০৯/০৬/১৪
----------------------------------------------
আজকে আমার এক খালুকে নিয়ে গ্যাস্ত্রলিভার হাসপাতালে গেলাম . hepatobiliary সার্জন মোহাম্মদ আলী স্যারকে দেখাবো . যদিও জানি খামোখাই দেখাচ্ছি. উনার common bile duct এ growth. খুব খারাপ পরিনতি. সাথে এক খালা আছেন. আমি সব খালা সহ সবাইকে এর পরিনতি সম্পর্কে বলেছি.
যেহেতো আমরা আগে সিরিয়াল দেইনাই তাই ভাবলাম দেখাতে একটু সমস্যা হবে. ডা :মিলন এই হাসপাতালে কাজ করে. তাই সে একটা ব্যবস্থা করেছে. আমরা অপেক্ষা করছিলাম.
রাত যখন সাড়ে আট বাজ়ে তখন দেখি একটা লম্বা লোক সাদা পাঞ্জাবি পরে আমাদের দিকে আসছে. কাছে আসার পর দেখি আওয়ামী লীগ নেতা সুলতান মনসুর সাহেব . আমার উনাকে দেখে খুব ভালো লাগলো.
১০।০৬।১৩
----------------------
গতকাল থেকে আমার ছেলে রুদ্রর জ্বর | তাই মনটা ভালো নেই খুব একটা |খুবই স্বাভাবিক |তবে কালকের একটা ঘটনার কথা মনে হলে নিজেকে একটু ভাগ্যবান মনে হয় |
দুপুর দুইটার দিকে যখন হাসপাতাল থেকে ফিরছিলাম | সরাসরি কোনো বাস না পেয়ে দুতলা বাসে করে আসাদ গেট নেমে যখন হেটে বাসার দিকে আসছিলাম দেখলাম ফুটপাতের উপর একটা বেঞ্চ এর উপর একটা যুবক বসে আছে |কোলে দু তিন মাসের একটা বাচ্চা | যুবকটি বাচ্চাটাকে ফিডার দিয়ে দুধ খাওয়াচ্ছে এবং খুবই মমতা নিয়ে খাওয়াচ্ছে |আমি কোনো বাবাকে বাসার বাইরে বাচ্চাকে ফিডার দিয়ে দুধ খাওয়াতে দেখি নাই |পাশে কোনো মহিলাও দেখলামনা | বাচ্চাটাকে দেখেই আমার অসুস্থ মনে হলো |জিজ্ঞেস করলাম বাচ্চাটার কি হয়েছে ? বাচ্চাটার বাবা বললো যে বাচ্চাটার হৃতপিন্ডে সমস্যা | শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেলো |পৃথিবীতে অনেক বাচ্চাই জন্ম গত ভাবেই হৃত পিন্ডের সমস্যা নিয়ে জন্মায় |এই বাচ্চাটাও সেই রকম |এদের মধ্যে খুব কম সংখায় বেশি দিন বাঁচে |সন্তানের জন্য ঔষধ নিয়ে ঘরে ফেরা যে কোনো বাবার জন্যই এই ঘটনা দু:খ জনক |হোক সে ডাক্তার |
সকালে হাসপাতালে গিয়ে দেখি আজকে আমাকে দুইটা অপারেশনে দাড়াতে হবে |একটা হলো এক মহিলার প্রস্রাবের রাস্তায় একটা সিস্ট হয়েছে, তা অপারেশন করে ফেলে দিতে হবে| আর একটা ১৬ দিনের বাচ্চার |তার পেটের উপর দিয়ে একটা প্রস্রাবের রাস্তা বানাতে হবে |কারন তার প্রস্রাবের রাস্তায় ভাল্ব আছে |যার ফলে মায়ের পেটের ভিতর থাকা অবস্থায়ই তার কিডনি ফেল হয়ে যাচ্ছিলো |দুটি অপারেশনই ভালো হয়েছে |যদিও আমার বাচ্চাদের অপারেশনে দাড়াতে ভালো লাগেনা |তাদের চিত্কার আমার উপর প্রেসার পড়ে|
এখন ঘুমিয়ে যাবো |
০৫.০৩.১৪
