সূর্যাসে-র সময়টায় তির"ভান্নামালাই শহরটার আকাশ বিয়ের শাড়ীতে বোনা সোনালী সূতার চোখ ধাঁধানো কাশিদার মতই অপরূপ ও দৃষ্টিনন্দন। দেখে মনে হয় কেউ যেন মন্দিরটার দেয়ালে খোদিত বিশালাকৃতির দেবদেবীদের গায়ে আলতোভাবে জড়িয়ে দিয়েছে সেই মোহনীয় শাড়িটা ।
বাজারের মাঝে তৈজসপত্রের দোকানগুলো খুঁজে পেতে আমার তেমন বেগ পেতে হয়নি। দোকানগুলোর ঢোকার মুখে দরজার উপর টাঙ্গান ইয়া বড় বড় ঢাউশ আকারের কেরোসিনের প্রদিপ জ্বলছে-যার থেকে মাঝে মাঝে ছিটকে পরা কণা কণা স্ফুলিঙ্গ জোনাকি পোঁকার মত বাতাসে সাঁতার কাটছে। এগুলোর প্রতি"ছবি আজস্রগুনে আশেপাশের তামা, কাসা, পিতল, এ্যালুমিনামের হাঁড়ি-পাতিল থেকে প্রতিফলিত হয়ে পুরো এলাকাটাকে এক অপরূপ অপার্থিব অবয়বে সাজিয়েছে। বাতাসের তাড়নায় হলুদ রঙ্গের ব্যানারগুলোও এক ছন্দময় নাচের আবেশ সৃষ্টি করেছে। সান্ধ্য-প্রার্থনা পালন করতে এর সাথে যোগ হয়েছে ভাং, আগর, ধূঁপ, মশলা আর পোঁড়া কাঠের গন্ধ। এখানে ওখানে জড়ো হওয়া জমাট বাঁধা ছায়ার নীচে ধুতি-লুঙ্গি আর ফতুয়া গায়ে অলস পুর"ষরা সিগারেট-বিঁড়ি ফুকছে। গুসুড় গুসুড় গপ্পে মত্ত- নাকি ফন্দি-ফিকিরে ব্যস- কে জানে?
রেশমী সূতার হরেক রকমের কান্চিপুরাম শাড়ী পড়ে বেশ অহমিকার সাথে গৃহীনিরা দোকান থেকে দোকান ঘুরে থালা-বাসন দেখছে- কেনার চেয়ে দোকানির সাথে দামদস'র করাটাই মুখ্য। মহিষের শিং-এর মত ইয়া বিশাল গোঁফ দুলিয়ে এক শিখ সর্দারজি আমার পাশ কাটালেন, তার পেছন পেছন মুখে কুলুপ আঁটা শিকলে বাঁধা একটা কৃশকায়, র"গ্ন, মলিন মুখের ভালুক। প্রথম দর্শণেই সর্দারজিকে ভয়ানক প্রকৃতির মনে হল; ভালুকটার চোখের কোনায় ধূলা আর চোখের পানিতে জমাট বাঁধা কাল অশ্র"বিন্দু।
আশেপাশে কোন সাধু-সন্ন্যাসিদের দেখা পেলাম না।
”সাধু রামসূরতকুমার-কে কোথায় পাওয়া যাবে?” - পাশের এক দোকানিকে জিজ্ঞেস করলাম। আমার প্রশ্নে কোন পাত্তা না দিয়ে এক বিশাল আকারের হাঁড়ি মুখের সামনে ঠেলে দিয়ে গছানোর জন্য উঁঠেপড়ে লেগে গেল। দামটা অসম্ভব সস-া - টোপটা গিলেই ফেলেছিলাম আর একটু হলে। যদি না মানষচক্ষে সিনেমার মত ভেসে উঠত-”এই আমি এক ভিনদেশি ছন্নছাড়া বৈরাগী, হিপ্পী এত বড় বিশাল একটা তামার পাতিলটা পিঠের উপর ফেলে বছরের পর বছর ভারতবর্ষ চষে বেড়া"িছ।” দোকানিকে স্মরণ করিয়ে দিলাম-হাঁড়ির খোঁজে এখানে আসিনি, সাঁধুবাবার খোঁজে। হুম-ম-ম-ম----,” এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দোকানি আমাকে পাতিলটা গছানোর আশা জলাঞ্জলি দিয়ে সামনের এক ধূলি-ধূসরিত গলিপথটা আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দিয়ে বলল-”সন্ন্যাসটা ওইখানেই আছে।”
কিছুই দৃষ্টিগোচর হল না।
”কোথায়?”
