১.
সজল কোন প্রকার কুসংস্কারে বিশ্বাসী নয়, তবে রাশিচক্রে ১২ রাশির ভাগ্যফল এর সত্যতা নিয়ে তার কোন সন্দেহ নেই। কারণ রাশিচক্রে গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান, আকর্ষণ ইত্যাদি হিসেব করে ভাগ্য গণনা করা হয়। মানুষের উপর গ্রহ নক্ষত্রের মহাকর্ষ বল কাজ করে, সুতরাং বিষয়টি একেবারে অবৈজ্ঞানিক নয়।
আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই কাওসার আহমেদ চৌধুরীর সংখ্যাতাত্ত্বিক ভাগ্য গণনার ফলাফল মনোযোগ দিয়ে পড়তে লাগল সজল। বিভিন্ন জনের গণনা বিভিন্ন রকম হয়। ভাগ্যফলে বৈপিরত্য এড়ানোর জন্য এবং সে নিজে হিউমার পছন্দ করে বলে হিউমার সমৃদ্ধ কাওসার আহমেদ চৌধুরীর গণনায় সে আস্থা রাখে।
মকর রাশির বর্ণনা সব শেষে পড়ে, কারণ সে নিজে মকর রাশির জাতক। মকর শব্দের অর্থ তার জানা নেই। অবশ্য এতে তার কোন অসুবিধাও নেই , ভাগ্য জানার জন্য মকর শব্দের অর্থ জানার দরকার কি!
আজকে মকর রাশিতে বলা আছে,
“দিনের শুরুতেই সুসংবাদ পেতে পারেন। রাম গরুড়ের ছানা হলে চলবে না, সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলুন। অর্থপ্রাপ্তির সম্ভাবনা আছে। দূরের যাত্রা শুভ”
রাশিফল জেনে মনটা ভরে উঠল সজলের। মেসের টয়লেটে আজ কোন লম্বা লাইন চোখে পড়ল না। এমনকি ভিতরেও কেউ নেই, যেখানে অন্যান্য দিনে দরজার সামনে ৮-৯ জনের দাঁড়িয়ে থাকা খুব কমন একটা বিষয়।
তলপেটে নিম্নচাপের আধিক্যর দরুন মনে মনে সজল কাওসার আহমেদের প্রতি এমন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল যেন তিনি নিজে এসে টয়লেটের সামনে থেকে অন্যান্য বর্ডারদের তাড়িয়ে দিয়েছেন।
২.
নিজেকে ভারমুক্ত এবং ফ্রেশ হয়ে রুমে এসে খুশি খুশি ভাব নিয়ে মোবাইল ফোন অন করল সজল। প্রায় সাথে সাথেই মোবাইলে মেসেজটোন বেজে উঠল। নাম্বার দেখে বুঝল তার গার্লফ্রেন্ড, নিশ্চয় সুসংবাদ।
“ তোমার মত একটা বেকার ছেলের সাথে সম্পর্ক কন্টিনিউ করার আর কোন কারণ খুজে পাচ্ছি না। আজকের পর থেকে আর আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে না। আজ থেকে আমাদের ব্রেকআপ। তোমার অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে আমি চাকুরীজীবী এক বয়ফ্রেন্ড পেয়েছি। ভাল থেক, অ্যাডিওস অ্যামিগো ”
মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল সজলের, সুসংবাদের জায়গাতে দুঃসংবাদ। দীর্ঘদিনের বিশ্বাস বলে রাশিফলকে অবিশ্বাসও করতে পারছে না। কে জানে এটা হয়ত তার জন্য সুসংবাদই-এই ভেবে দুর্বল যুক্তি দাঁড় করার চেষ্টা করল। কিন্তু বিশ্বাসের ভিত যে নড়ে উঠেছে সেটা বলাই বাহুল্য। তবে কাওসার আহমেদের পরামর্শমত হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করল।
বাহিরে এসেই পাশের রুমের গালিব ভাইয়ের সাথে দেখা।
-কি’রে সজল, তোকে বেশ খুশি খুসি লাগছে। কেসটা কি?
হাসি হাসি মুখ করে সজল বলল, কষ্টে আছি ভাই। বর্ণীর সাথে আজ ব্রেকআপ হয়ে গেল। মন খুব খারাপ।
-এটা তো দুঃখের কথা। কিন্তু তুই এমন দাঁত কেলিয়ে খবর দিচ্ছিস যেন নতুন প্রেম হয়েছে।
হাসিমুখ পরিবর্তন না করে সজল বলল, দুই বছরের সম্পর্ক এভাবে হঠাৎ ভেঙ্গে গেল, কান্না পাচ্ছে ভাই।
-কিন্তু তোর মুখ দেখে মনে হচ্ছে ঈদ লেগেছে। কোন দুঃখই নেই তোর, নতুন গার্লফ্রেন্ড জোটাতে পারবি এই আনন্দে বিভোর তুই। চোখের সামনে থেকে যা, প্লেবয় কোথাকার।
ঝাড়ি খেয়ে রাশিফলের উপর মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল সজলের। এই জিনিসের উপর আর বিশ্বাস রাখা নিরাপদ মনে হচ্ছে না। এতদিনের গার্লফ্রেন্ড চলে গেল, দুঃখে মন ভরে উঠল তার। সাগরের কাছে গেলে নাকি মন হালকা হয়ে যায়। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল কক্সবাজার যাবে। ব্যাগ গুছিয়ে রওনা হয়ে গেল বাসস্ট্যান্ডের দিকে।
৩.
