somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রম্য : লকডাউন ও আমার পরকীয়া

২০ শে জুন, ২০২০ বিকাল ৪:৩৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বস বললেন ওনার স্ত্রীকে টাটানগরে পৌঁছে দিয়ে আসতে। লকডাউন আছে তাই গাড়িতে পাঠাতে পারছেন না।লকডাউন স্পেশাল ট্রেন চলছে। ওই ট্রেনে করে পৌঁছে দিতে হবে। টাটানগর স্টেশনে ওনার বাপের বাড়ির লোক থাকবে। তাই স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে আমি আবার ফিরে আসতে পারব।
.
ট্রেনে যখন বসলাম তখন ট্রেন ফাঁকা। পাশাপাশিই বসতে হল। ম্যাডাম বেশ গম্ভীর। হাসা দূরের কথা একটা কথাও বলেননি।
ট্রেন যখন ছাড়ল তখন ট্রেনে বেশ ভিড় হয়ে গেছে।
হঠাৎ দেখি দুটো রো আগে পিটু বসে আছে। পিটুকে দেখেই আমার হৃৎপিণ্ডটা ধক ধক করে জোরসে দৌড়াতে লাগল।
পিটু একটা কথা বলার মেশিন। পৃথিবীতে যদি বেশি এবং একটানা কথা বলার কোনও প্রতিযোগিতা থাকে ওর ফার্স্ট প্রাইজ বাঁধা।
আমি মনে মনে বললাম, "হে ভগবান পিটু যেন আমায় দেখতে না পায়!"
.
কিন্তু ভগবান খুব কমই আমার কথা শোনে, আজও শুনল না!
হঠাৎ পিটু আমাকে ট্রেনের মধ্যে আবিষ্কার করে হট্টগোল শুরু করে দিল, "আরে তুই? বউদিও আছে দেখছি? একদম চিনতে পারিনি বউদিকে! মাইরি বলছি। কী চেঞ্জ! সবই বিউটিশিয়ানের কৃপা! কী বলিস? বউদির কত লম্বা চুল ছিল! বউদির চুল দেখলেই ওই কবিতার লাইনটা মনে পড়ত, চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা... এক মাথা চুল সব কেটে ফেলে বয়েজ কাট্ করে দিলেন বউদি? যাই বলুন বউদি, বড় চুলেই আপনাকে ফ্যান্টা লাগত। এখন কেমন যেন লাগছে! আর গায়ের রঙটাও পুড়ে গেছে। সে যাইহোক এটা অবশ্য বলতেই হবে যে এখন বউদিকে খুব মডার্ন লাগছে! কী রে তোর মুখে কোনও কথা নেই যে! মুখ ঘুরিয়ে বসে আছিস কেন?"
.
ম্যাডামের হ্যান্ড-ব্যাগে থাকা ফোন বেজে যাচ্ছে। ম্যাডাম এত রেগে গেছেন যে ফোন ধরছেন না।
আমি পিটুর দিকে তাকিয়ে কাঁচুমাচু হয়ে বললাম, "একটু চুপ কর প্লিজ!"
পিটু শুনতে পেল না বা শুনতে পেলেও গ্রাহ্য করল না।
চেঁচিয়েই বলল, "বউদিকে নিয়ে ঘাটশীলা যাবি নাকি রে? ওখানে আমার চেনা একটা ভাল হোটেল আছে। ওই হোটেলে উঠতে পারিস। কালই বোধহয় পূর্ণিমা। রাত্রে ডিনারের পর সুবর্ণরেখার তীরে দুজনে বসে থাকিস। উফফ্ জ্যোৎস্নার আলোয় প্রেমের কেমন জোয়ার এসে যায় দেখিস! তুই যদি বলিস আমি হোটেলে ফোন করে দিচ্ছি। তুই আমার বন্ধু, তাই ডিসকাউন্টও দেবে!"
আমি দেখলাম মিসেস বসের মুখ ডবল গম্ভীর হয়ে গেছে।
ম্যাডাম ব্যাগ থেকে বোতল বের করে জল খেলেন। আমারও গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। একটু জল পেলে ভাল হত!
.
কিন্তু এখন আমার প্রধান কাজ হল পিটুকে থামানো। নইলে চাকরি 'ঘচাং ফু' হয়ে যাবে।
জোরে বললাম, "ঘাটশীলা নয় টাটানগর যাব।"
পিটু বলল, "তাহলে ওখান থেকে ডিমনা লেক-টেকগুলো তো দেখবিই আর হাতে একটু সময় নিয়ে দলমা স্যাংচুয়ারিতে চলে যাস। দারুণ জায়গা। দুজনে খুব এঞ্জয় করবি। বউদি সিওর যাবেন কিন্তু। আরে বউদি স্পিকটি নট যে! বন্ধুর সঙ্গে ঝগড়া-টগড়া হয়নি তো? মান-অভিমানের পালা চলছে নাকি?"
আমি ঠোঁটে আঙুল রেখে ইশারায় পিটুকে চুপ করতে বললাম।
