১।
জুলাই মাসে কই ছিলেন – গত দেড় বছর ধরে অনলাইনে এই এক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি বহুবার। এই প্যাটার্নের প্রশ্ন, অভাগা দেশে বারবার ফিরে আসে। শেষমেশ এই ধরনের প্রশ্নগুলোই নতুন ফ্যাসিবাদের জন্ম দেয়।
মনে পড়ে, পাঁচই অগাস্ট ২০২৪ সালে যখন আওয়ামী সরকারের পতন হয়, শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান এবং দেশের মানুষ গনভবনে ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ে ভাঙচুর, লুটতরাজ চালাতে থাকে, তখন ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম এরকম যে – অবিশ্বাস্য, শেখ হাসিনার পতন!
তখন প্রথমবারের মতো এক ছাত্র কমেন্ট বক্সে এই মহার্ঘ্য কমেন্টটি প্রথমবারের মতো করে – এতোদিন পর গর্ত থেকে বের হইসেন, জুলাই আন্দোলনের সময় কই ছিলেন?
জুলাই আন্দোলনের সময় ঐ ছাত্রের বাবা, মা, অন্য অনেক সাধারণ কর্মজীবী মানুষ যেখানে ছিল, আমিও সেখানেই ছিলাম। অফিসে। অফিস শেষে বাসায়। ছেলেটি গনভবন ভাঙচুরে অংশ নিয়েছিল। তার ছবিও ফেসবুকে পোস্ট করেছিল।
আমি ওকে কোন উত্তর দিতে পারি নি। অগাস্ট ৫ – ৮ ছিল পুলিশ – প্রশাসনবিহীন বাংলাদেশে স্মরণকালে সবচে বিপদজনক সময়। নিজেকে জুলাই বিপ্লবী ও সমন্বয়ক দাবী করা ছাত্রদের ঘাঁটানোর ফল কি হতে পারে, সেই ভয়েই নীরব থেকেছি। দিন যত গেছে, বুঝতে পেরেছি, আমার প্রাক্তন ছাত্রের ছুঁড়ে দেয়া অভিযোগের জবাব না দিয়ে গর্তে লুকিয়ে কাজটা ঠিকই করেছিলাম।
কিন্তু সেই প্রথমবারের মতো আমার মনে প্রশ্নটি জোরেসোরে উত্থাপিত হয়, তবে কি আমারও ওর সঙ্গে গনভবন ভাংচুরে যাওয়া উচিৎ ছিল? দেশপ্রেমিক, সচেতন নাগরিক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার জন্য কেন সবসময় একটা শক্ত রাজনৈতিক অবস্থান, আমাদের নিতেই হবে? সোশ্যাল মিডিয়ায়, অথবা ব্লগে, অথবা রাজপথে নেমে কেন শ্লোগান দিতেই হবে?
আমি খুব গর্ব করে কথাটা সবসময় বলি যে, আমি একজন ট্যাক্সপেয়িং সিটিজেন। ২০১৬ সাল থেকে পেশাজীবী, ঐ বছরেই আমার ই-টিন তৈরি করে ২০১৭ সাল থেকে নিয়মিত ট্যাক্স দিই। রাষ্ট্রের নিয়ম মানি। সৎভাবে পয়সা উপার্জন করি। দুর্নীতি করি না। দেশের প্রতি নিজের ভালবাসা, নিজের দায়িত্ববোধ প্রমাণের জন্য এই কাজগুলো যথেষ্ট নয় কেন?
দেশপ্রেমিকের প্যারামিটার হিসেবে ফেসবুকে প্রোফাইল লাল করা, আর সরকার বিরোধী শ্লোগান দেয়া – এই ধরনের জনতুষ্টিমূলক কাজগুলিকেই বারবার কেন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়?
২।
সরকারের পতন হয় ছাত্র – জনতার রোষে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আর খেটে খাওয়া মানুষের রাজপথে আন্দোলনে। জনতার এই দুই শ্রেণীর প্রতি পুরো সম্মান রেখেই বলছি, এদের হারানোর মতো জিনিস কম।
কিন্তু আমরা কর্মজীবী মধ্যবিত্ত যারা বহু কষ্টে, সততার সাথে তিলে তিলে নির্মাণ করেছি নিজেদের সামান্য সঞ্চয়, আমাদের মতো যাদের বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় থাকে স্ত্রী – পুত্র কন্যা, আমাদের পক্ষে রাস্তায় ঝাঁপিয়ে পড়ে গুলির সামনে বুক পেতে দেয়াটা সহজ নয়। আমরা পঙ্গু হয়ে গেলে, বা মারা গেলে, কে দেখবে আমাদের পরিবারকে?