”ওখানেই আছে, খুঁজে নাওগে!”
গলিপথটা মাড়িয়ে যেটার সামনে দাঁড়ালাম তাতে মনে হল-পরিত্যাক্ত একটা ছোট্ট দোকান। অন্ধকারের মধ্যে বেঞ্চের উপর বসা পেটান শরীরের এক ষাটোর্ধ-তবে বয়সটা সম্পূর্ণ অনুমানভিত্তিক। কাঁচা-পাকার মিশ্রণে ইয়া বিশাল দাড়ি-গোঁফের দংগল। গায়ের উপর জড়ান কাপড়টা বেশ মলিন হলেও প্রাচীন রোমানবাসিদের মত আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট। শক্ত করে ধরা তালপাখাটা দিয়ে বেশ জোরে জোরে বাতাস খা"েছন-গরমটা বোধহয় তাকে খুব জ্বালা"েছ! হাত আর তালপাখাটার ছন্দোময় আন্দোলনে তাঁর মুখখানা বার বার আড়াল হয়ে যা"েছ। পাশে ঘামে ভেজা শত ব্যবহূত বড় আকারের একটা র"মাল।
”সাধু রামসূরতকুমার?”-ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
সম্মতিসুলভ মাথা ঝাকিয়ে হাসিমুখে চোখ তুলে তাকালেন; চোখের তাঁরায় দুস্টুমীর আভাস।
”ওহঃ, ওহঃ-----”- বারে বারে বলতে লাগলেন। হাতপাখাটা পাশে রেখে উঠে দাঁড়িয়ে আমার হাতটা টেনে নিয়ে ঝাঁকাতে লাগলেন-ভাবেসাবে মনে হল মামুভাগ্নের অনেকদিন পর দেখা হল।
”ওহঃ, আহঃ, তুমি তাইলে আইছো!”
অস্বীকার করতে পারলাম না।
”কোত্থেকে?”
যদিও তাঁর গলার স্বরে মনে হল-উনি জানেন আমি কোথাকার বস'।
ওঁনার ইংলিশ জ্ঞান বলতে গেলে খুবই ভাল। উ"চারণ আর গায়ের রং দেখে বোঝা যায় উঁনি এই অঞ্চলের বাসিন্দা নন-অর্থাৎ দক্ষিণ ভারতী নন। শারীরিক গঠণ, বৈশিষ্ট্যও এখানকার স'ানীয়দের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বেশ চওড়া হাতপায়ের হাঁড়গুলো, মাংশপেশিগুলোও বেশ সুঠাম, সাবলীল আর পরিপুষ্ট। বাঙ্গালি বংশোদ্ভূত - মনে মনে তাই-ই ঠিক করলাম। তাঁকে দেখে কবিগুর"র কথা মনে পড়ে যায়।
সাদরে তাঁর পাশে বসিয়ে হাতড়ে হাতড়ে খুঁজে-পেতে দোমরান এক প্যাকেট উইলস ফিল্টর সিগারেট বের করে তার থেকে একটা সলা ধরালেন। সিগারেটা তর্জনী ও মধ্যাঙ্গুলীর মাঝে বসিয়ে কসে দম দি"েছন; অন্য হাতটা আবার তালপাখার বাতাস দিতে শুর" করেছে। পায়ের কাছে রাখা পুরনো এক ঝুলিতে আরো তিনটা পাখা মজুদ।
আমার জানা ছিল না যে সাধু-সন্ন্যাসিরা ধুমসে তামাক-বিঁড়ি সেবনে অভ্যস-! তা-ও আবার ফিল্টার বিশিষ্ট; আধুনিকতার বাতাস সংসার বিবাগীদেরও স্পর্শ করেছে। গঞ্জিকা-সেবন তাঁদের প্রথম এবং প্রধান আর্কষণ এটা পাশ্চাত্যের সবাই জানে।
