চারুকলার ছাত্র ও কবি টোকন ঠাকুরের প্রথম চলচ্চিত্র ব্ল্যাক আউট। ঠিক জীবনকাহিনী না-হলেও এটা আসলে তারই মানসকাহিনী। তিনি এই ছবিতে নিজেকে ভেঙ্গে দুই চরিত্র বানিয়েছেন, ব্যাকটেরিয়া যেভাবে নিজেকে দ্বিবিভক্ত করেÑ এই ছবির প্রধান দুই চরিত্র রাফি ও মাদল যথাক্রমে চিত্রশিল্পী ও কবি। টোকনের মতোই তারা দু’জন ত্রিশোর্ধ যুবা, ব্যাচেলর, চিলেকোঠায় বাস করে এবং স্বপ্নে-প্রেমে-কামে জর্জরিত থাকে। প্রথম ছবিতেই টোকন ঠাকুর আত্মকাহিনী লিখেছেন, কবি চরিত্রটি যেভাবে শৈশবের স্মৃতিতে বিভোর থাকে, তাতে মনে হতে পারে তিনি যেন আত্মজীবনীই লিখতে বসেছেন। তবে আত্মজীবনীর প্রতিটি পর্বের বর্ণনা না-থাকলেও ব্ল্যাক আউট যে এই সময়ের স্বপ্নাতুর, নেশাতুর, কামাতুর কিছু যুবকের জীবনযাপন ও চর্চার ডকুমেন্টশন, একথা নিশ্চিত করেই বলা যায়। বিশেষত, চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে আজিজ সুপার মার্কেটের মধ্যবর্তী কয়েক গজের ভূখণ্ডে ঢাকাকেন্দ্রিক শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি প্রতিনিয়ত কিছু তরুণ দ্বারা রোপিত ও চর্চিত হচ্ছে, তাদের শিল্পভাবনা-প্রেম-অপ্রেম-জীবনযাপনের ডকুমেন্টশন যেন ব্ল্যাকআউট ছবিটি। তবে ডকুমেন্টারির কিংবা ফিচার ফিল্মের কনভেনশনাল ন্যারেটিভের মধ্যে যাননি পরিচালক, প্রতীক-পরাবাস্তবতা-এনিমেশন মিলিয়ে নিরীার জটিল পথে হেঁটেছেন। বাংলাদেশে নির্মিত এটিই, সম্ভবত, সবচাইতে এক্সপেরিমেন্টাল পূর্ণৗদর্ঘ্য চলচ্চিত্র। তবে নিরীায় কতটুকু সফল হলেন তিনি, সেটা বিচার্য।
গল্পহীনতা এই ছবির বৈশিষ্ট্য, নিরীাধর্মী ছোটগল্পের মতো ব্যক্তি-অনুভবের দারুণ দাপট এখানে। সরল ন্যারেটিভ সিনেমায়, গল্পের-গহীনে-ডুবতে-অভ্যস্ত দর্শকের জন্য এই ছবি আমোদ বয়ে আনে না, বরং এই যুগসন্ধিণে তরুণের অবিশ্লেষিত অথচ তীব্র অনুভূতির প্রকাশ এই ছবির পরতে পরতে, যা কবিতার মতো, চিত্রকলার মতো খানিক প্রকাশিত আর খানিক অপ্রকাশিত রহস্যে আবৃত থাকে। প্রতিভা-মাদক-প্রেম-কাম-যন্ত্রণায় বিদ্ধ তরুণদের এই ছবি অনেকখানি স্পর্শ করবে, আর সমকালীন তারুণ্যকে বুঝতে আগ্রহী অ-তরুণদেরও এই ছবি আকৃষ্ট করতে সম হবে। তবে এর বাইরে যারা আছেন, তারা এই ছবিকে প্রত্যাখ্যান করবেন, কতকটা এর জটিল উপস্থাপনা-ধরনের জন্য, কতকটা এর ‘অনৈতিক’, ‘অপ্রথাসিদ্ধ’ বক্তব্যের কারণে। ভাগ্যিস এই ছবিটি সেলুলয়েডে ধারণকৃত নয়, ভিডিও ফিকশন ছবির সেন্সর লাগে না, নইলে সেন্সরবোর্ডের