বাসায় আসতে আসতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো| এসে দেখলাম রুদ্র ঘুমিয়ে আছে| সাধারনত সে বিকালে ঘুমায়না |পলিন রান্না ঘরে রান্না করছিলো | বাসায় আসার সাথে সাথে বললো “সারা দিন আমরা একা একা ছিলাম |তোমার অপারেশন শেষ হতে এতক্ষন লাগলো ?” আমি তারদিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করলাম সে কতো টুকু রেগে আছে |
“ একটু পরে আমাকে হাসপাতালে চলে যেতে হবে |” সে বললো | তার নাইট ডিউটি| গাইনির নাইট ডিউটি খুব কষ্টের ব্যাপার |
বললাম “ রুদ্র কখন থেকে ঘুমাচ্ছে |” |
“বিকাল থেকে | সেই কখন থেকে না খেয়ে আছে |” মনোযোগ বাচ্চার দিকে |
“তিন ঘন্টা লাগলো অপারেশন শেষ হতে |দুপুরে ভাতও খেতে পারিনি| গিয়ে দেখি অপারেশন শুরু হয়ে গেছে প্রায় |অপারেশন শেষে ভাত খেয়ে দেখি সাতটা বেজে গেছে |” দুপুরে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে নাসির ভাইয়ের সাথে শাহবাগে ঔষধ মার্কেটে সনি ট্রেডার্সে গেছিলাম |উনি ইনস্টুমেন্ট কিনবেন |আমারও তানভীরের সাথে কাজ ছিলো|তার অফিস অবশ্য সেগুনবাগিচায় | নাসির ভাই আমার সহকর্মী| উনি পাশ করা ইউরোলজিস্ট|বাংলাদেশের অষ্টম এফসিপিএস পাশ করা ইউরোলজিস্ট |কোন এক বিচিত্র কারনে উনি আমাকে নিয়ে ইনস্ট্রুমেন্ট কিনতে যান |
পলিন চা গরম করে দিলো | তার কিছুক্ষন পার সে হাসপাতালে চলে গেলো |তখনো রুদ্র ঘুমাচ্ছিলো |তার মা তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে বলে যেতে চাচ্ছিলো | কিন্তু সে উঠলো না |
০৯.০৩.১৪
কয়েকদিন আগে নাসির ভাই ফোন করে বললো ‘তোকে আমার সাথে কুষ্টিয়া যেতে হবে|’ বললাম ‘কেন’| বললো ‘দুইটা রুগী ভর্তি হবে বৃহস্পতি বারে| তোকে নিয়ে ওটি করবো |বুঝসত প্রথম অপারেশন করবো |তুই থাকলে ভরসা পাই |’
আমি রাজি হয়ে গেলাম |প্রথমত নাসির ভাই আমার খুব কাছের মানুষ|দ্বিতীয় কারন, গেলে কিছু টাকাও পাওয়া যাবে আর কুষ্টিয়া ঘুরে আসা যাবে |আগে আমি কখনো কুষ্টিয়া যাই নাই |
গাড়িতে উঠে আমার মন ভীষন খারাপ হয়ে গেলো | আমার ছেলেকে ছেড়ে কোথাও গেলেই আমার খারাপ লাগতে থাকে |হাসপাতালে ২৪ ঘন্টার ডিউটি থাকলে কিংবা তার নানার বাসায় তাকে তার মা সহ রেখে আসলেও আমার খারাপ লাগে |তার উপর তাকে একটা মিথ্যা কথা বলে এসেছি |বলেছি ‘আমি হাসপতালে ডিউটিতে যাচ্ছি আগামী কাল চলে আসবো |’রুদ্র বললো ‘তুমিতো ডিউটি করে আসলা আবার যাবা কেন |যাওয়া লাগবেনা |’ আমি পলিনের দিকে তাকালাম |মানে হলো আমাকে উদ্ধার করো |সে বললো ‘রুদ্র বাবাকে ডিউটিতে যেতে দাও |যন্তনা করোনা |’
নাসির ভাই বললেন ‘কিরে তোর্ কি মন খারাপ নাকি?’ | বললাম ‘হু’ |’কেন’ নাসির ভাই জানতে চাইলো |বললাম ‘এমনি’ | ‘তোর্ কি ছেলের জন্য মন খারাপ নাকি ?’|উনি কিভাবে বুঝলেন আল্লাহ জানে |
