somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শিপ ব্রেকিং শিল্পের জাহাজ কাটা বর্জ্য পানিতে বিপর্যয়ের মুখে উপকূলীয় এলাকার মৎস্য ও প্রানীকুল

৩০ শে মে, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সলিমপুর জেলে পাড়ার বৃদ্ধ হীরালাল জলদাসের অভিযোগ, ‘আগে এ অঞ্চলে মাছ পেতাম প্রচুর পরিমানে। মাছ, জাল, নৌকার উপর নির্ভর করে জীবন চলতো। সমুদ্রের পানির রং ছিল আয়নার মত পরিষ্কার। বর্তমানে পানির রং ঘোলাটে কালো হয়ে গেছে। মাছও আগের মত পাচ্ছি না।’ মাছের অভাব দেখা দেয়ায় জেলেরা এখন কষ্টের মধ্যে দিন যাপন করতে হচ্ছে। কয়েকযুগ ধরে তিনি এ পেশায় নিয়োজিত। কিন্তু বর্তমানে সামুদ্রিক মাছের তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় এখন তিনি পৈত্রিক পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। এ ধরনের অভিযোগ শুধু হীরালালের নয়, এই অঞ্চলের আরো অনেকের।
সীতাকুন্ডের সলিমপুর থেকে কুমিরা সমুদ্র উপকূল জুড়ে ৭টি জেলেপাড়া। এই জেলেপাড়ার জেলে স¤প্রদায় যুগ যুগ ধরে নিয়োজিত ছিল সামুদ্রিক মাছ ধরার পেশায়। কিন্তু গত এক যুগ ধরে সমুদ্রের উপকূলে জাহাজ ভাড়া শিল্পের ব্যাপক প্রসারে ফলে এই অঞ্চলের জেলে স¤প্রদায়ের বিঘিœত হচ্ছে স্বাভাবিক পরিবেশ। বিশেষ করে জাহাজ ভাঙ্গা বিভিন্ন বর্জ্য ও তৈলজাত দ্রব্য এসব এলাকার সমুদ্রের পানি ও মাটিকে দুষিত করে চলেছে প্রতিনিয়ত।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিদেশ থেকে সমুদ্রগামী জাহাজ চট্টগ্রামের ফৌজদারহাট, ভাটিয়ারী, সোনাইছড়ি ও কুমিরা এলাকার ৪৫টি ইয়ার্ডে কাটা হয়। জাহাজগুলো কাটার সময় তেল ট্যাংকারের তলানিতে জমে থাকা বিপুল পরিমাপ অপরিশোধিত তেল, অন্যান্য লুব্রিকেল্ট এবং ইঞ্জিনের তেল বিভিন্ন জাহাজ থেকে পানিতে পড়ে থাকে। এই বর্জ্য মিশ্রিত তেল সমুদ্রের পানিতে মিশে পানিকে দুষিত করে দারুনভাবে। এই দূষনের ফলে তৎসংলগ্ন সমুদ্র সৈকতের স্বাভাবিক অবস্থায় সৃষ্টি হচ্ছে নানা বিপর্যয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক বিজ্ঞান ইনষ্ট্রিটিউটের অধ্যাপক এম.এম.হোসাইন ও অধ্যাপক এম.ইসলাম এই অঞ্চলের সমুদ্রের পানি ও মাটি দুষণ সংক্রান্ত ‘জাহাজ ভাঙ্গা কার্যক্রম এবং চট্টগ্রাম উপকুলীয় এলাকায় এর প্রভাব’ বিষয়ক এক গবেষণায় দেখা যায়, জাহাজ ভাঙ্গা বা মেরামতের সময় ভাঙ্গা জাহাজের অপরিশোধিত তেল, ভারী ধাতু এবং রাসায়নিক বিভিন্ন বর্জ্য উপকূলের বিস্তির্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। শুধু উপকূলে নয়, এসব ছড়িয়ে পড়ে সমুদ্রের পানিতেও।
তাদের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকার মাটিতে বিষাক্ত ধাতু ছড়িয়ে পড়ে। তারমধ্যে পারদ রয়েছে ০.৫-০.২৭ পিপিএম, সীসা রয়েছে ০.৫- ২১.৮ পিএম, ক্রোমিয়াম রয়েছে ২২০ পিপিএম, ক্যাডামিয়াম রয়েছে ০.৩-২.১ পিপিএম, ক্যালসিয়াম রয়েছে ৫.২-২.১০ পিপিএম এবং ম্যাগনেসিয়াম রয়েছে ৬.৫-১.৫৭ পিপিএম।
গবেষণায় আরো উলে¬খ করেন যে, সমুদ্রের পানির উপর যে তেল ও বর্জ্য জমা হয় তা সূর্যের আলোকে পানির নীচে পৌছতে বাধা দেয়। এতে পানির নীচের উদ্ভিদ জগতের সালোক সংশে¬ষণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ হয়। এসকল উদ্ভিদ ছোট ছোট মাছ ও ক্ষুদে সামুদ্রিক প্রাণীদের খাদ্য সরবরাহ করে। সালোক সংশে¬ষণ প্রক্রিয়া বাধা পেলে উদ্ভিদের জন্মনো এবং বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে ২১ প্রজাতির মাছ বিপন্ন হয়ে পড়েছে।
সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী, সোনাইছড়ি ও কুমিরা সমুদ্র উপক’লে মৎস্য আহরণকারী জেলেদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত ১০বছরে সীতাকুণ্ডের সমুদ্র উপক’লে মৎস্য আহরণ ৮০ শতাংশের মতো কমেছে। স্থানীয় ভাবে পরিচিত লাল চিংড়ি, ট্যাংরা (গুইল¬্যা মাছ), লইট্যা মাছ, রিটা মাছ, পোপা মাছ, ছিরিং মাছ, রিস্শা মাছ, হোন্ধরা মাছ, বাইলা মাছ, ইছা মাছ এখন আর তেমন পাওয়া যায় না। শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে পাওয়া যেতো প্রচুর রুপালী ইলিশ, যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। শুধু তাই নয়, একসময় গাংচিল, রাজ হাঁস, পানকৌরি, বক, রাজহাঁস, শামুক কেচা, হারগিলা, শারস, পানকোড়ি, মানিক জোড় জাতীয় পাখিরও বিলুপ্তি ঘটছে।
উপকুলীয় জীব-বৈচিত্র্য সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. হারুণ জানান, জাহাজভাঙা কর্মকান্ডের কারণে চট্টগ্রাম উপকুলীয় অঞ্চলের মৎস্য ও প্রানীকুলের উপর নৈতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুল কুদ্দুস জানান, এই অঞ্চলগুলো ছিল এক সময় বিভিন্ন মাছের প্রজনন ক্ষেত্র। গভীরতার কারণে এখানে এক সময় মাছেরা ডিম পাড়তে আসত। এখন তা আর নেই। জাহাজ ভাঙ্গা ঘাটার পাশে বির্স্তৃত এলাকা জুড়ে পানিতে তেল ভাসতে দেখা যায়। ফলে ঐ এলাকার পানিতে সূর্যরশ্মি প্রবেশ করতে পারে না। এ কারনে সামুদ্রিক মাছ ও অন্যান্য জলজ উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।
সীতাকুণ্ড উপকুলীয় বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা জামিল মোহাম্মদ জানান, পতেঙ্গা থেকে বাঁশবাড়িয়া পর্যন্ত উপকূলীয় অঞ্চলে শিপ ব্রেকিং শিল্প গড়ে উঠার আগে উপকূলীয় ভাঙ্গন রোধ কল্পে ব্যাপক হারে বনায়ন করা হয়েছিল। কিন্তু উক্ত এলাকায় এই শিল্পের প্রসারের ফলে এলাকার বনাঞ্চল সম্পূর্ণ ভাবে নিশ্চিহৃ হয়ে যায়। ফলে ভাঙ্গন বিস্তৃতি লাভ করে।
বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি মোঃ জানান, জাহাজ কাটার সময় বর্জ্য পর্দাথগুলো পানিতে না ফেলার জন্য সমিতির পক্ষ থেকে মালিকদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তারপরও বিশাল জাহাজ কাটতে গিয়ে অসাবধানবশত পানিতে পড়তেই পারে।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমার একশততম পোস্ট!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:১৮



