আমি, সে ও সখা
গৌতম দাস
১
অবনীদের আর আমাদের বাড়ির মাঝে পাঁচিলের ব্যবধান, শুধু পাঁচিলের ব্যবধানই নয়, আমি লম্বা, গায়ের রঙ আমার পাকা গমের মতো, বাদামী কটা চোখের সাথে আমার একমাথা এলোমেলো চুল, অন্য দিকে অবনী বেঁটে, তার গায়ের রঙ কালো, চোখে-মুখে সব সময় কেমন যেন একটা দুঃখ-দুঃখ ভাব লেগে থাকে ওর।
তবু আমাদের এক স্কুল, এক ক্লাস, এক টিফিন বাক্স, এক ঘুড়ি, এক লাটাই, আমি হাসলে ও হাসে, আমি কাঁদলে, ওর চোখের কোনেও জলের ফোঁটা টলোমলো করতে থাকে। পড়াশুনায় অবনী ভালো, প্রতি পরীক্ষায় ও ক্লাসে প্রথম পাঁচ জনের মধ্যে থাকে। রেজাল্ট বেরোলে আমি পাড়ার বন্ধুদের ডেকে-ডেকে অবনীর রেজাল্টের খবর বলি আর রাতে পড়ার বইটাকে সামনে রেখে নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করি, কেন আমি পারি না অবনীর মতো পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করতে?
২
ক্লাস নাইন, অবনী প্রথম কবিতা লিখল আর চিলেকোঠার ঘরে আমায় ডেকে নিয়ে গিয়ে শোনালো তার সেই কবিতা। নদী পাখী আকাশকে নিয়ে লেখা অবনীর সেই কবিতা আমি আমার আলাপচারিতায় ডেকে ডেকে সবাইকে শোনালাম। শুধু শোনানোই নয়, কবিতাটা আমি আমাদের স্কুল ম্যাগাজিনেও দিয়ে দিলাম। সবাই যখন ওর কবিতা পড়ে ভবিষ্যতের এক তুর্কি কবির সন্ধান পেলো আমি তখন অনেক রাত অবধি ব্যর্থ চেষ্টা করলাম চাঁদ তারাকে নিয়ে সাদা কাগজের বুকে একটা কবিতা লেখার।
৩
স্কুলের পড়া শেষ করে আমরা এখন মফঃস্বলের কলেজে। আমাদের দুজনার বাবা আমাদের দুটো সাইকেল কিনে দিলেও আমরা কিন্তু একটা সাইকেলেই যাতায়াত করি। কলেজ যাওয়ার সময় আমি পিছনে, ও তখন চালায়, ফেরার সময় আমি চালাই, অবনী তখন রাস্তা দেখে, দূরের ইটভাটার চিমনি থেকে বেরতে থাকা কালো ধোঁয়া দেখে। নজর করে আমাদের পাশ কাটিয়ে চলতে থাকা মানুষের স্রোতটাকে। অবনীর কবিতায় প্রকৃতির থেকে এখন মানুষের কথা বেশী। শাসন শোষণ সাম্যবাদ গণতন্ত্র, ভারী ভারী শব্দে তার কবিতা মোড়া থাকে। রাতে সবাই ঘুমিয়ে পরলে আমি কলেজের ইউনিয়ন ঘর থেকে নিয়ে আসা ‘লাল লন্ঠন’ বইটা খুলে পড়তে থাকি। অচেনা নামের বিদেশী নেতাদের বিবৃতি বুঝে ওঠবার ব্যর্থ চেষ্টা করি। ইচ্ছে থাকলেও আমি কিন্তু ঐ সব নাম আর বিপ্লব মাখা শব্দগুলি নিয়ে একটাও কবিতাও লেখার সাহস করে উঠতে পারি না।
৪
কলেজ শেষ, রেল স্টেশনের সামনের চায়ের দোকানে সিগারেটের ধোঁয়ায় এখন আমার দিন কাটে। অবনীর কবিতায় প্রকৃতি আবার ফিরে এসেছে। তবে রূপক হয়ে। আকাশ এখন তার কবিতায় পুরুষ, সমুদ্রের জলে সে এখন ইলোরার চোখ খুঁজে পায়। ইলোরা আমাদের গাঁয়ে থাকে না, মফঃস্বলের শহরে তার বাস। অবনীর সঙ্গে কেমন করে যেন মেয়েটার আলাপ হয়েছে আর সেই আলাপ দিনে-দিনে রূপান্তরিত হয়েছে প্রেমে। ইলোরার সঙ্গে আমার এখনও আলাপ হয়নি। তবে অবনীর কবিতার মাঝে আমি ইলোরাকে চিনে নেই। দিনান্তের আলোর রঙে অবনী এখন ইলোরার শাড়ির আঁচল বর্ননা করে, মেঘদের ভাষায় তার খুনসুটির কথা বলে, আর যখন দেখি অবনীর কবিতায় বৃষ্টির কথা, তখন বুঝি যে ইলোরার মন খারাপ।