মৃদু হেসে সিগারেটে আবেশ করে আরেকটা কসে টান দিয়ে খুব গভীর মনযোগের সাথে তালপাখার বাতাস খা"েছন বাবাজি। হাঁপানী রোগীদের ইনহলার টানার মতই তাঁর সিগারেটে টান-নির"পায়। না টেনে উপায় নেই। এই দুইয়ের মধ্যে একটা বেশ মিল আছে।
থাকতে না পেরে আমিও আমার সিগারেট প্যাকেট বের করে তার থেকে একটা সলা ধরালাম। কিন' পরক্ষণেই কেমন যেন একধরণের লজ্জা ঘিরে ধরল। সাধু-সন্ন্যাসিদের সাথে বসে সিগারেট সেবন মোটেই বাঞ্ছনীয় নয়। তাড়াতাড়ি সিগারেটটা ফেলে দিলাম।
”আপনি কি সবসময়ই সিগারেট টানেন?”- লজ্জা আর মৌনতা কাটানোর জন্য তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম।
আগের সিগারেটটা দিয়ে আবার নতুন আরেকটা ধরালেন এরই মধ্যে।
”শুধু এখানে আসলেই।”
গা’টা সিরসির করে হঠাৎ এক ভীতিজনক অনুভূতির উদয় হল- উনি আমার অন-রের সব খবরা-খবর খোলা বইয়ের মতই পড়তে পাড়ছেন। তারচেয়েও ভীতিকর-কোন এক সময় আমি যে এই লেখাটা তাঁকে নিয়ে লেখব সেটাও তাঁর জানা।
একটা বিষয় লক্ষ্য করলাম তালপাখাটা যখন তাঁর হাত থেকে নিস-ার পেল তখন হাতের আঙ্গুলগুলোর করায় জপমালা জপার মত কিছু একটা জপে চলছেন। বলতে গেলে ওঁনার পুরো শরীরটাই একধরণের ছন্দময় সঞ্চালনে ব্যস-। অন্য কারোর বেলায় হলে মনে হত-মানসিক ভারসাম্যহীনতা। কিন' তাঁর বেলায় সম্পূর্ণ ব্যাপারটাই হ"েছ অতিরিক্ত প্রাণশক্তির বহিঃপ্রকাশ।
”কোথায় থাকেন, দিনের বেলায় কি করেন?”- আমি জিজ্ঞেস করলাম। সাধুবাবাকে তেমন আলাপি বলে মনে হল না।
”এই ভবঘুরে সারাদিনমান ওই বাইরের বিস-ীর্ণ এলাকাটা চষে বেড়ায়”- বলেই হাত উঁচু করে সামনের বিস-ৃত অর"ণাচলের খোলা প্রান-রটা দেখিয়ে দিলেন।
”ঈশ্বর যা করতে নির্দেশ দেন তাই-ই করে যাই”- বাবা রামসূরতকুমার জানালেন।
”ঈশ্বর কি করতে বলেন?”
”এই বাউন্ডুলে সারাদিনভর কি করে বেড়ায় সেটা মুখ্য বিষয় নয়!”- বেশ ঝাঁঝের সাথে উত্তর দিলেন।
”আপনার কি মতলবে এখানে আগমন?”
”আমি শুধু আপনার দর্শনার্থে এসেছি।”
উন্মাদের মত উ"চস্বরে হাসতে শুর" করলেন অনেক্ষণ ধরে। এমন অবান-র, উদ্ভট উত্তর বুঝি উঁনি আর শুনেননি কখনো। একাধারে আহত এবং অপমানিত। একবার মনে হল-ব্যাটাটা আগাগোড়াই আস- একটা ভন্ড ও বাউন্ডুলে। পরক্ষণেই ভাবি-ছদ্ধবেশে বিতারিত কোন এক রাজা-বাদশা নয় তো!
