somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হঠাত ঘাসের ঘ্রাণ

২২ শে জুলাই, ২০১১ সকাল ১০:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


পারুল নিচের দিকে তাকিয়ে একবার হাসলো যেন | শেষ বিকেলের আলো তার মুখের একটি পাশ আলোকিত করে রেখেছে | ভ্রমরকৃষ্ণ চুলে, অস্তাচলের লালিমা জড়ানো |
আমি আলতো করে ডাকলাম, পারুল !
পারুল অন্যমনস্ক হয়ে উত্তর দিল,
-উঁ !
-কি ভাবছ ?
-অনেক কিছু |
-ভাবনাগুলো হারিয়ে যাচ্ছে |
আমার কাছে কাগজ কলম আছে | বল, আমি লিখে ফেলছি |
-উঁহু | হারায়, হারাক |
আচ্ছা ! আমাকে একলব্যের গল্পটা আবার বলনা ?
-আবার? অনেক বারই তো শুনেছ |
-আবার বল. তোমার মুখে শুনতে ভালো লাগে | আমি বইয়েও পড়েছি ওটা. অতটা ভালো লাগেনি, যতটা..
পারুল থেমে গেল. আমি হেসে বললাম, বল বল ?
-না |
-কেন?
-তোমার অহংকার হবে |
-আমার অহংকার এখনো বেশ হচ্ছে | তুমি পারলেনা ঠেকাতে |
-তাই বুঝি? তাহলে জেনে নাও, ধরনীতল টানছে তোমায়..|
- হা হা হা !
আমি পারুলকে কাছে টেনে নিলাম |

হেঁটে হেঁটে একটা বড় বাগানবিলাসের নিচে এসে দাড়ালাম আমরা | অন্য এক অচেনা গাছকে ঘিরে, বেড়ে উঠেছে বাগানবিলাসটা | সবুজ পাতা, ঢেকে গেছে লালচে গোলাপী পাতার আড়ে |
ঘাসের ওপর ব্যাগটা রেখে পারুল বসে পড়ল | আর, হাত দুটোকে বালিশ বানিয়ে শুয়ে পড়লাম আমি | পারুলের একটা হাত নিজের হাতে তুলে নিলাম | আবৃতি করলাম-
''রুক্ষ এ হাতে, কোমল তোমার হাত ধরিব জড়ায়ে..''
পারুল ম্লান হাসলো |
-পারুল | ভাবনা কি?
-ভাবনা কিছু না | রাতের বেলা খুব ভয় হয় |
-তাই বুঝি | রাত তো ভয় হবারই সময় | হতে দাও |
পারুল হেসে ফেলল | বলল, তোমার ভয় করেনা?
আমি বললাম, ভয় কিসের?
-সময়ের? খুব খারাপ কোনো সময়ের..?
-নাহ |
বলে আমি সূর্যের দিকে তাকালাম | পারুল আমার চুলে গভীর স্নেহে কিছুক্ষণ হাত বুলিয়ে দিল | একসময় বলল , এদিকে ফের, বল, কেন তোমার ভয় করেনা |

আমি চশমার আড়ালে পারুলের গভীর চোখজোড়ার দিকে তাকালাম. নরম স্বরে বললাম, এইযে এমন সোনার দিন যাচ্ছে, প্রকৃতি একদিন তা কৃষ্ণসময় দিয়ে বদলে দেবে, সমতা করবার জন্যে, এই তো ভয় ?
-হুমম |
-পারুল | অনেক কষ্টের দিন গেছে বলেই তো এই সোনার দিনগুলো এসেছে | তাই না ? তখন , কোনো একদিন এ অন্ধকার সময় কেটে যাবে, এ স্বপ্ন নিয়ে আমরা বেঁচে ছিলাম | আমরা তো স্রষ্টার প্রাকৃতচক্রের কথা জেনেই গেছি | স্বপ্ন আর দু:স্বপ্ন একই মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ | দুই পিঠেই বিজয় লেখা আছে | জানো না সে কথা ?
পারুল চুপ করে রইলো বহুক্ষণ | একসময় মৃদু হেসে বলল, তোমার কথা বিশ্বাস করতে ভালো লাগে |