আমার একশততম পোস্ট!

আজ আমার লেখকজীবনের এক ছোট্ট কিন্তু হৃদয়ের গভীরে দাগ কাটা দিন- সামহোয়্যারইন ব্লগ এ আমার একশততম পোস্ট। সংখ্যার হিসেবে হয়তো ১০০ খুব বড় কিছু নয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

খরচ

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১২:২৯


কোন কোন রাত্রি শেষের বেগুনী আলোয়
বাতাস যখন রতিতৃপ্ত দৃষ্টির মত কোমল-
উন্মোচনের আগ্রহে উদগ্রীব আলো
কী এক দ্বিধায় থমকে আছে পুবের দরজায়,
হঠাৎ যেন কেউ মাছের মত
ছেকে তোলে জালে।
লাগায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

সংসদের বায়না : ৩০ সেট গয়না

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১:১৪

একসময় এই প্রবাদটি খুব প্রচলিত ছিল, এমনকি পণ্ডিত মহলেও এটি নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করা হতো।
সময় বদলে গেছে; যমুনা নদী দিয়ে বহু জল বয়ে গিয়ে সাগরে মিশেছে।



বাস্তবতার নিরিখে আমাদের সমাজে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফুল ট্যাঙ্ক স্বপ্ন

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৬



শহরের সকালগুলো এখন আর আগের মতো নয়। সূর্য ওঠার আগেই পেট্রোল পাম্পের সামনে লম্বা লাইন পড়ে যায়। সেই লাইনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে রিদম—একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, আর জীবনের বাস্তবতায় আটকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশি দৃষ্টিতে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ও ভারতের হিন্দুরাষ্ট্র হয়ে ওঠার প্রচেষ্টা

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ২৩ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:০৬


কাল থেকে দুই ধাপে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন শুরু হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ভারতের কেন্দ্রীয় শাসনক্ষমতা ও মতাদর্শ দ্বারা যেমন প্রভাবিত, তেমনি এর প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশেও প্রতিফলিত হয়। ভারতে যখন হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদী... ...বাকিটুকু পড়ুন

×