যখন ঘুমিয়ে ছিলাম তখন জানতাম ঈশ্বরের ইচ্ছা ছাড়া গাছের একটা পাতাও নড়ে না। এই যে মানুষ ধনী-গরীব এই সবই ঈশ্বরের ইচ্ছায় হয়ে থাকে।
"..এছাড়া আমি তোমাকে এমন ধন, সম্পদ ও সম্মান দেব যা তোমার আগে কোন রাজার ছিল না এবং তোমার পরেও থাকবে না।” (২ বংশাবলি ১ঃ১২)
সয়ং ঈশ্বর এই কথা বলছেন রাজা সলোমনকে। অর্থাৎ ঈশ্বরই মানুষকে ধন সম্পদ দিয়ে থাকেন। এটা যদি সত্য হয় তাহলে এর উল্টোটাও সত্য। অর্থাৎ, যাদের ধন সম্পদ নেই ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই নেই। কিন্তু, জেগে উঠে দেখি, পৃথিবীতে যে পরিমাণ সম্পদ আছে তার সুষম বন্টন হলে কারোই অভাবে, অনাহারে থাকার কথা না। এক শ্রেণীর মানুষই মানুষকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করে বৈষম্য তৈরী করছে, আর বঞ্চিত শ্রেণীকে বলছে, "ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই তোমরা দরিদ্র"। আর তাই দরিদ্র মানুষ গুলোও এটাই তাদের নিয়তি হিসেবে মেনে নিচ্ছে। তারা তাদের দারিদ্র্যের কারণ খুঁজে না, সংঘবদ্ধ হয় না, তাদের উপর অন্যায়ের প্রতিবাদ করে না। শুধু কঠোর পরিশ্রম করে যায়, কিন্তু দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের হতে পারে না। ফলে এই বৈষম্যমূলক সমাজ ব্যবস্থা টিকে আছে হাজার বছর ধরে।
যখন ঘুমিয়ে ছিলাম তখন জানতাম, প্রতিটা শিশুর সাথে স্বর্গদূত থাকে। সেই দূত তাকে নানা ধরণের বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করে। এই বিশ্বাসের পক্ষে দুই একটা বাস্তব উদাহরণও মিলে যেতো বটে। কিন্তু, জেগে উঠে দেখি, পৃথিবীর প্রতিটা দুর্যোগে, হোক সেটা মানুষের তৈরী অথবা প্রাকৃতিক, সেখানে সবচেয়ে বেশী হতাহত হয়, নারী, শিশু, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। সমস্ত পরিসংখ্যানই তাই বলে। অর্থাৎ, যে কোনো দুর্যোগে সবলেরা টিকে থাকবে আর দুর্বলের বিলুপ্তি ঘটবে এটাই চরম সত্য।
যখন ঘুমিয়ে ছিলাম তখন জানতাম, অসুখ-বেসুখ ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই হয়, তাঁরই ইচ্ছায় সেরেও যায়, আর না সারলেও সেটা তাঁরই ইচ্ছা। কিন্তু, জেগে উঠে দেখি পৃথিবীর যে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা যত উন্নত তাদের মৃত্যুর হারও তত কম।
যখন ঘুমিয়ে ছিলাম তখন টেবিলে খাবার দেখে আনন্দে ভরে যেত আমার মন। কৃতজ্ঞ চিত্তে প্রার্থনা করতাম,
"হে উদার হৃদয় প্রভু, এ খাদ্য তোমারই দান, তোমার এই দান আশীর্বাদ করো, আমাদিগকে আশীর্বাদ করো। আমেন।"
জেগে উঠার পর, খাবার ভরা টেবিলের সামনে গেলেই আমার জাগ্রত বিবেক আমাকে প্রশ্ন করে, "ঈশ্বর কেবল তোমার ক্ষেত্রেই এত উদার হলো কেন? যারা এই মুহুর্তে অর্ধাহারে, অনাহারে আছে কি দোষ তাদের? কোন পাপের শাস্তি ভোগ করছে তারা?"
যখন ঘুমিয়ে ছিলাম তখন দিন শেষে বিছানায় গেলে আরো একবার কৃতজ্ঞতায় মন ভরে যেত, কত আরামদায়ক আর নিরাপদ বিছানা দিয়েছেন তিনি আমাকে। এখন শুতে গেলে ফার্মগেট পার্কের পাশে পলিথিনের তাবু টানিয়ে থাকা মানুষ গুলোর কথা মনে পরে, মনে পরে খোলা আকাশের নিচে শুয়ে থাকা মানুষগুলো কথা। আমার ঘুম আসে না...
আহা কি শান্তির আর সুখের ঘুম ছিল আমার! হঠাৎ জেগে উঠার পর কোথায় মিলিয়ে গেল আমার সেই শান্তির ঘুম? এত যন্ত্রণা, এত কষ্ট সইবো কেমনে? হে ঈশ্বর, তুমি আবার আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দাও, শান্তির ঘুম, সুখের ঘুম, স্বস্তির ঘুম...
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে মার্চ, ২০১৬ দুপুর ১:২৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


