somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বড় ঘৃণা হয়, বড় ঘৃণা হয়, বড় ঘৃণা.....

০৮ ই এপ্রিল, ২০১৬ দুপুর ২:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বেশ কয়েক বছর ধরে আমাদের গলিটায় একজন লোককে রিক্সা চালাতে দেখেছি আমি। গরম কালের বেশির ভাগ সময়ই তিনি উদোম গায়ে রিক্সা চালাতেন। গায়ের মলিন ফতুয়াটি খুলে কাঁধে ঝুলিয়ে রাখতেন। দেখে মনে হতো, পিঠের সাথে পেট লেগে গেছে যেন। প্যাডেলে চাপ মারার সময় পাঁজরের হাড়গুলো ভেসে উঠতো তার। পিঠের মেরুদণ্ডের হাড়টা কুঁজো হয়ে যেত।

একদিন জিজ্ঞেস করলাম, "চাচা আপনার কি ছেলেপুলে নেই? এই বয়সে এই শরীর নিয়ে রিক্সা চালাচ্ছেন?"

তিনি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, "আছে বাবা, আছে। দুইডা পোলা আছে। একটা মাইয়া। দুই পোলাই শাদি কইরা আলাদা সংসার পাতিছে। বউ বাচ্চা লই থাকে। আমি মাইয়া আর তোমার চাচিরে লইয়া থাকি।"

"ছেলেরা আপনাকে দেখে না? টাকা পয়সা কিছু দেয় না?"

বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। তারপর বললেন, "পোলারা যা ইনকাম করে তাতে তাগোরই হয় না। আমারে কি দিবো? দোয়া করি তারা বউ বাচ্চা লই ভালো থাকুক। আমি নিজেরটা নিজেই চালাতি পারি। তিনটা মাত্র পেট, চইলা যায় কুনুমতে।"

বৃদ্ধের পরনের লুঙ্গিটার দিকে নজর গেল আমার। মলিন কটকটে সবুজ রঙের খাটো একটি লুঙ্গি। বললাম, "চাচা আমি আপনাকে দুইটা লুঙ্গি কিনে দিতে চাই, নিজ হাতে। আর একটা পাঞ্জাবিও দিবো। ঐ মার্কেটটার সামনে একটু রাইখেন।"

আমি তখন ছাত্র । অনার্স থার্ড ইয়ার চলছে। খরচের পয়সা থেকে বাঁচানো কিছু টাকা ছিল হাতে।

বৃদ্ধ আস্তে করে রিক্সাটা থামালেন। তারপর আমার দিকে বেশ কিছু সময় অদ্ভুত চাহনিতে তাকিয়ে থাকলেন। বললেন, "বাবাজি আমার পোলারাও কোনদিন আমারে এমন কথা কয় নাই। আমি সারাজীবন রিক্সা চালাইয়া তাগোরে খাওয়াইছি। বড় করছি। চৈত মাসের রইদ, মাঘ মাসের শীত, ভাদ্র মাইস্যা বিষ্টি- কোনদিন ঘরে থাকি নাই। রাস্তায় রিক্সা চালাইছি। চাইল কিইনা নিছি, তরকারি নিছি। তারপর পোলাগোরে খাওয়াইছি। তারা কোনদিন এমন কথা কয় নাই বাবাজি।"

মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে দুইটা শশা কিনে লবণ মেখে একসাথে খেলাম দুজন। তারপর মার্কেটে ঢুকে একজোড়া নতুন লুঙি আর একটা পাঞ্জাবি কিনে এনে বৃদ্ধের হাতে দিলাম। নতুন লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি হাতে পেয়ে বৃদ্ধ কেঁদে ফেললেন। ভাবলাম, কতো অল্পতেই সুখি কিছু মানুষ! যেই সুখে চোখে জল নেমে আসে তাদের।

বৃদ্ধের ছেলে দুটির জন্য আমার করুণা হলো। তাদের বাবার এই আনন্দাশ্রু দেখার সৌভাগ্য হয়নি তাদের।

