ধর্ম নিয়ে আমার চিন্তাভাবনা বরাবরই আউলা ঝাউলা,
আমি কোনকালেই শক্ত সামর্থ্য ধার্মিক ছিলাম না, আবার স্রষ্টার অস্তিত্ব অস্বীকার করার মত দুঃসাহসও হয়নি কখনো।
জন্মসূত্রে আমি মুসলিম এবং আমার বাবা মা প্রচণ্ড রকমের বিশ্বাসী মানুষ, মায়ের সারাদিনের ২৪ ঘণ্টা সময়ের কম করে হলেও ৫/৬ ঘণ্টা চলে যায় ইবাদাত-বন্দেগীতে, বাবাও বরাবরই নামায রোজা করতেন, বছর –দুয়েক আগে হজ্জ করে আসার পর থেকে উনি জাগতিক চিন্তা ভাবনা থেকে বেশ দূরেই আছেন, বিশেষ কোনও দরকার না পড়লে তিনি বাসা আর বাসার পাশের মসজিদ ছাড়া আর কোথাও যান না।
উনারা সবসময়ই আমাকে ধর্ম পালনে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এমন অভিবাকের ছায়ায় বেড়ে উঠেও আমি সমসময়ই ধর্মীয় রীতিনীতি পালনে কিছুটা উদাসীন ছিলাম,তবে ধর্মের ব্যাপারে আমার আগ্রহ ছিল বেশ, আমাকে সবচাইতে বেশি ভাবায় আমরা কেনও ধর্ম পালন করি এই চিন্তায়, আর এই প্রশ্নের সবচাইতে গ্রহণযোগ্য উত্তর আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে সেটা হোলও
“ আপনার সন্তুষ্টির জন্য”
যদিও ধর্ম মতে আমাদের যাবতীয় ইবাদাত স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্য, কিন্তু আমরা যদি একটু ব্যাপকভাবে সেটা ভাবতে যাই তাহলে অনায়াসে দেখতে পাবো যে, মানুষ তার নিজের উপর অথবা অন্তর্গত মানব-সম্প্রদায়কে স্রষ্টার চাইতে বেশি বিশ্বাস করে। কিভাবে সেটা?? সহজ সরলভাবে আমরা যেটা দেখি, যখন আমাদের কোনও বিপদ হয়,শুরুতেই আমরা নিজের প্রচেষ্টায় সেখান থেকে উত্তরণের চেষ্টা করি, ব্যর্থ হলে তখন অন্য কোনও মানুষের সাহায্য প্রার্থনা করি, আর যদি সবদিক থেকেই বিফল হই তখনি স্রষ্টার কৃপা লাভের আশায় ইবাদাত শুরু করে দেই।
এমন কি কখনো হয় না যে আমরা বিকল্প কোন চিন্তা না করে শুরতেই স্রষ্টার পানেই মুখ তুলে তাকাই?? হ্যাঁ হয়, এমনটা তখনি ঘটে, যখন বুঝতে পারি যে, এই বিপদ থেকে পরিত্রাণের জন্য আমি অথবা আমার সহযোগী মানব সম্প্রদায় অক্ষম তখন আর বৃথা চেষ্টা না করে স্রষ্টার কোনও কারিশমা দেখার জন্য উন্মুখ থাকি।
আরেকটু উদাহরন যদি দেই, ধরুন আমরা কেউ অসুস্থ হলাম, নিজের ধারনামত কোন ঔষধ খেলাম, আরোগ্য হোল না, তখন যাই ডাক্তারের কাছে, যদি আমার অসুখ নিরাময়ের কোন উপায় ডাক্তারের জানা না থাকে, অথবা তিনি বুঝতে পারেন যে এই দুরারোগ্য ব্যাধি কিছুতেই ভালো হবার নয়, তখন তিনি আমাদের স্রষ্টার সাহায্যের আশা করতে বলেন, আমরাও শেষ চেষ্টা হিসেবে সেটাই করি, অর্থাৎ যখন আমরা অক্ষম তখনি স্রষ্টার আবির্ভাব। যদি সেই দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি কোনভাবে আরোগ্য লাভ করে তবে আমরা সেটা স্রষ্টার কৃপা বলে মানি, আর যদি সে মারা যায় তখনও আমরা ভাবি সব স্রষ্টার ইচ্ছা, উনি চাননি বলেই সে বাঁচলও না, এখানে কোনভাবেই স্রষ্টাকে