somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

এক নিরুদ্দেশ পথিক
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব,ইইই প্রকৌশলী। মতিঝিল আইডিয়াল, ঢাকা কলেজ, বুয়েট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র।টেলিকমিউনিকেশন এক্সপার্ট। Sustainable development activist, writer of technology and infrastructural aspects of socio economy.

সেতু নির্মানে দূরদর্শিতাঃ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চাহিদাকে সমন্বিত করুন!

০৭ ই মার্চ, ২০১৬ দুপুর ২:৪৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সরকার কাঁচপুর, মেঘনা ও গোমতী নদী ত্রয়ের ওপর চার লেনবিশিষ্ট নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন।

আমাদের বিবেচনায় মাত্র চার লেন সেতু দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নয়। কেন?
১। ১০০ বছরের লাইফ সাইকেলে মাত্র ৪ লেইন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ইকোনমিক এবং ট্রান্সপোর্ট গ্রোথ ধারণ করেনা।
২। স্লো মুভিং ট্রান্সপোর্ট, হাঁটা, সাইক্লিং লেন, সেতুর মাঝবরাবর মেইন্টেনেন্স স্পটসহ ন্যূনতম ছয় লেনবিশিষ্ট সেতু প্রয়োজন। আট লেইন হলেই সেটা সেতুর সম্পুর্ন লাইফ সাইকেলের এবং ট্র্যাফিক গ্রোথের সাথে সামঞ্জস্য পূর্ন।
৩। ভবিষ্যতের ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ ডিজাইনকে বিবেচনায় রেখে সেতুত্রয় ট্রেন চলাচলের উপযোগী করে ডিজাইন করা হোক। যমুনা সেতুর রেল ইঙ্কলুসন জনিত ডিজাইন জটিলতা থেকে শিক্ষা নেওয়া হোক।
৪। উপরন্তু, ভবিষ্যতের চাহিদাকে মাথায় রেখে গ্যাস পাইপলাইন, পাওয়ার কেবল ও হান্ড্রেড কোরের ফাইবার অপটিক কেবল ওয়ে সেতুর মূল ডিজাইন ও ডাইমেনশনিংয়ে রাখা হোক।


আরও যা বলা জরুরি,
স্থায়ী নকশা ওউনার ও দীর্ঘমেয়াদি মেইন্টেনেন্স ওউনার নিয়োগ
৫। নকশা, তদারকি ও ব্যবস্থাপনার জন্য সাময়িক পরামর্শক এজেন্ট নিয়োগের প্রথা থেকে বেরিয়ে এসে স্থায়ী নকশা ও দীর্ঘমেয়াদি মেইন্টেনেন্স ওনার নিয়োগ দেওয়া হোক। যমুনা সেতুর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়া হোক, সরকার ও সেতু বিভাগ দীর্ঘ মেয়াদি মেইন্টেনেন্স চুক্তি না করে পরে বিশাল আর্থিক পেনাল্টি দিয়েছে, সেতুটিও ঊচ্চমান সম্পন্ন হয়ে উঠেনি। দায়বদ্ধতা না থাকায় মূল নির্মাঙ্কারি কোম্পানি মানহীন কাজ করে চলে গেছে।
বঙ্গবন্ধু সেতুতে ফাটল: হুন্দাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করছে না সরকার

উচ্চ ভূমিকম্প রোধী সেতু বানানোঃ
৬। এ ছাড়া উচ্চ ভূমিকম্প ঝুঁকি মাথায় রেখে সেতু নির্মাণ করা (বিএনবিসি কোড অনুযায়ী ভূমিকম্পের মান যা ধরা দরকার তাঁর চেয়েও কিছুটা এগ্রেসিভ ডাইমেনশনিং)।
৭। এছাড়া প্রাথমিক ডিজাইনেই বিকল্প হিসেবে স্থায়ী ফেরিঘাটের স্থানও নকশায় রাখা হোক।


মেঘনা, গোমতী ও যমুনা সেতুর নির্মাণ-উত্তর অভিজ্ঞতা বলছে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিকাশের গ্রোথকে স্পষ্টতই অবকাঠামো গ্রোথের সঙ্গে সমন্বিত করা যায়নি, লাইফ টাইমের মাত্র এক-চতুর্থাংশ সময়ে এসেই একচুয়াল গ্রোথ সেতুর মূল লোড ডাইমেনশনিং গ্রোথ থেকে কমপক্ষে চার গুণ বেশি হয়েছে। এই থেকে শিক্ষা নেওয়া হচ্ছে না নতুন অবকাঠামো ডিজাইনে।