”হো-হো-হো----------”-আবার অট্টহাসি হাসতে হাসতে সাধু দম ফুরিয়ে খাবি থেতে লাগলেন।
”ও তাই নাকি?”-সাধুবাবা প্রশ্ন শুধালেন।
”হ্যাঁ, আমি আসলেই জানতে এসেছি আপনাদের মত সাধু-সন-রা কি নিয়ে জীবন কাটায়। আমি যে সমাজ-ব্যবস'া থেকে এসেছি সেখানে এই শিক্ষা দেয় যে, তাকে সমাজবদ্ধ হয়ে অন্য সবার সাথে বসবাস করতে হবে, সমাজের তথা পরিবার-পরিজনের দাবী-দাওয়া মেটাতে হবে------পরোপকারে আসতে হবে; সুতরাং বুঝতেই পারছেন, এই পৃথিবীটাকে সবার মঙ্গলের জন্য কাজ করে যেতে হবে”-এক নিশ্বাসে এই লম্বা দার্শণিক মার্কা কথাটা বলে নিজেকে বেশ হাল্কা প্লাস জ্ঞানী,বিজ্ঞ মনে হল।
”আ"ছা, তাই নাকি?”- সাধুবাবা আমার ঐ ওজনদার মন-ব্যে এক্সট্রা মজা পেয়ে গেলেন।
”তারা বলে-আপনাদের মত সাধু-সন-রা সামাজিক দায়-দায়িত্ব কাঁধে নেবার ভয়ে পালিয়ে বেড়ায়, সোজা কথায়-ঘর পালান!”
”পৃথিবীতে অনেক অনেক ধরণের দায়-দায়িত্ব আছে”-উঁনি হঠাৎ বলে উঠলেন; গলার স্বরটা এখন অনেকটা শান-,গভীর।
”অনেক কর্তব্য আছে যা শুধু একমাত্র তাদেরকে দিয়েই সম্ভব যাদেরকে ঈশ্বর পছন্দমাফিক বেছে নেন। পৃথিবীতে অনেক ধরণের অসরিরী বৈরি শক্তি বিরাজ করে যা সমাজের, দেশের গুর"ত্বপূর্ণ ব্যক্তি যেমন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সমাজের নীতিনির্ধারকদের উপর প্রভাব বিস-ার করে। এদের রক্ষা করা প্রয়োজন যাতে তারা শুষ্ঠুমত সনাজের উন্নতির জন্য কাজ করে যেতে পারেন। অন্যথায় যুদ্ধ-বিগ্রহ, হানাহানি, অশানি- ছড়িয়ে পরবে”- সাধু রামসূরত নিজের কৃতিত্ব জাহির না করে এক নিশ্বাসে উপরের কথাগুলো বলে গেলেন।
সাধুবাবাজীর দিকে তাকিয়ে বুঝলাম-ওঁনার প্রধান দায়িত্ব হ"েছ কোন এক মন্ত্রবলে বা অন্য কোন ঐশ্বরিক উপায়ে ধণাত্বক শক্তি প্রয়োগ করে ঔসব রাজনৈতিক, সামাজিক নীতিনির্ধারক ব্যক্তিত্বদের আগলে রাখা যাতে তারা সমাজের জন্য মনপ্রাণ বিলীয়ে দিয়ে কাজ করে যেতে পারেন।
তাঁর এই মতামতটা আমার কাছে খুবই গূর"ত্বপূর্ণ ও যথার্থ মনে হল; নাকি, পুরোটাই চাপাবাজি? এসব কি তাঁর পূর্বেকার কল্কে-সেবনের সুপ্রভাব সুলভ উত্তেজিত নার্ভের অসার কল্পনাপ্রসূত আবোলতাবোল নয় কি? সাধুবাবার চাপাবাজি যদি সত্যি বলে মনে করে গলাধকরণ করি তবে যে এত অত্যাচার, অনাচার, যুদ্ধবিগ্রহ, অবিশ্বাস, অসি'রতা