বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে ভারত ইতোমধ্যে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় স্থান দখল করে নিয়েছে। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে ভারতীয় গার্মেন্টের সাব কন্টাক্টের কাজ করতে হতে পারে। এর কারণও হয়তো সত্য হতে চলেছে। তবে আমরা সবাই আশা করবো, যেন বিষয়টি কখনো সত্য না হয়, কারণ বাংলাদেশের সবচেয়ে বিনিয়োগ এবং লাভজনক খাত এটি।
এবার বর্ণনায় যাওয়া যাক। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর না হওয়ায় দেশের বিনিয়োগ খরা কাটছে না। গত প্রায় এক বছর ধরে চলা এই মন্দাভাব আরও প্রকট হচ্ছে। বর্তমানে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগে যেতে চাচ্ছেন না কেউ। পাশাপাশি শিল্পে গ্যাস-বিদ্যুতের নতুন সংযোগ না দেয়া ও অবকাঠামোগত দুর্বলতাকে এর জন্য দায়ী করেছেন বিশ্লেষকরা। উদ্যোক্তাদের মতে, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার জন্য দীর্ঘদিন থেকে বলা হলেও এ ব্যাপারে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তারা মনে করেন, দেশে শিল্প খাতের বিকাশ হোক এটা অনেকে চায় না। এ কারণে নানা ধরনের ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ওই গ্রুপটি বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে একটি দেশি-বিদেশি সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই চক্রের সবচেয়ে বড় ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে দেশের অর্থনীতির প্রাণ তৈরি পোশাকশিল্প। দুই কোটি মানুষের রুটি-রুজির উৎস এই খাতটিকে পেছনে ঠেলে দেয়া হয়েছে। আমাদের প্রধান প্রতিযোগী ভারতকে পথ করে দেয়া হয়েছে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিনিয়োগ বাড়াতে আগে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর করে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এজন্য গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবি তুলেছেন ব্যবসায়ীসহ বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা। গার্মেন্ট ব্যবসায়ীদের জিএসপি ফিরে পাওয়ার সব আশা উবে গেছে বুধবারের যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির (ইউএসটিআর) প্রতিবেদনে। ওই প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, জিএসপি ফিরে পাওয়ার জন্য বাংলাদেশ কিছু শর্ত পূরণ করেছে। তবে আরও অনেক শর্ত বাকি আছে। এগুলো পূরণ না হলে জিএসপি ফিরিয়ে দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবে ওবামা প্রশাসন। এদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বাগাড়ম্বর করেই যাচ্ছেন। গতকালও তিনি বলেছেন, আমরা সব শর্ত পূরণ করেছি। তাই জিএসপি ফিরে পাবো।
এদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, জিএসপি ফিরে পাওয়ার পথে বাংলাদেশ যতটা এগিয়েছিল তার চেয়ে বেশি পিছিয়ে গেছে ইন্ডাস্ট্রি অল’এর চিঠি নিয়ে সম্প্রতি বণিজ্যমন্ত্রী ও বিজিএমইএ সভাপতির বক্তব্যের কারণে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক এই শ্রমিক সংস্থাটি বাংলাদেশের শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন হচ্ছে মর্মে চিঠি দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি সংগঠনটির বাংলাদেশ অংশের নেতাদের শাস্তির আওতায় আনার ঘোষণা দেন। বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে ইন্ডাস্ট্রি অল-এর নেতাদের শাস্তি দেয়ার আবেদন জানান। এর প্রতিক্রিয়ায় উদ্বেগ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহকারী মুখপাত্র এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের কথা জানান। এই পরিপ্রেক্ষিতেই ইউএসটিআর এই প্রতিবেদন দিতে পারে বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষক ও খাত সংশ্লিষ্টরা। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাতজন কংগ্রেসম্যান সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন, বাংলাদেশে শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। এসব কারণে বিশ্লেষকদের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে, সরকারের নেতিবাচক কর্মকা-ের কারণেই দেশের সবচেয়ে বড় শিল্প খাতটির দুর্দশা কাটছে না।
বিনিয়োগ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত কয়েকদিন আগে বলেছেন, রাজনৈতিক সহিংসতায় অগ্নিকান্ড ঘটানোর কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আসেনি। সাধারণত বিদেশিদের কাছে অগ্নিকান্ড আতঙ্কের বিষয়। এটি অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। এই অগ্নিকান্ড বিদেশিদের মনে আঘাত করেছে। হরতাল যতটা আঘাত করে, তার চেয়ে বেশি আঘাত করেছে জ্বালাও-পোড়াও। বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য এটি বন্ধ করতে হবে।
বিনিয়োগ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, বর্তমানে দেশি-বিদেশি কোনো ধরনের বিনিয়োগ আসছে না। এর বড় কারণ হলো রাজনৈতিক অস্থিরতা। ব্যবসায়ীদের ধারণা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এখনও কাটেনি। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে গুম-হত্যা দেখে মনে হচ্ছে, দেশে আইনের শাসনের অভাব রয়েছে। এ অবস্থায় কেউ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করতে চাইবে না। তার মতে, বাজেটের পর জুলাই মাসে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়তে পারে।
এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, দেশি-বিদেশি কোনো বিনিয়োগই হচ্ছে না। কয়েকটি কারণ রয়েছে। ২০১৩ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল। এছাড়া শিল্পের মূল উপাদান হলো গ্যাস-বিদ্যুৎ। কিন্তু নতুন গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রয়েছে। তিনি বলেন, দেশের রফতানি আয়ের মূল খাত তৈরি পোশাক। আন্তর্জাতিক বাজারেও এর চাহিদা কমছে। ফলে কেউ কেউ নতুন করে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছে না।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান বলেছেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণেই দেশে বিনিয়োগ হচ্ছে না। দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে রাজনৈতিক সমঝোতার প্রয়োজন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বলেন, বিনিয়োগ খরা কাটাতে হলে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই।
বিনিয়োগ খরা
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আমানতের তুলনায় ঋণ প্রবৃদ্ধি অর্ধেকে নেমে এসেছে। এ সময় আগের তুলনায় রাষ্ট্রীয়, বেসরকারি এবং বিদেশি খাতের ১৯টি ব্যাংকের ঋণ প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক পর্যায়ে রয়েছে। আলোচ্য সময়ে ঋণ ও আমানতের গড় অনুপাত (এডিআর) দাঁড়িয়েছে ৭০ দশমিক ৬৬ শতাংশ। যা গত জানুয়ারিতেও ছিল ৭১ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ১০ এপ্রিল ব্যাংক ব্যবস্থায় মোট ৬ লাখ ৪১ হাজার ২৩৪ কোটি ৫ লাখ টাকা আমানত ছিল। আলোচ্য সময়ে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ৪ লাখ ৭০ হাজার ৮৮৬ কোটি ৮ লাখ টাকা। এ সময় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় গড় আমানত বেড়েছে ১৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। আর ঋণে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। সে হিসাবে আমানতের তুলনায় ঋণ প্রবৃদ্ধি অর্ধেকে নেমে এসেছে।
বিনিয়োগের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন বলেন, দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নেই। গত কয়েক বছর বিনিয়োগের খারাপ অবস্থা চলছে। এর ফলে ব্যাংকে প্রচুর অলস টাকা জমা পড়ছে। দেশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে তারা বিনিয়োগে আস্থা পাচ্ছে না।
বিনিয়োগ নিবন্ধন কম
চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ এই তিন মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বিনিয়োগ কম এসেছে। বিনিয়োগ বোর্ডের সর্বশেষ তথ্য মতে, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ৪৩২টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে ১৫ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে স্থানীয় বিনিয়োগের প্রস্তাব হচ্ছে ১৪ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা ও বিদেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে ১ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা। এই নিবন্ধের অনুকূলে ৮৪ হাজার ১২৮ জনের কর্মসংস্থানের প্রস্তাব আসে। বিদেশি বিনিয়োগের তথ্য অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্র“য়ারি, আট মাসে বিনিয়োগ এসেছে প্রায় ১১৫ কোটি মার্কিন ডলার। গত বছর একই সময়ে এই বিনিয়োগ আসার পরিমাণ ছিল ১১১ কোটি ডলার।
বাংলাদেশকে টপকে পোশাক রফতানিতে ভারত এগিয়ে
জাতিসংঘের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইউএন কমট্রেড থেকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে বস্ত্রখাতে বিশ্ববাজারে ভারতের অংশীদারিত্ব এর আগের বছরের তুলনায় ১৭.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের তুলনায় ভারতের প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৯ শতাংশ বেশি। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ভারতের পোশাক রফতানি হচ্ছে ৪০২০ কোটি ডলারের। ভারত এ খাতে পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ, ইতালি ও জার্মানির মতো দেশকে। মালয়েশিয়ার বার্তা সংস্থা বারনামা এই তথ্য দিয়েছে। বারনামার রিপোর্টে আরও বলা হয়, গত বছর বিশ্বব্যাপী বস্ত্রশিল্পে প্রবৃদ্ধির হার মাত্র ৪.৭ শতাংশ হলেও ভারতে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২২ শতাংশ। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৫.৪ শতাংশ।
চীনের বাজার দখলে বাংলাদেশের কোনো উদ্যোগ না থাকলেও ভারত ব্যাপক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ভারত সরকার ৫০টি সমন্বিত টেক্সটাইল পার্ক তৈরির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে। ইতোমধ্যে ভারতের ৯টি রাজ্যের ২৬টি পার্কে স্থাপিত হয়েছে ৫৯২টি ইউনিট। পোশাক খাতের আন্তর্জাতিক বাজার ধরতে ভারত সরকার ২০০৯-১০ সাল থেকে এসব প্রকল্পে অর্থ সরবরাহ শুরু করছে। এখন পর্যন্ত তারা মঞ্জুরিকৃত অর্থের ৪০ শতাংশ বা ১২.৭৬ বিলিয়ন রুপি ব্যয় করেছে।
ইউএসটিআরের বিজ্ঞপ্তি
গত বুধবার ইউএসটিআরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ উন্নয়নে বাস্তব পদক্ষেপ নিলে জিএসপি স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারে বিবেচনা করবেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, শর্ত বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকারের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করেছে ওবামা প্রশাসন। এতে দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এখনো ওই কর্মপরিকল্পনার উল্লেখযোগ্য অংশ বাস্তবায়ন করেনি। শ্রমিকদের অধিকার ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার উন্নয়নে বাংলাদেশকে আরও কাজ করতে হবে।
মার্কিন জিএসপি উপকমিটি ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবে। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারে রানা প্লাজায় ধসের পর কারখানার কর্ম পরিবেশের উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের পণ্যে অগ্রাধিকারমূলক বাজার-সুবিধা (জিএসপি) স্থগিত করে আমেরিকা।
প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে প্রমাণিত হয়, বাংলাদেশ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত পূরণ করতে পারেনি।
কার্টেসী: ব্লগটি তৈরিতে আমাদের সময় ডট কমের সহায়তা নেয়া হয়েছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





