শেক্সপীয়ার বলেছিলেন What's in a name। নামে কি আসে যায়৷ গোলাপকে গোলাপ না বলে অন্যকিছু বলে ডাকলে কি তার গন্ধের কোনো হেরফের হবে?
এর উত্তর দিয়েছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলি তাঁর পঞ্চতন্ত্র গ্রন্থে৷ বলেছিলেন গোলাপকে গোলাপ না বলে ঘেঁটু বলে ডাকলে তার সুগন্ধের কোনো হেরফের হয় না ঠিকই, কিন্তু ওই নামের জন্যেই কাব্যের সীমানা থেকে তার চিরনির্বাসন ঘটবে। 'ঘেঁটু' যে ফুলের নাম, তা যত সুন্দরই হোক, তাকে নিয়ে কাব্য রচনা করতে আগ্রহী হবেন না কোনো কবিই।
আসলে নাম শুধু একটা মানুষ বা প্রতিষ্ঠানের বিশেষ সম্বোধনবোধক শব্দই নয়, এই নামের সাথে জড়িয়ে থাকে অনেককিছু। ব্যক্তির নামের ক্ষেত্রে জড়িয়ে থাকে ব্যক্তিটির পিতামাতার আভিজাত্য, শিক্ষাগত যোগ্যতা, সাহিত্যানুরাগ, ধর্মপরিচয় ইত্যাদি৷ প্রতিষ্ঠানের নামের ক্ষেত্রেও এটা অনেকদূর সত্যি। নাম দিয়েই অনেকদূর আন্দাজ করা যায় একটা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বহুকিছু।
আগে একটু প্রতিষ্ঠানের দিকে নজর দেওয়া যাক৷ রাস্তার পাশের ভাতের হোটেলগুলোর নামগুলো খেয়াল করেছেন? দেখবেন এদের নাম হয় 'মা তারা হিন্দু হোটেল', 'বাবা বিশ্বনাথ হিন্দু হোটেল' ইত্যাদি। কিন্তু কখনো দেখেছেন কোনো পাঁচতারা হোটেলের নাম 'মা তারা' বা 'বাবা তারকনাথ' ? না, দেখেন নি। দেখবেন না। এটাই পার্থক্য। অথচ এইসব বড়ো বড়ো স্টার হোটেলগুলির মালিকরা কিন্তু কেউই নাস্তিক নয়, প্রায় সবাই-ই ঈশ্বরবিশ্বাসী। কিন্তু তবুও তাদের প্রতিষ্ঠানের নাম রাখার ক্ষেত্রে তারা এইধরনের 'মা কালী' বা 'বাবা তারকনাথ' মার্কা নাম রাখেন না। গ্রান্ড, তাজ, মৌর্য, ইত্যাদি সুন্দর সুন্দর ছোট্ট নাম রাখেন। যা থেকে তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও রুচিবোধের একটা আন্দাজ পাওয়া যায়।।
বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে আসুন। এখানেও দেখবেন নাম শুনেই বলে দেওয়া সম্ভব কোন স্কুল কোন মাধ্যম। বাংলামাধ্যম ও ইংরাজীমাধ্যম স্কুলগুলির নামের ক্ষেত্রে একটা সুস্পষ্ট পার্থক্য আছে। বাংলামাধ্যম স্কুলগুলির অধিকাংশ ক্ষেত্রে নাম হয় দেখবেন হয় জায়গার নাম অনুসারে (যেমন ঘোষপাড়া হাইস্কুল, পুবপাড়া হাইস্কুল, ডোমকল হাইস্কুল ইত্যাদি), আর নয়তো প্রাচীন কিছু ব্যক্তির নাম অনুসারে (যেমন পাঁচুবালা দাসী বালিকা বিদ্যালয়, মোক্ষদারানী দাসী বালিকা বিদ্যালয়, অক্ষয়চরণ পাল বালক বিদ্যালয়, হরিপদ কর্মকার আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় ইত্যাদি। এগুলো