আমাদের একটি অদ্ভুত প্রবৃত্তি খেয়াল করলাম। আমরা যে কোন পরিস্থিতিতেই একটা ইস্যু বানিয়ে ফেলি। ইস্যু বানিয়ে নাচতে থাকি। আশেপাশে কি হচ্ছে আমাদের খেয়াল থাকে না। খেয়াল করার মত মানসিকতা আজও আমাদের হয়নি। ব্যাপারটা দুঃখজনক এবং ভীতিকর বৈকি।একটু খুলে বলি...
আমরা অহংকারী জাতি। হ্যা! অবশ্যই অহংকার করার মত আমাদের অনেক কিছুই আছে। আমাদের ৫২ আছে,৬৯ আছে, ৭১ আছে। আমি মনে করি অন্য অনেক উন্নত জাতির চাইতে অহংকার করার রসদ আমাদের বেশি। অহংকার করার অধিকার আমাদের আছে। আমরা অহংকার করিও। তাতে আমার কোন দুঃখ নেই। দুঃখটা অন্য জায়গায়।
ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল ২০১০-২০১১ সালের নিউজিল্যান্ড সিরিজে। ক্রিকেট বিশ্ব অবাক হয়ে গেল এক নতুন বাংলাদেশ কে দেখে। কি অনায়াসে ভেট্টরি-ম্যাককালাম দের নাকানি চুবানি খাইয়ে বাসায় পাঠিয়ে দিল আমাদের বাঘের বাচ্চারা। আমরা আনন্দিত হলাম। আসলে অনেক আনন্দিত হলাম। বাংলাওয়াশ নামে এক নতুন শব্দের উদ্ভাবন হল। আমরা তখনও ছোট দল। আমাদের মনে তখনো কোন পরিবর্তন হয়নি। আমরা তখনও জিতলে হাসি, হারলে কাঁদি।
তখনই আসলে চুপে চুপে একটা ঘোষণা হয়ে গিয়েছিল। ক্রিকেট বিশ্বে এক নতুন রাজার আগমন ঘটতে যাচ্ছে।আমরা কিন্তু তখনও স্বাভাবিক। তারপর ওয়েস্ট ইন্ডিজ এসে আমাদের হারিয়ে দিয়ে গেল। পাকিস্তান এসে একেবারে হোয়াইট ওয়াশ করে গেল। আমাদের উৎসাহ একটু ভাটা পড়ে গেল।বেশি উচ্চবাচ্য করলাম না আমরা। কারণ আমাদের কাছে আমরা তখনও একটা ছোট দল। তখনও আমরা জিতলে হাসি, হারলে কাঁদি।
তারপর অনেক গল্প। গল্পগুলো পরিবর্তনের। একটি শিশুর ক্রমে বড় হবার কাহিনী। এর মাঝে নিউজিল্যান্ড আবার আসলো । অবশ্যই তারা আগের চাইতে অনেক সাবধান ছিল। অবসর থেকে ডেকে ভেট্টরিকে নিয়ে এল। লাভ হল না। আমরা আবার তাদের হোয়াইটওয়াশ করে দিলাম। তারা শুভ্র সাদা হয়ে দেশে ফিরে গেল। এবার ক্রিকেটের হর্তাকর্তারা একটু নড়েচড়ে বসলেন। কত আর অঘটন বলে চালাবে? "দেখি তো ব্যাপারখানা কি?" বলে তারা নতুন বাংলাদেশকে লক্ষ্য করতে শুরু করলেন। সেই আলোকপাত বেশিদিন স্থায়ী হল না। ২০১৩-১৪ তে শ্রীলংকা এসে আমাদের ধবল ধোলাই করল। তারপর ইন্ডিয়া এসেও শ্রীলংকাকে অনুসরণ করল। সবচেয়ে দুঃখজনক ভাবে আমরা ওয়েস্ট ইন্ডিজে গিয়ে ওদের কাছেও ধবলধোলাই খেলাম। হর্তাকর্তারা আবার পেশীতে ঢিল দিলেন। ও! ব্যাংলাডেশ! এ আর কি! এমনকি আমরাও আবার আগের টোনে ফিরে গেলাম। বাংলাদেশই তো।
