পরশু দুপুরে কিসরুতে এসে পৌঁছেছিলাম। আর আজ সকালে টুরিস্ট বাংলোর হিসেব মিটিয়ে গাড়িতে উঠে বসে ছিলাম দিল্লির পথে। পাহাড়ি ডাকবাংলোটা ছেড়ে যখন আমাদের গাড়িটা সমতলের বুকে নেমে আসছিল তার চলার পথে দু-চোখ ভরে দেখছিলাম পথের দু-ধারে ছড়িয়ে থাকা প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্যকে। পাহাড়ের কোল ঘেঁসে কত গাছের সাড়ি, কিছু তার চেনা, অনেকই আবার অচেনা। শাল-পাইন-ফার। আরে, ওটাকেই তো রডোডেনড্রন বলে, তাই না? চেনা-অচেনা গাছের ছায়া মাখা রাস্তা পার হয়ে আমরা এক সময় নেমে এসেছিলাম দেব-প্রয়াগের সমতলে।
আর, সেখানেই তোর সাথে দেখা হয়েছিল, অলকানন্দা।
ভেবেছিলাম আজ তুই আকাশের রঙে নীল হয়ে থাকবি। কিন্তু আকাশটা বড় দুষ্টু। শুনল না আমার কথা। নিজের বুকে তাই সে আজ ডেকে আনল সারি সারি কালো মেঘ। আর সেই কালো মেঘের ছাওয়া নিয়ে যখন তুই এলি, আমার মনে হলো প্রকৃতির বুকে যেন আঁকা তুই এক অশ্রুকণা। দু'জনা আমরা এরপর হাত ধরাধরি করে চলতে শুরু করলাম। চলার পথে কখনও তুই আমার বাঁয়ে কখনও বা ডাইনে। মাঝে-মাঝে তুই হারিয়ে যাচ্ছিলি খাঁদের অতল গহ্বরে। হারিয়ে গেলেও আমি কিন্তু শুনতে পাচ্ছিলাম তোর নূপুরের ধ্বনি। পাথরের নুড়ির সঙ্গে তোর সেই একান্ত আলাপচারীতা।
এর মাঝে ড্রাইভারটা কখন যেন গাড়িটাকে এনে দাঁড় করিয়েছিল সাঁকোর বাঁকে সেই ছোট্ট চায়ের দোকানটায়। মুলিবাঁশের দেওয়াল - টিনের ছাউনি - উনুনের ছাইয়ের গাদায় হারিয়ে যাওয়া ধিকিধিকি করে জ্বলতে থাকা আগুন - আর তার বুকে কালচে সসপ্যানে সকাল থেকে শ্বাস তুলতে থাকা চায়ের লিকার।
আর?
পায়ে বাঁধা তার নূপুরের রিনি
দোকানের বুকে বাজে রিনিঝিনি
ছুটে বেড়ায় সে চপল পায়ে
ডুরে শাড়িটা তার আদুল গায়ে।
পাহাড়ের বুকে সে যেন এক বন্যা
অলকানন্দা, তুই যে বলেছিলি, তুই অনন্যা?
নাম জিজ্ঞাসা করাতে সরল চোখ দুটো মেলে আমার দিকে চেয়ে বলেছিল, সবাই আমাকে ছুটকি বলে ডাকে। বাবুজি বলে বিটিয়া। ওর প্রসারিত আঙ্গুলের পথ চেয়ে দেখলাম দূরের মাঠে এক বুড়ো নিজের মনে মাটির মূর্তি গড়ছেন।
আর তোমার মা?
নাই - হারিয়ে গিয়েছে।
কোথায় হারিয়ে গেছে তোমার মা?
সেই যে সেবার বাণ এলো, তারপর, বাণের জল নেমে যাওয়ার পর শুরু হলো নদীর বুকে বাঁধ বাধার কাজ। দূর-দূর থেকে কত্ত মানুষ সেদিন এসেছিল আমাদের গাঁয়ে।
তারপর?
তারপর একদিন বাঁধ বাধার কাজ শেষ হলো। অচেনা মানুষগুলো ফিরে গেল তাদের শহরে। আর যাওয়ার সময় কে যেন আমার মা-কেও সঙ্গে করে নিয়ে গেল। কতো কেঁদেছিলাম আমি সেদিন। বাবুজিও সেদিন সারাদিন দোকানে না বসে নদীর পাড়ে একা-একা গিয়ে বসেছিল। আর বিকেল বেলায় মাটির তালে জল দিতে-দিতে বলেছিল, বিটিয়া, তোর মা তো খুব সুন্দর, আমি কি পারব তার মত সুন্দর একটা মাটির মা তোকে বানিয়ে দিতে?
চা খাওয়া শেষ। পয়সার হিসেব মিটিয়ে গাড়িতে ওঠার আগে ছুটকি ওর বাবুজির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেয়। মাটির মূর্তিতে রঙের প্রলেপ লাগাতে থাকা অনন্তরাম আমাদের দেখে হাত জোড় করে বলে উঠেছিল ‘নমস্কার।‘ আকাশের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা মেঘগুলি এর মধ্যে কখন যেন ভাসতে-ভাসতে চলে গিয়েছে দূর শহরে। অলকানন্দা এখন নীল। নীল জলের একটা ফোঁটা যা টলোমলো হয়ে ভেসে বেড়ায় ছুটকির চোখের কোনে। কান্না হয়ে ঝরে পড়ে না, নুড়ির সঙ্গে এখন আর তা খুনসুটি করে বেড়ায় না। সে যেন এখন সমতলের সমাহিত একটা প্রবাহ যা পুড়তে থাকা মানুষটাকে কাছে ডেকে বলে বাবুজি, মাটির মূর্তি বানিও না, ও যে যখন-তখন ভেঙ্গে যায়।
ড্রাইভার গাড়ির ইঞ্জিন চালু করেছে। বিদায় ছুটকি। বিদায় অনন্তরাম। কোনোদিন হয়তো আবার ফিরে আসব তোমাদের কাছে অলকানন্দার বুকে ভেসে থাকা সেই কবিতাটা নিয়ে
অলকানন্দাকে বুকে নিয়ে
একটা পুড়তে থাকা মানুষ তুমি - অনন্তরাম
সময় তোমার বয়স চুরি করে নিয়ে গিয়েছে
নদী তোমার ঘর ভাসিয়েছে
ভালোবাসা তোমায় ছেড়ে ফেরারি হয়েছে
তবু, তুমি আজও নদীর ফেরার পথে চেয়ে
মাটি পেলে তার মূর্তি গড়ো,
আজও তুমি----------------------

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