এই মূহুর্তেই আমাদের চোখের সামনে ঘটে যা"েছ তার কি ব্যাখ্যা দেব? আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে ব্যাটাকে কথার মারপ্যাঁচে ঘায়েল করতে পারছি না। তার প্রধান কারণ, সে প্রথমেই স্বীকার করেছে সে একজন নগন্য ভিক্ষুক ছাড়া আর কিছু নয়। নিদেনপক্ষে, ঈশ্বরের আজ্ঞাবহ দাস মাত্র! সে যদি এভাবে আমাদের প্রানপ্রিয় জননেতাদের তুকতাক, ফুস্মন-র দিয়ে আগলে কোলে তুলে না রাখতেন তাহলে আরও কতই না সাড়ে-সব্বেনাশ হয়ে যেত আমাদের এই ছোট্ট দুনিয়াটায়। তার এই গুর"ত্বপূর্ণ দায়িত্বজ্ঞানবোধটা আমার আসলেই মাথার অজুত কোটি নিওরোনগুলো হজম করতে পারছে না।
”বেশ বড় মাপের একজন গুর" ছিলেন উঁনি”-তাঁর অতীত সম্ভন্ধে শুধু এটুকুই বললেন। সেই পরম স্বর্গীয় গুর" আমাকে তাঁর পদতলে আশ্রয় দিয়েছিলেন, দীক্ষা দিয়েছেন ঈশ্বরের আজ্ঞাবহ দাস হিসেবে নিজেকে শ্বপে দিতে। একজন গাড়ির কারিগর যেমন পুরনো একটা গাড়িকে মেরামত করে চলার উপযোগি করে তোলে আমার অবস'াটাও তদ্র"প, তাই না? চালকের প্রধান কাজই হ"েছ গাড়ি চালান- ঠিক নয় কি? আর, সে কারণেই গাড়িটাকে চলার উপযোগি রাখা উচিৎ সর্বক্ষণ। জানই তো, ভাঙ্গা গাড়ি কারো কাজে আসে না।”
আপনি যথার্থই বলেছেন সাধুমশাই!
সাধুজি তাঁর সেই পরম গুর" কে ছিলেন, কি তাঁর বংশ বৃত্ত্যান- এ ব্যাপারে আর তেমন উ"চবাচ্য করলেন না।
”অদৃশ্য রক্ষাবর্ম-এটা কিভাবে আমরা আমাদের চারপাশে হাইরাইজ করতে পারি?”- সাধুজিকে সকাতরে ব্যাখ্যা করার জন্য অনুরোধ করলাম। আবার শুর" হল সেই ঐতিহাসিক অট্টহাসি, দম বেড়িয়ে যাবার মত অবস'া। কোঠর থেকে যে কোন সময় চোখদুটো ছিট্কে আমার কোলে আশ্রয় নিতে পারে।
যাক্্ বাবা, কুমারজিকে এই ভর সন্ধ্যেবেলায় আনন্দ দিতে পারছি তাই-ই বা কম কিসে? অনেক সান-না পেলাম।
ধ্রাম - কোন পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই সাধুজী তাঁর এক শক্তিশালী হাত উঠিয়ে শুন্য দোকানের ততোধিক শূন্য পাটাতনের উপর বসা নিরীহ একটা মাছি বধ করে ফেললেন। মরা মাছিটার একটা ভাঙ্গা ডানা ধরে উঠিয়ে আমার হাতের তালুতে ফেলে দিলেন। কিছুটা ঘৃণা ও অনি"ছা স্বত্তেও আমাকে এই মহামূল্যবান প্রসাদটা সাদরে গ্রহণ করতে হল। ভাব দেখালাম-কতই না কৃতার্থ হয়েছি বাবাজীর আশীর্বাদ পেয়ে!
