১)
অত্র এলাকায় মোহতেরাম জলিল লাল তরফদারের ব্যাপক সুনাম তাহার সমাজব্রতের কারনে। অলিগলির কুনা কান্ঞ্চির মজা পুস্কুরিনী পরিশুদ্ধ করন, মশক নিধন কর্মসূচী, মাদকাসক্ত দূরীকরনের মতো নানা কার্মে তাহার জুড়ি মেলা ভার। তিনি কখনো চোর বাটপার বা মাদকাসক্তদের ঘৃনা করিতেন না। তাহার মতে," ইতারা পয়দা হইছিলো এক পঙ্কিল সমাজে নিস্পাপ হইয়া, কিন্তু বড় হইছে বান্দর হইয়া, ইহা তো সমাজেরই দুষ?" এই তত্বে অনুপ্রানিত হইয়া জলিল মিয়া তাহার ঘুষের টাকা জীবনের শেষ প্রান্তে আসিয়া সমাজের জন্য কল্যানকর কাজে অতিবাহিত করিতে ব্রত হইলেন। তাহার এহেন টাকার গরমের কর্মের কারনে সবাই খুবই গুনিয়া মানিয়া চলে। এইজন্য তাহাকে বিভিন্ন সভা সেমিনার সাক্ষাৎকারে অংশগ্রহন করিবার জন্য কাড়াকাড়ি চলে প্রতি প্রত্যুষে। তাহার অমৃত সুধা শুনিবার তরে সমাজের সুধীবৃন্দ হা হইয়া থাকে। কিন্তু তিনি প্রথম আলো নামক দৈনিক পত্রিকাকে দুচক্ষে দেখিতে পারেন না। তাহার মতে এই পত্রিকা চরম হিপোক্রেটদের আখড়া। সমাজ বদলাইবার নাম করিয়া ইতারা সমাজে বিভিন্ন বিশৃঙ্খলতার জন্ম দেয়, শুরু করে সুগভীর ষড়যন্ত্র। উক্ত কারনে বহু সভা সমিতিতে প্রায় প্রকাশ্যেই বলিয়া ফেলেন,"দেশের অর্ধেক সমস্যা তলায়া যাবে যদি প্রথম আলোর মতো কাগুজ বন্ধ কইরা দেওন যায় !"
তো একদিন প্রত্যুষে নিদ্রা থেকে উঠিয়া প্রাতঃরাশ যাইবার নিমিত্তে তাহার পদযুগল গেটের সামনে রাখিতেই দারোয়ান সাদেক আলীর কেলায়িত হাসি,"স্যার, আপনের ফটুক ছাপাইছে হালারা। যদি কন তো হালাগো গোডাউন জ্বালায় দেই?"
জলিল সাহেব কিন্ঞ্চিৎ ভ্রু কুচকাইয়া অম্লান বদনে পত্রিকা খানা হাতে লইয়া দেখিলেন প্রথম আলো পত্রিকার "গুনীজন কহে" সম্পাদকীয়তে তাহার ফটুক স হ বিশাল স্তুতি লেখা ছাপাইয়াছে। তিনি প্রায় এক নিঃশ্বাসে বিশাল বড় লেখা পড়িয়া আবেগে আপ্লুত হইয়া কহিলেন,"ওরে সাদেক, কালকা থিকা জনকন্ঠের গোডাউনে আগুন লাগা, প্রথম আলো ছাড়া অন্য কোনো পত্রিকা এলাকায় না ঢুকেরে বলে দিলুম!"
