অনেকদিন আগে থেকেই বিষয়টা নিয়ে একটা সূক্ষ চুলকানি আমার মধ্যে অনুভব করছিলাম। কিন্তু কিভাবে ব্যাপারটা বের করে আনবো বুঝতে পারছিলাম না।
সেদিন বাসায় গিয়ে একটা নতুন পাঠ্যবই আবিস্কার করলাম আমার ছোট বোনের। সে একাদশ শ্রেণীতে অধ্যয়নরত। বইটি তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে। নামটা মনে নেই।
দেখে খুব ভালো লাগল। দেশের শিক্ষার্থীরা আজকাল তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে পড়ছে। ইন্টার পাশ করেও আমরা প্রযুক্তিগতভাবে যতটা পিছিয়ে ছিলাম তারা থাকবে না। কম্পিউটার এর র্যাম আর প্রসেসর এর যোগসাজশ জানতেই আমার লেগেছে বহু দিন। তাদের নিশ্চয়
সেটা লাগবে না। তারা হবে আরো আধুনিক। আরো স্মার্ট। আরো গতিবহুল...
এই আশা নিয়ে সেদিন বইটা খুলেছিলাম। কিন্তু হতাশ হতে হল । নতুন মদ দেয়া হচ্ছে। বোতলটা সেই পুরোনো। মান্ধাতা আমলের। আমরাও এই বোতলেই অন্য মদ খেয়েছিলাম।
একটা উদাহরণ না দিলেই নয়। প্রথম পাতার প্রথম সংজ্ঞাটা দিলেই বুঝতে পারবেন কি বলতে চাইছি। প্রথমেই তাদের শেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে GLOBALIZATION বা বিশ্বায়ন সম্পর্কে। আমি হুবুহু তুলে দিচ্ছি...
" বিশ্বায়ন (GLOBALIZATION) হলো পারস্পরিক ক্রিয়া এবং আন্তঃসংযোগ সৃষ্টিকারী এমন একটি পদ্ধতি যা বিভিন্ন দেশের সরকার, প্রতিষ্ঠান এবং জনগনের মধ্যে সমন্বয় এবং মিথস্ক্রিয়ার সৃষ্টি করে। পরিবেশ, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক পদ্ধতি
, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রগতি এবং মানবিক ও সামাজিক অগ্রগতি; সবকিছুর ওপরেই এর সুস্পষ্ট প্রভাব রয়েছে। এই পদ্ধতির চালিকাশক্তি হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ, আর এর প্রধান সহায়ক শক্তি হচ্ছে
তথ্যপ্রযুক্তি। ব্যক্তি জীবনের উৎকর্ষ সাধন, জাতীয় জীবনের উন্নতি ও অগ্রগতি, বিশ্বের জাতিসমূহের পারস্পরিক সহযোগিতা... ...(চলবে)"
আরো অনেক কথা লেখা ছিল। কিন্তু লিখলাম না। আমার অভ্রও হাঁপিয়ে উঠেছে , সাথে আমিও। কে কতটুকু বুঝতে পেরেছেন সেই প্রশ্নে যাব না। শুধু বলব বিশ্বায়ন ব্যাপারটাকে এই পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, মিথস্ক্রিয়া, আন্তঃসংযোগ,
প্রগতি, উৎকর্ষ, উন্নতি, অগ্রগতি এই শব্দগুলোর মাঝে বেধে কি লাভ হচ্ছে? হ্যা, আনুষ্ঠানিকতা রক্ষা হচ্ছে। এই আনুষ্ঠানিকতার ফাঁদে আর কতদিন?? কে কি বুঝছে তা নিয়ে কি কারো মাথাব্যাথা নেই?