গাড়ি তিনটার সময় ছাড়ার কথা |কিন্তু ছাড়লো তিনটায় |মারুফ ভাইয়ের জন্য দেরি করে হলো |উনি এই গাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত করেন |জ্যামে পরে দেরী হইছে |যদিও দুই তিন জন যাত্রী চিল্লা চিল্লি করছে |
১২.০৩.১৪
হঠাৎ করে দুপুরে সুরজিত ফোন দিয়ে বললো বারডেমে যেতে হবে | সুরজিতের মা গত ২০ দিন ধরে বারডেমের আই সি ইউ তে ভর্তি আছে | অবস্থা ভালোনা | মামুন ও রিপন বাসায় আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলো | তাদের নিয়েই বাসা থেকে বের হয়ে বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে বাসে উঠি | মাঝে রিপন নেমে যায় | আমি ও মামুন যখন বারডেমে পৌছাই তখন সুরজিত ল্যাব এইড গেছে |
মামুন ও আমি আই সি ইউ এর সামনে বসে আছি | তখন রানা (ছ্দ্ম নাম) ভাই ফোন দিলেন | বললেন "হাবিব ভাই আপনি কোথায় "| আমি বললাম "আমিতো বারডেমে"| জানতে চাইলেন আমি এখন ইমার্জেন্সি একটা অপারেশনে আসতে পারব কিনা ? আমি বারডেমে আসার কারনটা বললাম | উনি বললেন "দেখি রাকিব (ছ্দ্ম নাম) ভাইকে পাই কিনা ?" দুই মিনিট পরে ফোন দিয়ে বললেন "কোনো ভাবে আসা যাবে কিনা ? একটা নেফ্রেক টমি করা লাগবে" | মামুন কে বসিয়ে রেখে একটা ট্যাক্সি নিয়ে ২৫ মিনিটের মধ্যে পৌছে গেলাম | গিয়ে ঘটনা শুনে আমার গা ঠান্ডা হওয়ার যোগার |
রানা ভাই একটা ইউরেটারের পাথর অপারেশন করছিলেন | ইউরেটারো রেনোস্কপী | হঠাৎ উনি খেয়াল করেন তার instrument এর মধ্যে পুরো ইউরেটার ছিড়ে চলে এসেছে | এই অপারেশনের সবচেয়ে খারাপ complication. সব সময় শুনে এসেছি |এবার দেখলাম | জিজ্ঞেস করলাম "রোগীর পার্টি জানে ?" বললেন "পুরোটা জানেনা "| বলেছি "ওপেন করতে হবে '| তবে হাসপাতালের সুপারভাইজার জানে | তার রোগী | রানা ভাইকে দেখে মায়া-ই লাগলো |
আমরা ওপেন করে দেখলাম ইউরেটার কিডনি থেকে bladder পর্যন্ত নাই| এবার পার্টিকে বলার পালা | বলতে হবে যে কিডনি কেটে ফেলে দিতে হবে| বইয়ে অনেক কিছু বললেও বাস্তবে আসলে এই অবস্থায় এ ছাড়া উপায় নাই | কিন্তু রোগীর পার্টি যথারীতি রাজী না | আসলে এটাই স্বাভাবিক | কে ই বা রাজি হবে ? রানা ভাই সহ আমরা কিডনি ওপেন করে দাড়িয়ে আছি | আর বাইরে হাসপাতাল ও রোগীর লোক | পার্টিকে বিভিন্ন ভাবে বোঝানো হচ্ছে | কিন্তু তারা বুঝতে চাচ্ছেনা | এর মধ্যে রোগীর একজন অপারেশন থিয়েটারে এসে রোগীকে দেখে গেলো | আসলে যাচাই করতে আসলো রোগী জীবিত আছে কিনা | রানা ভাই পার্টির সাথে কথা বলে আসলে আমি বললাম সিনিয়র কোনো ইউরলোজিস্ট এর সাথে কথা বলেন | বললেন "মোহাম্মদ (ছদ্ম নাম ) সারের সাথে বলছি | স্যার বলছেন এ ছাড়া কিছু করার নাই | পার্টিকে .........হাসপাতালের এর ....... স্যারের সাথে কথা বলিয়ে দিছি |
