somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রঙিন ডালিম ফলের একটি ব্যতিক্রমি অঙ্গ বিশ্লেষন ( Anatomy of Pomegranate )

১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


সবুজ পাতার আড়াল ভেঙে
ডালিম ঝুলে লাজুক রঙে
বাইরে রক্তিম খোলস কঠিন
ভিতরে দারুন জীবন রঙিন।
শত দানার গোপন ভুবন
একসাথে বাঁধা মধুর টান
হৃদয়ের হাজার স্বপ্ন যেন
লুকিয়ে থাকা রক্তিম গান।
নীচে দেয়া চিত্রে রেনেসাঁ যুগের ইতালীয় শিল্পী সান্দ্রো বত্তিচেল্লি ( Sandro Botticelli) কর্তৃক অঙ্কিত Madonna of the Pomegranate চিত্রকর্মে ভার্জিন মেরির হাতে ধরা ডালিমটির অর্থ সম্পর্কে কিছু ব্যখ্যা দিয়ে লেখার কাহিনী হয়েছে শুরু।


চিত্রটিতে থাকা ডালিমটিকে হৃদযন্ত্রের গঠনের একটি যথার্থ প্রতিরূপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে বিখ্যাত চিত্রশিল্পী বত্তিচেল্লি মানবদেহের অঙ্গসংস্থানবিদ্যা সম্পর্কে নতুন করে জাগ্রত আগ্রহ এবং প্রাচীন যুগের হারিয়ে যাওয়া চিকিৎসা বিজ্ঞানের জ্ঞান পুনরুদ্ধারের ধারার সঙ্গে পরিচিত হন। রেনেসাঁ যুগের শিল্পীরা মৃতদেহ বিচ্ছেদের মাধ্যমে এই হারানো জ্ঞান পুনরায় অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

রেনেসাঁ যুগে শিল্পীরা অঙ্গসংস্থানবিদ হওয়াকে অত্যন্ত মূল্যবান মনে করতেন, কারণ এতে মানবদেহ সম্পর্কে তাদের গভীর উপলব্ধি তৈরি হতো এবং তাদের শিল্পকর্ম আরও জীবন্ত ও বাস্তবসম্মত হয়ে উঠত।এই লিংক https://en.wikipedia.org/wiki/Uffizi# ফলো করে ইটালির ফ্লোরেন্সে অবস্থিত বিশ্ববিখ্যাত উফিজি আর্ট গ্যলারীতে (Uffizi Gallery) থাকা বত্তিচেল্লীর মত রেনেসাঁ যুগের শিল্পীদের আঁকা বিশ্বখ্যাত কিছু চিত্র কর্ম দেখতে
পারেন ।

উপরে তুলে দেয়া চিত্রটির নাম Madonna of the Pomegranate। এসেছে ভার্জিন মেরির হাতে ধরা ফলটির কারণে। ডালিমের ইংরেজী নাম Pomegranate। ডালিম এখানে যিশুর ভোগান্তি ও পুনরুত্থানের পূর্ণতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। খ্রিস্টধর্মে ডালিম জীবন থেকে মৃত্যু এবং পুনর্জন্মের প্রতীক কারণ এর বীজ থেকে পুনরায় নতুন জীবন জন্ম নিতে পারে।


খোলা ডালিমের ভেতরে দেখা লাল বীজগুলো দর্শককে যিশুর রক্তপাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যা মানবজাতিকে রক্ষা করেছিল। ডালিমের খোসা ছাড়ানো অংশে অসমমিত কুঠুরির মতো গঠন দেখা যায়, যা হৃদযন্ত্রের প্রকোষ্ঠগুলোর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। বত্তিচেল্লি ভেতরের স্পঞ্জের মতো ঝিল্লিকে এমনভাবে দেখিয়েছেন, যা বীজগুলিকে পাঁচটি ভাগে বিভক্ত করেছে। এই পাঁচটি অংশ হৃদয়ের অলিন্দ (atria), নিলয় (ventricles) এবং প্রধান পালমোনারি ট্রাঙ্ককে নির্দেশ করে।

ডালিমের মুকুটসদৃশ অংশটি দুই ভাগে বিভক্ত, যা সুপিরিয়র ভেনা কাভা এবং তিনটি শাখাযুক্ত অ্যাওর্টার ধনুকের অনুকরণ বলে মনে হয়। ফলটি মেরির বক্ষের বাম পাশে ধরা হয়েছে, যা হৃদয়ের প্রকৃত অবস্থানের সঙ্গে মিলে যায়।
হৃদযন্ত্রের প্রকৃত অঙ্গসংস্থানের সঙ্গে এই বিস্ময়কর সাদৃশ্য এবং বক্ষস্থলের ওপর এর অবস্থান এই ধারণাকে শক্তিশালী করে যে, মেরি ও শিশুযিশুর হাতে ধরা ফলটির ভেতরে শিল্পী প্রতীকীভাবে একটি হৃদয় লুকিয়ে রেখেছেন।
ভার্জিন মেরির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মাতা হিসেবে ভার্জিন মেরি যিশুর শৈশব বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন; তিনি শিশুর সামগ্রিক বিকাশের জন্য দৃঢ় মানসিক ও শারীরিক ভিত্তি প্রদান করেন। যিশু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মা অব্যাহতভাবে তাঁকে সমর্থন দেন এবং তাঁর বেড়ে ওঠা দেহের জন্য যথাযথ পুষ্টির ব্যবস্থা করেন।