একদিন জানতে পারলাম, এর মাস কতেক পরই বৃদ্ধ মারা গেছেন। অনেকদিন তাকে দেখতে না পেয়ে স্ট্যান্ড এর কয়েকজন রিক্সাঅলাকে জিজ্ঞেস করলে, তারা জানালেন, বৃদ্ধ মারা গেছেন। তার স্ত্রী ও কণ্যা কোথায় গেছে কেউ জানে না।

আমি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম।

বৃদ্ধের ছেলেরা মূর্খ আর অভাবী ছিল। কিন্তু আমাদের এই সমাজের অনেক শিক্ষিত সক্ষম সন্তানদের পিতা-মাতাকেও আমরা জীবনের শেষবেলায় বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নিতে দেখি। দেখি, বাবা-মা একসময় তাদের কাছে হয়ে ওঠেন বুড়া-বুড়ি। হয়ে ওঠেন অনেক ভারী বোঁঝা। যেই ভারী বোঁঝাটি মাথা থেকে নামাতে পারলেই যেন, চিরদিনের মতো বেঁচে যান তারা।

সেসব সন্তানদের জন্য আমার করুণ হয় না। বড় ঘৃণা হয়, বড় ঘৃণা হয়, বড় ঘৃণা.....

নিচে একজন বৃদ্ধ বাবার ছবি, এই গরমে কাজের ফাঁকে যিনি মাথা ঘুরে পড়ে যান, আরেকজন বৃদ্ধ বাবা তার মাথায় পানি ঢালছেন, ছবিটি অনেক কিছু বলছে আমাদের, কিন্তু আমরা কি তা শুনতে পাচ্ছি???

সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই এপ্রিল, ২০১৬ দুপুর ২:৪২
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

খেলা ফাইনাল হয়ে যেতে পারে আগামীকাল ...

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:৪৮


আগামীকাল অপপ্রচারকারীদের খেলা ফাইনাল হয়ে যেতে পারে। গ্যাস আর বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে সরকারকে কাবু করার দিন ফুরিয়ে এসেছে। 'কাছিমের মতো গর্ত থেকে বের হয়ে' যারা এতদিন সরকারের... ...বাকিটুকু পড়ুন

নতুন ভোরের গান

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ ভোর ৬:৪৭


নতুন ভোরের গান



কষ্টের দিন পেরিয়ে এবার
আসবে আলোর গান,
নতুন দিনের নতুন সুরে
জাগবে সবুজ প্রাণ।

নষ্ট স্মৃতির আড়ষ্টতা
ঝরিয়ে দেবো অনেক দূরে,
নিজের মনেই ভালোবাসার
নূপুর বাজবে সুরে সুরে।



ভ্রষ্ট পথের আঁধার কেটে
ভোর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগে চার বছর একদিন হয়ে গেল । কি আশ্চর্য!

লিখেছেন সামরিন হক, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ ভোর ৬:৪৭

অবজ্ঞা

তোমার বিশেষ ঘৃণা দ্বারা আক্রান্ত আমি
চারপাশ ঘিরে ফেলেছে ঘৃণারা আমাকে
আস্তে আস্তে গ্রাস করে নিচ্ছে আমাকে তোমার ঘৃণা
আমার কথা শোন
আমি কখনই মনুষ্যত্বের সীমা পার করিনি
কিন্তু তোমার ঘৃণায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

গুপ্ত-গায়েব-গুম এবং পিওর ও শিওর লাভ

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:১৬


৭ মাসে বাংলাদেশে ১৫ হাজার শিশু নিখোঁজ !!!
এমন রোমহর্ষক, চমকে যাওয়া এবং অন্তরে কাপুনি ধরানোর মতো তথ্য বা কথা বার্তার কোনও মানে হয় ??!!
গরীব পরিবারের শিশুদের কথা বাদ দেই-এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

সরকারী অফিসারদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:০০

দেশের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সরকারী অফিসারদের হাত ধরেই হয়। সেজন্যে, এই পদগুলো যোগ্য মানুষদের হাতে যাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু, সমস্যা হচ্ছে, গত কয়েক দশকে দেশের টপ ট্যালেন্টদের বেশির ভাগই কোনক্রমেই সরেকারী অফিসার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×