কাঁচি এই ছবির েেত্র অনেক ধারালো হয়ে উঠতো। কারণ এই ছবির চরিত্র পুরুষ্ট পুংলিঙ্গের ছবি এঁকে তাকে মিসাইল বলতে চায়, এখানে আছে হস্তমৈথুনের প্রসঙ্গ, এই ছবির চরিত্র একইসঙ্গে বিষমকামী ও সমকামী। এফডিসির ছবিগুলোতে এর চাইতেও মারাত্মক কিছু থাকে, তবে সেগুলো পার পেয়ে যায়। তার অন্য রাজনীতি আছে, উপরন্তু সেগুলোর দৃশ্যায়ন এত অবিশ্বস্ত যে, তা পার পেয়ে যায়। কিন্তু ব্ল্যাক আউট ছবিতে বিষয়গুলো খুব বিশ্বস্তভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেন্সর বোর্ডের হাতে পড়লে এর আর রা থাকতো না।
এই ছবির শরীরজুড়ে কাহিনী বলতে এটুকুই: কবি মাদল ও চিত্রশিল্পী রাফি দুই কামরার এক চিলেকোঠায় বাস করে। তারা একসঙ্গে ঘুমায়, সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে। রাফির কামরা বা স্টুডিওর নাম তাহিতি, ইউরোপীয় চিত্রকর গগ্যাঁর তাহিতি সিরিজের ছবির কাছ থেকে ধার করে রাখা এই নাম। রাফির একজন গার্লফ্রেন্ড আছে, রাফি তাকে তাহিতিকন্যা হিসেবে কল্পনা করে, ভালবাসে, এমনকি বিয়েও করতে চায়; কিন্তু মিটি নামের মেয়েটি তাকে উপোও করেনা, ভালওবাসেনা। মিটির পোর্ট্রটে আঁকার কথা রাফির, রাফি তাকে মডেল হয়ে সিটিং দিতে বলে, কিন্তু মিটির এেেত্র মডেল হবার আগ্রহ নেই, সে হতে চায় বিজ্ঞাপনের মডেল। ছবির শেষে সে রাফির তাহিতি দ্বীপ থেকে উড়ে বালি দ্বীপে চলে যায়, বিজ্ঞাপনের মডেল হয়ে। এর আগেই অবশ্য তাদের সম্পর্ক ভেঙ্গেও যায়। অন্যদিকে মাদল হলো ঘরকুনো কবি, তার কিচ্ছু ভাল্লাগেনা, তার অনেক কবিতার উৎস এক নারী শাল্মলী, কিন্তু তার সঙ্গে মাদলের সম্পর্ক কখনোই গড়ে ওঠেনি। শাল্মলী সম্পর্কে সে কল্পনা করে: কোনো এক কুয়াশাচ্ছন্ন খোলা প্রান্তরে একরাশ হলুদ-কমলা গাঁদাফুলে আবৃত শাল্মলী শুয়ে আছে, মাদল সেই প্রান্তর ডিঙিয়ে শাল্মলীর কাছে এসে তার মুখমণ্ডল থেকে ফুল সরায়, চুম্বন করে। রঙিন ফুলে ছাওয়া শাল্মলীÑ এই দৃশ্য স্থিরচিত্র হয়ে মাদলের মনে গেঁথে আছে, এর বেশি হয়তো তার আর কিছূ মনে পড়েওনা। রাফির যেমন বাইরের জগত আছে, মিটি আছে, চারুকলার দাদু আছে, হঠাৎ-দেখা-হয়ে-যাওয়া বন্ধু আছে, গুরু চিত্রকর ধ্র“ব এষ আছেন, ফুটপাতে অনির্দিষ্ট হাঁটা আছেÑ মাদলের আছে এককামরার জগত, ছাদ, ছাদে দাঁড়িয়ে পাশের ভবনের বালিকার সঙ্গে ইশারায় খুনসুটি করা, আর আছে বিরাট এক কল্পনার জগত। সেই কল্পনার জগতে আছে শৈশবে সিগারেট খেয়ে নাকে খত দেবার ঘটনা, হারিয়ে