২)
শাহেদের সকাল বেলা অফিস শুরু হয় ঠিক ৮ টায়। কিন্তু জ্যামের কারনে তার অফিস যেতে লাগে ৩ ঘন্টা। আইটি সেকশনে কাজ করার কারনে তাকে ঠিক ৮ টার মধ্যেই ঢুকতে হয়। তাই বেচারাকে খুব ভোরে উঠতে হয়। কিন্তু তাই বলে সে সকাল ৫ টায় উঠে ৬ টায় রওনা দিতে পারে না। তাহলে দেখা যাবে রাস্তা খালি থাকার কারনে তাকে ৭ টার আগে অফিসের সামনে দাড়িয়ে থাকতে হবে। তাই খুব ক্যালকুলেশন করে ৫:৪৫ এ উঠে ঠিক ৬:৩০ এর বাস ধরার। এর পরে আছে ৭ টার বাস। কিন্তু ৭ টার বাস ধরলে তাকে অফিসে পৌছাতে হয় বেলা ১০ টায়।
তো ভোর ৫:৪৫ এ আইফোনে এলার্ম দিয়ে ঘুমালো ঠিক আগের রাত্র ১০ ঘটিকায়। ঘুমটা ভালোই হলো। ঘুমের মধ্যে নানা কিসিমের স্বপ্ন দেখিলো। মাঝরাতে বৃষ্টি হওয়াতে ঘুম আরও গাঢ়ও হলো। ঘুমের মধ্যে তার সাবেক ১৫ টা গার্ল ফ্রেন্ডের মধ্যে সবচেয়ে ফাটাফাটি দু'জন দেখা দিয়ে গেলো। শাহেদের এমন ঘুম যে কতবছর পর হলো তার হিসাব করাটাও বোকামী। তো যখন তার সবচেয়ে হট সাবেক ৩ নম্বর গার্লফ্রেন্ড আসলো সেইরকম শর্টকাট পড়ে, এমনি সময় মনে হলো ঘুমটা বেশী হয়ে যাচ্ছে। দুম করে চোখ খুলে মোবাইল হাতে নিয়ে হোম বাটন চাপতে লাগলো। কি যন্ত্রনা! মোবাইল কেনো চালু হয় না? চার্জার তো মোবাইলে লাগানো। ফ্যানটাও ঘুরছে, তার মানে ইলেক্ট্রিসিটি আছে। তাহলে? উঠে সকেটের দিকে তাকিয়ে দেখে চার্জারের প্লাগটা লাগানো হয় নি।
শাহেদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। রাগে মাথার চুল টানাটানি করার আগেই সকেটে ঢুকিয়ে চার্জ দিলো। কটা বাজে সেটা দেখার জন্য ল্যাপী চালু করলো। ল্যাপী চালু করতেই দেখে উইন্ডোজ ১০ এর আপডেট, কমসে কম আধা ঘন্টা! মেজাজ আরো তিরিক্ষে! মাথায় ঘুরতে লাগলো রুমে কোথায় ঘড়ি আছে। এমন সময় মনে পড়লো বড় স্যুটকেসে তার ১৫ টা গার্ল ফ্রেন্ডের মধ্যে সবচেয়ে কম সুন্দরী শ্যামলা হ্যাংলা বর্নের সোনিয়ার দেয়া ৫০০০ টাকার টোপাজ ঘড়ি। অগত্যা কি আর করা, আলমারীর ওপর থেকে স্যুটকেস নামানোর জন্য টুলটা রাখলো। টুলের ওপর দাড়িয়ে বিশাল ভারী স্যুটকেস নামালো। স্যুটকেস নামানোর পর খুলতেই দেখে প্রচুর কাপড় চোপড়। এসব কাপড় চোপড়ের অধিকাংশই গিফট। যাই হোক, রদ্দির সব কাপড় খুজে অবশেষে ঘড়ির বাক্সটা দেখা পেলো, কালো বর্নের টোপাজের বাহারী বাক্স। সোনিয়ার মামা গতবছর সিঙ্গাপুর থেকে সোনিয়ার জন্য এনেছিলো। সোনিয়া শাহেদকে গিফট দেয় ভ্যালেন্টাইস ডে তে। সমস্যা হলো ঘড়িটা লেডিস, আর সোনিয়া জানতো না কোনটা লেডিস আর কোনটা জেন্টস। যাই হোক, তাড়াতাড়ি বাক্স খুলে বুভূক্ষের মতো ঘড়িটা খুলতেই মেজাজটা আরেক দফা গরম। ঘড়ির টাইম সেট করা নাই। দেখাইতেছে বেলা ১২....সেকেন্ডের কাটা না থাকায় বুঝা যাচ্ছে না ঘড়ি কি চলে না চলে না!
