অপলার ডায়েরী
অপলার Diary-র পাতা, ১০ ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৬, বয়স তখন ষোলো
দুয়ারে এসে দাঁড়িয়েছি আনন্দ, চণ্ডালিকা তুমি কোথায়?
অনেক ভোরে ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছে আজ। শেষ কবে যে এত সকালে ঘুম থেকে উঠেছি মনে পরছে না। আসলে ভোর রাতে স্বপ্নটা দেখে সেই যে চোখটা খুললো তারপরে আর চোখের পাতা দুটো কিছুতেই এক করতে পারলাম না। এখন সাড়ে ছ-টা। পূব মুখী জানলাটার স্ক্রিনটা সরিয়ে দেওয়াতে সকালের মিঠে রোদ আহ্লাদী মেয়ের মত এখন আমার দশ তলার বেডরুমের বিছানা-বালিশে হুটোপুটি করছে। কি ভীষণ মিষ্টি আর নরম এই সকালের রোদ, তাই না পলাশদা?
জানেন, নিজেকে না এখন কেমন যেন ভীষণ আলু-থালু লাগছে, ঘুরে ফিরে খালি মনে পরছে স্বপ্নের কথাগুলো, দুয়ারে এসে দাঁড়িয়েছি আনন্দ, চণ্ডালিকা তুমি কোথায়? কেন বলুন তো আপনি কথাগুলি বলতে-বলতে স্বপ্নে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন?
স্ক্রিপ্টে তো কোথাও এই কথাগুলো লেখা ছিল না, পলাশদা!
ঠিক আছে, পরে নয় ভেবে উত্তরটা দেবেন, এখন এদিকে দেখুন কি হয়েছে, আপনার সঙ্গে যখন কথা বলছিলাম তখন না কোন ফাঁকে একটা নাম না জানা পাখী খোলা জানলাটা দিয়ে ঘরে ঢুকে আমার স্টাডি টেবিলটার উপর এসে বসেছে। জুল জুল করে পাখীটা এখন তাকিয়ে আছে আমার জিম (জেম) মরিসনের ফটোটার দিকে। আচ্ছা পলাশদা, পাখীটা কি দেখছে বলুন তো? প্লিজ মানা করুন না ওকে, ও যেন আমার মনের মানুষটার দিকে ওভাবে না তাকায়। ডাজন্ট শী নো, জিম শুধু আমার? কারোর সঙ্গে আমি ওকে শেয়ার করতে পারব না। আই লাভ হিম, এন্ড দ্য ওর্যাল্ড নোজ দ্যট জিম অলসো লাভস মি, তাই তো প্রতিদিন রাতে ও ফটো থেকে নেমে এসে আমাকে গান শুনিয়ে ঘুম পারিয়ে যায়,
Don’t you love her face?
Don’t you love her as she’s walkin’ out of the door?
Like she did one thousand times before.