সবচে বড় কথা, এই মধ্যবয়স্ক মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের দুঃখ দুর্দশাই সবচে কম অ্যাড্রেসড হয়। ছাত্রদের কোটার প্রয়োজন নেই, সরকারী চাকরির বয়স সীমা উঠিয়ে দিতে হবে, হলে সিট লাগবে, খাবারের মান উন্নত করতে হবে – এ সমস্ত দাবীতে তারা সহজেই রাস্তায় নামতে পারে। যূথবদ্ধ হয়ে সরকারের দিকে চোখ রাঙ্গাতে পারে।
কিন্তু কর্মজীবী মধ্যবিত্তরা পৃথিবীর সবচে দলছুট গোত্র। তাদের সমস্ত বেদনা, সমস্ত পরাজয় - বিচ্ছিন্ন ও একাকী।
পর্যাপ্ত ট্যাক্স দেয়ার পরেও যখন সরকার বেসরকারি চাকুরীজীবীদের পকেটে যখনতখন হাত ঢুকায়, ট্যাক্সের হারে তারতম্য করে, যখন আমাদের চাকুরীদাতা সংস্থাগুলো আমাদের নানারকম পেশাভিত্তিক চাপের মধ্যে ফেলে, আমাদের যাওয়ার জায়গা থাকে না। বিগত সরকারের আমলে সালমান এফ রহমানের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিতে আমার বিল্ডিং এর ঠিক পেছনের বিল্ডিং এ বসবাসকারী তিন কন্যাসন্তানের জনক এক ভদ্রলোক গলায় দড়ি বেঁধে ফাঁশ নিয়েছিলেন, শেয়ার মার্কেটে সবকিছু খুইয়ে, সেই লোকটার জীবন, কষ্ট নিয়ে কোথাও আলাপ হয় নি কখনো।
তবুও নিজের বিবেকের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে, নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেই লিখেছি - যখন সরকারের যে পলিসি অপছন্দ হয়েছে তার বিরুদ্ধে। ২০২৪ এর জুলাই মাসের ১৬ তারিখে, যখন আন্দোলন ঠিক দানা পাকিয়ে ওঠে নি, তখনি সরকারী ক্রাকডাউনের বিরুদ্ধে আমার লেখা গল্প ছাপা হয়েছিল জাতীয় দৈনিকে। এই ব্লগেই আছে সে লেখা। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ইলেকশন রিগিং নিয়ে গোটা একটা চ্যাপ্টার আছে আমার প্রকাশিত উপন্যাস শহরনামায়।
কিন্তু যারা জুলাই বিপ্লবের সময় কই ছিলেন - এই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে উইচ হান্টিং করবেন, তাদের এত সময় কোথায় বইপত্র পড়বার? এর থেকে অনেক সহজ আমাদের মতো গোবেচারা মধ্যবিত্তদের কলার ধরে প্রশ্ন করা – ‘কই ছিলেন জুলাই আন্দোলনের সময়?’
জবাবে আমাদের কিছু বলার থাকে না।
কারন প্রশ্নটা অশ্লীল।
রাস্তায় কেউ যদি আপনাকে থামিয়ে প্রশ্ন করে – আরে, তুমি কি হিজড়া? এই প্রশ্নটা যেমন অশ্লীল, ঠিক তততুকুই অশ্লীল পূর্বের প্রশ্নটি। প্যান্টের চেইন খুলে নিজের পুংদণ্ড প্রদর্শন ছাড়া যে অশ্লীলতার প্রতিউত্তর সম্ভব নয়।
এদিকে আমরা আজ দেখছি, এক পরিবারতন্ত্রের পতনের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আরেক পরিবারের প্রতিস্থাপন। দেশেজুড়ে ধর্ম বেচাকেনার রাজনীতির মচ্ছব। আমরা মধ্যবিত্তেরা সন্দিঘ্ন চোখে তাকিয়ে আছি নতুন সরকারের দিকে। একদিকে আশা, অপরদিকে সন্দেহ। কারণ আমরা জানি, আমরা মধ্যবয়স্ক কর্মজীবী নারি এবং পুরুষ। আমরা দেশের ক্ষমতার বলয়ে সবচে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। যাদের নতুন করে জেতার মতো তেমন কিছু নেই, কিন্তু হারানোর আছে প্রায় সবকিছুই।
৩।
পরাজিত পক্ষকে ফ্যাসিবাদ বলে লাভ নেই। যারা ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াইয়ে হেরে গেছে, তারা আর বর্তমান প্রেক্ষাপটে ফ্যাসিবাদী নয়। বর্তমানে যারা ক্ষমতাসীন, তাদের পক্ষেই ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠা সম্ভব।
জুলাই আন্দোলনের সময় কই ছিলেন – হরেদরে এই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে অ্যাপলিটিক্যাল জনসাধারণকে ঘায়েল করার চেষ্টা সেই ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠারই লক্ষণ।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৫:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