তারপর আরো কয়েক জন ডাক্তারে সাথে পার্টি কথা বলার পর পার্টি কিডনি কেটে ফেলে দেয়ার সিদ্ধান্ত দিলো |
একজন সার্জনের জন্য আজকের দিনটি সবচেয়ে কঠিন দিন |
সুরজিত ফোন দিয়ে আগামীকাল বারডেমে যেতে বলেছে | বলল জরুরী কথা আছে |
১৩.০৩.১৪
হাসপাতালের কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করে শাহবাগে বারডেম হাসপাতালে গেলাম | দেখি সুরজিত আই সি ইউ এর সামনে যথারীতি বসে আছে | মন খুব খারাপ |গত ২০/২৫ দিন এখানেই বসে থাকে আর তার মায়ের সুস্থ্যতার জন্য অপেক্ষা করে | চট্রগ্রামে আরও ৭দিন বসে ছিলো | আমি খুব অবাক হই | কিভাবে একজন মানুষ এতো কষ্ট করতে পারে | নিজে সময় দিতে পারিনা বলে খুব খারাপ লাগে | বুঝতে পারি আমরা গেলে তার একটু ভালো লাগে |
আসাদ আসার পর সুরজিত বললো " মার অবস্থা খারাপ | অক্সিজেন স্যাচুরেশন দিনে দিনে আরো কমছে | মার বাচার আশা কম | বরং উনি কস্ট পাচ্ছেন | আমি বারডেমের পরিচালকের কাছে ইনটিউবেশনের নল খুলে দেয়ার জন্য আবেদন করেছি |আগামীকাল সম্ভবত খুলে দিবে |তোরা মাকে নেয়ার জন্য একটু হেল্প করবি | মানে এম্বুলেন্স ঠিক করে দিবি |" বলে সুরজিত কেদে ফেললো |
আমি ঠিক কি বলব বুঝতে পারলামনা | শুধু বললাম " ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিস |"
একটু পরে আমরা তিন জন হাসপাতালের কেন্টিনে গেলাম |সুরজিত তখন পর্যন্ত কিছু খায়নি | কিন্তু সে চোখের পানির জন্য কিছু খেতে পারলনা | একজন অসহায় সন্তানের কান্না ছাড়া কিবা-ই করার আছে |একটু পর দেখি আমার চোখেও পানি চলে এসেছে |
আজকের দিনটি একজন সন্তানের জন্য সবচেয়ে কঠিন দিন |
১০।০৬।১৩
----------------------
গতকাল থেকে আমার ছেলে রুদ্রর জ্বর | তাই মনটা ভালো নেই খুব একটা |খুবই স্বাভাবিক |তবে কালকের একটা ঘটনার কথা মনে হলে নিজেকে একটু ভাগ্যবান মনে হয় |
দুপুর দুইটার দিকে যখন হাসপাতাল থেকে ফিরছিলাম | সরাসরি কোনো বাস না পেয়ে দুতলা বাসে করে আসাদ গেট নেমে যখন হেটে বাসার দিকে আসছিলাম দেখলাম ফুটপাতের উপর একটা বেঞ্চ এর উপর একটা যুবক বসে আছে |কোলে দু তিন মাসের একটা বাচ্চা | যুবকটি বাচ্চাটাকে ফিডার দিয়ে দুধ খাওয়াচ্ছে এবং খুবই মমতা নিয়ে খাওয়াচ্ছে |আমি কোনো বাবাকে বাসার বাইরে বাচ্চাকে ফিডার দিয়ে দুধ খাওয়াতে দেখি নাই |পাশে কোনো মহিলাও দেখলামনা | বাচ্চাটাকে দেখেই আমার অসুস্থ মনে হলো |জিজ্ঞেস করলাম বাচ্চাটার কি হয়েছে ? বাচ্চাটার বাবা বললো যে বাচ্চাটার হৃতপিন্ডে সমস্যা | শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেলো |পৃথিবীতে অনেক বাচ্চাই জন্ম গত ভাবেই হৃত পিন্ডের সমস্যা নিয়ে জন্মায় |এই বাচ্চাটাও সেই রকম |এদের মধ্যে খুব কম সংখায় বেশি দিন বাঁচে |সন্তানের জন্য ঔষধ নিয়ে ঘরে ফেরা যে কোনো বাবার জন্যই এই ঘটনা দু:খ জনক |হোক সে ডাক্তার |
