somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সৌন্দর্য_অভিশাপ_না_আর্শীবাদ ?

১৩ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

জন্ম নিয়েছিলাম জোৎস্না রাতে। চাঁদের আলোয় তখন আমাদের বাড়ির উঠোনটা ঝলমল করছিলো। বাবা তখন উঠোনে মাচার উপরে বসে আমার আগমনের অপেক্ষা করছিলেন। আমি হওয়ার পর বাবা আমায় কোলে নিয়ে আমার নাম দিয়েছিলেন জোৎস্না। আমার দাদি তখন বাবার পিঠে হাত বুলিয়ে বলেছিলেন, তোর ঘর আলো কইরা চান্দের মতন সুন্দরী কইন্যা আইছে। ওর বিয়া নিয়া তোর চিন্তা করোন লাগবো না মজিদ। কিন্তু দাদি বোধহয় জানতেন না চাঁদের মতো সুন্দরী কন্যাদের গায়েও কলঙ্ক লেগে যেতে পারে।
আমি এতটাই সুন্দরী ছিলাম যে আমার বাবা কখনো আমাকে একা কোথাও যেতে দিতেন না৷ রোজ বাড়িতে কয়েকটা করে বিয়ের সম্বন্ধ আসতো। ঘটকরা জোকের মতো বাবার পেছনে লেগে থাকতো। আমি যখন স্কুলে যেতাম তখন প্রায় প্রতিদিনই প্রেমের প্রস্তাব পেতাম। কিন্তু আমার এসবে মন ছিল না। আমি পড়াশোনা করে চাকরি করবো, নিজের পরিচয় বানাবো এসব নিয়েই সারাক্ষণ ভাবতে থাকতাম। স্কুলে স্যার ম্যাডামরাও প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতেন আমার সুন্দর চেহারার। তবে এর জন্য অনেকের কুনজরও পড়েছিলো আমার উপরে। সুন্দরী নারীদের জীবনে যে সবসময় সুন্দর সুন্দর ঘটনা ঘটবে এই ভাবনাটা ভুল। কখনো কখনো একটা মেয়ের অতি সুন্দরী হওয়াটাই তার জন্য অভিশাপ বয়ে আনে।
পরীক্ষায় বেশি নম্বর পেলে বাকিরা আমাকে হিংসে করে বলতো, তুই সুন্দরী বলে স্যাররা তোকে বেশি নম্বর দিয়েছে। তোর মুখ দেখেই তারা গলে যায়। অথচ ভালো রেজাল্টের জন্য আমি রাত জেগে পড়াশোনা করতাম। কত রাত নির্ঘুম কাটিয়োছি। লোডশেডিংয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়াশোনা করেছি। এসবের সাক্ষী ছিল আমার পড়ার টেবিল আর টিমটিম করে জ্বলা মোমবাতিটা। তবুও ভালো রেজাল্ট করলে আমাকে শুনতে হতো, তুই সুন্দর বলে তোকে এক্সট্রা নম্বর দিয়েছে। সুন্দরী হওয়ার যন্ত্রণা এখানেই শেষ নয়।
আমার দাদি গর্ব করে বলতেন, তোর সোয়ামি ভাইগ্য ভালা হইবো দেহিছ। এত সুন্দরী বউ পাইয়া তোর ব্যাডার যে কী হাল হইবো কেডায় জানে! শ্বশুর ঘরেও কদর হইবো মেলা। আল্লাহ আমগো ঘরে এমনই চান্দের মতো মাইয়া দিছে।
সুন্দরী উপমা পেতে কার না ভালো লাগে! কিন্তু এসব কথা শুনলে আমার প্রচন্ড মন খারাপ হতো। কেউ আমাকে ভালোবাসবে শুধুমাত্র আমি সুন্দরী বলে? কেন? আমি যদি দেখতে কালো হতাম তাহলে কি সবাই আমাকে ভালোবাসতো না! এই যে সবাই আমাকে নিয়ে এত আহ্লাদ করে সেটা আমি দেখতে এত সুন্দর বলে, এই ব্যাপারটা আমার মোটেও পছন্দ নয়।
আমার মামাতো বোনের সংসার ভেঙ্গে যাওয়ার কথা যেদিন দাদির কানে উঠলো সেদিন দাদি আমাকে বলল, তোর কোনো চিন্তা নাই। রূপ দিয়া স্বামীরে আটকাইয়া রাখবি। রূপবতী মাইয়া গো এত চিন্তা কী!
কিন্তু আমার সহজ সরল দাদি তখনো জানতো না আমাকে যেই বড় ঘর থেকে বউ করে নিয়ে গিয়েছিলো সেই ঘরে আমি ভালো নেই৷ টাকা-পয়সার সুখই তো কেবল সুখ নয়৷ শ্বশুরবাড়ির কেউ পছন্দ না করলেও সেই কষ্টটা গায়ে লাগে না যদি স্বামী তার ভালোবাসা দিয়ে সেই জায়গাটা পূরণ করে দেয়। কিন্তু আমার তো স্বামী ভাগ্যও ভালো না। ইদানিং সে আমাকে ছাড়াই ভালো থাকে। আমার সুন্দর চেহারাটা ভেদ করে সমস্ত খুঁত গুলো বেরিয়ে চলে আসে তার সামনে। সুন্দর চেহারা দিয়ে নাকি স্বামীকে ভুলিয়ে রাখা যায়৷ কই আমি তো পারলাম না। এখানেও আমি ফেইল করলাম। ঠিক যেমন পরীক্ষায় নিজের যোগ্যতায় ভালো রেজাল্ট করেও আমি হেরে যেতাম।
চাকরি হওয়ার পর সবাই বলতে শুরু করলো, চেহারা দেখে চাকরি দিয়েছে। আর নয়তো এখনকার বাজারে এত সহজে চাকরি মিলে! অথচ এই চাকরির জন্য আমাকে কত কত বই পড়তে হয়েছে। অনেক গুলো ধাপ পেরোনোর পরই আমার চাকরিটা হয়েছে। তবুও লোকে বলে রূপ দেখে চাকরি দিয়েছে।
আমার গানের গলা ছোটবেলা থেকেই ভালো ছিল। টুকটাক গাওয়া হতো বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। কেউ খুব করে জোর করলে গাইতাম। তবে গান শেষ হওয়ার পর দেখতাম, সবাই আমার গানের গলার প্রশংসা না করে আমি দেখতে কতটা সুন্দর তা নিয়ে পড়ে থাকতো। সুন্দরী কেউ গান গাইলে নাকি তা শুনতে মধূরই হয়। আমি সুন্দর বলেই নাকি তারা আমার গান শুনতে আসে। আমি গান গাওয়ার সময় আমার দিকে তাকিয়ে থেকে মুগ্ধ হয়। কিন্তু কেন? আমার চেহারার সাথে গানের গলার কী সম্পর্ক! আলাদা দুটোর গুণের আলাদা করে প্রশংসা করা যায় না কেন? কেবল সুন্দর বলে আমার গান সুন্দর হবে৷ তাহলে তারা কালো, শ্যামবর্ণের তাদের গানের গলা কি সুন্দর নয়?
এই যে লোকে বলে, রূপ দিয়ে মানুষ আটকে রাখা যায়। তাহলে আমার মতো আরও সুন্দরী মেয়েদের সংসার কেন ভাঙ্গে? তাদের স্বামীরা কেন পরকীয়াতে জড়ায়? সবার সাথে এমনটা না হলেও অনেকের সাথেই এই ঘটনা গুলো ঘটে। মারাত্মক সুন্দর চোহারার জন্য এই যে ট্যালেন্ট গুলো চাপা পড়ে যায় এগুলো ভীষণ যন্ত্রণার। সৌন্দর্য সবসময় জীবনে সুখময় ঘটনা ঘটায় না৷ কেউ সুন্দর বলেই সে কেবল তার সৌন্দর্য দিয়েই পৃথিবী জয় করবে এই চিন্তাভাবনা গুলো পরিবর্তন হওয়া জরুরি। মানুষকে তার গুণ দিয়ে বিচার করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। "Don't judge a book by It's cover." এই কথাটা আমরা সবাই মুখস্থ করে নিয়েছি ঠিকই কিন্তু মন থেকে কথাটা মানি কয়জন?
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:১১
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পারলে একবার সোহাগী ঘুরে যেও।