সবগুলোই কাল্পনিক নাম, এখন বানালাম। কিন্তু এদের নামগুলো সাধারণত এরকমই হয়)৷ তুলনামূলকভাবে ইংরাজীমাধ্যম বিদ্যালয়গুলির দেখবেন একটা সুন্দর নাম থাকে, যেমন ডলফিন, লিটল এঞ্জেল, কিডজি, অ্যাবাকাস ইত্যাদি৷ কিছুকিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম থাকে অবশ্যই, যেমন কাঁচরাপাড়া হাই স্কুল বা সতীশচন্দ্র মেমোরিয়াল স্কুল। নাম শুনে বাংলা মাধ্যম স্কুল বলে মনে হলেও দুটোই খাঁটি ইংরাজীমাধ্যম স্কুল। কনভেন্ট বা ICSE স্কুলগুলিও অনেকসময়ই কোনো খ্রীষ্টান সাধুসন্তদের নাম অনুসারে হয়, যেমন লা মার্টিনিয়ার, সেন্ট স্টিফেনস, সেন্ট ফ্রান্সিস ইত্যাদি। তবে এগুলি ব্যতিক্রম। তুলনামূলকভাবে CBSE স্কুলগুলির ক্ষেত্রে নামের আধুনিকতা চোখে পড়ে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক নাম থেকে এরা অনেকটা বেরিয়ে আসতে পেরেছে। যাইহোক, মোটকথা, স্কুলের নামের ক্ষেত্রেও 'মাধ্যম' একটা ফ্যাক্টর৷ 'পাঁচুবালা দাসী' যেমন কোনো ইংরাজী মাধ্যম স্কুলের নাম হবে না কোনোদিন, তেমনি 'লিটল এঞ্জেল' বা 'সেন্ট জোসেফ' বা 'কিডজি' জাতীয় নামের স্কুল বাংলাধ্যমের হবে না কোনোদিন৷ না, আমি কোনো মাধ্যমের স্কুলকেই ছোট বা বড়ো করছি না৷ শুধু যেটা বাস্তব ঘটনা সেটা তুলে ধরতে চাইছি শুধু।
সবচেয়ে কৌতুহলকর ও বৈচিত্রময় হচ্ছে মানুষের নাম। কত ধরনের যে নাম চোখে পড়ে, কত ধরনের তথ্য যে একটি ব্যক্তির নামের ক্ষেত্রে লুকিয়ে থাকে, তা খেয়াল না করলে আপনি বুঝতে পারবেন না। ব্যক্তির নাম অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড, বাবা মায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা, রুচিবোধ, সাহিত্যবোধের পরিচয় বহন করে। ধরা যাক দুজন ডাক্তার, দুজনের ডিগ্রী একই। একজনের নাম ঘনশ্যাম দাস, আরেকজনের নাম সৌম্যদীপ ব্যানার্জী৷ এক্ষেত্রে স্রেফ নাম থেকেই দুজনের পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ডের একটা মোটামুটি আন্দাজ করে নেওয়া যায়। ধরেই নেওয়া যায় ঘনশ্যাম নামের ডাক্তারবাবু উঠে এসেছেন নিম্নবিত্ত বা অল্পশিক্ষিত পরিবার থেকে, আর সৌম্যদীপ নামের ডাক্তারবাবুটি উঠে এসেছেন শিক্ষিত স্বচ্ছল পরিবার থেকে। কারণ বর্তমান যুগের শিক্ষিত বাবা মায়েরা কখনই তাদের সন্তানদের নাম ঘনশ্যাম, কালীপদ ইত্যাদি রাখবেন না। অরিত্র, অনুভব, সৌপর্ণ, সৌম্যদীপ, অঙ্কুর, প্রবাহ, ইত্যাদি জাতীয় কিছু একটা রাখবেন। এবং এটাও খেয়াল করবেন, এইসব ঘনশ্যাম বা গোবিন্দ জাতীয় নামের মালিকরা