তীক্ষ্ণ নজরে পরীক্ষণ করে বোঝার চেষ্টা করলাম সাধুর এই ক্ষুদ্র কেরামতির মাহাত্যটা কি? দোমরান, নেটা-পেটা বেরোন, ভাঙ্গা ডানাটা আরও বেঁকে পেটের নীচে ঢুকে পরেছে - আমার দেখা অগুনিত অকালপ্রাপ্ত মাছির মত এটারও কোন বৈশিষ্ট্যমন্ডিত পার্থক্য খুঁজে পেলাম না।
সন্ন্যাসী খুব গভীর মনযোগের সাথে আমাকে পর্যবেক্ষণ করছেন। সিগারেটে দম মারা আর অদৃশ্য জপমালা গণণা - দু’টোই সমানতালে চলছে। হাসিটা ক্ষণে ক্ষণে বিস-ৃত হয়ে তাঁর উঁচু চোয়ালকে আরো উঁচু করছে।
”খুব বাজে একটা জিনিষ” - থুতনিটা একটু উঁচু করে মাছিটার দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন।
”ওখানে রেখে দিন” - সাধুজী যেখানটায় মাছিটা বধ করেছিলেন ঠিক সেখানটায় রাখতে বললেন। ওই জায়গাটায় এখনও এক রত্তি মাছিটার পেটা লেগে আছে। কৌতুহল নিবারণের জন্য নখের কোণা দিয়ে খুঁচিয়ে দেখলাম। হতভাগ্য মাছিটারই উদরাংশ।
”মৃত্যুটা কি হতে পারে?” - সন্ন্যাসী জিজ্ঞেস করলেন।
কাঁধ ঝাঁকান ছাড়া আমি আর কিছু যোগান দিতে পারলাম না।
”এই প্রশ্নের উত্তর পেতে সবাই আগ্রহী, পেরেশান, তাই না?”
এবার মাথা ঝাকালাম।
”দেখুন” - সন্ন্যাসী আবার মরা মাছিটার দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন।
ছোট্ট একবিন্দু কিসমিশের মত হতভাগা মাছিটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। কানে আসছে সাধুজী খুব গভীর ভাবে ঘন ঘন শ্বাস নিয়ে হঠাৎ বিরতি টানলেন। তারপর তাঁর ডান হাতটা মাছিটার থেকে প্রায় এক গজ দূরে রেখে খুব সি'র হয়ে গেলেন। তাঁর পূর্বেকার আচরনের সাথে অর্থাৎ শারীরিক সঞ্জালন, খোলামেলা অট্টহাসির সঙ্গে এই আচমকা সি'রতার কোনই সাদৃশ্য নেই।
মৃত মাছিটার উপর থেকে এখনও চোখ সরাইনি। মাছিটা আসে- আসে- নড়াচড়া করছে, ডানাদুটো তির তির করে কাঁপছে, পাগুলও ক্ষণিকপর দোমারান অবস'া থেকে সটান সোজা করল। খানিকটা পর মাছিটা সদ্য ফিরে পাওয়া শক্তি দিয়ে পায়ের উপর ভর করে এলমেল কয়েকটা পদক্ষেপ নিল - শিশুদের প্রথম দিককার টলমলে হাঁটার মত। ক্ষণিকপর ডানা ঝাঁপিয়ে উড়ে সন্ধ্যার আকাশটায় মিলিয়ে গেল।
মাছিটা অদৃশ্য হবার পরও প্রায় এক মিনিট শান-, ঋজু ভঙ্গিতে সি'র হয়ে বসে রইলেন। তারপর, আবার সেই পুরনো আদি অকৃত্তিম খলখলে সাধু বনে গেলেন। আরেকটা সিগারেট বের করে ধরিয়ে কসে টান দিয়ে তালপাখার বাতাস খেতে ব্যস- হয়ে পড়লেন।
আমার প্রথম প্রশ্ন হল- মাছিটা ঠিক কতখানি মৃত ছিল। অবশ্যই জীবনে অনেক মরা মাছি দেখেছি। মৃত ও জীবিত মাছি দেখতে কেমন তা বোধকরি নতুন করে প্রানীবিদ্যার উপর পাঠ নিতে হবে না।
ওই মাছিটার হাঁড়গোড়, পেটা-পাখনা - কোন কিছুই আস- ছিল না। বলতে গেলে ধর আর মাখাটা কোনমতে লেগে ছিল।
”এটা কিভাবে সম্ভব?”