ঘড়ি ব্যাগের ভিত্রে রেখে কোনো মতে গোসলের জন্য বাথরুমে গেলো। বাথরুমে শাওয়ার ছাড়তেই ঝুম পানি। শাহেদ মাথায় শ্যাম্পু দিয়ে শাওয়ারের নীচে দাড়াতেই পানি বন্ধ। আরে কি হইলো? শাওয়ারের নব ঘুরানো শুরু করলো, কিন্তু পানির খবর নাই। যতটুকু পানি মাথায় পড়েছে শ্যাম্পু পুরা মাথায় ছড়িয়ে গেছে! টাংকির পানি শেষ হবার আর সময় পেলো না। গরর!
শাহেদ দৌড়ে কীচেনে গেলো। জগে ফুটানো পানি ছিলো। তাই কোনো মতে মাথায় ঢাললো। কিন্তু শ্যাম্পুর ফেনা আরও বাড়লো। পুরো শরীর জুড়ে সানসিল্কের গন্ধ!এখন কি করা যায়? মাথায় দুটো বুদ্ধি ঘুরতেছে একটা হলো ফ্রিজের কোকের বোতল দিয়ে মাথা ধোয়া আরেকটা হলো ইলেক্ট্রিক রেজর দিয়ে মাথাটাই কামিয়ে ফেলা। কিন্তু মাথা কামাতে সময় লাগবে। ফ্রীজ খুলে ২ লিটার কোকের বড় বোতল নিয়ে মাথাটা ধুলো। ইউটিউবে দেখেছিলো কোকা কোলা দিয়ে মাথা ধুলে চুল নাকি সুন্দর সিল্কি হয়। দু লিটার কোক ফেলার পর দেখলো আসলেই তাই। পুরা সিল্কি চুল, কোনো শ্যাম্পুর গন্ধ নাই।
কোনো মতে শরীরটা মুছে জামা কাপড় পড়ে দৌড়ে বাস স্ট্যান্ডে দাড়ালো। কিন্তু বাস স্ট্যান্ডে বাসের সামনে প্রায় ১ কিমি লাইন। পল্লবীতে দিন দিন মানুষের সংখ্যা এতো বাড়তেছে.........উফফ...।কত যে দেরী হলো আজকে অফিসে! এমন সময় পকেটে হাত দিয়ে দেখে মোবাইলটাও আনে নাই। আজকে শাহেদের লাগছে কুফা!
আশে পাশে তাকিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে চোখ আটকালো যেখানে ঘড়ির কাটা ঠিক নটায়। ইসস........ পুরো এক ঘন্টা লেট, তার ওপর যেতে আরো ৩-৪ ঘন্টা। অফিসে জানানো দরকার কিন্তু মোবাইলটাও নাই পাশে। নম্বরটাও মুখস্থ নাই। এখন যে ফ্লেক্সিলোডের দাকানে গিয়ে ফোন করবে সে উপায়ও নেই কারন এতে দুটো সমস্যা হবে যার একটা হলো লাইন ছেড়ে বেরুলেই আরও ৫০ জনের পিছে দাড়াতে হবে, আরেকটা, নম্বর নাই স্মরনে। তবে একটা কাজ করা যেতে পারে যেহেতু তার আপেল একাউন্ট জিমেইল দিয়ে করা সেহেতু মেইলে ঢুকলে নম্বরটা খুজে পাবে। ওমনি শাহেদ তার সামনে দাড়িয়ে থাকা টিপটপ সুন্দরীকে বললো,"আপা, বাস কি দু একটা গিয়েছে এর মধ্যে?"
সুন্দরী কোমড় দুলিয়ে পেছনে তাকিয়ে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। শাহেদ দেখতে যেমন ফর্সা তেমনি ড্যাসিং। হাতের ম্যাগাজিনটা জোরে জোরে বাতাস করতে করতে নিজের চুল আর কামিজের দেহের ভাজ ফোটানোর জন্য একটু পিঠের কাছে টান দিয়ে বললো,"আর বলবেন না ভাইয়া, সেই কখন থেকে দাড়িয়ে আছি। ফেসবুকে অফলাইনে একটা স্ট্যাটাসও লিখে রেখেছি, সাথে দুটো সেলফি। বাসে ওয়াই ফাই পেলে আপলোড করবো বলে, কিন্তু বাসের খবরই নেই।"
অন্য সময় হলে শাহেদ তার ফোন নম্বর, ফেসবুক একাউন্ট সাথে দু তিনটা সেলফি তোলার ধান্ধায় থাকতো। কিন্তু শাহেদ মনে মনে বিড় বিড় করলো,"ফকিন্নীর নেটও নাই!"