৫
কলেজ স্ট্রীটের কফি হাউসে টেবিলে আমরা এখন ত্রিভুজ। শীর্ষ বিন্দুর পাদদেশের একদিকে হলুদ শাড়ি। মানান সই টিপ, চুড়ি, কানের দুল। কাঁধের শান্তিনিকেতনের ঝোলাটা টেবিলের উপর। কফির কাপ সামনে রেখে অবনী শোনাচ্ছে তার নতুন কবিতা ‘এসো সূর্য, পুড়ে মরবার জন্য আমরা তৈরি’। মরবার জন্য আমি তৈরি নই, কারণ, আমি মরে গিয়েছি। কিন্তু আমি একা মরিনি, টেবিলের ওপারের হলুদ দ্বীপটাও আমার সঙ্গে পুড়ে গিয়েছে। বাড়ি ফিরে অনেকক্ষণ ধরে আজ আয়নার সামনে দাঁড়ালাম আর আয়নার আমিটাকে ইলোরা মনে করে তার সেই চোরা চাহনিগুলির মানে খুঁজতে থাকলাম। আজ শোওয়ার পর অবনীর একটা কবিতাও আমার মনে পরলো না। একটা হারিয়ে যেতে থাকা হলুদ দ্বীপের কথা ভাবতে ভাবতে আমি কখন যেন আজ ঘুমিয়ে পরলাম।
৬
অবনী এখন বঙ্গ সমাজের প্রতিষ্ঠিত কবি, তার লেখা কবিতা নিয়ে মাঝে-মাঝেই এখন শহরে সাহিত্য সভা হয়। কবি অবনী বেশীরভাগ সময়ই অবশ্য সেই সব সভায় সময় করে আসতে পারেন না। আমি আর ইলোরা সভাগুলোতে আসি, আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে। ইলোরা এখন আর আমার দিকে চুরি করে তাকায় না। আমাদের মধ্যে এখন আর কোনো কবিতার আলো-ছায়া নেই। অনেকদিন আগেই আমরা স্বচ্ছ গদ্যে নিজেদের-নিজেদের মনের কথা একে অন্যকে জানিয়েছি। গ্রামের পাঁচিলের ব্যবধান পার করে অবনী কখনও আমার ঘরে এসে খেলত না, আমিই যেতাম ওর চিলে কোঠার ঘরে। শহরের রাস্তার ব্যবধান মুছে আজও আমি-ই পৌঁছে যাই ওদের ফ্লাটে। বেশীরভাগ সময়ই অবনী তখন বাড়িতে থাকে না। ওর বেডরুমের বিছানা থেকে কবিতার বইগুলো সরিয়ে আমি আর ইলোরা তখন রূপক ছাড়াই আমাদের শরীর দুটোকে প্রথমে আলাদা-আলাদা করে তারপর একসাথে চিনে নেই। ইলোরা তার রাতের অতৃপ্তি দিনের আলোয় আমার কাছে নিঃশেষ করে পূরণ করে নেয়। আর অবনী ঘরে ফেরার আগে আমি ঘরে ফিরে আসি কফি হাউস থেকে বেরনোর সময় আমার বুকের মধ্যে যে তৃপ্তির ছোঁয়াটা ছিল তা বুকে নিয়ে।
৭
পুলিশের ছাড়পত্র পাওয়ার পর অবনীর মৃতদেহ দাহ করে এই কিছুক্ষণ আগে আমি আর ইলোরা ওদের ফ্লাটে ফিরে এসেছি। সকালের খবরে কাগজে আজ কবি অবনী সেন অনেকগুলি ঘুমের ওষুধ খেয়ে মারা গিয়েছেন এই খবরটা প্রকাশ পাওয়ার পর তার অসংখ্য গুণমুগ্ধ ভক্তবৃন্দ এতক্ষণ তাকে ঘিরে ছিল। পঞ্চভূতে ওর শরীরটা বিলীন হয়ে যাওয়ার পর তারা একে-একে বিদায় নিয়েছেন। আমার আজ আর বাড়ি ফেরা নেই, অবনী নেই, তাই আজ রাতে আমার আর আয়নার সামনে দাঁড়াতে হবে না। নিজের কাছে আজ আর আমার হেরে যাওয়া নেই, আজ রাতে আমি ইলোরার পাশে থাকব, ইলোরাকে বলবো ও যেন ওর সব হলুদ শাড়ি পুড়িয়ে ফেলে, সঙ্গে সেই শান্তিনিকেতনের ব্যাগটাও যেটা অবনী ওকে প্রথম উপহার হিসেবে দিয়েছিল। ইলোরার শরীরটাকে আজ থেকে প্রতি রাতে আমার পুরুষ হাতটাই শুধু জড়িয়ে থাকবে, কবিতার অক্ষম শব্দগুলি আর কখনো তার শরীরটাকে স্পর্শ করবে না।