সকালে হাসপাতালে গিয়ে দেখি আজকে আমাকে দুইটা অপারেশনে দাড়াতে হবে |একটা হলো এক মহিলার প্রস্রাবের রাস্তায় একটা সিস্ট হয়েছে, তা অপারেশন করে ফেলে দিতে হবে| আর একটা ১৬ দিনের বাচ্চার |তার পেটের উপর দিয়ে একটা প্রস্রাবের রাস্তা বানাতে হবে |কারন তার প্রস্রাবের রাস্তায় ভাল্ব আছে |যার ফলে মায়ের পেটের ভিতর থাকা অবস্থায়ই তার কিডনি ফেল হয়ে যাচ্ছিলো |দুটি অপারেশনই ভালো হয়েছে |যদিও আমার বাচ্চাদের অপারেশনে দাড়াতে ভালো লাগেনা |তাদের চিত্কার আমার উপর প্রেসার পড়ে|
এখন ঘুমিয়ে যাবো |
০৫.০৩.১৪
বাসায় আসতে আসতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো| এসে দেখলাম রুদ্র ঘুমিয়ে আছে| সাধারনত সে বিকালে ঘুমায়না |পলিন রান্না ঘরে রান্না করছিলো | বাসায় আসার সাথে সাথে বললো “সারা দিন আমরা একা একা ছিলাম |তোমার অপারেশন শেষ হতে এতক্ষন লাগলো ?” আমি তারদিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করলাম সে কতো টুকু রেগে আছে |
“ একটু পরে আমাকে হাসপাতালে চলে যেতে হবে |” সে বললো | তার নাইট ডিউটি| গাইনির নাইট ডিউটি খুব কষ্টের ব্যাপার |
বললাম “ রুদ্র কখন থেকে ঘুমাচ্ছে |” |
“বিকাল থেকে | সেই কখন থেকে না খেয়ে আছে |” মনোযোগ বাচ্চার দিকে |
“তিন ঘন্টা লাগলো অপারেশন শেষ হতে |দুপুরে ভাতও খেতে পারিনি| গিয়ে দেখি অপারেশন শুরু হয়ে গেছে প্রায় |অপারেশন শেষে ভাত খেয়ে দেখি সাতটা বেজে গেছে |” দুপুরে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে নাসির ভাইয়ের সাথে শাহবাগে ঔষধ মার্কেটে সনি ট্রেডার্সে গেছিলাম |উনি ইনস্টুমেন্ট কিনবেন |আমারও তানভীরের সাথে কাজ ছিলো|তার অফিস অবশ্য সেগুনবাগিচায় | নাসির ভাই আমার সহকর্মী| উনি পাশ করা ইউরোলজিস্ট|বাংলাদেশের অষ্টম এফসিপিএস পাশ করা ইউরোলজিস্ট |কোন এক বিচিত্র কারনে উনি আমাকে নিয়ে ইনস্ট্রুমেন্ট কিনতে যান |
পলিন চা গরম করে দিলো | তার কিছুক্ষন পার সে হাসপাতালে চলে গেলো |তখনো রুদ্র ঘুমাচ্ছিলো |তার মা তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে বলে যেতে চাচ্ছিলো | কিন্তু সে উঠলো না |
০৯.০৩.১৪
কয়েকদিন আগে নাসির ভাই ফোন করে বললো ‘তোকে আমার সাথে কুষ্টিয়া যেতে হবে|’ বললাম ‘কেন’| বললো ‘দুইটা রুগী ভর্তি হবে বৃহস্পতি বারে| তোকে নিয়ে ওটি করবো |বুঝসত প্রথম অপারেশন করবো |তুই থাকলে ভরসা পাই |’
আমি রাজি হয়ে গেলাম |প্রথমত নাসির ভাই আমার খুব কাছের মানুষ|দ্বিতীয় কারন, গেলে কিছু টাকাও পাওয়া যাবে আর কুষ্টিয়া ঘুরে আসা যাবে |আগে আমি কখনো কুষ্টিয়া যাই নাই |