মাঝে মাঝে ভাবি, এত সাহস কোথা হতে পাই ? মধ্যবিত্ত পরিবারের একমাত্র ছেলে আমি | রিটায়ার্ড সরকারী অফিসার বাবা, গতমাসে তাঁর বেতনের শেষ টাকা কটা তুলে আনলেন | সেকেন্ড ক্লাস গেজেটেড অফিসার ছিলেন | পেনশন যা পাবেন, তার একটা বড় অংশ ঋণ শোধে আর বাড়ির অবশিষ্ট কিস্তি পরিশোধ করতেই বেরিয়ে যাবে | মা একটা জুনিয়র স্কুলে শিক্ষকতা করে, পরিবারের গায়ে সচ্ছলতার পোশাকটুকু এখনও টিকিয়ে রেখেছেন | বাবা প্রায়ই আমাকে ডেকে বলেন, তোর লেখাপড়ার আর কতদূর |
আমি বলি, এইতো বাবা | শেষ হল বলে |
বাবা বলেন, সংসারের হাল ধরবি, বাবা-মা কে খাওয়াবি এমন বলছি না | নিজেকে শুধু, নিজের জন্যেই খানিকটা তৈরী কর | বড্ড খামখেয়ালী তুই |
আমি চুপ করে শুনি |

ছোটবেলায়, ছাত্র হিসেবে নাম কুড়িয়েছিলাম বেশ | স্কুলজীবনে স্যারদের প্রশংসা আর প্রত্যাশা ছাড়া ভিন্ন কথা শুনিনি কখনও | কলেজেও তাই | বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেই সব বদলে গেল | অথচ শুদ্ধ থাকবার প্রয়োজন ছিল এখানটাতেই সবচেয়ে বেশি | স্কুল কলেজে যারা কোনদিন পরীক্ষায় নাম্বারে ছুঁতেও পারেনি আমাকে, তাদের অনেকেই, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিতে যাচ্ছে কদিন বাদে | আর আমি ?
কাজের মাঝে, অর্থহীন কবিতাদের জন্ম দিই, যাদের বেশির ভাগেরই গন্তব্য হয় ওয়েস্টপেপার বাস্কেট | সেখানে তারা দলোমলো হয়ে পচতে থাকে | দুএকটা আলোর মুখ দেখে শুধু | বেশির ভাগই থাকে অন্ধকারে | হাত ধরে আদরে সবাইকে আলোতে নিয়ে আসব, সেই উত্সাহটুকু পাইনা |

ইচ্ছে হয়, পিছুডাক কে পেছনে ফেলে, চলে যাই আমার ছোট্ট গ্রামের বাড়ি | সেখানে নিভৃতে বসে ভোরবেলা, শুনব যত বুনো পাখির ডাক | বিকেলে, খরস্রোতা মাতামুহুরীর সাথে অস্তাচলের আবীর মাখাবো গায়ে | মাঝরাতে লক্ষীপেঁচার সাথে মাতব কবিতার জলসায় | যে রাতে খুব জোছনা ঝরবে ভুঁয়ে , সেরাতে ; বাঁশঝাড়ের কাছে বসব বাঁশিটা হাতে নিয়ে | হঠাত নেমে গিয়ে স্বচ্ছ পুকুরের জলে, টুক করে ছুঁয়ে দেব চাঁদের ছায়া.. |
পারুলের পরিবার থেকে তাকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, আমাতে চলবে না | তার পছন্দের মুল্য দেয়া হবে, তা যেমন ঠিক,আবার আমার মত একটা বাউন্ডুলেকে গ্রহণ করার হবে না, তাও তেমনই ঠিক | আমাকে পারুল বলে , তুমি যেমন আছ তেমনি থেকো | কেউ একজন থাকুক তোমার মত | আমার হাতে, তার হাতের চাপ মৃদু বাড়ে | আমি বুঝতে পারি, পারুল আমাকে ভালবাসে | কিন্তু, মনে এও জানি...

-কি ভাবছ ? পারুলের প্রশ্ন ।
-ভাবছি..অনেককিছুই..|
-কাগজ কলম তো আছেই | লিখে ফেল | ভাবনা হারিয়ে যাচ্ছে |
-হা হা হা | হারায় হারাক |
পারুল খিল খিল করে কিশোরী মেয়ের মত হেসে উঠলো | সাথে হাসলো লালচে আলোয়, একরাশ পিঙ্গল মসৃন চুল |


সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই এপ্রিল, ২০১২ রাত ৩:৪০
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×