রাখাইনে রোহিঙ্গা নির্যাতনের অভিযোগে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এ দফায় কোনো প্রস্তাব নেওয়া যায়নি। দুই স্থায়ী সদস্য চীন ও রাশিয়ার সম্মতি না পাওয়ায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো প্রস্তাব নিতে পারেনি নিরাপত্তা পরিষদ। গত ৬ নভেম্বর নিরাপত্তা পরিষদের এক অনির্ধারিত বৈঠকে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছে সভাপতির বিবৃতি (presidential statement)।
বাংলাদেশের নীতি নির্ধারকদের কাছে এটাই 'বড় অগ্রগতি' হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞায় 'অভ্যস্ত' মায়ানমারের উপর এই জাতীয় বিবৃতি কতটা চাপ সৃষ্টি করতে পারে তা এই বিবৃতির জবাবে মায়ানমারের বক্তব্যেই স্পষ্ট হয়েছে।
মায়ানমারের পরীক্ষিত বন্ধু চীনের উপস্থিতিতে নিরাপত্তা পরিষদে দেশটির বিরুদ্ধে কোন কার্যকর এবং কঠোর প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার আশা করাটাই অর্থহীন। নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে মায়ানমারের বিরুদ্ধে কঠোর কোন ব্যাবস্থা নিতে হলে বাংলাদেশের আগে বসতে হবে চীনের সাথে। চীনের সাথে বসলেই চীন বাংলাদেশের পক্ষে চলে আসবে তা না। এজন্য চীনের উপরও পরোক্ষ চাপ তৈরি করতে হবে।
এক্ষেত্রে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকাতে পারি। মানবতার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের পাশে দাঁড়াবে এটা ভাবার কোন কারণ নেই, যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সাহায্য করবে তার নিজের স্বার্থেই। যুক্তরাষ্ট্র চীনের পুরোনো শত্রু। এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব কমাতে ওবামা প্রশাসন হিন্দু জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী নরেন্দ্র মোদির সরকারের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করলেও, ভারতকে যুক্তরাষ্ট্র যে এখনও বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে দেখে না, তা বলাই বাহুল্য।
যুক্তরাষ্ট্রের মায়ানমারের বিশাল খনিজ সম্পদের উপর স্বাভাবিক আগ্রহ রয়েছে। মায়ানমারে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং সুচি কে ক্ষমতায় আনার পেছনে পশ্চিমা লবির মূল উদ্দেশ্য ছিলো মায়ানমারে বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদের ভাগ নেয়া। কিন্তু দেশটির সামরিক জান্তা এখন পর্যন্ত সফল ভাবেই ক্ষমতা নিজেদের কাছে রাখতে সমর্থ হয়। পাশাপাশি রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিজের অবস্থানের কারণে পশ্চিমা বিশ্বে সুচির ভাবমূর্তি চরম ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে মায়ানমারে যুক্তরাষ্ট্রের 'একমাত্র প্রতিনিধি' গণতন্ত্রের মানসকণ্যা সুচির নৈতিকতা এখন অনেকটাই প্রশ্নের মুখে।
বাংলাদেশ এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বহু পুরোনো সামরিক সহযোগীতার চুক্তি রয়েছে। বাংলাদেশ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রস্তাব দিতে পারে যে রোহিঙ্গা সমস্যার দ্রুত সমাধান নিশ্চিত করার বিনিময়ে বাংলাদেশ দেশটির জন্য কি করতে পারে। বাংলাদেশ খুব সহজেই বঙ্গোপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের নামে যুক্তরাষ্ট্রও সুযোগ পাবে এই অঞ্চলে নিজের উপস্থিতি ও প্রভাব বাড়ানোর।
এইরকম একটি পদক্ষেপের নানামাত্রিক পরিণতি থাকতে পারে। তবে একথা নিশ্চিত এ জাতীয় পদক্ষেপ চীনের উপর চাপ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখবে। এক্ষেত্রে চীনও বাধ্য হবে এই ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা রেখে এই অঞ্চলে নিজের প্রভাব বজায় রাখতে। বাংলাদেশও এর মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান ভালোভাবে জানান দিতে পারে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কাছে।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ অনেক কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছে সন্দেহ নেই। তবে তা নিয়ে আত্মতৃপ্তিতে ভোগারও অবকাশ নেই। সমস্যাটা জটিল, সমাধানে আমাদের কৌশলী হওয়া বাঞ্ছনীয়।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই নভেম্বর, ২০১৭ দুপুর ১:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