গাড়িতে উঠে আমার মন ভীষন খারাপ হয়ে গেলো | আমার ছেলেকে ছেড়ে কোথাও গেলেই আমার খারাপ লাগতে থাকে |হাসপাতালে ২৪ ঘন্টার ডিউটি থাকলে কিংবা তার নানার বাসায় তাকে তার মা সহ রেখে আসলেও আমার খারাপ লাগে |তার উপর তাকে একটা মিথ্যা কথা বলে এসেছি |বলেছি ‘আমি হাসপতালে ডিউটিতে যাচ্ছি আগামী কাল চলে আসবো |’রুদ্র বললো ‘তুমিতো ডিউটি করে আসলা আবার যাবা কেন |যাওয়া লাগবেনা |’ আমি পলিনের দিকে তাকালাম |মানে হলো আমাকে উদ্ধার করো |সে বললো ‘রুদ্র বাবাকে ডিউটিতে যেতে দাও |যন্তনা করোনা |’
নাসির ভাই বললেন ‘কিরে তোর্ কি মন খারাপ নাকি?’ | বললাম ‘হু’ |’কেন’ নাসির ভাই জানতে চাইলো |বললাম ‘এমনি’ | ‘তোর্ কি ছেলের জন্য মন খারাপ নাকি ?’|উনি কিভাবে বুঝলেন আল্লাহ জানে |
গাড়ি তিনটার সময় ছাড়ার কথা |কিন্তু ছাড়লো তিনটায় |মারুফ ভাইয়ের জন্য দেরি করে হলো |উনি এই গাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত করেন |জ্যামে পরে দেরী হইছে |যদিও দুই তিন জন যাত্রী চিল্লা চিল্লি করছে |
১২.০৩.১৪
হঠাৎ করে দুপুরে সুরজিত ফোন দিয়ে বললো বারডেমে যেতে হবে | সুরজিতের মা গত ২০ দিন ধরে বারডেমের আই সি ইউ তে ভর্তি আছে | অবস্থা ভালোনা | মামুন ও রিপন বাসায় আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলো | তাদের নিয়েই বাসা থেকে বের হয়ে বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে বাসে উঠি | মাঝে রিপন নেমে যায় | আমি ও মামুন যখন বারডেমে পৌছাই তখন সুরজিত ল্যাব এইড গেছে |
মামুন ও আমি আই সি ইউ এর সামনে বসে আছি | তখন রানা (ছ্দ্ম নাম) ভাই ফোন দিলেন | বললেন "হাবিব ভাই আপনি কোথায় "| আমি বললাম "আমিতো বারডেমে"| জানতে চাইলেন আমি এখন ইমার্জেন্সি একটা অপারেশনে আসতে পারব কিনা ? আমি বারডেমে আসার কারনটা বললাম | উনি বললেন "দেখি রাকিব (ছ্দ্ম নাম) ভাইকে পাই কিনা ?" দুই মিনিট পরে ফোন দিয়ে বললেন "কোনো ভাবে আসা যাবে কিনা ? একটা নেফ্রেক টমি করা লাগবে" | মামুন কে বসিয়ে রেখে একটা ট্যাক্সি নিয়ে ২৫ মিনিটের মধ্যে পৌছে গেলাম | গিয়ে ঘটনা শুনে আমার গা ঠান্ডা হওয়ার যোগার |
রানা ভাই একটা ইউরেটারের পাথর অপারেশন করছিলেন | ইউরেটারো রেনোস্কপী | হঠাৎ উনি খেয়াল করেন তার instrument এর মধ্যে পুরো ইউরেটার ছিড়ে চলে এসেছে | এই অপারেশনের সবচেয়ে খারাপ complication. সব সময় শুনে এসেছি |এবার দেখলাম | জিজ্ঞেস করলাম "রোগীর পার্টি জানে ?" বললেন "পুরোটা জানেনা "| বলেছি "ওপেন করতে হবে '| তবে হাসপাতালের সুপারভাইজার জানে | তার রোগী | রানা ভাইকে দেখে মায়া-ই লাগলো |
