ঈদের আগে কাজের চাপ এমনিতেই বেশি। তারমধ্যে কথাবার্তা নেই হঠাৎ কাউকে সাক্ষাৎকারের জন্য সময় দেয়ার প্রশ্নই উঠে না। কিন্তু ভদ্রলোক এমনভাবে ধরেছে না করতে পারে নি পার্থ। পার্থ আহমেদ। গত পনেরো বছর ধরে দেশের মিডিয়া জগতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এই তারকা। শুরুটা মডেলিং দিয়ে হলেও এখন নাটকেও তাঁর সমান দাপট। জনতার ভোটে প্রায় প্রতিবছর সেরা মডেল অভিনেতার পুরষ্কার জন্য তাঁর জন্য বাঁধা হয়ে গেছে।
আজ দুপুরে যখন ফোনটি এলো তখন ভাত খাচ্ছিল সে। সামান্য খাওয়া, অল্প ভাত, পুই শাক ভাজি আর ডাল। এরচেয়ে বেশি কিছু খাওয়ার উপায় নেই। মুটিয়ে যাওয়ার ভয় থাকে। নতুন নতুন ছেলেমেয়ে উঠে আসছে। আগের তারকাদের চেয়ে এখন অনেক স্বাস্থ্যসচেতন হতে হয় পার্থদের। চল্লিশ পার হয়ে গেলেও নিজেকে এখনো তরুন করে রাখতে পেরেছে সে। অল্পবয়েসী মেয়েদের কাছে তাঁর আবেদন এখনো ফুরিয়ে যায় নি।
ফোনটা না ধরে খাওয়ায় মনোযোগ দিয়েছে পার্থ। দেখা যাক আবার করে কি না। নাছোড়বান্দা হলে তারপর সাক্ষাৎকারের ব্যাপারটা ভাবা যাবে। হাবিজাবি পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিয়ে নিজের ওজন কমাতে চায় না সে।
মোবাইলটা আবার বেজে উঠলো।
‘হ্যালো,’ কন্ঠস্বর যতোটা সম্ভব গম্ভীর করার চেষ্টা করল পার্থ।
‘স্যার, আজ দুপুরে সময় দিয়েছিলেন, আমি কি আসবো?’
আজ দুপুরেই সময় দিয়েছিল কি না ভাবার চেষ্টা করল পার্থ। এরকম কথা দিলে তাঁর মনে থাকার কথা। অথচ লোকটারও মিথ্যে বলার কোন কারন নেই।
‘আপনি এখন কোথায়? এক্ষুনি বেরুতে হবে আমাকে?’
‘স্যার, আপনার বাসার গেইটে। আপনি বললে চলে আসবো।’
‘ঠিক আছে, আসুন,’ বলল পার্থ। খাওয়া শেষ না করেই উঠে পড়ল পার্থ। বাসায় এখন কেউ নেই। স্ত্রী সায়মা মেয়েকে নিয়ে স্কুলে। ফিরতে আরো ঘন্টাখানেক সময় লাগার কথা। হাত ধুয়ে বসার ঘরে চলে এলো পার্থ। চমৎকার সাজানো গোছানো ড্রইংরুম। যে কাউকে ডেকে এনে বসানো যায়। একপাশে ক্রেস্ট রাখার একটা তাক বানিয়েছে সায়মা কিছুদিন আগে। সেখানে পার্থর পাওয়া সব পুরষ্কার থরে থরে সাজানো। একপাশে দেয়ালে বাধানো কিছু ছবি তাঁর দারুন সব অর্জনের সাক্ষ্য দিচ্ছে।
কলিং বেল বেজে উঠলো এই সময়। কাজের মেয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিয়েছে। লিকলিকে লম্বা একজনকে ভেতরে ঢুকতে দেখল পার্থ। মুখে দাড়িগোঁফের জঙ্গল। এখনকার মিডিয়া সাংবাদিকরা অনেক স্মার্ট, সে তুলনায় এই লোকটাকে পুরানো দিনের কাঁধে ঝোলাওয়ালা কবি বলে মনে হচ্ছে।
সোফায় আরাম করে বসেছে পার্থ। ইশারায় অপরদিকের সোফায় বসতে বলল সাংবাদিককে।
লোকটার চেহারা ভালো করে দেখে নিচ্ছে পার্থ। একসময় ফর্সা ছিল বোঝা যায়, গায়ের রঙ এখন তামাটে হয়ে গেছে। দাড়িগোঁফের আড়ালে পুরো মুখটা ঢেকে গেলেও সুন্দর তীক্ষ্ণ চোখ জোড়া তাঁর দৃষ্টি এড়াল না। লোকটা বুদ্ধিমান এবং জ্ঞানী, এই রকম একটা ভাবনা মাথায় এলো পার্থর। সাবধানে কথা বলতে হবে।
‘আমি, পিয়াস রহমান, সাপ্তাহিক কালের খবর থেকে এসেছি,’ হাত বাড়িয়ে দিয়েছে লোকটা, হ্যান্ডশেক করার জন্য।
ইচ্ছে না থাকলেও অভদ্রতা করলো না পার্থ। সাপের মতো লিকলিকে হাত, ফর্সা, লোমশ।
‘হাতে সময় বেশি নেই, কি কি জানতে চান ঝটপট বলুন?’