পিটু বলল, "এই জন্যই শালা বিয়ে করিনি বুঝলি। চুপ করে, শান্তশিষ্ট পত্নীনিষ্ঠ ভদ্রলোক হয়ে থাকতে পারব না বাপু। কী বউদি আপনার হাসব্যান্ডের বন্ধুর কথায় রাগ করলেন নাকি?"
.
ম্যাডামের ফোন আবার বাজছে কিন্তু ম্যাডাম ধরছেন না। তাঁর মেজাজ কী পরিমাণ উত্তপ্ত হয়েছে এতেই বোঝা যাচ্ছে।
মিসেস বস যে কোনও সময় আমার গালে একটা থাপ্পড় কষিয়ে দিলে আশ্চর্যের কিছু নেই।
.
আমি গলা উঁচিয়ে বললাম, "উনি আমার বউ নয়। তুই ভুল করছিস। আর আজেবাজে বকছিস।"
কামরায় উপস্থিত বসে থাকা দাঁড়িয়ে থাকা জনগণ আমার দিকে তাকাল বড় বড় চোখ করে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বা বসে বসে 'বোর' হয়ে যাওয়া লোকজন রসের গন্ধ পেয়ে নড়ে চড়ে উঠল।
পিটু থমকে গেল। আমি ভাবলাম যাক বাঁচা গেল! চাকরির কী হবে জানি না কিন্তু মহিলার হাতে মার খাওয়া থেকে এ যাত্রায় বেঁচে যেতেও পারি।
.
আমার ফোন বেজে উঠল। বসের ফোন। বললেন, "সব ঠিক আছে তো? আমি দু তিনবার ফোন করলাম, অলি মানে আমার মিসেস ধরল না তাই আপনাকে করছি। বসার জায়গা-টায়গা পেয়েছেন তো?"
আমি বললাম, "হ্যাঁ স্যার সব ঠিক আছে। আপনি একদম চিন্তা করবেন না।"
ম্যাডাম আমার দিকে ফিরেও তাকালেন না, তিনি এক মনে জানলার বাইরের দৃশ্য দেখতে লাগলেন।
.
কয়েক মিনিট পরে পিটু আবার মুখ খুলল। বলল, "মনটা খারাপ হয়ে গেল রে। বিশ্বাস কর তোকে আমি অন্য রকম ভাবতাম। ভাবতাম খুব ভাল ছেলে তুই। তুইও শালা... ছিঃ! বউদির জন্যই খুব খারাপ লাগছে! বহুদিন যাইনি তোদের বাড়ি, কালই যাব, বউদির সঙ্গে দেখা করতে হবে!"
তারপর কামরার দেওয়ালকে শুনিয়ে জোরে জোরে বলল, "কী পরকীয়ার জোয়ার এল রে বাবা! আবার কোর্ট নাকি বলেছে পরকীয়া বৈধ! ব্যাস লেগে পড়ো বন্ধুগণ, আর কী!"
.
সর্বনাশ! পিটু কি ভেবেছে আমি অন্য কারুর বউকে নিয়ে বেড়াতে যাচ্ছি? এ তো কেলেঙ্কারির একশেষ! কম্পার্টমেন্টের সবাই কেচ্ছার গন্ধ পেয়ে আমাদেরকে দেখছে! মিসেস বস একবার আমার দিকে তাকাতেই আমার শরীরের রক্ত শুকিয়ে গেল! যা বুঝলাম চাকরি তো যাবেই তার সঙ্গে জেলখানার ভাতও না খেতে হয়। এতো অপমান কোনও ভদ্রমহিলার পক্ষে, আবার সে যদি হয় বসের বউ, মুখ বুজে মেনে নেওয়া অসম্ভব।
টাটানগরে পৌঁছেই একটা ফোন হবে ব্যাস! আমার রাহুর-দশা, শনির-দশা, কালসর্প যোগ সব একসঙ্গে শুরু হয়ে যাবে।
.
.
এইসময় আবার আমার ফোন বেজে উঠল। বসের ফোন।
উদ্বিগ্ন গলায় বস বললেন, "একটা জরুরি কারণে আপনাকে ফোন করছি। আমার মিসেস, কানের একটা জটিল অসুখে ভুগছে। এটা আপনাকে বলা হয়নি। ও হিয়ারিং এইড ছাড়া কিচ্ছু শুনতে পায় না। আর এক্ষুনি কাজের মেয়ের থেকে জানতে পারলাম শোনার যন্ত্রটা পরে যেতে ভুলে গেছে। এইজন্যই আমার ফোন বেজে গেছে ও ধরেনি। ইন ফ্যাক্ট শুনতে পেলে তো ধরবে! আপনি কিন্তু ওকে চোখে চোখে রাখবেন। টাটানগর স্টেশনে ওর ভাইয়ের কাছে সাবধানে পৌঁছে দেবেন তাহলেই আপনার কাজ শেষ।"
.
কিচ্ছু শুনতে পায় না! কীয়ানন্দ! জ্বর দিয়ে ঘাম ছাড়ল!
হ্যাঁ জানি জানি, খুশির চোটে শব্দ এদিক ওদিক হয়ে গেছে...
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে জুন, ২০২০ বিকাল ৪:৪২
২৫টি মন্তব্য ২৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

"সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী চৌতালী রায়ের অজ্ঞতা না ধৃষ্টতা ?"

লিখেছেন আরািফন, ২০ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৯

একজন আইনজীবী হয়েও সে যেভাবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করে আলাদা প্রদেশ গঠনের হুঁশিয়ারি দেখিয়েছেন,তা দেশের প্রচলিত আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
অধিকার আদায়ের আন্দোলনের নামে দেশের মানচিত্র খণ্ডিত করার হুমকি কোন নাগরিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভালো লাগে

লিখেছেন আরমান আরজু, ২০ শে জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৮

এরা কারা, কী এদের পরিচয়?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২১ শে জুন, ২০২৬ রাত ১:৪৮


যা আশঙ্কা করা হয়েছিল, ঠিক তাই ঘটছে। ‘আজাদ পার্টি’ নামের একটি নতুন ভূঁইফোড় রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে গতকাল ভারতীয় দূতাবাস অভিমুখে যে মিছিল এবং ঘেরাও কর্মসূচি করা হলো, তা কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ বিশ্ব বাবা দিবস।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ২১ শে জুন, ২০২৬ ভোর ৫:৩৬

বাবা: নীরব ত্যাগের এক অনন্ত মহাকাব্য।
========================
আজ বিশ্ব বাবা দিবস। আমাদের দেশে মা দিবস যতটা জাঁকজমক ও আবেগের সঙ্গে পালিত হয়, বাবা দিবস ততটা আলোচনায় আসে না। অথচ একজন সন্তানের জীবনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

৫০১ নাম্বার রুম কি বিজয় নাকি লাম্পট্যর সাক্ষী।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ২১ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:২৮





মাওলানা মামুনুল হক নামের হেফাজত ইসলামের এক নেতা তার ফেসবুক ওয়ালে দীর্ঘ একটি পোস্ট লিখেছেন। তার এই পোস্টটি এক অদ্ভুত রসাত্মক ট্র্যাজেডি।

লেখাটি পড়লে মনে হয়, তিনি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×