somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মারধর খাচ্ছে বাচ্চারা?

২৫ শে জুলাই, ২০১৫ বিকাল ৩:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

যতটুকু মনে পড়ে তখন আমি খুবই ছোট। ক্লাস ১-২ তে পড়ি। সারাদিন ঢ্যাং ঢ্যাং করে ঘুরে বেড়াতাম আর খাবার সময় হলে দৌড়ে বাসায় যেতাম। আম্মুকে কিছুক্ষন সময় দিতাম। আম্মুকে ওই সময়ের মধ্যে আমার গোসল করানো, খাওয়া-দাওয়া, ভালো জামা পড়ানো ইত্যাদি ইত্যাদি অপ্রয়োজনীয় কাজ সারতে হত। একদিন আমি খেতে বসে দেখলাম, কি এক অচিন প্রজাতির শাঁক দেয়া পাতে। আমি নাক কুঁচকে বললাম "খাবো না এইটা!"... আম্মু আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে শাকে অনেক ভিটামিন... কিসের ভিটামিন কিসের কি! আমি ভাতের থালা উল্টে ফেললাম। আম্মুর রিফ্লেক্স আমার চাইতেও বেশি। চোখের পাতা খোলার আগে আম্মু পাশে রাখা ঝাটাটা তুলে নিলেন। পাতা বন্ধ হবার আগে একটা বাড়ি আমার গায়ে পড়ে গেল। মোট কথা চোখের পলকে আমি একটা "ঝাঁটার বাড়ি" খেলাম। আমি দৌড়ে বাইরে চলে এলাম। আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে আম্মু আমাদের বাসার গেট এ দাঁড়িয়ে ঝাটা উঁচিয়ে বলছেন "আসিস আজকে বাসায়!"...আর আমি নিরাপদ দূরত্বে দাড়িয়ে ঠোঁট উল্টে বলছি "জীবনেও আসব না..."

আমার জীবনের এইসব ছোট আনন্দ বেদনার গল্প আজ লিখতে বসি নি। একটি স্পশকাতর বিষয় নিয়ে কথা বলতে এসেছি। আগেই বলে নিচ্ছি যা পড়বেন তা সম্পূর্ণই আমার ব্যক্তিগত মতামত। নিজ দায়িত্বে পড়বেন। কেউ আঘাতপ্রাপ্ত হলে তার দায় আমি নেব না।

গত ৬ তারিখের দেশের একটি স্বনামধন্য পত্রিকার হেডলাইনে চোখ আটকে গেল। হেডলাইন ছিল, " দুই-তৃতীয়াংশ শিশুকে মারধর করে মা-বাবা "। এই হেডলাইন টা দেখে কিছু একটা লিখতে ইচ্ছে হল। এত কুৎসিত করে বাবা-মা ও শিশুর সম্পর্ককে আর কোথাও দেখানো হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। দুই তৃতীয়াংশ শিশুকে মারধর করেন তার পিতা অথবা মাতা!...কি ভয়ানক!... কি ভয়ানক!... জাহিলিয়া যুগে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ!

এখন এই ব্যাপারটা নিয়ে যদি গবেষণা করতে যাই তবে ব্যাপারটা পরিস্কার হবে। শুরু করি তবে...

এই রিপোর্টটা ছিল জরিপভিত্তিক। জরিপের উপর ভিত্তি করে এগুলো তৈরি করা হয়। হয়ত ১০০ জন বাচ্চাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে "বাবু...তোমাকে কি আম্মু পিট্টি দিয়েছে?"... বাবুও বলে "হ্যা... প্রায়ই পিট্টি দেয়।" কেউ কেউ বলেছে "উহু!...আমার আম্মু খুব ভালো।" কেউ বলেছে "আম্মু মারে না তো... আব্বু মারে।" এই প্রশ্নের উত্তরগুলো একত্র করে যাচাইবাচাই করে দেখা হয় কত শতাংশ মাইর খায় আর কত শতাংশ খায় না। তারপর ফলাফল এনে সোজা ছাপিয়ে দেয়া হয়, "পোলাপাইন ধুমাইয়া মাইর খাইতাসে। সবাই সাবধান! বাচ্চারা তোমরা আরো সাবধান!" আমার প্রশ্নটা হল দেশে শিশুর সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি।গড়ে প্রতি পরিবারে ২.১৬ টা বাচ্চা। যদি ২ টা করেও ধরি তবে ৬ কোটি বাচ্চা ৩ কোটি পরিবারে বড় হচ্ছে। ৩ কোটি পরিবারে ৬ কোটি বাবা মা । ৬ কোটি বাবা মা ৬ কোটি বাচ্চাকে রুটিন করে দিনে দুইবেলা পিটাচ্ছে। কোটি কোটি বাবা মা প্রতিদিন কোটি কোটি বাচ্চাকে পিটাচ্ছে। মাথাটা একটু ধরে এল কি?... হিসেবে গোলমাল লেগে যাচ্ছে? কি করব বলুন , গনিতের সমীকরণ দিয়ে ভালবাসা মাপতে গেলে একটু প্যাচ তো লাগবেই।