‘আপনি কি খেতে ভালোবাসেন?’
‘কি আশ্চয্য! এই প্রশ্নের উত্তর তো আমি হাজারবার দিয়েছি, আপনি বোধহয় আমার উপর কোন স্টাডি করেন নি,’ বেশ রাগত গলায় বলল পার্থ।
‘আপনি বলুন প্লিজ, হয়তো আপনার পছন্দের খাবারের পরিবর্তন হয়েছে, হতে পারে না?’
‘খুব পারে। আগেও মাছ-ভাত পছন্দ করতাম, এখনো তাই।’
‘কার গান শুনতে পছন্দ করেন?’
‘কিশোরকুমার, হেমন্ত আর ----’
‘ঠিক আছে, আর লাগবে না। কার বই পড়তে ভালোবাসেন?’
‘দেখুন এই ধরনের এলেবেলে প্রশ্নের উত্তর ছাপিয়ে সাক্ষাৎকার দেয়ার প্রয়োজন নেই আমার। আপনি এখন আসতে পারেন।’
‘স্যার, আরেকটা প্রশ্ন, যা অন্য কেউ কখনো করে নি।’
‘প্রশ্নটা কি?’
‘লোক ঠকাতে কেমন লাগে আপনার?’
‘গেট আউট!’ রাগে সোফা থেকে লাফিয়ে উঠলো পার্থ। পিয়াল রহমান নামে ফালতু সাংবাদিকটাকে লাথি মেরে ঘর থেকে বের করে দিতে ইচ্ছে করল তাঁর। কিন্তু মেজাজ সামলে রাখতে হবে, যেভাবেই হোক।
উঠে দাঁড়িয়েছে সাংবাদিক। দরজা দিয়ে বের হওয়ার আগে চারপাশে তাকাচ্ছে, যেন দেখে নিচ্ছে কোথায় কি আছে? লোকটাকে হঠাৎ পরিচিত মনে হলো পার্থ’র কাছে। একে কোথাও দেখেছে সে, এই মুখ, হাঁটাচলা অনেকটাই পরিচিত। কিন্তু মনে পড়ছে না কিছু।
‘এই যে ভাই, আপনি দাঁড়ান?’ হাঁক দিয়ে ডাকল পার্থ। ‘আপনাকে আমার চেনা চেনা লাগছে।’
কথা শুনতে পায় নি এমন ভঙ্গিতে বের হয়ে যাচ্ছে সাংবাদিক। পিছু পিছু যেতে ইচ্ছে করলেও নিজেকে সংযত করল পার্থ। হাত ঘড়ির দিকে তাকাল। ফালতু কাজে অনেকটা সময় নষ্ট হলো। এখুনি বের হতে হবে। শুটিং-এ সময়মতো না যাওয়ার রেকর্ড নেই তার।
‘কাট! কাট!’ ডিরেক্টরের কন্ঠ শোনা গেল। মনিটর থেকে মুখ তুলে তাকিয়েছে পার্থের দিকে। শট ওকে হয়েছে। নাটকে প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করছে পার্থ। নাটকে তার ভূমিকা একজন বৃদ্ধের, নস্টালজিয়ায় ভোগে। যখন তখন পুরানো দিনের কথা মনে পড়ে যায়, তাই নিয়ে কাহিনি এগুচ্ছে।
শট শেষ হওয়ার পর একটু বিরতি নিচ্ছে সবাই। বাইরে এসে সিগারেট ধরাল পার্থ। নায়িকার রোল করছে যে মেয়েটা সে এখনো আসে নি, ওর সাথে দুটো শট আছে, সেগুলো করলে আজকের মতো কাজ শেষ। মেয়েটা নতুন তবে সুন্দরী বলে কিছুটা অহংকারীভাব আছে। অভিনয়ও ভালো জানে। যদিও সময়জ্ঞান একেবারেই কম। বিরক্তিতে সিগারেটটা ছুঁড়ে মারল পার্থ। মোবাইল ফোন বেজে উঠলো এই সময়।
অচেনা নাম্বার থেকে ফোন। সাধারনত এই ধরনের কল রিসিভ করে না পার্থ। কিন্তু আজ করলো।
‘হ্যালো।’
‘পার্থ আহমেদ বলছেন?’