এতদিন পর্যন্ত সব ঠিক ছিল। এতদিন পর্যন্ত আমরা সাধারণ ক্রিকেটখোর ,ক্রিকেটপ্রেমী জাতি হিসেবেই ছিলাম। জিতলে হাসতাম, হারলে কাঁদতাম। বিশ্বকাপ চলে এল। চারিদিকে এক গোপন কানাকানি চলছিল যে এইবার বাংলাদেশের একটা চান্স আছে। কাপ নিয়ে না আসতে পারলেও কিছু একটা করবেই বাংলাদেশ। আমরা ম্যাচের পর ম্যাচ টিভির সামনে বসে রইলাম। সুসংবাদ আসতেই থাকল। এমনকি বৃষ্টিও আমাদের পক্ষ নিয়ে এসে অস্ট্রেলিয়ার সাথে ম্যাচ বাতিল করে দিল। কে যে ওইদিন খুশি হয়েছিল আসলে বলা মুশকিল। কারণ ততদিনে বড় বড় দলগুলো বাংলাদেশের সাথে খেলতে অস্বস্তিবোধ করা শুরু করেছে। কে চায় জোর করে বাঘের খাচায় ঢুকতে? :-D আমাদের বড় একটি স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেল ইন্ডিয়ার সাথে এক বিতর্কিত ম্যাচে। সারা বিশ্বই সেদিন এই দুর্ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করল। আমরাও অনেক কাঁদলাম। অনেক অনেক কাঁদলাম। সেই সাথে একটা গোপন ক্ষোভ আমাদের মাঝে তৈরি হল। আমরা হিংস্র জাতিতে পরিণত হলাম।
কথাটা শুনতে খারাপ লাগছে জানি। বলতেও খারাপ লাগছিল।কিন্তু সত্যটা বলা দরকার। এরপর থেকে আমি আর ক্রিকেটারদের কথা বলবনা। কারণ তারা তারপর থেকে একের পর এক ইতিহাস তৈরি করে গেছে। আমি আমাদের কথা বলব। আমাদের মানসিক পরিবর্তনের কথা বলব। আমরা আমাদের এই হিংস্রতা দেখলাম পরের পাকিস্তান সিরিজে। ছিঁড়ে ফেল ওদের মুশফিক। ভাইঙ্গা দে ওদের। শেষ করে দে। ৭১ কে নিয়ে আসা হল। আমরা তাদের হোয়াইটওয়াশ করে দিলাম। আমরা আরো অহংকারী হয়ে উঠলাম!
সোনায় সোহাগা হয়ে উড়ে এল ভারত। এবার আমাদের পায় কে? শা-আ-লা রে-ন্ডি-য়া!!!... পাইসি তোগো। মওকা পাইসি। এইবার মিলেগা, বরাবর মিলেগা। কুত্তারা আমাদের কামড়াইছে, দে দে কামড় দে!!! চারিদিকে একটা একাকার লেগে গেল। দিবো এবার। ভাইঙ্গে দিবো। বাংলাদেশ আসলেই ধোনির দলের কোমড় ভেঙ্গে দিল। মাশরাফি- সৌম্যরা কিন্তু শান্ত রইল। কিন্তু আমাদের ঠেকাবে কে? আমরা পাগল হয়ে গেলাম। ট্রল, কার্টুন বানিয়ে একাকার করে দিলাম। রমিজ রাজাকে ধুয়ে দিলাম। এমনকি ভার্চুয়াল জগতেও যেখানে যত ইন্ডিয়ান পেলাম সবাইকে ধুতে লাগলাম। কুকুরকে কামড় ফেরত দিতে পেরে আমরা কি খুশি! আমরা কি খুশি!