জানি পলাশদা আপনি হয়তো ভাবছেন যে আমি একটা পাগল, হয়তো ভাবছেন আমাকে জিজ্ঞাসা করবেন যে একটা মানুষ যে কি না অনেকদিন আগে মারা গিয়েছে সে কি করে আমাকে প্রতি রাতে গান শোনাতে আসবে? কিন্তু বিশ্বাস করুন পলাশদা এরকম হয়, আমার মন চাইলেই আমার প্রিয় মানুষগুলো এসে জড়ো হয় আমার চারপাশে। এই তো আজ সকালেই যেমন ঘুম থেকে ওঠার পর মনে হলো টেবিলের ওপরে রাখা ফটোটা থেকে আজ জিম নয়, আপনি আমাকে গুড মর্ণিং বলছেন। কি আশ্চর্য পলাশদা! কাল বিকেলের আগে আপনাকে আমি চিনতাম-ই না। মৃত্তিকা আর কুশল যখন কাল সকালে এসে জানালো যে এবারের বসন্ত উৎসবে চণ্ডালিকা পরিচালনা করবেন কুশলের দাদার কলেজের এক বন্ধু তখনই তো ওদের কাছে প্রথম আপনার কথা শুনলাম আর তারপরে সন্ধ্যার রির্হাসালে আপনাকে প্রথম দেখলাম।
অপলার Diary-র পাতা, ১০ ই মার্চ, ১৯৮৭, বয়স তখন সতের
পলাশদা, তোমার সঙ্গে না এলে জানতেই পারতাম না যে এই শহরের সীমানা ছুঁয়ে এত সুন্দর একটা গ্রাম আছে। জানো, আমি তখন ছোট, আমাদের বাড়িতে পারুলদি বলে এক ভদ্রমহিলা কাজ করতেন। সেই দিদি রোজ দুপুরে আমায় গল্প বলতেন ব্যাঙ্গমা - ব্যাঙ্গমী, রাজপুত্র-রাজকণ্যা, রূপোর কাঠি - সোনার কাঠি, আরো অনেক কিছুর। এক-একদিন ওনার গল্পে থাকত এক দুঃখী মেয়ে। সেই মেয়েটা যে গ্রামে থাকত তার সঙ্গে কি আশ্চর্য মিল তোমাদের এই গ্রামটার। তোমাদের এই স্টেশনের গা ঘেঁসে যে ধু ধু মাঠটা আর তার বুকে যে বিশাল বট গাছটা আছে, পারুলদি কিন্তু অনেকদিন আগেই আমাকে এদের কথা শুনিয়েছিল। আর তাই আজ যখন রিকশায় চড়ে গ্রামের রাস্তা ধরে তোমাদের বাড়ির দিকে যাচ্ছিলাম তখন আমার না খুব পারুলদি-র কথা মনে পরছিল।
তোমাদের গ্রামের নামটাও ভারি মিষ্টি, ঠিক যেন তোমার মায়ের মত। আচ্ছা পলাশদা, একটা কথা বলো তো, মাসীমাকে কি তুমি আগেই আমাদের ব্যাপারে বলেছিলে? আমার না প্রথমে মাসীমার সঙ্গে কথা বলতে খুব লজ্জা-লজ্জা লাগছিল, কিন্তু উনি এত ভালো যে আমার সেই লজ্জাটাকে আমি বেশীক্ষণ ধরে রাখতে পারলাম না।
এখন অনেক রাত হয়ে গিয়েছে, নিশ্চয় তুমি শুয়ে পরেছ, যদি না ঘুমোও, তবে একবার হোস্টেলের ঘরের দরজাটার দিকে তাকাও। দেখতে পেলে আমায়? আমার অশরীরী মনটা আজ সারা রাত ধরে তোমার পাশে বসে থাকবে বলে সেই কখন পৌঁছে গিয়েছে তোমার দরজায়, সারা রাত ধরে সে আজ তোমার সঙ্গে গল্প করবে, শব্দ আর অক্ষরের কবিতায় তোমার কপালে হাজারো চুমু এঁকে দেবে - তুমি অবশ্য তা টের পাবে না - সারা রাত সে বিছানায় তোমার পাশে শুয়ে থাকবে - তুমি জানতেও পারবে না।
অপলার Diary-র পাতা, ১০ ই এপ্রিল, ১৯৮৯, বয়স তখন উনিশ
পলাশদা, ভীষণ বিচ্ছিরি তুমি! যত দিন যাচ্ছে, তত যেন অসভ্য হয়ে উঠছ। সেদিন সিনেমা হলের অন্ধকারে ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়ালে, আর আজ? জানো তো, আজ দুপুরটার কথা মনে পরলেই আমার শরীরটায় এখনও কাঁটা দিয়ে উঠছে। বিশ্বাস করো পলাশদা, আজকের আগে কোনোদিন ভাবতেই পারিনি যে ভালোবাসা দুটো শরীরকে এত সুন্দর ভাবে এক সূত্রে বেঁধে ফেলতে পারে। মাঝে মাঝে আমার কি মনে হয় জানো? তুমি হচ্ছ গিয়ে একটা ঘাপটি মারা শয়তান। এ বাবা! তোমায় শয়তান বলে ফেললাম! কিছু মনে করো না প্লিজ। আই রিয়েলি ডিডন্ট মীন ইট। আর যদি মনে করো, তাহলে বয়েই গিয়েছে! আমি কি তোমায় পরোয়া করি না কি?