যাওয়া প্রিয় বাউলের শিঙায় ফুঁক দেবার পরম মুহূর্ত, আর আছে শাল্মলী-শকুন্তলার মতো কিছু খানিক-দেখা রমণী। রাফির কামরা যদি হয় তাহিতি তবে মাদলের কামরার নাম মোকাম, সেই মোকামে খেয়ালের বশে এমএসওয়ার্ড-এর পরিবর্তে ফটোশপে কবিতা লেখে মাদল। আর মিটির সঙ্গে রাফি ডেটিঙে বেরিয়ে গেলে, মাদলের জন্য বরাদ্দ থাকে স্বমৈথুন। বাকি সময়টায় আছে শুয়ে-বসে রাফি-মাদলের অলস আলাপ, যদিও সেই আলাপের মাঝ দিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথাও তারা ইস্যু আকারে দর্শকের কাছে পেশ করে।
যতটুকু কাহিনী বর্ণনা করা হলো তার মধ্যেও গল্পহীনতা রয়েছে। গল্পহীনতাই এই ছবির গল্প। তাহলে এই ছবিতে আছেটা কী? পরিচালক এই ছবির মাধ্যমে বর্তমান সময়কে ধরতে চেয়েছেন। মাদল ফটোশপে যে-কবিতাটি লেখেন তা এরকম ছিল: সময়, সবুজ ডাইনী/পৃথিবীর উপকণ্ঠে থাকো/নাবিকের হাড় দিয়ে/সন্ধ্যার উঠোনে তুমি/ভাঙা জাহাজের ছবি আঁকো।
ফলে চারুকলা-আজিজ মার্কেট যেমন আছে তেমনি অবিকল চরিত্র নিয়ে এই ছবিতে হাজির হয়েছেন গায়ক কফিল আহমেদ ও তার গান, চিত্রকর ধ্র“ব এষ, লেখক আহমদ ছফা ও তার পুষ্প বৃ বিহঙ্গ পুরাণ। সময়কে এভাবেই অবিকৃতভাবে তুলে আনতে চেয়েছেন পরিচালক। আবার সাউন্ড ট্র্যাকে বেশ কয়েকবার ব্যবহার হয়েছে ‘সময়, সবুজ ডাইনী...’ কবিতার সুরারোপিত গান। সময়কে ধরতে গিয়ে পরিচালক কোনো আড়াল নেননি, ডকুমেন্টারির মতো প্রকৃত অনুষঙ্গকে হাজির করেছেন। তা বরং বক্তব্যের বিশ্বস্ততা বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে ‘ডাইনী’ সময়কে বর্ণনা করতে গিয়ে আসলে একটি খণ্ডিত সময় বর্ণিত হয়েছে। কারণ মুক্তবাজার অর্থনীতি ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর যে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া, যার প্রান্তিক ও ভোক্তা প্রান্তে রয়েছে বাংলাদেশ, সেই সময়ের বাংলাদেশকে পরিচালক পুরোপুরি এড়িয়ে গেছেন। শেষের দিকের কোলাজ এনিমেশনে রায়েরবাজারের বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ ছাড়া বাংলাদেশের নিজস্ব রাজনীতির প্রসঙ্গ কিংবা সা¤প্রতিক সময়ের উগ্র মৌলবাদকেও পরিচালক তার ছবিতে আনেননি। মিটি চরিত্রটির মধ্য দিয়ে বিশ্বায়িত সময়ের নারীকে হয়তো উপস্থাপন করা গেছে, কিন্তু মূল দুই চরিত্রের মধ্য দিয়ে রাজনীতির প্রসঙ্গকে ইঙ্গিত আকারে হলেও অনায়াসে স্পর্শ করা যেত।