‘জ্বি বলছি।’
‘আপনার জন্য একটি সুসংবাদ আছে।’
‘তার আগে বলুন আপনি কে বলছেন?’
‘সুসংবাদ তো বন্ধুরাই দেয় তাই না।’
‘হতে পারে। কিন্তু অচেনা বন্ধু আমার পছন্দ নয়।’
‘কি যে বলেন। আপনার অনেক অচেনা বন্ধু ছিল এবং আছে।’
‘হাতে সময় কম। কি বলবেন তাড়াতাড়ি বলুন।’
‘শেষ কখন আপনার স্ত্রীর সাথে কথা হয়েছে?’
‘বিকেলে, কেন?’
‘সুসংবাদ হচ্ছে তারা আমার কাছে আছে, নিরাপদে আছে।’
‘ঠাট্টা করছেন?’
‘এবার দুঃসংবাদটা শুনুন।’
‘অ্যা।’
‘আপনার স্ত্রী এবং মেয়ে আমার কাছে এখনো নিরাপদে আছে, তবে আপনার হাতে সময় আছে আধঘন্টা। ধানমন্ডি লেকের কাছে চলে আসতে এর চেয়ে বেশি সময় লাগার কথা না।’
‘ফাইজলামি করার জায়গা পান না। আমি---’
লাইনটা কেটে গেছে। ফোনটা হাতে নিয়ে চুপচাপ কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে রইলো পার্থ। মাথায় কিছু ঢুকছে না। বিকেলেও সায়মার সাথে কথা হয়েছে। টুটু’র সাথে কথা হয়েছে। সবকিছু স্বাভাবিক। এর মধ্যে কিভাবে?
এখন চিন্তা করার সময় নেই। মোবাইল ফোনে তাড়াতাড়ি সায়মার নাম্ভারে ডায়াল করল পার্থ। রিং হচ্ছে, ধরছে না। ক্রমাগত চেষ্টা করছে পার্থ। ঘামছে সে এখন। ডিরেক্টরের একজন এসিস্ট্যান্ট এসে ইশারায় ডেকে গেল। নায়িকা সম্ভবত এসে পড়েছে। আবারো চেষ্টা করলো পার্থ। এবার ফোনটা বন্ধ পাওয়া গেল। এরকম হয় মাঝে মাঝে। টুটু মোবাইল ফোন নিয়ে খেলে, মাঝে মাঝে চাপ দিয়ে বন্ধ করে ফেলে। আজকেও এরকম কিছু হতে পারে, অসম্ভব না। কিন্তু... বাসার টেলিফোন লাইনে ডায়াল করলো এবার। রিং হচ্ছে। কেটে দিলো পার্থ। টেলিফোনটা অনেক দিন ধরেই ডেড। সময় হচ্ছে না বলে ঠিক করা হয় নি। এখন একমাত্র উপায় বাসায় গিয়ে দেখে আসা। উত্তরার এই শুটিং স্পট থেকে বাসায় যেতে কমপক্ষে ঘন্টাখানেক সময় লাগবে অথচ ফোনে হুমকি দিয়েছে আধ ঘন্টার মধ্যে ধানমন্ডি লেকের সামনে যেতে।
যেতে যেতে এক কাজ করা যায় অবশ্য। যে ফোন থেকে কল এসেছিল তার লোকেশন এবং নাম্বারধারীর নাম ঠিকানা জোগাড় করা। র্যাবে তার ঘনিষ্ট লোক আছে, ইফতেখার, ছোট বেলার বন্ধু, ফোন করে জানালেই সব বের করে দেবে। কিন্তু এখনি এতোদূর যেতে ইচ্ছে করছে না। পুরোটা ধাপ্পাবাজিও হতে পারে।
‘স্যার, মাড্যাম আইস্যা পড়ছে, শট রেডি,’ ডিরেক্টরের এসিস্ট্যান্ট ছেলেটা আবার এসে ডাকল তাকে।
‘যাও, আসছি,’ বলল পার্থ।