টেকনোলজি ট্রান্সফার
বিশেষ করে স্থায়ী ডিজাইন ওউনার না রেখে সাময়িক পরামর্শক নিয়োগের প্রথা দেশের অবকাঠামো খাতে গুরুতর কিছু সমস্যা তৈরি করেছে, বিদেশি প্রকৌশলীরা প্রযুক্তিনির্ভর নকশার খুঁটিনাটি দেশীয় প্রকৌশলীদের হস্তান্তর করেন না, কিংবা তার কোনো বিধানই থাকে না। ফলে নকশা জমা দিয়েই এজেন্সি পরামর্শকের কন্ট্রাক্ট ক্লোজ করেন, পরবর্তীকালে অতি কম খরচে দেশীয় কনসালট্যান্ট নিয়োগ করে ফলোআপ ও হস্তান্তরের কাজ করেন। প্রাথমিক নকশা মোতাবেক প্রকৌশলীদের নির্দেশনা অনুযায়ী অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ হয়, এমনটা বাংলাদেশের কোনো অবকাঠামোতে দেখা যায়নি। মানে, নতুন সেতু নির্মানে টেকনোলজি ট্রান্সফারের বিষয়টি যাতে আর উপেক্ষিত না থাকে। টাকা খরচ হচ্ছে কিন্তু টেকনোলজি ট্রান্সফার না হওয়ায় বার বার সেতু ডিজাইন বাইরের লোকেরাই করে যাচ্ছেন।


মেঘনা এবং গোমতী সেতুঃ ভূমিকম্প সহনশীলতা, ট্র্যাফিক গ্রোথ, লোড গ্রোথ ফোরকাস্ট সব জায়গাতেই অদুরদর্শিতা

স্বাধীনতা পরবর্তি সময়ে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নের প্রথম ফেইজের ল্যান্ডমার্ক স্থাপনার প্রতীক হচ্ছে ঢাকা-চট্রগ্রাম রুটে নির্মিত অসাধারণ ডিজাইনের (স্টেইট অফ দ্য আর্ট) সড়ক সেতু জাপান-বাংলাদেশ মৈত্রী সেতু-১ (মেঘনা সেতু) এবং তার কিছু পরেই নির্মিত আরেকটি নান্দনিক সেতু জাপান-বাংলাদেশ মৈত্রী সেতু-২ (গোমতী সেতু)। দেশের ব্যস্ততম মহাসড়কে কাছাকাছি দূরত্বে অবস্থিত দুটি সেতুর ডাইমেনশনিং এর ট্র্যাফিক ইনপুট প্রায় একই, তবে মেঘনা নদির গভীরতা, স্রোত, গড় পানি প্রবাহ বেশি এবং এটা দেশের ব্যস্ত নৌ এবং নৌ কার্গো রুট। সেতুগুলোর উপরে বর্তমানে দৈনিক গড়ে ৩০ হাজার এর বেশি যান চলাচল করে যার ৬০ শতাংশই বাণিজ্যিক অর্থাৎ মালবাহী যান (হেভি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভেহিক্যাল, রড ও পাথর বাহী ট্রাক, কন্টেইনার, পণ্যবাহী ট্রাক, ফুয়েল ট্যাংকার এবং আন্তঃবিভাগীয় যাত্রীবাহী বাস।)

ডাইমেনশনিংঃ
১। ক্যাপাসিটি গ্রোথ নির্ধারনে যে প্রজেকশন দেয়া হয়েছিল তার নূন্যতম ৪ গুন বেশি সংখ্যক যানবাহন এবং ধারণক্ষমতার চেয়ে অন্তত ৪ গুণ বেশি ওজন (লোড) সম্পন্ন ভেহিক্যাল মেঘনা সেতুর উপর দিয়ে যাতায়াত করে।
২। মেঘনা সেতুর নিচ দিয়ে গড়ে ৩ হাজার টন পণ্যবাহী নৌযান চলাচল করছে। কিন্তু ৫০০ টন পণ্যবাহী নৌযান চলবে—সে হিসাব করেই নকশা করা হয়েছিল।
৩। সওজ সূত্র জানায়, মেঘনা সেতু এখন মেরামত করতে গেলে ভূমিকম্পের সহনীয় মাত্রাও বাড়াতে হবে। কারণ ১৯৯১ সালে সেতুটি তৎকালীন বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুযায়ী ভূমিকম্পের জন্য মান ধরা ছিল দশমিক শূন্য ৫ জি যা আউট ডেটেড এবং ত্রুটি পুর্ন। বর্তমানে বিএনবিসি কোড অনুযায়ী ভূমিকম্পের মান ধরা হয়েছে দশমিক ১৫ জি। দেখা যাচ্ছে, প্রয়োজনের তুলনায় তিন গুন কম ভূমিকম্প সহনশীল করে দেশের সর্বচ্চ প্রায়োরিটির স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে।

অর্থাৎ সেতুর মৌলিক ট্র্যাফিক ক্যাপাসিটি নির্নয়ে ইনপুট হিসেবে নেয়া ভেহিক্যাল সংখ্যা এবং লোডের ফোরকাস্ট, বর্তমান প্রয়োজনের মাত্র এক চতুর্থাংশ ছিল, আরো এক দশক পরে যা এক পঞ্চমাংশ হয়ে যাবে, ২ দশক পরে আরো কমবে যার কারনে লাইফ সাইকেলের অর্ধেক পার হবার অব্যহতি পরেই সেতু ভেঙ্গে নতুন করে করার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি সেতুর নিচের নৌ চলাচলের গ্রোথ ফোরকাস্টও মাত্র ছয় ভাগের এক ভাগ ছিল। আরো দেখা যাচ্ছে ভূমিকম্প সহনশীলতায়ও ইনপুট প্রয়োজনের এক তৃতীয়াংশ ধরা হয়েছে। আমরা এখন এর সরাসরি প্রভাব প্রত্যক্ষ করছি।