লিখেছেন রাজা সরকার, ১৪ ই এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

পারলে একবার সোহাগী ঘুরে যেও।

আজ সারাদিন কোনো কাজ করিনি,,কারো কথা শুনিনি, যা যা কাজের কথা বলা হয়েছিল তার সব উত্তর হয়েছিল ‘পারবো না, পারবো না’। আজ সারাদিন সূর্যের দেখা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা নব বর্ষের সেকাল একাল

লিখেছেন কালো যাদুকর, ১৪ ই এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১২:১০

৯০ দশকের বাংলা নব বর্ষ বেশ ঘটা করে পালন হত । শহরে এই দিনটি পালনের সাথে আনন্দ উদযাপন, গান , পথ নাটক, বাংলা ব্যান্ডের বিশাল আয়োজন , পান্তা... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন ফেইল করবেন

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ১৪ ই এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৬



শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন ফেইল করবেন। তিনি এখনও ২০০১-০৬ সালে আটকে আছেন। সেই সময়ে যখন তিনি শিক্ষা মন্ত্রী হয়েছিলেন তখন শিক্ষায় নকল সমস্যা ছিল সব থেকে বড় সমস্যা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পহেলা বৈশাখের শুভেচ্ছা সবাইকে ❤️

লিখেছেন সামিয়া, ১৪ ই এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ২:৪০



নরম রোদের স্পর্শ পেয়ে
পুরনো দিনের ক্লান্তি ক্ষয়,
বুকের ভাঁজে জমে থাকা
অভিমানগুলো ভেসে যায়।

পহেলা বৈশাখ এল যখন,
রঙিন হাওয়ায় মেলা বসে,
বৈশাখী ঢাকের তালে তালে
মনটা নাচে হাসিমুখে।

শুভ নববর্ষ ডাকে ধীরে,
যাক পুরাতন স্মৃতি সব,
যাক... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গুদের সমস্যা কি ইসরায়েল নিয়ে?

লিখেছেন অর্ক, ১৪ ই এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৪:২৮



ফিলিস্তিন দেশ না হলেও তাদের নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো আছে। এক ধরনের ছায়া সরকারের মতো ব্যাপার আরকি। ইয়াসির আরাফাত প্রেসিডেন্ট ছিলেন। এখন মাহমুদ আব্বাস। সে সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভার্সন আঘাবেকিয়ান শাহিন সম্প্রতি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×