প্রায় অন্ধকারা"ছন্ন পরিবেশে আমার দিকে কৌতুকপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। চোখের সাদা জমিন দু’টো দূর তারার মত জ্বলজ্বলে।
”জীবন মানেই শক্তি” - অনু"চ কন্ঠে বললেন।
”মৃত্যু হ"েছ শক্তির প্রস'ান, তাই না?”
”মনে হয়---------”- আমতা আমতা করছি।
”মাছিদের খুবই অল্প পরিমাণ প্রাণশক্তির প্রয়োজন হয় মানবকূলের তুলনায়, কি ঠিক বলিনি?”
”হয়তবাঃ-------” - ফের মিনমিনে গলায় সায় দিয়ে গেলাম।
”এই ছন্নছাড়া ভবঘুরেটা কি এইটুকু সামান্য পরিমাণ প্রাণশক্তি ঐ মাছিটাকে দিতে পারে না!”
”কিভাবে আপনি আপনার প্রাণশক্তি অন্যকে উপহার দিকে পারেন এবং একটা মৃত মাছিইবা কিভাবে নিজেকে ঠিকঠাক করে জ্যান- হয়ে উড়ে যেতে পারে?”-সাধুর কাছে এর সবিশেষ ব্যাখ্যা চাইলাম।
”ঈশ্বর চাইলে কি না করতে পারেন।”
”হ্যাঁ, তবে------”-মাঝপথে থেমে গেলাম; কেন যেন মনে হল, উঁনি আমার প্রশ্নের যথার্থ উত্তর বা ব্যাখ্যায় যাবেন না।
”আপনি এই সাধুকে কেন না দেখার ই"ছাপোষণ করলেন না?”-এবার সাধু উল্টো আমাকে জেরা শুর" করলেন।
উপহাস বা অবজ্ঞা প্রকাশ করতে চাইনি। উঁনি সারাদিনমান কি করে বেড়ান, কেনইবা এই বাজারে এসে এইখানটায় বসে থাকেন-এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আমার মাথায় ধারণ করা সম্ভব নয়।
”আপনি যে দয়াপরবশঃ হয়ে আমার সঙ্গে কিছুটা সময় ব্যায় করেছেন এতেই আমি অত্যন- আনন্দিত, কৃতজ্ঞ।” পুনরায় তাঁর সেই দম ফাটান, প্রাণখোলা অট্টহাসি।
”আমি কি আপনার কোন খেদমতে আসতে পারি?”- কুমারজি কে জিজ্ঞেস করলাম।
আমার কথায় একটু চাপা হাসি হেসে বললেন-”এই ভিক্ষুকের কোন চাহিদা নেই। ঈশ্বরই ঠিক করে দেন এই হীনমানের কতটুকু প্রাপ্য, কতটুকু হলে চলবে; তবে সে কিছুই চায় না, তাই না!”
আমার সিগারেটের প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিলাম। স্মীত হেসে কৌতুহলবশতঃ সিগারেটের প্যাকেটটা দেখতে লাগলেন যেন এরকম প্যাকেট আর দ্বিতীয়টি দেখেননি। তারপর, খুব লজ্জার সাথে জিহ্বার ডগায় দাঁত বসিয়ে একটা সিগারেট টেনে নিলেন।
”পুরো প্যাকেটটাই রেখে দিন না!”
”নাহ!, একটা সিগারেট নিয়েই লজ্জায় পরে গেছি, আর না!”
অপ্রতিভ ভাবটা কাটানোর জন্য অর"ণাচলের পবিত্র পাহাড়টা সম্বন্ধে জানতে চাইলাম; আর কেনই বা এটাকে পবিত্র বলে গন্য করা হয়?