এই কথা বলছ না কেন? কি হলো? সত্যি সত্যি রাগ করলে নাকি? প্লিজ পলাশদা, রাগ করো না। বললাম না তোমায় আই রিয়েলি ডিডন্ট মীন ইট। জানো, আজ তুমি আমার কি করেছ? বাড়ি ফিরে দেখি সারা শরীরে তোমার ঠোঁট আর নখের দাগ। এন্ড ডু ইউ নো, হোয়াট আই অ্যাম ডুয়িং রাইট নাও? দরজা বন্ধ করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমি এখন তোমার সেই ঠোঁটের দাগগুলির উপর আমার আঙুল রাখছি। বিশ্বাস করো, মনে হচ্ছে যেন আই অ্যাম টাচিং ইউ। আমার আঙুলগুলো যেন সত্যিই তোমার ঠোঁটের স্পর্শ পাচ্ছে, আর আমার প্রত্যেকটা প্রশ্বাসের সঙ্গে তোমার পুরুষালি শরীরের গন্ধটা মিশে যাচ্ছে। চোখ বুজে আমি অপেক্ষা করছি কখন আবার তুমি আমাকে টেনে নেবে তোমার বুকের মাঝে, আর তারপর ধীরে ধীরে আমার সব লজ্জাকে দূর করে আমার শরীরটাকে মিশিয়ে নেবে তোমার শরীরের মাঝে।
এই পলাশদা, আই অ্যাম সিরিয়াস, রাতের ডানায় ভর করে একবার প্লিজ চলে এসো না আমার কাছে, আরেকবার আমায় পুড়িয়ে দেবে বলে।
বাই দ্য ওয়ে, সন্ধ্যা বেলায় বাড়ি ফিরে দেখি আমার জন্য একটা সারপ্রাইজ রয়েছে। সুমন্তকাকু আর কাকিমা ড্রয়িং রুমে বসে মা আর বাপীর সঙ্গে গল্প করছেন। এই সুমন্ত আঙ্কল হচ্ছেন বাপীর একেবারে ছোটবেলাকার বন্ধু। ওনারা এখন বোস্টনে থাকেন। রণো আর জুন অবশ্য এবার আসতে পারেনি, জুনের পরীক্ষা আর রণো এ বছর-ই চাকরিতে ঢুকেছে, তাই ও ছুটি পায়নি।
অপলার Diary-র পাতা, ১০ ই মে, ১৯৯১, বয়স তখন একুশ
মৃত্তিকা সকালে ফোন করে জানিয়েছে যে দুটো নাগাদ ও একেবারে বিউটি-সিয়ান মেয়েটিকে পার্লার থেকে পিক আপ করে আমাদের বাড়িতে আসবে। কণে সাজানর ভারটা মা মৃত্তিকার উপরেই দিয়েছে। আর বেচারি তাই নিয়ে এ’কদিন একেবারে নাজেহাল। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে শেষ পর্যন্ত ও সাউথ ক্যালকাটার পার্লারটাকেই সিলেক্ট করেছে আমাকে সাজানর জন্য।
মৃত্তিকার হাত দিয়েই চিঠিটা সেদিন পাঠিয়েছিলাম পলাশদাকে। জানি পলাশদা, তুমি চিঠিটা পড়ে কষ্ট পেয়েছ বাট বিলিভ মি, আই ডিডন্ট হ্যাভ এনি আদার অপশন। অ্যাকচুয়ালি, অনেক চেষ্টা করেও আমি মা বা বাপীকে তোমার ব্যাপারে কনভিন্স করাতে পারিনি। মা ইমোশনালি আমাকে কাউন্টার করছিল, বাট বাপী ওয়াজ ভেরি প্রফেশনাল ইন হিজ অ্যাপ্রোচ। ঠিক যেভাবে নিজের বিজনেস ডিলগুলি নেগোশিয়েশন করে ঠিক সেই ভাবেই আমার সঙ্গে