মা হিসেবে ভার্জিন মেরির দায়িত্বের মধ্যে ছিল সুরক্ষা প্রদান, প্রয়োজনীয় দক্ষতা শিক্ষা দেওয়া, এবং এমন নিয়ম ও মূল্যবোধ শেখানো যা যিশু সারাজীবন বহন করবেন। ঈশ্বরের পুত্রকে জন্ম দেওয়া ও লালন-পালনের এই বিশেষ দায়িত্ব তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন বলে তাঁর মধ্যে সাহস, ভালোবাসা এবং গভীর বিশ্বাসের মতো বহু মহৎ গুণের প্রকাশ ঘটে। তিনি ঈশ্বরের পক্ষ থেকে অর্পিত এই মহান দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে তাঁর অসাধারণ আধ্যাত্মিক শক্তি ও আনুগত্যের পরিচয় দিয়েছেন।

ডালিমের উন্নত জাতই হলো আনার বা বেদানা। ডালিম খুবই আকর্ষণীয়, মিষ্টি, সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর একটি ফল। এ জন্যই তো এর এত কদর মায়েদের কাছে ।


শিল্পীর তুলিতে আঁকা ছবিটি গৃহ সজ্জাতেও ব্যবহৃত হয় অনেক অভিজাত মহলে ।


এর আদি নিবাস ইরাক ও ইরান। ককেশাস অঞ্চলে এর চাষ প্রাচীনকাল থেকেই হয়ে আসছে। সেখান থেকে তা ভারত উপমহাদেশে বিস্তার লাভ করেছে।

বাংলাদেশের মাটি বেদানা চাষের জন্য উপযোগী বিধায় আমাদের দেশের বসতবাটির আঙ্গিনায় ডালিমের চাষ দেখা যায়। আমার দাদার বাড়ীর আঙগিনা জুরেই ছিল ফুলে ফলে ভরা গুটি কয়েক ডালিম গাছ ।
আহারে ডালিম ফুল আর ফল নিয়ে শ্রুতি মধুর কী গানই না ছিল ।
ছোটকালে সকলের চুপিসারে সমবয়সীদেরকে সাথে নিয়ে শীতকালে চাদনী রাতে চাদর মুরী দিয়ে যাত্রা পালায় গিয়ে দেখতাম আর নাচে গানে মাতিয়ে তুলা গান শুনে বাড়ীতে এসে পর দিন থেকেই ডালিম গাছের নীচে গিয়ে গানের অর্থ না বুঝেই গলা ছেরে হেরে গলায় গাইতাম ।
চারা গাছে ফুল ফুইটাসে
ডাল ভাইঙ্গ নারে মালি ফুল ছি্ইরোনা
পাকা ডালিম ভরবে রসে …..
পায়ে ধরে মিনতি করি
কাছে আইসনা হাত ধইরনা
ডাল ভাইঙ্গ নারে মালী
ফুল ছিইরোনা।

গলা ছেরে গানটি গাওয়ার সাথে সাথে্ই মা আর দাদীর কাছে বকুনী খেতাম । আর বুঝি গান জানসনা,আজ তোর বাপ বাড়ীতে আসুক, দেখবি লুকিয়ে যাত্রা পালা দেখে গান গাওয়া কাকে বলি । মনে মনে বলতাম গান গাইলে ক্ষতি টা কী?
তার পর বড় হয়ে বুঝলাম এর মর্ম কথা, গুরুজনদের সামনে কেমন করে তেমন গান গাইতাম সে কথা ভাবলে এখনো লজ্জা পাই । যাহোক অর্ধ শতাব্দিরও আগের সেই জনপ্রিয় গানটি নীচের লিংক ফলো করে যে কেও শুনতে পারেন।

আনার বা ডালিমের অনেক ঔষধী গুণও রয়েছে। নিয়মিত পরিচর্যা করলে আনার গাছ থেকে সারা বছর যেমনি পাওয়া যাবে ফল তেমনি একে ঔষধি কাজেও লাগানো যাবে । ছাদ বাগানে টবে বা ড্রামে খুব সহজেই ডালিমের তথা আনার বা বেদানার চাষ করা যায়।


