যে শাড়িটা পরলে তানোটের রোদ হয়ে যেতে তুমি ... যে শাড়িটা মেলে দিলে
আলো আসতো আমার দোতালার ঘুপছি ঘরটায় ...বড় ইচ্ছে করে ঐ আলোটাকে খুঁজে তাকে পঙ্গু করে ফেলে রাখি বিছানায়............বড় ইচ্ছে করে গোধূলির শেষ লাল রঙটুকু চুরি করে তোমায় মাখিয়ে দিয়ে বলি, হওনা আজ তুমি আবার আমার অচেনা নাগরিক......
বারবেলায় যে ছেলেটা গোছাভরা চিঠি হাতে ঘোরে ... এ বাড়ি ...
সে বাড়ি... কখনো বা আমার বাড়ি ... ইচ্ছে করে, বলি ওকে
ওরে আমারটা নয় ...অন্য কারো চিঠি তুই দিয়ে যাস আমায় ... অন্য কারোর চিঠি ...
অন্য কারোর রাত ... ধূলোভরা মাঠ ..... অন্য সেই উঠোন যার কোনো ধরাবাঁধা নেই ... খুনসুটিরা যেখানে একদিন বা ভুল করে প্রতিদিন ফিরে আসে বারবার ..... তুই সেই চিঠিটা না হয় ফেলে দিয়ে যাস আমায়..................
চেনা-অচেনায় আজ নয় হারিয়ে যাই আবার, আবার নয় অচেনা তুমি ফিরে এলে নিয়ে যারা আছে ...বা ছিল .... তাদের সবার খবর .........
মনে বড় ইচ্ছে হয় ... দু কলম লিখে দেই ...
“ যা কিছু খুঁজছ তুমি আজ –
যা কিছু চাইছো পেতে লেখনীর ছলে
সব কিছু তা হারিয়ে গিয়েছে
বৃষ্টির সাথে
বৃষ্টির জলে “
এই ছেলে ... তুই যদি চাস ...অন্য কারো
নীল খাম ... মুখবাধা চিঠি ...আমার ডাকবাক্সে রেখে দিয়ে যাস ।।
আচ্ছা আবীর, কখনো তুমি আকাশের বুকে মেঘ জমতে দেখেছ? একটু একটু করে থরে থরে কালো মেঘ এসে জমা হচ্ছে আকাশের বুকে। স্কুল থেকে ফিরে কাল বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমি মেঘেদের সেই জমায়েত দেখছিলাম। প্রথমে এক টুকরো একটা মেঘ ...... তারপর সেই এক টুকরো মেঘটা ডেকে আনলো আরো অনেক টুকরো- টুকরো মেঘকে...... ছড়িয়ে পরলো তারা পুরো আকাশটায়,
বৃষ্টি নেই, বেলা বাড়লে সূর্যের প্রচণ্ড তাপে বাইরে বেরনো-ই মুশকিল, ছাতা ছাড়া বের হলে মনে হয় গায়ে যেন ফোস্কা পরে যাবে। চারিদিকের ক্ষেত-মাঠ শুকিয়ে কাঠ............যে দুটো কুয়ো এখানকার মানুষের পিপাসা মেটায় তার জলও এসে নেমেছে তলানিতে......... জানি না, কদিনের মধ্যে বৃষ্টি না হলে এখানকার মানুষ বাঁচবে কি করে?
মৃত্তিকা, তুমি নেই, বৃষ্টিও কি তাই আজ আমার কাছে অধরা?
ভিজে যাওয়া বাতাস মনটাকে বড় এলোমেলো করে দিচ্ছে, বৃষ্টির জলে মাধবীলতাও যেন আজ বড় চঞ্চল, ক্ষণে ক্ষণে জানলার কাচে তাই সে এঁকে যাচ্ছে নতুন ছবি, তুমি বলতে আবীর, এই ছবিগুলি নাকি অদৃশ্য শিল্পীর তুলির ছোঁওয়া - এক-একটা ছবি নাকি সুখ-দুঃখ বা হাসি-কান্নার এক-একটা গল্প।
ছবিগুলির বুকে জমে থাকা গল্পগুলি তুমি আজ আর খুঁজে বেড়াও না, তাই না আবীর?