তোমার ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলতে বসেছিল। এক্সেল শিটে নিখুঁত ভাবে তোমাকে একদিকে আর অন্য দিকে রণদীপকে ফ্রেম করে আমাকে দেখিয়ে দিয়েছিল যে আজকের একটা ছোট্ট ভুলে আমার ভবিষ্যতটা কীভাবে লোকসানের খাতায় চলে যেতে পারে। টু বি ভেরি অনেস্ট আমি নিজেও বাপীর ঐ আর্গুমেন্টের সামনে বেশীক্ষণ তোমার হয়ে কাউন্টার করতে পারিনি। এন্ড আই থিংক ইন রিয়েল সেন্স সে-টা বোধ হয় সম্ভব-ও ছিল না। ঝুমরি এন্ড বোস্টন যেমন নেভার কম্পায়েরেবেল তেমনি রণোর সঙ্গে তোমার-ও কখনো তুলনা হয় না পলাশদা। আই মীন তোমাদের দুজনার দুনিয়াটা-ই আলাদা, পারহাপস রণো উইল বি নেভার এবেল টু রাইট দ্যট ‘অরণ্য পেরিয়ে’ যেটা তোমার প্রথম কবিতার বই বাট ইউ নো পলাশদা, হি ইজ হ্যাভিং এ ডিফারেন্ট চার্ম অল টু-গেদার।
তুমি হয়তো ভাবছ যে আমি ভীষণ স্বার্থপর, বাট এটাই কঠিন বাস্তব পলাশদা। বাপী ঠিকই বলে, জীবন একটাই, এন্ড উই শ্যুড ইউজ ইট ভেরি কেয়ারফুলি।
অপলার Diary-র পাতা, ১০ ই জুন, ১৯৯৯, বয়স তখন ঊনত্রিশ
হঠাৎ করে পুরনো কিছু খুঁজে পেলে খুব আনন্দ হয়, তাই না? আর সেই ফিরে পাওয়াটা যদি ভীষণ স্মৃতি মাখা হয়, তবে তো কথাই নেই। বলবেন হয়তো, স্মৃতি কি শুধুই আনন্দের? হয়তো স্মৃতি সব সময় আনন্দের হয় না, কিন্তু দুঃখের স্মৃতি-ও ফিরে পাওয়ার মাঝে কেমন যেন একটা ঝিম-ঝিম মদিরতা থাকে, তাই না?
বাবাইয়ের এবার ক্লাস টু আর মুনের থ্রি। পড়াশোনার স্টাইলটা আজকাল অনেকখানিই বদলে গিয়েছে। সেই আমাদের সময়কার মত আজকাল ঢিলে-ঢালা বলে কোনো ব্যাপার নেই। এই দেখুন না ক্লাস টু আর থ্রি-তেই ওদের বই-খাতা গুনে যেন শেষ করা যায় না। বাবাই আর মুনের বই-খাতা রাখবার জন্য রিয়েলি আলাদা একটা জায়গার এবার দরকার হয়ে পরেছে। আর তাই সকালে পুরনো জিনিস রাখার শেলফটা খালি করতে গিয়ে ফিরে পেলাম আমার সেই পুরনো বন্ধুকে, অপলার Diary-র পাতা। পড়তে পড়তে কেমন যেন নস্টালজিক হয়ে পরেছিলাম, অনেক পুরনো কথা মনে পরে যাচ্ছিল, কেমন আছ পলাশদা? বিয়ে করেছ? নাকি, এখনও সাহিত্য চর্চা, ড্রামা ডাইরেকশন এসব নিয়েই মেতে আছ? বাই দ্য ওয়ে, মাসীমার কি খবর? উনি কি এখনও ঝুমরিতেই থাকেন? নাকি তুমি ওনাকে তোমার কাছে কোলকাতায় নিয়ে এসেছ? কোলকাতা-টা অবশ্য জাস্ট একটা গেস, আমি তো এ-ও জানি না যে তুমি নিজেই এখন কোলকাতায় থাকো কি না?