সন্ন্যাসী একটু থতমত খেয়ে গেলেন। উত্তর দেবার তেমন কোন গরজ দেখালেন না। প্রশ্নটা একটু ঘুরিয়ে আবার জানতে চাইলাম-পাহাড়ের চূঁড়ায় উঠলে কি কোন পুণ্য-সওয়াব হবে? সব পবিত্র পাহাড়ের তো এইই বৈশিষ্ট।
”পাহাড়ের পাদদেশটা প্রদক্ষিণ করলেই তো যথেষ্ট!”-বেশ অনিচছার সাথে জানালেন।
”শুধু চারিদিকটা?”
”খুব ভাল একটা ব্যায়াম হবে বৈকি, তাই না?”
”কোন দিক এবং কোথা থেকে শুর" করব?”
”এটা কোন মুখ্য বিষয় নয়।”
আমার উপসি'তিটা ওঁনার আর কাম্য নয় বুঝতে পেরে সাধুবাবাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিলাম এবং আগামিকাল আবার দেখা করতে পারব কিনা অনুরোধ জানালাম।
”কেন আপনি আবার এই হত দরিদ্র, নোংরা, ছিন্নমূল মানুষটার সাথে দেখা করতে চান?”
”আমি এই দরিদ্র, নোংরা, ছিন্নমূল মানুষটাকে পছন্দ করি, ভক্তি করি-------।”
আহঃ, আহঃ। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আমার হাতদুটো পরম আগ্রহে টেনে নিয়ে বললেন-”ভগবান আমার প্রতি বড়ই সদয়।”
”ইন্দিরা গান্ধীর চারপাশেও কি এই ঐশ্বরিক বন্ধনটা আছে?”-যাবার জন্য দাঁড়িয়ে জানতে চাইলাম।
”যদি সৃষ্টিকর্তার মর্জি হয় তবেই তো!”
”উনি কি আপনার মুরিদ, ভক্ত?”
”একজন রানীর কি এই নোংরাটে ভিখিরীকে দিয়ে কোন প্রয়োজনে আসবে?”
তর্কাতীত, যথার্থ জবাব; অনেক বছর ভেবেছি তাঁর এই উত্তরের যথার্থতা।
যেদিন ইন্দিরা গান্ধী গুলিবিদ্ধ হয়ে নিজের রক্তে ভেসে যা"িছলেন এবং পূরো ভারতবর্ষ একটা অজানা অসি'রতা আর ঘোর অমনিশার মধ্য দিয়ে পার হ"িছল তখনও সাধুবাবার ওই মন-ব্যের মর্মার্থ উদ্ধারের চেষ্টা করেছি।
ওইসব হঁড়ি-পাতিল, বাসন-কোসন আর বাজারের নোংরাআবর্জনা, পূতি:গন্ধময় পরিবেশে সাধুবাবা রামসূরতকুমারজি-কে রেখে চলে এলাম। যদিও আমার মনে হ"িছল তিঁনি সৃষ্টিরহস্যে ঘেরা এক অপার্থিব, অবিনশ্বর সৌন্দর্য্যে ভরপুর কোন এক স্বর্গীয় উদ্যানে বিচরণ করছেন।
সাধুকে ছেড়ে আসার পর থেকে কেন জানি আমার হূদয়-মন-মসি-স্ক এক অজানা, অব্যক্ত ভাললাগা, ভালবাসায়, সার্বজনিন প্রেমে সিক্ত হয়ে আছে। একটা ঘোরের মধ্য দিয়ে আমি আমার আশ্রমে পৌঁছলাম।
কিছু কিছু কালকণা, বিশিষ্ট মুহূর্ত আছে যা কখনই বিনিময়যোগ্য নয়- এমনকি শতবর্ষের আয়ুর বিনিময়েও নয়!
**মূল লেখক: পল উইলিয়াম রবার্ট। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাহিত্যে মাষ্টার্স সনদ লাভ এবং সেখানেই শিক্ষকতা। কয়েকবছর ভারতবর্ষ ও হলিউডে ঘোরাফেরা। এই মুহুর্তে টরন্ট শহরে স্ত্রী-সন-ানাদিসহ আস-ানা গেড়েছেন। এখানেই অনেক সম্মানে ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
ভাষান-রে:সেলিম

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