ছোট বেলার মত রাজা রানীর গল্পে আজ আর চোখের পাতা দুটো এক হয় না, রাতে তাই ঘুম না আসলে চলে যাই হিণ্ডন নদীর পাড়ে, রাতের আঁধারে তখন নদীর শুকনো চরে নেমে আসে মৃগশিরা, শতভিষা, স্বাতী, রোহিণী, কৃত্তিকা, কালপুরুষ – কালের সব অতন্দ্র প্রহরীরা। দূর থেকে ওদের সাথে আমিও দেখি নদীর ওপারের বনে আগুনের উৎসব - বসন্তের সেই রাতে যে ভাবে আমাদের বিছানা বালিশ প্লাবিত হয়েছিল আশ্লেষের মাঝে - শুকনো পাতার ঘর্ষণে জ্বলে ওঠা দাবানলে শুখরা আর ছররা ঘাসের বনও সেভাবে নিজেরা পুড়ে যায় শুধু পুড়ে যাবে বলেই। মৃত্তিকা, মাধবীলতা তার বুকে বৃষ্টির ফোঁটাকে ডেকে নেয় নিজে ভিজে যাবে বলে - সেটা ওদের প্রেম – তেমনি শুকনো ঘাসও নিজের বুকে আগুনকে ডেকে নেয় নিজে পুড়ে যাবে বলেই - সেটাও কিন্তু ওদের ভালোবাসাই।
দূরে চলে যাওয়ার পর তোমায় যেন অনেক স্পষ্ট দেখতে পাই আবীর। চিঠি লেখা, সে তো, তোমার কাছেই শেখা, তুমি বলতে চিঠির মধ্যে দিয়ে আমরা একে অন্যকে এত আগল-হীন, স্পষ্ট এবং কাছাকাছি করে পেতে পারি যে তেমন করে মুখের কথাতেও কখনও পাই না। অল্প বয়সে মনে হতো সব কিছু বড় সহজে বুঝি, আলো হাতে থাকলে অন্ধকার দূর করা খুব সহজ, কিন্তু আজ বুঝি, অন্ধকার দূর করা অত সহজ নয়, একটা জোনাকিও আমার হাতের মুঠোতে নেই আজ, অন্ধকার তাই যেন আজ আমায় ঘিরে ধরেছে, পারবে আবীর, আরো একবার, একবার আলোর শিখাটা নিয়ে আমার কাছে এসে দাঁড়াতে?
ছেলেটি কিছুদিন আগে এসেছিল আমাদের গ্রামে, গ্রামের এক মাত্র যে গাছটায় সবুজ পাতা তখনও বেঁচে ছিল তার তলায় সে তার অস্থায়ী সংসার পেতেছিল, নিজে আর তার কাঁধের ঝোলা, এই ছিল তার সংসার, দিনের বেলা গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত ছেলেটি আর রাতের বেলায় সবাই ঘুমিয়ে পরলে ঝোলা থেকে বাঁশিটা বের করে বে-সুরে বাজাত।
একদিন দপ্তর থেকে ফেরার পথে দাঁড়িয়েছিলাম ওর কাছে। আমার চোখে চোখ রেখে সেদিন ও বলেছিল, 'আমি বারিশওয়ালা গো, বৃষ্টি এনে দেব তোমাদের।'
বৃষ্টিকে সাবধান করেছি একরাত
কেন এত ঝমঝম্
এত কেন বাঁধনহারা
কেন এত মেঘলা-ডাকাডাকি তার
ছাদশূন্য আকাশ
মাঠশূন্য ঘর
ভাসিয়ে দেবো একদিন তোমাদের সকলের নজরবন্দী সকাল.....
বৃষ্টির সেই সকালে ছেলেটির খোঁজে আমরা সবাই এসে দাঁড়িয়েছিলাম গাছ তলাতে। কিন্তু আমাদের আসার আগেই বারিশওয়ালা চলে গিয়েছিল আমাদের ছেড়ে, ঠিকানা না রেখে।
আর ছেলেটিকে দেখতে না পেয়ে সিধু বাইগার ক্ষয়িষ্ণু শরীরের মেয়েটা সেদিন ভিজতে ভিজতে নদী পাড় করে বনের মাঝে দৌড়ে গিয়েছিল তার খোঁজে।
আবীর, আমার জলছবি আঁকার তুলিটা হারিয়ে গিয়েছে, কবে আসবে তা ফেরত নিয়ে?
আমি বারিশওয়ালার ঠিকানাটা হারিয়ে ফেলেছি মৃত্তিকা।
মেয়েরা মাটিতে পা রেখে দাঁড়াতে ভালোবাসে
তবু তোমায় প্রতিদিন বুঝিয়ে চলেছি
নদীর ওপারে একটা ভালো জায়গা আছে'
সে কথা তুমিও জানো
আর সেই দ্বীপটার খোঁজে
তুমি এক মেঘ থেকে আরেক মেঘে ভেসে বেরাও
খামে ভরে আমি চিঠি লিখি
ভালোবাসার ওম খুঁজতে গিয়ে সে চিঠি তার শব্দ হারায়।
ছররা ঘাসের বনে সিধু বাইগার মেয়েটা সেদিন পুড়ে গিয়েছিল, নিজে পুড়ে যাবে বলেই।
কৃতজ্ঞতা স্বিকারঃ Shrabona Chakraborty, Arya)
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে আগস্ট, ২০১২ সকাল ৯:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