রণোদের ইন্ডিয়ান সেট আপ শুরু হওয়ার পর এই কিছুদিন আগে আমরা দেশে ফিরে এসেছি। রণো এখন ওদের ইন্ডিয়ান উয়িংয়ের সি ই ও। দেশে ফিরলেও আমাদের অবশ্য সেটল করতে হয়েছে দিল্লিতে। সাউথ এক্সে ওদের কোম্পানি রণোকে একটা বিশাল বাংলো দিয়েছে। আমরা এখন ওখানেই থাকি। আজ আবার ওদের ইন্ডিয়ান অপারেশনের থার্ড অ্যানিভারসারি উপলক্ষে একটা পার্টি আছে। রণো টেনিস ক্লাব থেকে ফিরে এলেই আমাদের আজ বেরিয়ে পরতে হবে।
সো, Diary, তুমি এখন আলমারির ভীতরেই থাকো। কাল দুপুরে ফ্রি থাকলে তখন না হয় আবার নতুন করে তোমাকে নিয়ে বসা যাবে।
অপলার Diary-র পাতা, ১০ ই জুলাই, ২০০৪ , বয়স তখন চৌত্রিশ
বাবাই, মুন আর আমি গত সপ্তাহে নতুন এই ফ্লাটটায় শিফট করেছি। জায়গাটা সাউথ এক্স থেকে আরো একটু দক্ষিণে, পুষ্পবিহার। বাবাইদের স্কুলটা এখান থেকে একটু দূর হয়ে যাবে, তাই মনে একটা খুঁত-খুঁত ছিল, কিন্তু সঙ্গীতাদের এই ফার্নিশড ফ্লাটটা ওরা বেশ কম ভাড়াতেই দিয়েছে। তাই মনের খুঁত-খুঁতটা মনেই থেকে গিয়েছে। সঙ্গীতার সঙ্গে আমার আলাপ আমাদের লেডিজ ক্লাবে, মেয়েটি বেশ ফ্রেন্ডলি। শুধু ফ্লাটটার ব্যাপারেই নয়, ওর হাজব্যান্ডকে বলে ও আমার জন্য একটা চাকরির ব্যবস্থাও করে দিয়েছে। রণো অবশ্য বারবার জানতে চেয়েছিল যে মান্থলি কত টাকা আমাদের চাই, আমি-ই মানা করেছি।
কি দরকার রণো, মাসিক কিছু টাকা তোমার থেকে নিয়ে শেষ হয়ে যাওয়া সম্পর্কের প্রেতাত্মাটাকে বয়ে বেরনোর?