এবার গনিত থেকে বাস্তবে আসি। সহজ একটা প্রশ্ন করি, "আপনার বাবা-মা কি আপনাকে কখনো শাসন করেছে?"... উত্তর যদি না হয় তাহলে প্লীজ আর পড়বেন না। বাদ দেন। কি আছে জীবনে? ডিনার-সাপার কিছু একটা করেন। ঘুম দেন। বাই। আর যদি উত্তর হ্যা হয়, তবে এবার একটু কঠিন আরেকটা প্রশ্নের উত্তর দিন, "আপনার কি মনে হয়?... আপনার বাবা-মায়ের শাসন আপনার জীবনে আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ?" এখনই উত্তর দেয়ার প্রয়োজন নেই। একটু ভাবুন। ভেবে বলুন...

আমি কখনই বলছি না যে আম্মুরা আব্বুরা মারধর করুক। আমি বলতে চাইছি শাসন এর কথা। শাসন আর মারধর কিন্তু এক না। যত হিসাবই দেখান না কেন, একটি বাচ্চাকে শাসন না করলে সে লাইনে থাকবে না। অনেকে বলতে পারেন বুঝিয়ে শুঝিয়ে......উহু! বুঝানোর বয়স ওটা না। আর আরেকটা বিষয় যেটা পত্রিকায় দেখানো হয়েছে যে দেশের বাবা মা শুধু মারধর ই করে, এটা ঠিক নয়। তারা শাসন করেন আবার তারাই আদর করেন। তারাই একটি শিশুকে গড়ে তোলেন। একজন মা তার বাচ্চাকে যে কত ত্যাগ,কত কষ্ট, কত বিসর্জনের মাঝে গড়ে তোলেন তা এসি অফিসে বসে ওই সাংবাদিক বুঝবেন না। বোঝার কথাও না।

একটা সত্যি কথা বলি?... মেয়েদের কথা জানি না। কিন্তু আমি আজ পর্যন্ত এমন একটা ছেলেরও সান্নিধ্যে আসিনি যে কিনা ছেলেবেলায় মার খায়নি। ছেলেগুলা কিন্তু আজ খুব ভাল ভাল জায়গায় আছে। কেউ অন্তত ঝরে যায়নি। তবে হ্যা, আমরা মাইর খাওয়া পোলাপাইন। হয়ত আমাদের যুগটাই এমন ছিল। পরবর্তী যুগে কেউ মাইর খাবে না। বাবা মা শাসন করবে না। তখন ছেলেমেয়েরা হবে আরো শার্প, আরো স্মার্ট। আমরা ওদের কাজকর্ম দেখে হা করে তাকিয়ে থাকব। ওরা দুর্দান্ত গতিতে জগতে বিচরণ করবে। আমরা হয়ত এক সময় গতি হারিয়ে ঝরে পড়ব। এই তো জগতের নিয়ম।
"এসেছে নতুন শিশু তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান..."

আমি শুধু বলতে চাইছি এখনো সেই যুগ চলে আসেনি যে যুগে বাবা মা শুধু মারধর করে। সেই যুগ অনেক আগে আমরা পিছনে ফেলে এসেছি। এই যুগে সাংবাদিক যতই বলুক দুই- তৃতীয়াংশ বাবা-মা সন্তানদের মারধর করছে আমরা বিশ্বাস করব না। কারন আমরা এই অঙ্কের হিসেবের পেছনের গল্পটাও জানি। আমরা জানি সকালে যেই বাবা পরীক্ষায় খারাপের জন্য আমাদের শাসন করেছে সেই বাবাই রাতে চুপি চুপি চাচা চৌধুরীর কমিক্স এর কালেকশন আমাদের বালিশের পাশে রেখে দিয়েছে। যে মা বিকেলে দেরি করে আসার জন্য বকেছে,মেরেছে সেই মাই রাতে জ্বর এলে সারারাত মাথায় পানি ঢেলেছে। এমন পরিবেশে আমরা যারা বড় হয়েছি তারা কি করে ওই অঙ্কের দুই তৃতীয়াংশ বিশ্বাস করি?

