somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রাম

২২ শে জানুয়ারি, ২০২৪ রাত ১২:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাংলার রাম, বাঙালির রাম.....

পুরো ভারতে সাজোসাজো রব, ইক্ষ্বাকু বংশের মহারাজা অজের প্রপৌত্রের রাজ্যাভিষেক হবে। পুরো শহর রাজপ্রাসাদ আলোতে সাজানো, ছেলেটিও মানসিকভাবে প্রস্তুত রাজ সিংহাসনে আরোহন করার জন্য এরকম সময় এক দূত এসে জানাল, দাদা আপনাকে এই মুহূর্তে বনবাসে যেতে হবে রাজ্য ত্যাগ করে। প্রায় একরাতে নোটিশে রাজ্য-রাজত্ব নিজের পরিচয় ছেড়ে এক কাপড়ে স্ত্রী ও ভাইকে নিয়ে রাস্তায় নেমে এলেন যুবক, হাঁটা লাগালেন, ভোরের আলো ফোটার আগেই রাজ্যসীমা ছাড়াতে হবে যে৷ যুবকের নাম? শ্রী রামচন্দ্র। কি কিছু মিল পেলেন?
নোয়াখালি/কুমিল্লা কিংবা এরকমই কোথাও জমিদার বাড়ির বড় ছেলে ডাক্তারি পাশ করেছে কয়েকদিনের মধ্যেই তার বিয়ে। সে জন্য পুরো জমিদার বাড়ি সেজে উঠেছে পুরো আলোয় আলোয়, গ্রামেও খুশির জোয়ার৷ হঠাৎ এক দূত এসে খবর দিল,
- দাদা আজ ভোর রাতেই ওরা আসবে, যা করার এখনই করেন, সইরা পড়েন!
যে ছেলেটির সামনে সুন্দর ভবিষ্যত ছিল, যে ছেলেটি স্বপ্ন সাজানো শুরু করেছিল সবে মাত্র, সে রাতের অন্ধকারে এক কাপড়ে হবু স্ত্রী, ভাই, পরিবার পরিজনদের সঙ্গে বেরিয়ে এল রাস্তায় তারপর হাঁটতে থাকল ততক্ষণ যতক্ষণ না রাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়ে যায়!
রাতারাতি বনবাসের যন্ত্রণা বাঙালিদের মতো করে সারা ভারতে আর কারা বুঝতে পারবে? রামকে সারা ভারতে বাঙালির থেকে আর ভালো কে অনুভব করবে? রাম সারা ভারতে বাঙালির চেয়ে আর বেশি কার?
যে দিন অযোধ্যা থেকে রাজত্ব ছেড়ে বনবাসে বেরিয়েছিলেন দশরথের বড় ছেলেটি সেদিন তাঁর পরিচয় ছিল দশরথ তনয়, বনবাসে এসে প্রতিপদে যাকে লড়াই করতে হয়েছিল একমুঠো খাবারের জন্য, স্ত্রীকে রক্ষা করার জন্য৷ কখনও পরস্ত্রী এসে প্রলোভন দিয়েছে বিপথগামী হওয়ার কখনও কুচক্রীরা এসে হরণ করেছে স্ত্রীকে৷ সে সময় সারা দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজবংশ ইক্ষ্বাকু বংশের জ্যোষ্ঠপুত্রকে সাহায্য করতে প্রস্তুত ছিল সারা ভারতের রাজারা। কিন্তু না, বনবাসী রাম বাকল পরেছেন, জল কাদা, জঙ্গলে কাঁচা বাড়ি বানিয়ে থেকেছেন, বনের উপজাতিদের সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলেছেন ব্রাহ্মণ্যবাদী রাবণের বিরুদ্ধে, আদিবাসী সবরীর এঁটো কুল খেয়ে জাতিবাদের বিরুদ্ধে খড়্গ ধরেছেন। একদিন বনবাসী হয়ে রাজ্য ত্যাগ করেছিলেন ১৪ বছর পর ফিরেছেন মর্যাদা পুরুষোত্তম রাম হয়ে৷
ঠিক যেন মরিচঝাঁপি কিংবা ওড়িশার জঙ্গল, জল কাদায় খড় বাঁশের ঘরে আশ্রয় নিয়ে লড়াই করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা কোন বাঙালি ছেলে। রাম তো শুরু থেকেই বাঙালি জীবনের অংশ। রামের লড়াইকে তো বারবার পাথেয় করেছে বাংলা।
মহাপরাক্রমশালী রাবন, যার বিরুদ্ধে সে সময় সারা ভারতে অস্ত্র ধরতেও ভয় পেত, সেই রাবনের বিরুদ্ধে স্বশস্ত্র আন্দোলন করার পর বিভীষণ যখন সোনার লঙ্কাতে কিছুদিন কাটানোর কথা বলছেন তখন শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় শ্রীরাম বলছেন,
জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপী গরীয়সী।
এ যেন দেশ থেকে হাজার কিলোমিটার দূরে গিয়ে দোর্দণ্ডপ্রতাপ ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে হিটলারের পাশে বসে জানিয়ে আসা, 'যা করছি দেশের জন্য, যা করছি জন্মভূমির জন্য।'
এ যেন, নোবেল পেয়ে দেশে ফিরে এসে শান্তিনিকেতন গড়ে তোলা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা শিকাগো জিতে দেশে ফিরে আসা স্বামী বিবেকানন্দের জীবন শৈলী, জন্মভূমির চেয়ে বড় আর কী? এভাবেই তো রামের জীবনশৈলী বরাবর সাধারণ হিন্দু বাঙালির জীবন জুড়ে প্রবাহিত হয়েছে৷
রাম কোনও মহাকাশের ঈশ্বর নন, রাম কোনও কল্পনা পুরুষও নন, না রাম উত্তরভারতের ৷ অসুস্থ বাবার চিকিৎসার জন্য WBCS -এর প্রস্তুতি ছেড়ে প্রাইভেট ফার্ম কিংবা টিউশানিতে যোগ দিচ্ছে যে বাঙালি ছেলেটি, ভাইকে পড়াবে বলে নিজের স্বাচ্ছন্দ্যে কাঁচি চালাচ্ছে যে বাঙালি যুবক৷ স্কুলের প্রেমিকাকে স্ত্রী হিসেবে নিজের কাছে পেতে বছরের পর বছর ধরে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছে যে বাঙালি যুবক সেই তো রাম৷ রাম আলাদা কোনও গ্রহান্তরের মানুষ নন, রাম এক ভারতীয় আদর্শ, যা প্রতিটি ভারতীয়ের মতোই বাঙালি সমাজ জীবনযাপনে মিশে রয়েছে, যতদিন আমাদের জীবনে শ্রীরাম রয়েছেন ততদিন আমাদের জীবন রামায়ণের মতো গতিশীল, মৃত্যুহীন, কালজয়ী৷ রাম সরলেই ব্যস...
আজ সারা দেশ জুড়ে এক শ্রেণির মানুষ রামকে, রামের সংস্কার ও সংস্কৃতিকে বিপক্ষে দাঁড় করানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। কেন জানেন? কারণ রাম হচ্ছে সেই DNA যার মধ্যে ভারতীয় সভ্যতার সমস্ত কোড সাজানো আছে৷ যা এত বছর পরেও নতুনদের মধ্যে ভারতীয় সংস্কৃতির বীজ বুনে চলেছে৷ রাম এমন এক নাম যা সারা ভারতকে এক সূত্রে বাঁধে৷ রাম নামের DNA টিকে ভাঙতে পারলেই ভারতীয় সভ্যতা ও একতাকে ভাঙা সহজ হবে, এটা ওরা জানে৷ সেটার চেষ্টা হচ্ছে সব রকমভাবে, রাবন মারা গিয়েছে, কিন্তু রাবনের DNA তো এখনও শেষ হয়নি!
কৃত্তিবাস ওঝা ছাড়ুন, বিজেপি, আরএসএস ছাড়ুন। বাংলার হৃদয়ে রাম এমনভাবে মিশে রয়েছেন যে খোদ কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন,
নব দূর্বাদল-শ্যাম জপ মন নাম শ্রীরঘুপতি রাম।
সুরাসুর কিন্নর যোগী মুনি ঋষি নর,
চরাচর যে নাম জপে অবিরাম॥
সজল-জলদ-নীল নব-ঘন-কান্তি
নয়নে করুণা, আননে প্রশান্তি
নাম শরণে টুটে শোক-তাপ-শ্রান্তি
রূপ নেহারি মূরছিত কোটি কাম॥

