1.
আমার ভেতর যে প্রপেলার তোমার হাত ছুঁয়ে ফিরে আসে গ্রামীণ আশ্বাসে_ তা নিছক নাগরিক। দিন বদলের চেষ্টায় মরিয়া বাংলালিংক কোনো অবস্থাতেই ওপরে ওঠার সিঁড়ি নয়। তবু দেশের কোটি মানুষের হাতে এখন সেলফোন! আমরা এখন মিথ্যা বলা সেলফোন যুগে বাস করছি। যদিও এখন চলছে অবাধ তথ্য প্রবাহের যুগ, তথ্য কী মিথ্যার বেসাতি নয়? এ প্রশ্নেও হিমসিম খাই আমি।
পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে সেলফোন বন্ধ রাখা অভদ্রতা। আর দেশে মোবাইল অফ যেন বেনিফিট অফ ডাউট। সন্দেহ নেই, সেলফোন আপনার নিঃসঙ্গতা কেঁড়ে নিচ্ছে, বাড়াচ্ছে মিথ্যে বলার অভ্যাস। অবশ্য এর একটা ইতিবাচক দিকও রয়েছে, মিথ্যা মানুষের কল্পনা বাড়ায়। সেলফোনের মিথ্যাচারে যদি কেউ কল্পনাপ্রবণ কবি হয়ে উঠেন, তবে তি সেই। তি অন্যখানে, কল্পনার তোড়ে যোগ্যতা অগ্রাহ্য করে যদি কেউ মহাকবি (!) সেজে বসে!
তবে সে ভয় নেই। মাঝি আপাতত এই সেলফোন কালচারের বাইরেই আছে। ভোলার চরফ্যাশনের কবি ইমরান মাঝি। তাই বলে আত্মভোলা নয় মোটেই। কবিতাগুলো পড়লে সেই ভোলার চরের ফুটেজ দেখতে পারবেন চোখের সামনে, আরো আছে কাহিনী ও ইনফরমেশন। সমপ্রতি প্রকাশিত হলো ইমরান মাঝির প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'দুধভাই'। ওর কবিতায় বিমূর্ততার লেশমাত্র নেই, অথচ বিমূর্ত প্রচ্ছদের কোনো কার্যকারণ আবিস্কার করতে পারিনি আমি।
2.
2000 সালের কথা। আমরা এক রাস্তা ধরেই হাঁটতাম। আমরা মানে আমি, ইমরান মাঝি ও চাঁদ। মেইনরোডে গতিময় ট্রাক দেখে যখন আমি 'মেইনরোডে এশা একা'য় বুঁদ_ তখন মাঝি শ্রমের বিবর্তন দেখছে। পৌষের রিক্সাগুলোকে তার পালতোলা নৌকা মনে হচ্ছে। ইমরান মাঝির কবিতায় যখন তার গ্রামীণ দৃশ্যপট ঘুরপাক খাচ্ছে, তখন আমি নগর থেকে নরক অবধি দার্শনিক অনুষঙ্গ হাতড়ে বেড়াচ্ছি। ফিলসফি, তত্ত্ব ও বুনট ইনফরমেশনসহ যা যা আমি পছন্দ করি কবিতায়, ইমরান মাঝির কবিতায় কিছুটা ইনফরমেশন ছাড়া অন্য কিছু খুঁজে পেতে বেশ কষ্ট হয়। আর যে ইনফরমেশন মেলে, তাতেও আবার নিউজের গন্ধ। বাজারে বিবিসি রেডিও সার্ভিস শেষে জনগণ যে পর্যালোচনামূলক নিউজ ফের সমপ্রচার করে, অনেকটা সে ধরণের নিউজের গন্ধ।
তবে ওর মধ্যে এক নিরেট কবি চরিত্র দেখি। শহর মাঝি মানিয়ে নিতে পারে না, এটা বেশ ভালো করেই জানি। ওর কবিতার পটভূমি গ্রাম। শব্দের কারিশমার চেয়ে গল্পের প্রাধান্য বেশি। দু চারটি উপমার গুণে হয়তো এ কাহিনী বর্ণনা গল্প না হয়ে হয়তো কবিতা হয়ে উঠছে।
ইমরান মাঝির কবিতায় যে গ্রামের কথা বলা হয়েছে, সে গ্রাম আমি দেখিনি। তবে তার কবিতায় ভ্রমণ করে আমি যে গ্রাম দেখছি_ আমার আন্তর্জাতিকতাবোধ বলে সে গ্রাম হারিয়ে যাবে। ইউসুফ, বাসু আর চৌমাথার সিজার দোকানেও এখন মিনিপ্যাকে ঢুকে গেছে বিশ্বায়ন। এ আগ্রাসনও ইমরান মাঝির চোখ এড়ায়নি।
বড়লোকেরা ব্যাংক থেকে জনম বাকি খায় (বাকি)
আমরা এক রাস্তা ধরেই হাঁটতাম। আমরা মানে আমি, ইমরান মাঝি ও চাঁদ। চাঁদে যাওয়ার জন্য বিজ্ঞানী কলিন্স কি দোয়া পড়েছেন, তা' হাতড়ে বেড়াচ্ছে ইমরান। আর আমি ডুবে যাচ্ছি মিথে_ 'পাপ পূণ্য সংস্কারে মুহাম্মদে দ্বিখণ্ডিত চাঁদ।' সিএন্ডবি রোডের পাশে পুকুরে প্রতিফলিত চাঁদে সত্য মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে কাহ্নপা'র দ্বারস্থ হই_ জলে বিম্বিত চাঁদ যেমন না সত্য, না মিথ্যা।
3.
ইমরান মাঝির কবিতার দৃশ্যপট আমাকে যতোই মুগ্ধ করে, ওর কবিতার বাক্য গঠনে আমি অতোটাই বিরক্ত। এটা হতে পারে ওর নিজস্ব লেখার স্টাইল। সন্দেহ নেই, শুন্য দশকের প্রভাবশালী এক কবির নাম ইমরান মাঝি। যে কবি এর মধ্যে পাঠকপ্রিয়তাও পেয়েছে। হয়তো তার এ সরল গল্প বলার স্টাইলের কারণেই এ পাঠকপ্রিয়তা। তবে আমি বিশ্বাস করি, শব্দ যতো পুরোনো হতে থাকে, ততো এর অভিজ্ঞতা বাড়তে থাকে- শব্দ বহুমাত্রিকতা পায়। এ কারণে আধুনিকায়নে যেভাবে ছোট হয়ে আসছে পৃথিবী_ উত্তরাধুনিকতায় সেভাবে ছোট হয়ে আসছে কবিতাও। দুধভাই'র ফাপে এ প্রসঙ্গেই সাইদ র'মান যেন আমার মনের কথাটিই লিখে ফেলেছেন, 'মাঝিকে ত্রিভুজের যে কোন বাহুতে রেখেই সাপলুডু খেলা যায়। বলা যায়_ফ্রি প্লে। ইতি, কাঠামো, আবেগ, ছন্দ, দ্যোতক, মৌলিক আবিস্কার_ এই শব্দ সমষ্টি অথবা বিপরীত কোন কিছুই মূখ্য নয় মাঝির কাছে।'
মাঝির কবিতা পড়ে মাঝে মাঝে মনে হয়_ ও বাক্য গঠনই শেখেনি। তবে ওর কাছে সুর আছে, গীতিময়তা আছে আর আছে সমকালীন গ্রহণযোগ্যতা। মোদ্দা কথা, একই সময় কবিতা লিখলেও আমি ও মাঝি আলাদা চোখেই আছি_ আলাদা টোনে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