ছেলেটা চলে যাওয়া মাত্র জানালা দিয়ে ভেতরের অবস্থা দেখে নিলো পার্থ। ভেতরে সবাই ব্যস্ত। কেউ তার দিকে তাকিয়ে নেই। পাশেই সিঁড়ি দিয়ে দোতলা থেকে সহজেই নেমে পড়া যায়। কেউ দেখবে না। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। নিজেকে একটু অন্ধকারে নিয়ে গিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো পার্থ। সামনেই তার গাড়ি। দেরি করার সময় নেই। আগে স্ত্রী, কন্যার জীবন, তারপর নাটক-ফাটক। তার ফর্সা চেহারা এরমধ্যে লাল হয়ে গেছে উত্তেজনায়। পকেট থেকে গাড়ির চাবি বের করতে গিয়ে চাবি পড়ে গেল কয়েকবার, হাত থেকে।
কোনমতে গাড়ি স্টার্ট দিল পার্থ।
রাস্তায় নামতেই মাথা খারাপের মতো অবস্থা হলো। ট্রাফিক জ্যাম। এফএম রেডিও চলছিল। বন্ধ করে দিল রাগের চোটে। একটা সিগারেট ধরালো পার্থ। মাথা জ্যাম হয়ে আছে। তার সাথে এই ধরনের ঘটনা ঘটবে চিন্তাও করা যায় না অবশ্য বাংলাদেশে সবকিছুই সম্ভব। অচেনা নাম্বারটায় ডায়াল করলো পার্থ। রিং হচ্ছে।
‘হ্যালো?’
‘হ্যালো,’ গলার স্বরটা চিনতে পারলো না পার্থ। একটু আগে এই কন্ঠস্বর শোনে নি সে।
‘ভাই একটু আগে এই নাম্বার থেকে কল এসেছিল একটা,’ পার্থ বলল। তার গলা কিছুটা কেঁপে গেল বলতে গিয়ে।
‘ভাই, এটা মোবাইলের দোকান। কই মাইনষেই তো ফোন করে,’ ওপাশ থেকে শুনতে পেল পার্থ।
‘ভাই জায়গাটা কোথায়?’
‘উত্তরা।’
‘উত্তরা কোথায়?’
‘সাত নাম্বারে সেকটর, ক্যান ভাই, কোন সমস্যা?’
‘ন-না, সমস্যা নেই, ভাই রাখি,’ ফোন রেখে দিল পার্থ। মাথা কাজ করছে না। তার শুটিং স্পটও সাত নাম্বার সেকটরে। যে লোকটা ফোন করেছিল সে কি তাহলে রসিকতা করেছে, নাকি সত্যি সত্যি সায়মা আর টুটুকে নিয়ে গেছে? লোকটা কি তার পেছন পেছনেই আসছে? সাত নাম্বার সেকটর থেকে ফোন করার কারন কি? লোকটা কি তাহলে তাকে ফলো করছে? আশপাশে জ্যামে আটকানো কয়েকটা গাড়ির দিকে তাকাল পার্থ। সব স্বাভাবিক, বিরক্তিতে কুঁচকে থাকা চেহারা। এদের মধ্যে ঐ লোকটা থাকলেও তাকে চেনার কোন উপায় নেই।
বাসার নাম্বারে আবার চেষ্টা করল পার্থ। সায়মার নাম্বার সুইচড অফ। রাগে পাশের সীটে মোবাইল ফোনটা ছুঁড়ে মারল পার্থ। জ্যাম ছেড়ে দিয়েছে, কেটে সামনে এগুতে চাচ্ছে পার্থ, কিন্তু গাড়িগুলোর মাঝে দূরত্ব এতো কম! এর মধ্যে দ্রুত চালানো কঠিন। পাশের নীল রঙের টয়োটা এতো কাছ ঘেষে চলছে, যে কোন সময় লেগে যেতে পারে। কিন্তু সেদিকে নজর নেই পার্থর। সামনের ট্রাফিকের দিকে নজর তার, কোন সময় আবার পথ আটকে দেয়। এতেই ভুল হয়ে গেল। নীল রঙের গাড়িতে ছোট একটা ধাক্কা দিল পার্থর সাদা গাড়িটা। ব্যস! নীল গাড়ির ড্রাইভার পথ আটকে দাঁড়াল। চাঁড়ালের মতো চেহারার ড্রাইভার নেমে এসেছে গাড়ি থেকে। মুখে যা আসে বলছে।
পার্থের পাশে এসে দাঁড়াল ড্রাইভার।
‘ভাই নামেন?’ রাগে গর্জে উঠে বলল ড্রাইভার।
‘নামছি। কি হয়েছে?’
