somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন

১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

*** জামাত শিবির এর যারা আছেন তারা দয়ে করে প্রবেশ করবেন না ***


বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এখন আর কেবল একটি দলের ভাগ্যের প্রশ্ন নয় এটি রাজনৈতিক ভারসাম্য, গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং জনমতের গতিপথের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। তারা রাজনীতিতে ফিরবে কি ফিরবে না এই প্রশ্নের উত্তর অনেকাংশেই নির্ভর করছে তাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, কৌশলগত দক্ষতা এবং উদ্ভূত বাস্তবতাকে কতটা বিচক্ষণতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারে তার উপর।

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাঃ ভারসাম্যহীনতার সংকেত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি (centre right) এবং প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে জামায়াতের (far right) উত্থান রাজনৈতিক পরিসরে একধরনের ডানমুখী ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে।

এমন পরিস্থিতিতে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রপন্থী (centrist) দলের অনুপস্থিতি রাজনৈতিক বিতর্ক ও নীতিনির্ধারণকে একপেশে করে তুলতে পারে। আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিকভাবে centre-left থেকে centrist ধারায় অবস্থান নেওয়া একটি দল হিসেবে এই শূন্যতা পূরণ করতে পারত। আপাতত তাদের বাইরে সমমানের কোনো সংগঠিত শক্তির উত্থান দৃশ্যমান নয়।

পতনের কারণঃ নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক সংকট
আওয়ামী লীগের পতন কেবল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফল নয়; এটি দীর্ঘদিনের জমে থাকা অভিযোগের পরিণতি। বিশেষত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে দেশি বিদেশি পর্যবেক্ষকদের প্রশ্ন তাদের রাজনৈতিক বৈধতাকে দুর্বল করেছ। Freedom House, EU Election Observation Mission সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা নির্বাচনগুলোর স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক চরিত্র নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, নির্বাচনী ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তোলার অভিযোগই তাদের পতনের কেন্দ্রীয় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাজনৈতিক বিজ্ঞানী রবার্ট ডালের “Polyarchy” তত্ত্ব অনুযায়ী, গণতন্ত্র টিকে থাকে প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন ও বহুমাত্রিক অংশগ্রহণের উপর। সে মানদণ্ডে প্রশ্ন উঠলে ক্ষমতায় টিকে থাকাও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না।

মানবাধিকার ইস্যু ও জনমতের বিচ্যুতি
গণঅভ্যুত্থানের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিবর্ষণ, গ্রেপ্তার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ দলটির বিরুদ্ধে তীব্র জনরোষ তৈরি করে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন তাদের ভাবমূর্তিকে আরও সংকটে ফেলে।
ফলে “হাইব্রিড রেজিম” বা নির্বাচনী কাঠামো থাকলেও কার্যত একদলীয় আধিপত্যের অভিযোগ এই বর্ণনাটি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। জনমনে তৈরি হওয়া এই ধারণা প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর নির্বাচনী প্রচারে বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার বনাম সাম্প্রতিক ব্যর্থতা
১৯৪৯ সাল থেকে সক্রিয় আওয়ামী লীগ ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান রচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের মতো নীতিমালা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার কৃতিত্ব তাদের।
কিন্তু ইতিহাসের গৌরব সমসাময়িক রাজনৈতিক বৈধতার বিকল্প নয়। ১৯৯১-পরবর্তী সময়ে তাদের আদর্শিক অবস্থানের পরিবর্তন, সামাজিক গণতান্ত্রিক থেকে কেন্দ্রপন্থী অবস্থানে রূপান্তর এবং ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশলগত কঠোরতা তাদের ইমেজকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের চ্যালেঞ্জ
বর্তমানে আওয়ামী লীগের কৌশল অনেকাংশে Narrative Framing এর উপর নির্ভরশীল নিজেদের ষড়যন্ত্রের শিকার হিসেবে উপস্থাপন করা। এই ফ্রেমিং দলীয় কোর সমর্থকদের উদ্দীপ্ত করলেও বৃহত্তর জনমতের মধ্যে বিপরীত প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে।
Cognitive Dissonance Theory অনুযায়ী, উন্নয়নের বয়ান এবং রাজনৈতিক পতনের বাস্তবতার দ্বন্দ্ব সামাল দিতে গিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের আশ্রয় নেওয়া দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বাসযোগ্যতা কমিয়ে দিতে পারে। এছাড়া দেশের অ্যান্টি-ইন্ডিয়ান সেন্টিমেন্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতা। ভূরাজনীতিতে ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত একটি দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে এই মনোভাব মোকাবিলায় নতুন কৌশল নিতে হবে।

