণের আর কোন আস্থা ছিল না।

এই সময়ে জার্মানিতে আরো বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটছিল। আগস্ট ১৩, ১৯২৩ তারিখে গুসটাফ স্ট্রিজেমান (Gustav Stresemann) জার্মানির চ্যান্সেলার নিযুক্ত হন। সেপ্টেম্বর ২৬, ১৯২৩ তারিখে স্ট্রিজেমান জার্মান শাসনতন্ত্রের সাতটি ধারা বিলোপ করে জরুরি অবস্থা জারি করেন। নবনিযুক্ত অর্থমন্ত্রী হ্যান্স লুথার এবং জার্মান ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের তদানীন্তন ম্যানেজিং ডাইরেকটর ইয়ালমার শট (Hjalmar Schacht) এর সহায়তায় ১৫ অক্টোবর ১৯২৩ সালে জার্মান কারেন্সি ডয়েসে মার্কের একটা অভিনব বিকল্প চালু করেন। এই বিকল্প মার্কের নাম দেওয়া হয়েছিল রেনটেনমার্ক এবং ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানের নাম রেনটেনবাঙ্ক।

রেনটেনমার্কের মূল্যমান স্থিতিশীল রাখার জন্যে তার বিনিময়ে কোন সোনারুপা কিংবা ফরেন কারেন্সি মজুদ রাখা হয়নি। ইস্যুকৃত টাকার বিনিময়ে যথেষ্ট সোনারুপা কিংবা ফরেন কারেন্সি থাকলে তো আর ডয়েসে মার্কের বিপর্যয় ঘটত না। নতুন কারেন্সির রিজার্ভ হিসাবে রাখা হয়েছিল ৩.২ বিলিয়ন রেনটেনমার্কের মূল্যমানসম রিয়েল এস্টেট ও ইনডাস্ট্রিয়াল অ্যাসেটের মর্টগেজ। এক রেনটেনমার্কের মূল্যমান নির্ধারিত হয়েছিল এক ট্রিলিয়ন ডয়েসে মার্কের সমান এবং এক আমেরিকান ডলারের বিপরিতে ৪.২ রেনটেনমার্ক। অর্থাৎ পুরাতন মার্কের পরিমাণ থেকে বারটা শূন্য বাদ দিলে নতুন মার্ক পাওয়া যেত। এই ব্যবস্থার ফলে দেশের বড় লোকদের কোন ক্ষতি হয় নি কারণ এসব লোক আগেভাগেই তাদের টাকা বিদেশী ব্যাঙ্কে সরিয়ে ফেলেছিল। দেশের গরীব লোকেরাও তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয় নি কারণ তাদের হাতে তেমন কোন টাকাকড়ি ছিল না। মধ্যবিত্তদের যারা টাকা ধার দিয়েছিল (মহাজন) তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল আর যারা ঋণগ্রহীতা (খাতক) তারা লাভবান হয়েছিল।

নভেম্বর মাসের ১৩ তারিখে ইয়ালমার শট কারেন্সি কমিশনার নিযুক্ত হন এবং নভেম্বরের ১৫ তারিখ থেকে ডয়েসে মার্কের প্রিন্টিং বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই সময় থেকে সরকারী ঋণপত্র ও ট্রেজারি-বিলের ডিসকাউন্টিংও বন্ধ হয়ে যায়। নভেম্বরের ২০ তারিখ থেকে ইয়ালমার রাইসবাঙ্কের প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হন। ফলে রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয় অনেকটা সহজ হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতির অঙ্গনে গুসটাফ স্ট্রিজেমান এবং ইয়ালমার শট একই ঘরানার লোক ছিলেন। দেশে বিদেশে তাদের দৃঢ়চিত্ততা ও দেশপ্রেমের ব্যাপারে সুনাম ছিল। দেশের মানুষ নতুন মুদ্রা ও মুদ্রা ব্যবস্থাকে সাদরে গ্রহণ করেছিল ফলে জার্মানির অর্থনীতিতে স্বস্তি ফিরে আসে এবং হাইপার-ইনফ্ল্যাশন বন্ধ হয়ে যায়।

এর মধ্যে তবে কী এমন ঘটলো যে রেনটেনমার্কের ওপর জনগণের আস্থা ফিরে এলো?

রেনটেনমার্কের ওপর জনগণের আস্থা জন্মাল কারণ এর আগে বাজারে রেনটেনমার্ক ছিল না। ডয়েসে মার্ক ও রেনটেনমার্কের মধ্যে মূল পার্থক্য হচ্ছে রেনটেনমার্কের উৎপাদন ছিল সীমিত আর ডয়েসে মার্কের উৎপাদন ছিল বল্গাহীন। তাছাড়া এ সময়ে মুদ্রানীতির সাথে সাথে রাজস্বনীতিও প্রয়োগ করা শুরু হয়েছে। আগে শুধু মুদ্রার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছিল ঠিক মুদ্রানীতির ব্যবহার হয় নি।

সুত্রঃ
ডাঃ আলি আহমেদ রুশদীর লেখা প্রবন্ধ
প্রফেসর খলিলুর রহমান
সাম্প্রতিক ডট কম
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি আসলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৪৪



“রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন “, “মূর্খের দেশে আবার কীসের বিশ্ববিদ্যালয়” – এসব প্রচারণা আমাদের দেশে অনেকদিন ধরেই হয়ে আসছে। বিশেষ করে ফেসবুকে আকছারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৯৭১ঃ নদী-নালায় ভেসে থাকা স্বদেশের কান্নাঃ শহীদদের প্রতি নিবেদিত একটি কাব্যগাথা জাতির রক্ত, অশ্রু ও স্বাধীনতার অমর ইতিহাস

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:০৫


পঁচিশে মার্চ ১৯৭১
রাত্রি তখন গভীর, নগরীর বাতিগুলো
যেন অনাগত বিপদের সামনে অসহায়
ঢাকার আকাশে হঠাৎ গর্জে উঠল কামান
ট্যাংকের চাকার নিচে কেঁপে উঠল রাজপথ
গুলি ছুটে গেল মানুষের ঘুমন্ত জানালায়
আগুন ছড়িয়ে পড়ল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×