ব্যর্থ ভাববার অবকাশ নেই, অন্তত বিশ্বাসীদের কাছে তো নয়ই। অর্থাৎ রোগী মরুক আর বাঁচুক, ফলাফল একই, ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকেও স্রষ্টা তাঁর চিকিৎসায় সফল,এখন প্রশ্ন আসতে পারে, যদি আমরা আত্মার সন্তুষ্টির জন্যই স্রষ্টার অস্তিত্ব মানি বা নিজের অক্ষমতার জন্য, তাহলে যে বিপদে নেই, অথবা আপাত দৃষ্টিতে সকলদিক থেকেই দারুনভাবে সক্ষম, সে কেনও ধর্ম পালনে উৎসাহী, আমাদের আশেপাশেই দেখুন, এমন অনেকের সন্ধান পাবেন একসময় ধর্ম কর্ম কিছুই করত না, অবৈধ উপায়ে সে অনেক টাকার মালিক হোল, সেই সাথে ক্ষমতা, আপাতত তার আশেপাশের মানুষের পক্ষে তার কোন ক্ষতি করা অসম্ভব, তখন হঠাৎ করেই সে পাক্কা ফরহেজগার হয়ে যায়, সেটা কেনও?? এক্ষেত্রেও তার আত্মার সন্তুষ্টি কাজ করে, সে ইবাদাতের মাধ্যমে এমন একধরনের প্রশান্তি পেতে চায় যে,স্রষ্টা খুশি হয়ে আমার অপরাধের জন্য আমাকে ক্ষমা করবেন, এবং ভবিষ্যতে আমি এই সংক্রান্ত কোন বিপদের সম্মুখীন হবো না, খুব সহজেই আপন স্বার্থ অথবা সন্তুষ্টির সাথে অবচেতন মনে কিছুটা অক্ষমতাও কাজ করে বটে। স্রষ্টার সন্তুষ্টি এখানে গৌণ, মুখ্যত সে সেটাকে কেন্দ্র করে নিজস্ব সন্তুষ্টিই খুঁজে বেড়ায়। সেইসাথে আরেকটা জিনিসও লক্ষণীয় সংখ্যাগরিষ্ঠরাই বিপদে থাকা অবস্থায় স্রষ্টাকে ডাকাডাকি করে, কিন্তু বিপদ কাটলেই তাকে দ্রুততম সময়ে ভুলে যায়, সেটা কেনও??এখানেও অক্ষমতা, যখন বান্দা অক্ষম, তখন তার মনে স্রষ্টা বিরজমান, যখন সে সক্ষম, স্রষ্টা পলায়নপর, সেকি তখন মানে না যে সে স্রষ্টার ইশারায় বিপদমুক্ত হোলও?? হুম মানে,আপাতদৃষ্টিতে বিশ্বাসও করে, তবে তখন তার বিশ্বাসটা অন্তর্নিহিত ভাবে লোপ পায়,সে এই উত্তরণকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়, এবং ঘটনার সাথে সাথে আস্তে আস্তে স্রষ্টার সহযোগিতার ধারনাটি থেকেও বের হয়ে আসে।
তবে আমি ধর্মীয় অনুশানের বিরোধী নই কিছুতেই, কারন সেটার ভালো ফলাফল অহরহ, সন্তুষ্টিলাভ যার জন্যই হোক, ভালো কাজকে ধর্মীয় দৃষ্টি কোন থেকে দেখুন অথবা অবিশ্বাসীর চোখ দিয়ে, শেষপর্যন্ত ভালোই লাগবে। আর যদি আখিরাত অথবা মৃত্যুর পরের সময়ের কথা বলি তো সেটাও স্পষ্ট যে মানুষ দৃশ্যমান লাভ ক্ষতিতেই বেশি মনযোগী অদৃশ্য কোন ফললাভের চাইতে, ফলশ্রুতিতে সে দুনিয়া নিয়েই বেশি চিন্তা করে, যেটা একেবারেই স্বাভাবিক। কারন যে ফলাফল অন্তত এখন দেখতে সে অক্ষম সেটা নিয়ে সে ভাবতে চায় না, যেটা তার ক্ষমতার বাইরে, তার নিজের উপরের বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই, আর যিনি এই অক্ষমতাকেও মেনে নিয়েও অদৃশ্য সুখের প্রত্যাশী তিনিই বিশ্বাসী, ধার্মিক।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০১২ সন্ধ্যা ৬:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