পরবর্তীকালে উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত হলেও কিন্তু নাম নিয়ে একটা হীনমন্যতা এদের মধ্যে রয়ে যায়। বুঝতে পারেন এদের নামগুলি ঠিক শিক্ষিত সমাজে পাতে দেবার মতো নয় (আমি বলছি না এটা হওয়া উচিত)। এবং এইকারণে নামগুলির শর্টফর্ম ব্যবহার করতেই এরা বেশী পছন্দ করেন তখন৷ তাই ডাঃ ঘনশ্যাম দাস হয়ে যান ডাঃ জি.এস দাস এবং ডাঃ গোবিন্দ বসাক হয়ে যান ডাঃ জি বসাক। আমার পেশাগত জীবনে প্রথম যে স্কুলে যোগ দিয়েছিলাম সেই স্কুলের সেক্রেটারি ছিলেন প্রফেসর এইচ.কে মন্ডল। ভদ্রলোকের আসল নাম যে 'হরেকৃষ্ণ মন্ডল' সেটা জানতে পারি অনেক পরে। সম্ভবত নাম নিয়ে হীনমন্যতার কারণেই ভদ্রলোক নিজের পুরো নাম বলতেন না কাউকে। এভাবেই ব্যক্তির নাম তার পিতামাতার শিক্ষাগত যোগ্যতা, রুচিবোধ, ধর্মবিশ্বাসকে তুলে ধরে। হরিহর, পাঁচুগোপাল, শক্তিপদ, কালীপদ, হরিপদ, বনমালী, পঞ্চানন, রাধাগোবিন্দ, তারকনাথ জাতীয় নামগুলি রাখা হয় তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়া, অল্পশিক্ষিত পরিবারে। আবার সৌম্যদীপ, সৌপর্ণ, তথাগত, আরণ্যক, শরণ্যা, পামেলা, লিজা, বিদিশা, মেঘাদৃতা, ঐশ্বর্য জাতীয় নামের অধিকারীদের বাবা মায়েরা যে তুলনামূলকভাবে শিক্ষিতা ও আলোকপ্রাপ্তা তা স্রেফ তাদের নাম থেকেই আন্দাজ করে নেওয়া সম্ভব। এরজন্য আলাদা করে শার্লক হোমস হবার দরকার হয় না।
একটা সময় শিক্ষিত বাঙালীদের মধ্যে ভারী ভারী যুক্তাক্ষরযুক্ত শব্দ দিয়ে নাম রাখার একটা চল ছিলো। আর অল্পশিক্ষিতদের মধ্যে চল ছিলো যুক্তাক্ষরবর্জিত ও ঠাকুর দেবতার নাম দিয়ে নাম রাখার। ক্ষীরোদারঞ্জন, অক্ষয়চরণ, রাঘবেন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ইত্যাদি জাতীয় নামগুলির মালিকরা হতেন সাধারণত উচ্চবিত্ত ও ভৌমিক অভিজাত পরিবারের সন্তানরা। আবার সাধারণ গরীব মানুষরা নাম রাখতেন এমনভাবে যা উচ্চারণ করতে সহজ, এবং যাতে সন্তানসন্ততিদের ডাকতে গিয়ে একইসাথে একটু ভগবানের নামও করা হয়ে যায়। তাই এদের নামগুলি হতো বিষ্ণুপদ, উমাপদ, তারকনাথ, কালীচরণ, দূর্গাচরণ, পঞ্চানন জাতীয়। কখনো কখনো এককড়ি, দুকড়ি ইত্যাদিও হতো, যা পূর্ববর্তী কোনো সন্তানের মৃত্যুকে ইঙ্গিত করতো৷ শুধু পুরুষদের নয়, মহিলাদের নামের ক্ষেত্রেও এই সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য চোখে পড়ে। উচ্চবিত্ত পরিবারের মহিলাদের নাম রাখা হতো মোক্ষদা, ক্ষেমদা, হেমপ্রভা, ক্ষণপ্রভা, বিদ্যুল্লতা, পুণ্যপ্রভা ইত্যাদি। অন্যদিকে নিম্নবিত্তেরা তাদের বাড়ির