স্টেইট অফ দ্য আর্ট হিসেবে নির্মিত সেতুর ডাইমেনশনিং এ যে ভয়ংকর অদুরদর্শিতার ছাপ রাখা হয়েছে এবং ইনপুট প্রদানে যে জ্ঞান হীনতা ফুটে উঠছে তা দেশের অবকাঠামো ডিজাইনের ইতিহাসে কলঙ্ক হয়েই থাকবে। দেশের অবকাঠামো খাতে কাজ করা বিদেশিদের ভুলে ভরা কাজ এবং ইনপুট যোগান দেয়া সংস্থাগুলোর লজ্জা জনক জ্ঞানহীনতা অবাক করার মত।

এই ডাইমেনশনিং ফোরকাস্ট এমন একটা নির্দেশক, যার ওপর ভিত্তি করে বলা চলে আশির দশকেও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে গ্রোথ হিসাব করা হয়েছিল, তা চরম ত্রুটিপূর্ণ ছিল, তার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত অবকাঠামোগুলো লাইফ টাইমের মাত্র এক-চতুর্থাংশে এসে বর্তমানে আউটডেটেড হয়ে যাচ্ছে এবং দেশের বর্তমান ইকোনমিক গ্রোথের বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ বুদ্ধিবৃত্তিক সামর্থ্য দিয়ে আমরা দেশের ইকোনমিক পটেনশিয়াল নির্ণয় করতে ব্যর্থ হচ্ছি, কিন্তু সেটা দিয়েই ভবিষ্যৎ স্থাপনাগুলো নির্মাণ করে যাচ্ছি। এরূপ দুর্বলতা যাতে বর্তমানের স্থাপনা নির্মাণে নতুন করে না হয়, সে জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর বাড়ানো দরকার। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, বিদ্যমান সমস্যা প্রশাসন ও প্রকৌশল খাতের জেনারেশনগুলো কীভাবে মেটাবে?


নতুন অবকাঠামো নির্মান দূরদর্শিতা পূর্ণ হোক!
অবাকাঠামো সেন্স উন্নত হোক!
বাংলাদেশ এগিয়ে যাক!


রেফারেন্স-
১। সেতুর নকশা ও বাস্তবায়নে ত্রুটির দায় কার?
২।মেঘনা সেতু এত অল্প সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ হলো কেন?
৩। বঙ্গবন্ধু সেতুতে ফাটল
৪। ঝুঁকিতে মেঘনা সেতু
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই মার্চ, ২০১৬ বিকাল ৪:২৬
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রহমতের দরজা কখনো বন্ধ হয় না; কবীরা গুনাহ, জাহান্নাম ও আল্লাহর অসীম ক্ষমা: কুরআন ও হাদীসের আলোকে একটি বিশ্লেষন

লিখেছেন নতুন নকিব, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৪৭

রহমতের দরজা কখনো বন্ধ হয় না; কবীরা গুনাহ, জাহান্নাম ও আল্লাহর অসীম ক্ষমা: কুরআন ও হাদীসের আলোকে একটি বিশ্লেষন

ছবি গুগল থেকে গৃহিত।

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

◆ ভূমিকা: এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

শুভ জন্মদিন কিং খান....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৫৫


আশি ও নব্বইয়ের দশকে জন্ম নেওয়া বিশাল এক প্রজন্মের শৈশব, কৈশোর আর বেড়ে ওঠার গল্পে জড়িয়ে আছেন বলিউড বাদশাহ শাহরুখ খান। নব্বইয়ের দশকে ভারতীয় অ্যাকশন সিনেমার একচ্ছত্র আধিপত্যের বিপরীতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আফগানিস্তানে একজন বেগম রোকেয়া কোনোদিন জন্মাবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ২:২৮


২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের চিহ্ন মুছে ফেলার এক অভিনব অভিযান শুরু হয়েছিল। শেখ হাসিনার ছবি, আওয়ামী লীগের কুশপুত্তলিকা, শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য, কিছুই বাদ যায়নি। বড়... ...বাকিটুকু পড়ুন

পরিস্থিতি কি জটিল?

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯

বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছি, অথচ বাইরে পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড আর টিয়ার গ্যাসের শব্দে চারদিক প্রকম্পিত! মিরপুরে আমার বাসার কাছেই মেট্রো রেলের নিচে আগুন দেওয়া হয়েছে; কিছুক্ষণের জন্য মেট্রো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ২০৩

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৯



খাওয়া দাওয়া করাটা আজকাল বিরক্তকর লাগে।
কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকতে হলে- খেতে হবে। না খেলে শরীর দুর্বল হয়ে যাবে। প্রিয় খাবার গুলোও খেতে ইচ্ছা করে না। ভালো লাগে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×