সাউথ আফ্রিকা আসার আগে কত কথা। সবচেয়ে ভদ্র টীম আসছে। সবাই ভদ্র থাকবা। আমরা কেউ ওদের টিজ করব না। কিছু বলবও না। ওরা এল। এখানে বলে রাখি আসার আগে ডেল স্টেইন নামের এক ভদ্রলোক বললেন তিনি হুদাই বল খরচ করবেন না। তাই তিনি ওয়ানডে খেলবেন না। ভালো কথা। না খেলুক! আমাদের কি?... আমরা কিন্তু তখন কোন কথা বললাম না। কারন আমরা তখনো জানি না কি আছে আমাদের ভাগ্যে। কথা শুরু হয়ে গেল আমরা যখন সিরিজ জিতে গেলাম!... ডেল স্টেইন ধুয়ে গেলেন। শুধু কি ডেল স্টেইন?... শেষ ম্যাচ টা আমি মাঠে গিয়েই দেখেছিলাম। সেখানে কমেন্টের বন্যায় লজ্জা পেয়ে বোধয় বৃষ্টিও নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। ভালো খেলছে কিনা বাংলাদেশ,অথচ দুয়ো খাচ্ছে সাউথ আফ্রিকার খেলোয়াড়রা। মার আমলার দাড়ি ধইরা টান মার। ভুয়া! ভুয়া!... বার বার স্ক্রিনে দেখানো হচ্ছিল যেন কোন বর্ণবৈষম্যমূলক আচরণ না করা হয়। তা নাহয় ঠিক আছে কিন্তু রাবাতা কেন কালো!... কেন কালো ও? একটা সাউথ আফ্রিকান খেলোয়ার কেন কালো হবে?... আমরা ধুয়ে দিলাম। আসলেই ধুয়ে দিলাম। দুনিয়ার সবচেয়ে ভদ্র ক্রিকেট খেলা জাতিটাকে শিখিয়ে দিলাম অতিথিপরায়ণতা কাকে বলে!...
অনেক কথা বলে ফেলেছি। এত কথা বলার উদ্দেশ্য একটু সচেতনতা। আমাদের কাছে হয়ত এসব নিছকই মজা। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে আমরা উপরে উঠছি। আগে আমাদের এসব আচরন বাচ্চামি বলে মেনে নেয়া হলেও এখন থেকে কিন্তু মানুষ আমাদের দেখবে। আমরা নিজেদের উপরে উঠিয়েছি। বিশ্ব আমাদের দিকে নতুন দৃষ্টি দিচ্ছে। প্রতিনিয়তই প্রশংসার বানীতে ভাসাচ্ছে আমাদের। আমাদের এই আচরন কিন্তু জাতিগতভাবে আমাদের আবার সেই "ব্যাংলাড্যাশ" এ পরিণত করতে পারে।
ক্রিকেটের উন্মাদনা আমরা দেখেছি। আমাদের আশেপাশেই তো কত উদাহরণ। কয়েক বছর আগেই তো আমরা আমাদের পাশের ভারতীয় উন্মাদনা দেখেছি। হেরে গেছে বলে ভাঙচুর করা হয়েছিল ধোনির বাড়ি। ঘেরাও করা হয়েছিল যুবরাজ এর বাসা। পাকিস্তানেও এসব হয় নিয়মিত। আমরাও কি ধীরে ধীরে ওরকম জাতিতে পরিণত হচ্ছি। আমরা কি আশপাশ থেকে কোন শিক্ষা নিচ্ছি না?... নাকি আমাদের হজম হচ্ছে না? বেশী খাওয়া হয়ে গেছে মনে হচ্ছে। বিশ্রী ঢেকুর উঠছে। দুর্গন্ধ ছুটছে খুব।
সময় এসেছে আমাদের চিন্তাভাবনাকে আরেকটু পরিশীলিত করার। অহংকার ঠিক আছে। মজা ঠিক আছে। এগুলো যেন একটু বেশি না হয়ে যায়। এমনিতে আমাদের ওপর অনেক আঁচড়। একটু মাথা উচু করে দাড়ানোর উপলক্ষ পেয়েছি। সেটাতেও যেন আমাদের আচরনের কারনে আঁচড় না পড়ে যায়। যে মুকুট আমাদের মাথায় উঠতে যাচ্ছে আমরা যেন সেটা বহন করতে পারি। ভারে যেন আমাদের মাথা ভেঙ্গে না যায় তাই এই লম্বা বয়ান। আমাদের পতাকা যেন আমরাই উঁচু করে ধরতে পারি। উচু করে ধরার সময় আমাদের মাথা যেন নিচু না হয়ে যায়...
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে জুলাই, ২০১৫ বিকাল ৩:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