আমরা ওপেন করে দেখলাম ইউরেটার কিডনি থেকে bladder পর্যন্ত নাই| এবার পার্টিকে বলার পালা | বলতে হবে যে কিডনি কেটে ফেলে দিতে হবে| বইয়ে অনেক কিছু বললেও বাস্তবে আসলে এই অবস্থায় এ ছাড়া উপায় নাই | কিন্তু রোগীর পার্টি যথারীতি রাজী না | আসলে এটাই স্বাভাবিক | কে ই বা রাজি হবে ? রানা ভাই সহ আমরা কিডনি ওপেন করে দাড়িয়ে আছি | আর বাইরে হাসপাতাল ও রোগীর লোক | পার্টিকে বিভিন্ন ভাবে বোঝানো হচ্ছে | কিন্তু তারা বুঝতে চাচ্ছেনা | এর মধ্যে রোগীর একজন অপারেশন থিয়েটারে এসে রোগীকে দেখে গেলো | আসলে যাচাই করতে আসলো রোগী জীবিত আছে কিনা | রানা ভাই পার্টির সাথে কথা বলে আসলে আমি বললাম সিনিয়র কোনো ইউরলোজিস্ট এর সাথে কথা বলেন | বললেন "মোহাম্মদ (ছদ্ম নাম ) সারের সাথে বলছি | স্যার বলছেন এ ছাড়া কিছু করার নাই | পার্টিকে .........হাসপাতালের এর ....... স্যারের সাথে কথা বলিয়ে দিছি |
তারপর আরো কয়েক জন ডাক্তারে সাথে পার্টি কথা বলার পর পার্টি কিডনি কেটে ফেলে দেয়ার সিদ্ধান্ত দিলো |
একজন সার্জনের জন্য আজকের দিনটি সবচেয়ে কঠিন দিন |
সুরজিত ফোন দিয়ে আগামীকাল বারডেমে যেতে বলেছে | বলল জরুরী কথা আছে |
১৩.০৩.১৪
হাসপাতালের কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করে শাহবাগে বারডেম হাসপাতালে গেলাম | দেখি সুরজিত আই সি ইউ এর সামনে যথারীতি বসে আছে | মন খুব খারাপ |গত ২০/২৫ দিন এখানেই বসে থাকে আর তার মায়ের সুস্থ্যতার জন্য অপেক্ষা করে | চট্রগ্রামে আরও ৭দিন বসে ছিলো | আমি খুব অবাক হই | কিভাবে একজন মানুষ এতো কষ্ট করতে পারে | নিজে সময় দিতে পারিনা বলে খুব খারাপ লাগে | বুঝতে পারি আমরা গেলে তার একটু ভালো লাগে |
আসাদ আসার পর সুরজিত বললো " মার অবস্থা খারাপ | অক্সিজেন স্যাচুরেশন দিনে দিনে আরো কমছে | মার বাচার আশা কম | বরং উনি কস্ট পাচ্ছেন | আমি বারডেমের পরিচালকের কাছে ইনটিউবেশনের নল খুলে দেয়ার জন্য আবেদন করেছি |আগামীকাল সম্ভবত খুলে দিবে |তোরা মাকে নেয়ার জন্য একটু হেল্প করবি | মানে এম্বুলেন্স ঠিক করে দিবি |" বলে সুরজিত কেদে ফেললো |
আমি ঠিক কি বলব বুঝতে পারলামনা | শুধু বললাম " ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিস |"
একটু পরে আমরা তিন জন হাসপাতালের কেন্টিনে গেলাম |সুরজিত তখন পর্যন্ত কিছু খায়নি | কিন্তু সে চোখের পানির জন্য কিছু খেতে পারলনা | একজন অসহায় সন্তানের কান্না ছাড়া কিবা-ই করার আছে |একটু পর দেখি আমার চোখেও পানি চলে এসেছে |
আজকের দিনটি একজন সন্তানের জন্য সবচেয়ে কঠিন দিন |
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জুন, ২০১৪ দুপুর ১২:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