অপলার Diary-র পাতা, ১০ ই আগস্ট, ২০১৮, বয়স তখন আটচল্লিশ
বাবাই ভোর রাতে আজ মাইক্রো বায়োলজি নিয়ে পড়তে জর্জিয়া চলে গেল। কাল রাতে ব্যাগেজ চেক করতে করতে ও বলছিল, মাম্মি চিন্তা কোরো না, আই অ্যাম ক্যাপাবেল এনাফ টু টেক কেয়ার অফ মাইসেলফ। ঠিকই। এই বয়সেই ও বুঝে গিয়েছে যে কেরিয়ারের রেসপেক্টে ইমোশনাল হয়ে কিছু লাভ নেই। স্কলারশিপটা পাওয়ার পর তাই সে বিন্দু মাত্র হেজিটেট না করে রণোর মাধ্যমে পিসিকে জর্জিয়ায় কন্টাক্ট করেছিল। রণোকে অ্যাপ্রোচ করবার আগে অবশ্য আমাকে একবার জিজ্ঞাসা করেছিল। তবে তা যেন শুধুই বুড়ি ছোঁয়ানর জন্য। আসলে ও জানতোই যে রণোর সঙ্গে আমার ডিভোর্স হলেও বা দীর্ঘ দশ বছর আমাদের সে-রকম যোগাযোগ না থাকলেও হি ইজ হ্যাভিং অ্যান ইমোশনাল প্লেস ইন রণো’স মাইন্ড এন্ড হি ক্যান এক্সপ্লোর দ্যট হোয়াইল নেগোশিয়েটিং উইথ হিজ বায়োলজিক্যাল ফাদার। বাবাই ডিড ইট সাকসেসফুলি। রণো সেটেলড এভরিথিং ফর হিম।
মুনটা কিন্তু অন্য রকম, যত বড় হচ্ছে মেয়েটা তত-ই যেন নিজেকে একটা পারসোনালিটির মোড়কে ঢেকে নিচ্ছে। অনেক চেষ্টা করেও আমি ওর সেই ব্যক্তিত্বের মোড়কটা পার করে ওর কাছে পৌঁছতে পারি না। লেডী শ্রী রাম কলেজে ও এখন ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে পোস্ট গ্রাজুয়েশন করছে, কলেজের বাইরে ওর যে দুনিয়াটা সেটা যেন শুধু বইয়ে ঢাকা। বই পড়তে ও খুব ভালোবাসে। ওকে বই পড়তে দেখলে আমার না তোমার কথা খুব মনে পরে যায় পলাশদা। তোমার হোস্টেলের ঘরেও যখন যেতাম দেখতাম চারিদিকে শুধু বই আর বই।
কিছুদিন আগে মৃত্তিকা স্বামীর সঙ্গে দিল্লিতে এসেছিল। ওরা একটা বিকেল আমাদের ফ্লাটে কাটিয়ে গিয়েছিল। ওর মুখেই শুনলাম কিছুদিন আগে কোলকাতার একটা পার্টিতে নাকি রণো আর ওর অভিনেত্রী বউ সাহানার সঙ্গে ওদের দেখা হয়েছিল। মৃত্তিকাকে চিনতে পেরে রণো এগিয়ে এসে ওদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিল ওর বৌয়ের।
মৃত্তিকার মুখেই শুনলাম তুমি নাকি এখন কোলকাতার সাহিত্য মহলে বেশ পরিচিত নাম! তোমার লেখা বইয়ের সংখ্যা নাকি পঁচিশ পার হয়ে গিয়েছে।
কথাটা শুনে সেদিন কিন্তু আমার বেশ আনন্দ হচ্ছিল, পলাশদা।
পলাশদা জানো তো বাপীর দেখানো সেই এক্সেলশীটটা আমি মনে হয় সেদিন ঠিক পড়ে উঠতে পারিনি। আসলে কি জানো আজ বুঝি যে অল্প বয়সে ঐ যে মনে হত সব কিছু কত সহজে বুঝি তা ছিল একটা ভুল অহমিকা। ভাবতাম, আলো জ্বালিয়ে অন্ধকারকে দূর করা খুব সহজ। কিন্তু এখন বুঝি, তা কত কঠিন। হাতের মুঠিতে আজ আমার একটা জোনাকিও নেই, অন্ধকারটা তাই যেন আজ আমায় ঘিরে ধরেছে পলাশদা,
পারবে পলাশদা আর একবার আলোর শিখাটা নিয়ে আমার কাছে আসতে? আর একবার স্বপ্নে এসে বলবে দুয়ারে এসে দাঁড়িয়েছি আনন্দ, চণ্ডালিকা তুমি কোথায়?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