মেয়েদের নাম রাখতেন লতা, সরলা, তরলা, মনোরমা, আশালতা জাতীয়। এখনও মফস্বল বা গ্রামের দিকে এইসব সরলা, মনোরমা, উমাপতি, কৃষ্ণপদ জাতীয় নাম শোনা যায় বটে, বা শহরের দিকে গৃহকর্মে সাহায্যকারিনী মহিলাদের নাম এখনও লতা, আশা, উমা, নমিতা জাতীয় হয় বটে, কিন্তু শিক্ষিত নাগরিক সমাজ থেকে এইসব নামগুলি অনেকদিন আগেই বিদায় নিয়েছে। বিশেষ করে ৭০ এর দশকের পরবর্তীকালে ধর্মনিরপেক্ষ নাম রাখার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়৷ উমাপদ বা দূর্গা জাতীয় নামগুলির বদলে অরণ্য, আকাশ, দীপ, অস্তরাগ, সৃজনী, রশ্মিতা ইত্যাদি সুন্দর সুন্দর সাহত্যিগুনসম্পন্ন নামগুলি সেইসময় থেকেই জায়গা করে নিতে থাকে শিক্ষিত বাঙালী সমাজে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় আমি গত দশ বছর ইংরাজী মাধ্যম বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে গিয়ে কোনোদিনই সরলা, মনোরমা বা কালীপদ, উমাপদ জাতীয় নাম কোনো ছাত্রছাত্রীর দেখিনি৷ এটাই স্বাভাবিক, কারণ এইসব স্কুলগুলিতে তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছল ও শিক্ষিত পরিবারের সন্তানরা আসেন। ফলে তাদের নামের মধ্যেও সেটা প্রতিফলিত হয়। কিন্তু বি.এড করতে গিয়ে ঠাকুরনগরের একটি বাংলামাধ্যম স্কুলে প্র্যাকটিস টিচিং করার সময় এইধরনের উমাপদ, সরলা জাতীয় নামের প্রচুর ছেলেমেয়ের সংস্পর্শে এসেছিলাম। এইপ্রসঙ্গে উল্লেখ্য, বাঙালীরা বেরিয়ে আসলেও অবাঙালী মেড়ো গুজ্জুরা কিন্তু ধর্মকেন্দ্রিক নাম রাখার প্রবণতা থেকে খুব বেশী বেরোতে পারে নি এখনও৷ খেয়াল করলে দেখবেন এদের পরিবারের মেয়েদের নামগুলো এখনও হয় মূলত পূজা, সাধনা, উপাসনা, আরাধনা ইত্যাদি জাতীয়৷
তাই, নাম শুধু নাম নয়, নাম একটি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কে অনেক লুকানো তথ্যের আধার। এবার থেকে নতুন কোনো ব্যক্তির সাথে পরিচয় হলে তার নাম থেকে তার সম্পর্কে আন্দাজ করতে চেষ্টা করুন, দেখবেন ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য বাদ দিয়ে (অর্থাৎ তিনি সৎ বা অসৎ, উচ্চবিত্ত না নিম্নবিত্ত, শিক্ষিত না অশিক্ষিত) অনান্য অনেককিছুই আন্দাজ পাওয়া সম্ভব হচ্ছে শুধুমাত্র তার নামটি থেকেই। নাম আসলে ডিএনএ-র মতই, ঠিকমতো ডিকোড করতে পারলে যা থেকে অনেক কিছু আন্দাজ করা সম্ভব।
(ভারতের পঃবঙ্গের প্রেক্ষিতে লেখা।)
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুন, ২০১৯ রাত ১২:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