(লিখেছেন শেখর ভারতীয়।)
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে জানুয়ারি, ২০২৪ রাত ১২:১৭
৯টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

"তোমরা জানাযা করে দ্রুত লাশ দাফন কর।"

লিখেছেন এমএলজি, ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ সকাল ৭:৩০

রাসূল (সাঃ) বলেছেন, "তোমরা জানাযা করে দ্রুত লাশ দাফন কর।" বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনায় এ কাজটি করা হয়নি বলে বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যাচ্ছে।

বিষয়টি সত্য কিনা তা তদন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্যক্তি বেগম খালেদা জিয়া কেমন ছিলেন?

লিখেছেন নতুন নকিব, ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ দুপুর ১২:০৪

ব্যক্তি বেগম খালেদা জিয়া কেমন ছিলেন?

ইয়াতিমদের সাথে ইফতার অনুষ্ঠানে বেগম খালেদা জিয়া, ছবি https://www.risingbd.com/ থেকে সংগৃহিত।

তিন-তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, শুধু প্রধানমন্ত্রী নন, সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্ত্রীও তিনি। তাকেই তার বৈধ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বছরশেষের ভাবনা

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ দুপুর ১২:৪৮


এসএসসি পাস করে তখন একাদশ শ্রেণিতে উঠেছি। সেই সময়ে, এখন গাজায় যেমন ইসরাইল গণহত্যা চালাচ্ছে, তখন বসনিয়া নামে ইউরোপের ছোট একটা দেশে এরকম এক গণহত্যা চলছিল। গাজার গণহত্যার সাথে... ...বাকিটুকু পড়ুন

উৎসর্গ : জাতীয় নাগরিক পার্টি (NCP)

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ বিকাল ৫:৩৮



খিচুড়ি

হাঁস ছিল, সজারু, (ব্যাকরণ মানি না),
হয়ে গেল “হাঁসজারু” কেমনে তা জানি না।
বক কহে কচ্ছপে—“বাহবা কি ফুর্তি!
অতি খাসা আমাদের বকচ্ছপ মূর্তি।”
টিয়ামুখো গিরগিটি মনে ভারি শঙ্কা—
পোকা ছেড়ে শেষে কিগো খাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

খালেদা জিয়ার জানাজা

লিখেছেন অপু তানভীর, ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ রাত ১১:৩৯

আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন আমার নানীর বোন মারা যান। নানীর বোন তখন নানাবাড়ি বেড়াতে এসেছিলেন। সেইবারই আমি প্রথম কোনো মৃতদেহ সরাসরি দেখেছিলাম। রাতের বেলা যখন লাশ নিয়ে গ্রামের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×