৮
কোলকাতার সাহিত্য মঞ্চের ডাকা স্মরণ সভায় দুজনার কথাই আজ এক সাথে উচ্চারিত হয়েছিল। কবি অবনী এবং তার ধর্মপত্নী ইলোরার মৃত্যুতে যে সমগ্র সাহিত্য সমাজ কতখানি শোকে ম্রিয়মাণ তা প্রতিটি বক্তার বক্তব্যেই আজ বারবার ফুটে উঠছিল। ইলোরার আত্মহত্যা যে তার স্বামীর প্রতি অখণ্ড ভালোবাসার নিদর্শন আর সেই ভালবাসাই যে অবনীর কবিতায় বারবার ভাষা আর শব্দের মোচড়ে ফুটে উঠত, সেই বিষয়ে সভার কারোরই কোনো দ্বি-মত ছিল না। অবনীর অভিন্ন হৃদয় বন্ধু হিসেবে আমাকেও আজ অনেক গুণীজনের মাঝে থাকতে হয়েছে। কিন্তু কেউ বোঝেনি, অনেকের মাঝে থেকেও আজ একটা ভয় যেন আমায় বাড়বার জড়িয়ে ধরছিল, আমার খালি মনে হচ্ছিল অবনী আজ রাতে আবার ফিরে আসবে আর তার হাতে ধরা থাকবে ইলোরাকে লিখে যাওয়া তার শেষ কথাগুলি
না, অবনী তার জীবনের শেষ লাইন-কটা কবিতায় লিখে যায়নি,
...... শেষ অবধি দিনগুলির মৃত্যু হলো, আকাশের বুকে সন্ধ্যা নামলো, মাটির পৃথিবীতে সন্ধ্যা নামলো, আমি তোমার হাত দুটো ধরলাম, বললাম, আমাকে আর একবারের জন্যও কি তুমি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারো না কবেকার সেই শেষ হয়ে যাওয়া চুম্বনে? তুমি মাথা নাড়লে, ওপাশ ফিরে শুলে, ঘুমোলে না, বালিশে গড়িয়ে পরলো না তোমার চোখের জল, আশ্লেষের অতৃপ্তি তোমার চোখের কোনায় টলমল করতে থাকলো, তুমি তাকে সযত্নে তুলে রেখে দিলে দিনের আলো ফোটার জন্য। দিনের আলোয় আমি যখন আবছা তখন তুমি বৃষ্টি, তুমি তখন কাঁদছ, তুমি তখন হাসছ, অয়নের পৌরুষে উচ্ছল জল তরঙ্গ হয়ে বাজছ, আর তোমার সেই বসন্ত উৎসবে আমি যেন নিতান্তই এক অনাহূত অতিথি।
ইলোরা, ভাবছি এবার মৃত্যু নিয়ে একটা কবিতা লিখব, আসন্ন মৃত্যুর অদ্ভুত শিহরনকে বেঁধে ফেলব শব্দের বাঁধনে। কবিতাটা কিছুটা লেখার পর একদিন আবার আমরা তিনজনে গিয়ে বসব সেই কফি হাউসটায়। স্কোয়ার শেপের টেবিলটায় ঐদিন আমাদের যে ত্রিভুজ গড়ে উঠবে তার শীর্ষ বিন্দুতে থাকব আমি। অর্ধ সমাপ্ত কবিতাটা তোমাদের শুনিয়ে দেখতে থাকব তোমার আর অয়নের চোখে ভেসে ওঠা অনুভূতি-টাকে। যদি দেখি তা ভয়ার্ত তবে বুঝব কবি হিসেবে আমি ব্যর্থ আর যদি দেখি তোমাদের চোখেও আমার মত অদেখা মৃত্যুর রোমাঞ্চ ফুটে উঠেছে তবে বুঝব প্রেমিক হিসেবে ব্যর্থ হলেও আমিই সেই কবি যাকে তুমি একদিন ভালো বেসেছিলে আর হাত ধরে বলেছিলে ‘এ হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে (চলো) এক সঙ্গে (দুজনে) জ্বলে পুড়ে ছাই (হয়ে যাই)’ ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