মেয়েটা অবাক হয়ে বললো,"ভাইয়া কিছু বললেন? ও আচ্ছা আমার নাম নিকি। থাকি পল্লবীর ৫ নম্বর....." কথা শেষ হবার আগেই শাহেদ একটা খালি সিএনজি থামিয়ে দুম করে উঠে পড়লো। সিএনজি চলা শুরু করলো ভোঁ ১০ নম্বরের দিকে। কিন্তু এত জ্যাম যে সিএনজি পাশের অলি গলি দিয়ে চলা শুরু করলো। অলিগলির ভেতরও জ্যাম! এদিকে সিএনজির চ্যাংড়া ছেলেটার মিটার বন্ধ হাতে নাই ঘড়ি। শাহেদের টেনশনে ভিজে গেলো পুরা শার্ট। সিএনজি আবার নতুন কাহিনী শুরু করলো, দুই কদম চলে তো ৫ কদম পেছায়। এমন করে কোনো মতে ক্যান্টনম্যান্টে গিয়েই বললো,"স্যার, গ্যাস লইতে হইবো।!"
শাহেদ দাত কিড়মিড় করে বাইরে নেমে দুটা লাফ দিলো, বাতাসে কয়টা ঘুসি ছুড়ে মারলো। না জানি মোবাইলে কতগুলা ফোন আর অফিসের না জানি কি অবস্থা! আর মরার আইফোন চার্জও থাকে না। জেসি গিফট করেছিলো। জেসি কানাডা যাওয়ার পর আর কোনো খবরই রাখেনি শাহেদ। দোষটা ওরই। জেসি দেখতে অতটা সুন্দরী না হলেও প্রচুর টাকা ছিলো। এই মনে করে পকেট থেকে একটা বেনসন বের করলো।টেনশন করে লাভ নেই। এমন সময় সিএনজিয়ালা বললো,"স্যার, গ্যাস নেয়া হয়ে গেছে।"
শাহেদ তীরিক্ষী সুরে বললো,"খালি না গ্যাস না, যদি পারও মুইত্যা হাইগ্যাও আসো! আজব দেশ।"
সিএনজি ওয়ালা কিছুই বললো না। শাহেদ উঠতে সিএনজি ভো টান। যাক, রাস্তাটা ফাঁকা। খুব দ্রুত অফিসে পৌছে গেলো। সিএনজি ওয়ালার ভাড়া ১৫০ টাকা হলেও সে নিজে থেকেই ১৩০ টাকা চাইলো। ২০ টাকা বেচে যাওয়াতে শাহেদের একটু অনুশোচনা হলো, হুদাই বেচারাকে গালি দিলো।
২০ টাকা পকেটে গুজে যেই না অফিসের ফ্লোরে গেলো দেখে দরজা বন্ধ, ভিতরে লাইট নাই। শাহেদের আক্কেল গুড়ুম। আরে কি কাহিনী?
বেশ কিছুক্ষন দাড়িয়ে থেকে লিফট চেপে নীচে নেমে বিল্ডিং এর দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলো,"মামা, অফিস বন্ধ কেন? "
দারোয়ান মামা পান চিবুতে চিবুতে একটু পিক ফেলে মুখটা একটু হাল্কা করে নিলো। একটা কাঠি দিয়ে দাত খুচাতে খুচাতে বললো,"কি কন মামা, আজকা তো শুক্রবার।ছুটি! তার ওপর আজকা বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ টুন্টি-টুন্টি। আপনাগো বাসার ওদিকেই তো খেল হইতাছে!"
বিঃদ্রঃ ইহা একখান কাল্পনিক ঘটনা, কারো সাথে মিলিয়া গেলে যা পারেন করেন গিয়া। কেস করেন, না চাপাতী দিয়া কুপাইবেন নাকি গোডাউনে আগুন ধরাইবেন, ধরান গিয়া

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