অনলাইন ছায়াযুদ্ধ বনাম বাস্তব রাজনীতি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় উপস্থিতি থাকলেও সেটি বাস্তব রাজনৈতিক সংগঠনের বিকল্প নয়। অ্যালগরিদমিক বাস্তবতা বলছে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া প্রাধান্য পাচ্ছে। ফলে কেবল অনলাইন প্রচারণা দিয়ে রাজনৈতিক পুনর্বাসন সম্ভব নয়।
রাজনীতিতে ফিরতে হলে তাদের বিকল্প সামাজিক প্ল্যাটফর্ম, নাগরিক উদ্যোগ এবং তৃণমূল সংযোগ পুনর্গঠনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। সান জুর “Indirect Approach অনুসারে, সরাসরি সংঘর্ষ নয় বরং কৌশলগত অভিযোজন ও ধৈর্যশীল পুনর্গঠনই হতে পারে কার্যকর পথ।

সামনে পথ কোনটি?
রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রায়শই ব্যাকস্লাইড তৈরি করে কিন্তু সেটিকে ইতিবাচক রূপান্তরের সুযোগেও পরিণত করা যায়। আওয়ামী লীগের সামনে এখন দুটি পথ:-

১. অতীতের অবস্থানে অনড় থেকে ধীরে ধীরে ইতিহাসের অধ্যায় হয়ে যাওয়া,
অথবা
২. আত্মসমালোচনা, কাঠামোগত সংস্কার এবং নতুন বয়ান নির্মাণের মাধ্যমে পুনর্গঠন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভারসাম্যের জন্য একটি কার্যকর কেন্দ্রপন্থী শক্তির প্রয়োজন রয়েছে এ নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু প্রশ্নটি অস্বীকার করা কঠিন। তবে সেই শক্তি হিসেবে ফিরে আসতে হলে আওয়ামী লীগকে অতীতের ভুল স্বীকার, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আস্থা পুনর্গঠন এবং জনসম্পৃক্ততার নতুন ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে।

শেষ পর্যন্ত, জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া যেমন কোনো অভ্যুত্থান সফল হয় না, তেমনি জনগণের আস্থা ছাড়া কোনো রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনও সম্ভব নয়।

সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:২৬
৯টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দেশে টেকসই পরিবর্তন আনতে এই 'প্ল্যান'-গুলো আমাদের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর লিস্টে আছে কি?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৪৮



আসসালামু আলাইকুম।
দেশে টেকসই পরিবর্তন আনতে নিচের বিষয়গুলোর উপর নজর দেওয়া জরুরী মনে করছি।

প্ল্যান - ১
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রত্যেকটিতে গবেষণার জন্যে ফান্ড দেওয়া দরকার। দেশ - বিদেশ থেকে ফান্ড... ...বাকিটুকু পড়ুন

পবিত্র হজ্জ্ব- ২০২৫ এর মায়াময় স্মৃতি….(৮)

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:১০

আমরা ০৯ জিলহজ্জ্ব/০৫ জুন রাত সাড়ে দশটার দিকে মুযদালিফায় পৌঁছলাম। বাস থেকে নেমেই অযু করে একসাথে দুই ইকামায় মাগরিব ও এশার নামায পড়ে নিলাম। নামাযে ইমামতি করেছিলেন আমাদের দলেরই একজন,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফ্যাসিবাদের নতুন ধরন - জুলাই মাসে কই ছিলেন?

লিখেছেন সাজিদ উল হক আবির, ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:৫৬

১।

জুলাই মাসে কই ছিলেন – গত দেড় বছর ধরে অনলাইনে এই এক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি বহুবার। এই প্যাটার্নের প্রশ্ন, অভাগা দেশে বারবার ফিরে আসে। শেষমেশ এই ধরনের প্রশ্নগুলোই নতুন... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্ধের দেশে আয়না বিক্রি করতে এসেছিলেন ইউনুস স্যার!

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:৩৪



অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে বিদায়ী ভাষণ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ছেড়ে গেলেও নতুন বাংলাদেশ গড়ার সার্বিক দায়িত্ব আমার, আপনার, আমাদের সবার। দীর্ঘ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন

লিখেছেন কিরকুট, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৫৪

*** জামাত শিবির এর যারা আছেন তারা দয়ে করে প্রবেশ করবেন না ***


বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এখন আর কেবল একটি দলের ভাগ্যের প্রশ্ন নয় এটি রাজনৈতিক ভারসাম্য, গণতান্ত্রিক কাঠামো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×