ডালিমের ঔষুধি গুণের সংক্ষিপ্ত বিবরণসহ একটি তালিকা নীচে তুলে দেয়া হল ।
ডালিম আয়ুর্বেদিক ও ইউনানী চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ পথ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এতে বিভিন্ন উপকারী রাসায়নিক উপাদান থাকায় এটি বহু রোগ উপশমে কার্যকর। কবিরাজী মতে ডালিম হৃদয়ের জন্য অত্যন্ত উপকারী এবং কোষ্ঠ রোগীদের জন্যও ভালো। ডালিম গাছের ফল, খোসা, ফুল, পাতা ও শিকড় সব অংশই ঔষধি গুণসম্পন্ন।


১.রক্তপাত বন্ধে :ডালিমের ফুল বা পাতা ক্ষতস্থানে লাগালে রক্তপাত বন্ধ হতে সাহায্য করে।
২.নাক দিয়ে রক্ত পড়া : ডালিম ফুলের রস নাকে নিলে রক্তপাত কমে।
৩.আমাশয় নিরাময় :ডালিমের খোসা সিদ্ধ করে খেলে আমাশয়ে উপকার পাওয়া যায়।
৪.ত্বক ও নারী রোগে উপকারী : গাছের ছাল বাগি/উপদংশে কার্যকর; ফুল মধুর সাথে সেবনে শ্বেতপ্রদর ও রক্তপ্রদরে উপকার হয়।
৫.গর্ভপাতের ঝুঁকি কমাতে : ডালিম পাতার মিশ্রণ সেবনে উপকারের কথা বলা হয়।
৬.কৃমিনাশক : গাছের শিকড়ের ছাল কৃমি দূর করতে ব্যবহৃত হয়।
৭.শিশুদের পেটের রোগে : শিকড়ের ছাল মধুর সাথে খেলে উপকার পাওয়া যায়।
৮.রক্ত বৃদ্ধি : ডালিম খেলে শরীরে রক্ত বৃদ্ধি পায় বলে ধারণা রয়েছে।
৯.ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে : প্রাকৃতিক ইনসুলিনের মতো কাজ করে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক বলে মনে করা হয়।

মোটকথা হল ডালিম গাছের প্রতিটি অংশই মানবস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী; তাই এটি একটি উপকারী ঔষধি উদ্ভিদ হিসেবে বিবেচিত। আমি প্রতিদিন একটি পাকা ডালিমের এক চতুতাংশ রসালো বিজ ও খোশা সহ চিবিয়ে খেয়ে ভাল ফল পাচ্ছি । আপনারা সকলে খেয়ে দেখতে পারেন । তবে যারা হালকা তিতা স্বাদও একেবারেই পছন্দ করেন না তারা শুধু ডালিমের মিষ্টি রসটুকু খেলেও উপকার পাবেন ইনসাল্লাহ।

ছবি : অন্তরজালে থাকা বিভিন্ন সুত্র হতে সংগৃহীত
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:৫৪
১২টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিএনপিপন্থী ব্লগারদের বাকস্বাধীনতা হরনের নমুনা

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ১৪ ই মার্চ, ২০২৬ সকাল ১০:১৬

বিএনপির মির্জা আব্বাস অসুস্থ হবার পর কিছু বিএনপি সমর্থক এর দায় খুবই ন্যক্কারজনকভাবে নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীর উপড় চাপাতে চাইছে !! অসুস্থ মির্জা আব্বাসের ছবি দিয়ে এরকম... ...বাকিটুকু পড়ুন

মির্জা আব্বাস ও দায় এড়িয়ে যাওয়া

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৪ ই মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১২:২৯

মির্জা আব্বাস ও দায় এড়িয়ে যাওয়া



মির্জা আব্বাসের যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটে, তাহলে এর নৈতিক দায় এড়িয়ে যাওয়া সহজ হবে না। সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে তাকে লক্ষ্য করে অসম্মানজনক... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রিয় সামু ব্লগারদের কাছে খোলা চিঠি....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৪ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৩২

প্রিয় সামু ব্লগারদের কাছে খোলা চিঠি....

প্রিয় সহব্লগার,
আমার লেখা একটা পোস্টের তথ্য খুজতে অনেক দিন পর আজ আবার লগইন করলাম আমাদের প্রিয় সামুতে। লগইন করার পর প্রথমেই অভ্যাসবশত চোখ গেল প্রথম... ...বাকিটুকু পড়ুন

কমরেড তারেক রহমান , লাল সেলাম ।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৫ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ১:৪৮


ভোটের কালি নখ থেকে মোছার আগেই তিনি কাজ শুরু করেছেন। এই কথাটা তিনি নিজেই বলেছেন, গতকাল, ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে। আর এই কথাটা পড়ে আমার বুকের ভেতরে একটা উষ্ণতা অনুভব... ...বাকিটুকু পড়ুন

×