‘কি হইছে মানে? পেছনের দরজা পুরা ভচকাইয়া দিছেন আবার বলেন কি হইছে?’
‘ঠিক আছে, ক্ষতি পূরন যা লাগবে দেবো,’ নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে পার্থ, এখানে বেশি সময় নষ্ট করা যাবে না।
‘আপনে নাটক করেন না?’ ড্রাইভারের মুখে এবার মৃদু হাসি দেখা গেল।
‘হ্যা করি।’
‘স্যার, মালিক দেখলে আমার চাকরি শ্যাষ। আপনে ক্ষতিপূরন দিয়া দ্যান। আমি জাইগা। রাস্তায় আপনের মতো মানী লোকের সাথে ঝামেলা করতে চাই না।’
‘কতো দিলে চলবে?’
‘দশ-বারো তো লাগবোই।’
‘দশ-বারো?’
‘আপনের কাছে কতো আছে?’
‘আটের মতো আছে।’
‘দ্যান স্যার, দেখি কি করতে পারি।’
প্যান্টের পকেট থেকে আট হাজার টাকা বের করে দিলো পার্থ। চাইলে আরো কম দিতে পারতো, কিন্তু এখন ঝামেলায় জড়ানোর মতো সময় নেই। পেছনে এর মধ্যেই জ্যাম হয়ে গেছে। নীল গাড়ির ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিয়েছে। স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ল পার্থ। এমনিতেই দেরি হয়ে যাচ্ছে। পনেরো মিনিট পার হয়ে গেছে। উত্তরাই পার হওয়া হয় নি।
মহাখালী আসার পর মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো। সায়মার নাম্বার। কোনমতে ফোনটা হাতে নিলো পার্থ। উত্তেজনায় কাঁপছে, কি শুনবে কে জানে।
‘হ্যালো, সায়মা?’
‘হ্যা, বলো, কি বলবে?’
‘তোমরা কোথায়?’
‘কেন বাসায়? কোথায় যাবো?’
‘টুটু আর তুমি বাসায়ই আছো?’
‘হ্যা, কেন? বাসায় থাকবো না তো কোথায় থাকবো?’
‘না-মানে?’
‘তুমি কোথায়?’
‘আমি মহাখালী, আসছি।’
‘কোন সমস্যা নেই তো?’
‘না, সব ঠিক আছে। এসে খাবো।’
‘আচ্ছা, তাড়াতাড়ি এসো।’
মোবাইল ফোনটা বুক পকেটে ঢুকিয়ে রাখল পার্থ। বিশাল এক বোঝা বুকের উপর থেকে নেমে গেছে। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে এফএম রেডিও চালু করল। কেউ একজন রসিকতা করেছে। প্রাকটিক্যাল জোক। যেই করুক না কেন কাজটা ঠিক করে নি। হঠাৎ চোখে পানি চলে এলো তার। সত্যি যদি সায়মা আর টুটু’কে কেউ অপহরন করতো তাহলে কি হতো কে জানে।
আধ ঘন্টার মধ্যে বাসায় পৌঁছে গেল পার্থ। দরজা খুলে দিতেই সায়মাকে প্রায় জড়িয়ে ধরল।
রাত বারোটা বাজে। টুটুকে ঘুম পাড়িয়ে ড্রইং রুমে এসে বসেছে সায়মা। পার্থ টিভি দেখছে। নিজের করা একটা বিজ্ঞাপন দেখাচ্ছে।
‘আজ তোমার কি হয়েছিল?’ জিজ্ঞেস করলো সায়মা।
‘কই, কিছু না তো।’
‘বারবার জিজ্ঞেস করছিলে আমরা বাসায় আছি কি না।’
‘না, এমনিই।’ টিভি থেকে চোখ না সরিয়েই বলল পার্থ।
‘এমনি এমনি তো তুমি কিছু বলো না।’
‘বাদ দাও না। মা ঘুমিয়েছে?’
