(আজ ডেইলি স্টারে প্রকাশিত মাহফুজ আনামের মন্তব্য প্রতিবেদন অবলম্বনে)
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত আর্থিক সততার কারণে ইতিবাচক সার্ক গঠন থেকে শুরু করে লজ্জাজনক ইমডেমনিটি অধ্যাদেশও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। অথচ তারই বড় ছেলে সে ইমেজ চুরমার করে দিয়েছে। বাবার ইমেজের ভাবনা দূরে থাক, দুর্নীতির অপবাদেই ডুবে ছিলেন তারেক রহমান। নিজেকে রাজবংশের একটি প্রডাক্ট হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং বিএনপির নেতৃত্বকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সমঙ্ত্তি হিসেবে ভাবতে শুরু করেন।
আইনের শাসন সংক্রান্ত অজ্ঞতাই ছিল তারেক রহমানের সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক। আইনকে অগ্রাহ্য করে ব্যক্তিগত স্বার্থকেই বড় করে দেখেছেন তিনি। তার ঔদ্ধাত্যপূর্ণ আচরণে নিজ দলের সিনিয়র নেতারাও বিব্রত ছিলেন, হয়তো তারা সব সময়ই নিজেকে প্রশ্ন করতেন, তাদের প্রকৃত নেতা কে?
তারুণ্যের সেন্টিমেন্ট প্রবীন নেতারা বুঝতে পারেন না, এ ধারণা তারেক রহমানের। তার মতে, তরুণ প্রজন্ম সম্পদ ও ক্ষমতা চায়। যারা মুক্তিযুদ্ধ ও অতীতের কথা বলেন, নীতি বা আদর্শ উপেক্ষা করে তারেক রহমান তাদের বিদ্রুপ করতেন। এক অনুষ্ঠানে তিনি আমাকে বলেছিলেন, 'ইতিহাস কি তরুণদের চাকরি দিতে পারে? আমরা ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে চাই, অতীতের দিকে নয়।' বিদ্রুপ করে তারেক আরো বলেছিলেন, আপনাদের আন্দোলনতো স্রেফ ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। জবাবে আমি বলেছিলাম, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এবং দেশ গঠনের লড়াইতো ভবিষ্যত নির্মাণের জন্যই। জাতির এ অসামান্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন তার বাবা, ছেলের মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে এ ভাবনা বিস্ময়কর।
যদিও বিএনপির ভাবমূর্তি পতনের কেন্দ্রে তারেক রহমান, তবু তাকে এ অবস্থার জন্য পুরোপরি দায়ী করা যাবে না। অবশ্যই তার মা এ অপবাদের প্রধান অংশীদার। অপকর্ম থেকে ছেলেকে নিবৃত করার কোনো চেষ্টাই করেননি তিনি। বরং যে নেতারা এ পরিস্থিতি সম্পর্কে খালেদা জিয়াকে সচেতন করতে চেয়েছিল_ তাদেরকে কোনঠাসা করেছিলেন সাবেক প্রধানমমন্ত্রী। এটা ক্রমেই পরিষ্কার হচ্ছিল যে, উত্তরাধিকারসূত্রে তারেক রহমানই বিএনপির ভবিষ্যত কর্ণধার হতে যাচ্ছেন। এ কারণে যারা বিএনপির মাধ্যমে ভবিষ্যত গড়ার পরিকল্পনা করছিল, তারা তারেকের পেছনে লাইন দিয়েছিল। সিনিয়র নেতাদের মধ্যে তারেকের আধিপত্য থেকে একমাত্র মোসাদ্দেক আলী ফালুকেই রক্ষা করেছিলেন খালেদা জিয়া। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিবের পদ থেকে ফালুকে উৎখাতের লড়াইয়ে হেরেছেন তারেক জিয়া। এটাই তারেকের একমাত্র পরাজয়।
প্রেসিডেন্ট বদরুদ্দোজার অপসরণের বিষয়টি এখনো পরিস্কার নয়। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর কেনই বা দলের কাছে অনাকাংঙ্ক্ষিত হলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব? তার প্রস্থান এটাই প্রমাণ করে যে, খালেদা জিয়া ও তার ছেলের সন্তুষ্টি অর্জন করতে না পারলে কেউ এ দলে টিকতে পারে না। এমনকি কেউ তাদের ব্যাপারে অবিশ্বাস বা সন্দেহ পোষণ করলেও বিএনপিতে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার তিগ্রস্ত হবে।
দুর্নীতির বীজ বপন, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনের সর্বস্তরে বিশেষ করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং আমলাতন্ত্রে দলীয়করণ যেমন সরকারকে ধ্বংস করছে, তেমনি ধ্বংস করছে বিএনপিকে। সাইফুর রহমান, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মান্নান ভুইয়া, মওদুদ আহমেদসহ আরো অনেক প্রবীণ নেতাও দলের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী। দলের পচন ঠেকাতে এরা কোনো পদক্ষেপ নেননি, প্রতিবাদও করেননি। হয় তারা এ যুবরাজের মনোতুষ্টিতে ব্যস্ত ছিলেন_ নয়তো তাকে ক্ষেপিয়ে দল বাঁচানোর কোনো উদ্যোগ নেননি। মন্ত্রিসভায় তারেক রহমানের প্রভাব বিস্তার বা বদরুদ্দোজা ইসুতে কোনো ভূমিকা নিতেও ব্যর্থ হয়েছেন তারা। যখন একটি রাজনৈতিক দল পারিবারিক সম্পত্তিকে রূপান্তরিত হচ্ছে, তখন এ দলটির ধসের জন্য তারাও সমানভাবে দায়ী।
আসুন আমরা বিএনপির পরিনতি থেকে শিক্ষা নেই। যে দলের ভেতরে গণতন্ত্র নেই, সে দলের কাছ থেকে গণতান্ত্রিক শাসন প্রত্যাশা করা যায় না। আসুন ভবিষ্যতে আমরা এমন কোনো রাজনৈতিক দলকে গ্রহণ করবো না, যারা নিজেদের মধ্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করছে না। এটা আওয়ামী লীগের জন্যও একটি শিক্ষা।
শব্দ: 490
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