যে-দুই চরিত্রকে নিয়ে (বলা যায় নিজেকে নিয়েই) পরিচালক গল্প ফেঁদেছেন, সেখানে মদ্যপান-স্বমৈথুন-সমকামের মতো বিষয়গুলো অবলীলায় এসে গিয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের এতদিনকার চলচ্চিত্রে এসবের অনেক কিছুই সতর্কভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। সমাজ ও দর্শক-রুচি হয়তো এর একটি কারণ। টোকন ঠাকুর সমাজের চেয়ে এগিয়ে গিয়ে কিছু বিষয়কে চলচ্চিত্রে ঠাঁই দিলেন, যাকে একটি বৈপ্লবিক পদপে বলতে হবে। সমকামিতার বিষয়টি এই বেলায় আলোচনা করে নেয়া দরকার। প্রধান চরিত্র দু’জন যখন বাসায় অলস সময় কাটায়, এ ওর গায়ে হেলান দিয়ে, কিংবা এ ওকে বালিশ বানিয়ে শুয়ে থাকে। পরস্পরকে স্পর্শ করা, ঘুমানোর সময়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়া খুব স্বাভাবিক বিষয় তাদের কাছে। মাদল মদ্যপান করে বিষাদাক্রান্ত হয়ে গেলে রাফি খোঁজ নেয়, মদ ছাড়া রাতের খাবার কিছু খেয়েছে কিনা। পরস্পরের প্রতি তাদের টান তীব্র, কিন্তু তার প্রকাশভঙ্গি স্বাভাবিক, সহজ। অন্যদিকে রাফির একজন মিটি থাকলেও, মাদল নারীসঙ্গবঞ্চিত। কিন্তু মিটিও রাফিকে ছেড়ে চলে যায়, দেখা গেল হৃদয়ের সবচেয়ে কাছের বন্ধু মাদলই, যার সঙ্গে জগতের যাবতীয় বিষয় শেয়ার করা যায়। হতাশ রাফি মাদলকে তার কষ্টের কথা জানায়, কষ্টকে ভুলে থাকার জন্য গান ছেড়ে দিয়ে দু’জন পরস্পরের হাত ধরে বলনৃত্য করে (ইতোমধ্যে জানা গেছে, মাদল আদ্যন্ত বিষণœ এক ব্যক্তি, কফিল ভাইয়ের কাছে যে একদিন কেঁদে কেঁদে বলে তার কিচ্ছু ভাল্লাগেনা), এক পর্যায়ে রাফি মাদলকে চুম্বন করতে চায়। মাদল বলে, হে এল্টন জন, এটা বাংলাদেশ। রাফি ‘প্রায় ভুলে যাচ্ছিলাম’ বলে তার বিষমকামী অস্তিত্বে ফিরে যায়। এই চুম্বনের প্রসঙ্গটি ছাড়া সমকামের আর কোনো ইঙ্গিত ছবিতে নেই। কিন্তু রাফির প্রেম মিটির সঙ্গে হয়নি, মাদলও শাল্মলীকে পায়নি। সত্যিকারের বন্ধুত্ব, সত্যিকারের প্রেম তো মাদল ও রাফির পরস্পরের মধ্যেই হয়েছে। ফ্রয়েডের মনঃসমীণের সাহায্য নিয়ে বলা যায়, এও এক ধরনের সমকামিতা। ইউরোপ ও আমেরিকায় বন্ধূদের ও বান্ধবীদের ভালবাসা নিয়ে প্রচুর উন্নত-শিল্পমানের ছবি হয়েছে, কুয়ার স্টাডিজে বিশেষত গে-ফিল্ম নিয়ে আলাদা করে স্টাডিও করা হয়ে থাকে। মোলি হাস্কেল এধরনের ছবিকে বলছেন ‘দোস্ত ছায়াছবি’ (বাডি মুভিজ)। টোকন তার অভিনব চলচ্চিত্রে সেদিকটাকেও স্পর্শ করেছেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