‘হ্যা, একটু আগে।’
‘তুমিও শুয়ে পড়ো। আমার ঘুম আসছে না।’
‘ঘুমাতে তো হবেই, টুটুকে নিয়ে ভোরেই বেরুতে হবে।’
‘হমম, তুমি ঘুমাও। আমি একটু টিভি দেখি।’
‘ঠিক আছে, বেশি রাত জেগো না আবার,’ বলে চলে গেল সায়মা।
টিভিতে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেল দেখাচ্ছিল। মন দিয়ে দেখছে না পার্থ। বিকেলের দিকে আসা ফোনটার কথা ভাবছে। এরমধ্যে ডিরেক্টর ফোন দিয়েছে এগারোবার। ধরে নি সে। কি উত্তর দেবে বুঝতে পারছে না। নাটকটা এখন প্রায় শেষ পযায়ে। এই সময় তার এই ধরনের আচরনের মানে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছে না বেচারা ডিরেক্টর।
এই সময় মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো। অচেনা নাম্বার। ধরবে না বলে ঠিক করলো পার্থ। এমনও হতে পারে ডিরেক্টর ফোন দিয়েছে অন্য নাম্বার থেকে কিংবা ঐ লোকটা। সাইলেন্ট করে দিল ফোনটা। টিভি চ্যানেলে মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করছে। মন বসছে না। বারবার মোবাইল ফোনের দিকে চোখ চলে যাচ্ছে। অচেনা নাম্বার থেকে ক্রমাগত ফোন এসেই যাচ্ছে। অবশেষে ইচ্ছের বিরুদ্ধে হলেও ফোন হাতে নিলো পার্থ। কল রিসিভ করলো।
‘হ্যালো।’
‘কি? খুব ভয় পাইছেন?’
‘কে বলছেন?’
‘নাম পরিচয় পরে। আগে বলেন ভয় পাইছেন কি না?’ ওপাশের কন্ঠস্বর কেমন খসখসে শোনাল।
‘আমি ভয় পাই না।’
‘গুড। ভেরি গুড। আপনাকে ভয় দেখাবো না আর। এরপর হবে ডাইরেক্ট অ্যাকশন।’
‘আপনার সমস্যা কি?’
‘কোন সমস্যা নাই।’
‘আর কখনো আমাকে ফোন করবেন না।’
‘ঠিক আছে। আজ তো মনে হয় মায়ের সাথে দেখা করেন নাই।’
‘আপনি কিভাবে জানেন?’
‘আমি সব জানি।’
‘ফোন রাখুন। আমি আপনাদের মতো ফালতুদের সাথে কথা বলি না।’
‘ঠিক আছে। আপনাকে একটা ব্যাপার জানানোর জন্য কল করেছি।’
‘শোনার ইচ্ছা নেই।’
‘শুনুন। আপনার মায়ের বিছানার নীচে ছোটখাট একটা বোমা রাখা আছে। আর--- দাঁড়ান, ঘড়িটা দেখে নিই। হ্যা, ঠিক দুই মিনিটের মধ্যে ফাটবে।’
‘কি বলছেন?’
‘দৌড় দাও বাবা পার্থ। দেরি করো না।’
ফোনটা কেটে গেল। দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির দিকে তাকাল পার্থ। বারোটা আটাশ বাজে। সত্যিই কি বোমা রেখেছে লোকটা? ফাইজলামী করছে, ভয় দেখাতে চাচ্ছে আবার। পুরো হলিউড স্টাইল ফলো করছে নাকি লোকটা ভয় দেখানোর জন্য?