আমি সাইন্সের ছাত্র ছিলাম। ভাগ্যিস আমাকে ইংরেজি ভার্শন এ ট্র্যান্সফার করা হয়েছিলো সেভেন এ। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার এক অদ্ভুত কৌতুক আমাকে দেখতে হয়নি। আমাদের ছেলেমেয়েদের খুব যত্ন করে বিজ্ঞান
শেখানো হয়। পড় বাবা, পড়...এটা হল জারণ। আর এটা বিজারণ!... বাবা দেখ এই যে পরমাণু... অনেকগুলো পরমাণু মিলে একটা অণু তৈরি হয়। এরকম আরো হাজারো শব্দ যেমন আলোকসংস্লেশন, আলোর প্রতিসরন,
পূর্ণ অভ্যন্তরীন প্রতিফলন ইত্যাদি ইত্যাদি... কিন্তু মজার ব্যাপার হল বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে (শুধু বাংলাদেশ কেন পৃথিবীর কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে) বাংলায় বিজ্ঞান পড়ানো হয় না। তবে কেন এই মঞ্চনাটক??
দুই তিন বছর ধরে ওই টার্মগুলো আত্মস্থ করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছরেই তাদের মাথা আউলে যায় শুধু টার্ম গুলো বুঝতেই। কোনটা atom আর কোনটা পরমাণু? oxidation কি আর বিজারণই বা কোনটা?কেন আগেই কি তাদের ওই টার্মগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া যেত না?আমাদের বাচ্চারা পৃথিবীর নামি দামী বিদ্যালয়ের বাচ্চাদের সাথে যুদ্ধে নামবে। অনু-পরমাণুর বদলে হাতিয়ার হিসেবে atom-molecule টা বেশি জমত না?আমি জানি
অনেকেই বলবেন কেন পাশাপাশি ইংরেজি টার্মগুলো দেয়া থাকে তো!!... কিন্তু কজনেই বা ওটা পড়ে বলুন!! পরীক্ষার খাতায় যে ওই বাংলাটাই লিখতে হয়!!
অপার সম্ভাবনা এই দেশে !! এই কষ্টের সাহিত্যবিজ্ঞান (!) পড়েও আমাদের মাঝে বেরিয়ে আসেন একজন আতাউল করিম, একজন মাক্সুদুল আলম, একজন জাফর ইকবাল এর মত এরকম হাজারো "একজন"। আমার শুধু
আফসোস হয় আমাদের বাচ্চাগুলোকেও যদি সহজভাবে বিজ্ঞানটা ধরিয়ে দেয়া যেত তবে আরো কত ভয় পেয়ে হারিয়ে যাওয়া আতাউল করিম পেত আমাদের এই দেশ। তারপরও ছাইয়ের মাঝ থেকে আশাটা ধুকধুক করে জ্বলে
যখন দেখি কিছু মানুষ চেষ্টা করে যাচ্ছেন এই প্রতিবন্ধকতার মাঝেও। জাফর ইকবাল স্যারের একের পর এক বিজ্ঞানভিত্তিক বই, চমক হাসানের ইউটিউবের অক্লান্ত প্রচেষ্টা জানি এগুলো বৃথা যাবে না। একদিন আশার আলো জ্বলে
উঠবেই!!... বাচ্চারা মনের আনন্দে সহজ ভাষায় বিজ্ঞান পড়বে। বিজ্ঞান নিয়ে খেলবে। তারা নিজেরা খেলার বস্তু হবে না...।
পুনশ্চ ঃ যারা এই সাহিত্য-বিজ্ঞান পড়ে হাঁপিয়ে উঠছ তাদের বলবো, হতাশ হয়ো না। বইতে পড়তে ভালো না লাগলে আরো অনেক উপায় আছে। একই জিনিস অনেক জায়গাতে পাবে। যেটা ভালো লাগে সেটা পড়ো। আমি জাফর ইকবাল স্যার এর
"থিয়োরি অব রিলেটিভিটি" বইটা পড়ার পর আর কখনো ইন্টারে পরীক্ষার আগে ওই চ্যাপ্টার এর অংক করতাম না। এতোটাই পরিষ্কার ছিল বিষয়টা। তাই কনসেপ্ট নিয়ে নাও। ভবিষ্যতে কাজে লাগবে...
মজার হোক ভবিষ্যতের শিক্ষা!...
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৫ সন্ধ্যা ৬:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