সর্বশেষ একটা কাহিনী বলি। আমার মাকে কয়েকদিন আগে আই সি ইউ তে রাখা হয়েছিল। আমার আম্মুর শরীরের সকল যন্ত্রাংশ নাকি একসাথে অচল হয়ে গিয়েছিল। আমি সব ফেলে ছুটে গেলাম। গিয়ে দেখি আমার মায়ের শরীরে কত রকমের পাইপ যে লাগানো। গলায় একটা ঘাড়-বন্ধ লাগানো। মা আমার ঘাড়টাও ঘুরিয়ে ছেলেকে ভালভাবে দেখতেও পারছে না। আমি আম্মুকে জিজ্ঞেস করলাম, "কেমন আছেন?" আম্মু শুধু ঠোঁট নাড়ল। কোন শব্দ বেরুলো না। আমার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। হু হু করে কান্না পেল। আমি তখন শুধু ভাবছিলাম মা আমার আজ কত অসহায়!... সেই ঝাটা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি , তেজী শাসন কিছুই নেই। মা আজ ক্লান্ত! আমার সেদিন বড় ইচ্ছে হয়েছিল একটু শাসিত হতে। মাকে বলতে "মা! আজও আমি দেরি করে রুমে যাই। কেউ কিচ্ছু বলে না। আজও রাতে না খেয়েই শুয়ে পড়ি। পা টা না ধুয়েই বিছানায় উঠি। দেরি করে গোসল করি। সকালে খেতে মনে থাকে না। সিগারেট খাই ইচ্ছেমত। রাত জেগে থাকি। বৃষ্টিতে ভিজি...এরকম হাজারো জিনিস করি যা তুমি করতে দিতে না...আমাকে একটু মারো। একটু শাসন কর"... আমি জানি মা কিছুই করবে না। ছেলেরা বড় হলে মা গুলো কেমন ছোট হয়ে যায়... বড় অদ্ভুত এই পৃথিবী...




সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে জুলাই, ২০১৫ বিকাল ৩:৫৬
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ডায়েরী- ১৯৮

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:০৫



আজ বৃহঃস্পতিবার, ২রা আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
ইংরেজি ১৭ই সেপ্টেম্বর। গত কয়েকদিন বেশ কয়েকজন ব্লগার সামুর ভালো মন্দ নিয়ে লিখেছেন। তাদের মুল বক্তব্য হলো- সামু গেলো। সামু শেষ। তারা সামুর... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে ইতিহাস আমাদের জানতে দেওয়া হয়নি অথবা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৩৩


আপনি জানেন কী?
ব্রিটিশরা প্রশাসনের সুবিধার জন্য ১৮৩৭ সালে ফারসি ভাষা বাদ দিয়ে আঞ্চলিক ভাষা ও উর্দুকে নিচ তলার দাপ্তরিক কাজে চালু করে।কারণ মুঘল আমল থেকেই প্রচলিত প্রশাসনিক কর্মীদের কাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

শরাব পিনে দে.....

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫১



মির্জা গালিব সম্পর্কে একটি গল্প চালু আছে। একদিন তিনি মসজিদে বসে মদ্যপান করছিলেন। তখন মুসল্লিরা তাকে বাধা দিয়ে বললেন "মসজিদ আল্লাহর ঘর, মদ্যপানের জায়গা নয়।" তখন মির্জা গালিব তাঁর বিখ্যাত... ...বাকিটুকু পড়ুন

বালছাল মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:৩৬

প্রথম পাতায় ব্যান ব্লগারের একটি পোস্টে ব্লগার রাজীব নূর মন্তব্য করে বলেছেন - “ওদের কে ‘বালছাল’ লিখতে দেন। বিনোদন নষ্ট করবেন না।”

বাহ! কী চমৎকার গণতান্ত্রিক দর্শন! এতদিন জানতাম দেশে তথ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি ব্লগ -৩ কফি শপ

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৪:০৬

আলোর-ছায়ার দোলাচলে এক কাপ কফি পান করার সুযোগ কি পাওয়া যেতে পারে?



ছবি ব্লগ - ২ টরন্টোর আকাশ
ছবি ব্লগ - ১ মেঘলা আকাশ
...বাকিটুকু পড়ুন

×