তারপরও বসে থাকতে পারলো না পার্থ। উঠে দাঁড়িয়ে রুমে কিছুক্ষন হাঁটল। চোখ ঘড়ির দিকে। মিনিটখানেক পার হয়েছে এরমধ্যে। হঠাৎ দৌড় দিলো সে। মায়ের রুমের দিকে। দরজা খোলাই থাকে। আস্তে দরজা খুলে ঢুকল পার্থ। বাতি জ্বালালো না। ডিম লাইট জ্বলছে।
কাঁথা জড়িয়ে রওশন আরা ঘুমাচ্ছেন। পুরানো ধাঁচের খাট, সেগুন কাঠে বানিয়েছিল তার বাবা। পাশে গিয়ে মায়ের মুখটা দেখল পার্থ। অনেকদিন এভাবে মা’কে দেখা হয় না। কেমন বুড়ো হয়ে গেছেন? হঠাৎ মোবাইলে পাওয়া হুমকিটার কথা মনে পড়ে গেল। উবু হয়ে খাটের নীচে তাকাল পার্থ। অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ চোখে পড়ল জিনিসটা। দমবন্ধ হওয়ার জোগাড় হলো পার্থর। লাল বাতির একটা ডিজিটাল ঘড়ি দেখা যাচ্ছে। বারোটা উনত্রিশ দেখাচ্ছে। ছোট একটা বাক্সের মধ্যে। এটাই কি টাইম বোমা? সত্যিই কি ফাটবে বোমাটা? সময় নেই হাতে। আর কয়েক সেকেন্ড! হামাগুড়ি দিয়ে খাটের নীচে ঢুকে গেল পার্থ। ঘড়িটা পেঁচিয়ে বেশ কিছু তার দেখা যাচ্ছে। লাল, নীল, হলুদ। দম আটকে আসছে পার্থ’র। এভাবে বোমা খেয়ে মরতে হবে মা’কে, সেই সাথে তাকেও। তাদের অপরাধ কি?
বারোটা উনত্রিশ মিনিট একান্ন সেকেন্ড, কি করবে বুঝতে পারছে না পার্থ। তার চোখ জোড়া ঘড়ির দিকে আটকে আছে, চুম্বকের মতো। বায়ান্ন, তিপান্ন, চুয়ান্ন। কিছু একটা করা দরকার। এখুনি। বাক্সটা হাত দিয়ে কাছে নিয়ে আসলো পার্থ। পঞ্চান্ন, ছাপান্ন। তারগুলো এলোমেলো। বাক্সটার মধ্যে কালো কি একটা দেখা যাচ্ছে। সাতান্ন, আটান্ন। যা করার এখুনি করতে হবে। উনষাট। পাগলের মতো টান দিয়ে লাল তারটা ছিড়ে ফেলল পার্থ। চোখ বন্ধ করে ফেলেছে উত্তেজনায়।
বেশ কিছুক্ষন চলে গেল এরমধ্যে। চোখ খুলে তাকাল পার্থ। বারোটা একত্রিশ মিনিট দশ সেকেন্ড। বোমা ফাটে নি!
বাক্সটা আস্তে করে হাতের কাছে নিয়ে খাটের নীচ থেকে বের হলো পার্থ। ভয় কাটে নি এখনো। যে কোন সময় কিছু একটা ঘটে যেতে পারে। ধীরে ধীরে মায়ের রুম থেকে ড্রইং রুমে চলে এলো। এখানে আলো জ্বলছে।
বাক্সটার দিকে তাকাল। বোঝাই যাচ্ছে একটা ডিজিটাল ঘড়ি আর কিছু তার ছাড়া আর কিছু নেই বাক্সটায়। কোন বোমা নেই। এতোক্ষন ঘেমে নেয়ে উঠেছিল পার্থ। হাত দিয়ে কপালের ঘাম মুছল। মুখে হাসি ফুটেছে, সেই হাসি মিইয়ে গেল কিছু একটা মনে পড়াতে।
মোবাইল ফোনটা হাতে নিলো পার্থ। অচেনা নাম্বারটায় ডায়াল করল। কল ঢুকছে না। লোকটাকে পাওয়া গেলে ইচ্ছেমতো গালিগালাজ করা যেতো।
টিভি চলছিল। বন্ধ করে দিয়ে নিজের রুমে চলে এলো পার্থ। বাক্সটা এখনো তার হাতে। জানালা দিয়ে ফেলতে গিয়েও কি মনে করে বিছানার পাশে রাখল। সায়মা ঘুমাচ্ছে বেঘোরে, সাথে টুটুও। অনেক উত্তেজনা গেছে সারাদিন। ঘুমাতে হবে এবার। বিছানায় শুয়ে সারারাত এপাশ-ওপাশ করলো পার্থ। ঘুম এলো না।
চলবে...............
"সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