টিকিট কেটে একটা বাসে উঠে পড়ল সে। কিছুক্ষণ পর বাস চলতে শুরু করল। হাইওয়ে তে উঠে সা সা করে বাস চলতে লাগল, কানে হেডফোন লাগিয়ে মান্না দে’র গান চালিয়ে দিল সজল। এখন বেশ ভাল লাগছে তার।
কিন্তু বাধ সাজল ঢাকা-কুমিল্লার মাঝামাঝি এসে, বাসের টায়ার গেল ফেঁসে। অল্পের জন্য দুর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচে গেল যাত্রীরা। রাশিফলের উপর তার অভক্তি চরমে উঠল, সেখানে বলা ছিল- দূরের যাত্রা শুভ। ইচ্ছে করছে এইসব ভণ্ড জ্যোতিষীদের ধরে থাপড়ায়, নিজে এই জিনিস এতদিন বিশ্বাস করেছিল বলে নিজেকেও উন্নতমানের গর্দভ মনে হতে লাগল তার।
বাসের সুপার ভাইজার যাত্রীদের পরের বাসে যাওয়ার অনুরোধ করল, তাদের কাছে অতিরিক্ত টায়ার নেই। নষ্ট বাস থেকে যাত্রীরা নেমে রাস্তার পাশে পরের বাসের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। এমন সময় সজলের ফোন বেজে উঠল। গালিব ভাই ফোন করেছে।
-সজল, আমি তখন বুঝতে পারিনি ভাই। তোর মন আসলেই খারাপ ছিল, দুঃখ ভোলার জন্য হাসি হাসি মুখ করে ছিলি। সুখে থাকতে চাওয়া তো আর অপরাধ নয়, কষ্টকে সহজভাবে সবাই মেনে নিতে পারে না। তোর এই গুণটা আমার ভাল লেগেছে। তুই কোথায় এখন?
-আমি কক্সবাজার যাচ্ছি, গালিব ভাই। সাতদিন পর ঢাকা আসব।
-আহারে ছেলেটা দুঃখ পেয়ে সাগর দেখতে যাচ্ছে। মন খারাপ করিস না, মানুষের জীবনে এর চেয়েও খারাপ ঘটনা ঘটে। তুই ঢাকায় ফিরলে তোর জন্য একটা পার্টি দিব।
-ধন্যবাদ, গালিব ভাই। ভাল থাকবেন।
৪.
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর নতুন বাস এসে গেল। গালি দিতে দিতে যাত্রীরা বাসে উঠে গেল, সিট ফাঁকা ছিল অনেকগুলি। প্রায় সবাই বসার জায়গা পেল, যারা পেল না তারা দাঁড়িয়ে থাকল।
সজল সিট পেল এক ললনার পাশে, ভাল করে তাকিয়ে দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল। এ যে আফসানা, যাকে সে খুব ভালবাসত একসময়। এমনকি গত তিন বছরেও তার কথা ভোলেনি সজল। আফসানাও সজলকে দেখে চমকে গেল। সাধারণ কথাবার্তা বলার পর আফসানা তুলল আগের প্রসঙ্গ।
-আমি আসলে দুঃখিত, সজল। কয়েকদিন তোমার ফোন বন্ধ ছিল বলে রেগে গিয়ে ফোন আছার মেরে ভেঙ্গে ফেলেছিলাম। তোমার নতুন নাম্বার আমার মুখস্থ ছিল না, আর আমার সিমটিও নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। রেজিস্ট্রেশন করা ছিল না বলে আমি সিম রিপ্লেস করতে পারিনি।
-আমি তোমাদের বাসায় গিয়েও তোমাকে পাইনি।
-আসলে বাবা বাসা চেঞ্জ করায় তোমার সাথে আর দেখা করতে পারিনি। তোমার আগের মেসে গিয়েছিলাম, সেখানে তুমি থাক না।
-তাহলে তুমি কি করতে চাও এখন? তবেঁ আমি তোমাকে এখনো মিস করি, আফসানা।
-আমিও তোমাকে এখনো ভালোবাসি, সজল।
সজল মনে মনে হাসে, দূরের যাত্রা আসলেই তার জন্য শুভ হয়েছে। বড় ধরণের দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। কিন্তু তা না হয়ে আফসানার সাথে দেখা হয়ে গেল, এই সেই আফসানা যাকে সজল প্রকৃত ভালবাসে। আর বর্ণী? কয়েকদিন আগে ফুচকা খাওয়ার সময় “তোমাকে চাই আমি আরও কাছে” টাইপের কথা বলে সজলের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকার শপিং করিয়ে নিয়েছিল বর্ণী। চলে গিয়ে বরং সজল বেঁচে গেছে, ব্রেকআপের খবর আসলে সুখবরই ছিল। রাশিফলে ফিরে এল পূর্ণ আস্থা, বিজ্ঞান সম্মত গণনা ভুল হতেই পারে না। সজল কোন কুসংস্কারে বিশ্বাসী নয়।
৫.
চট্টগ্রাম বাস স্ট্যান্ডে নেমে সজলের খুব বাথরুম চাপল। সে আফসানাকে ব্যাগ আর মোবাইল দিয়ে চলে গেল বাথরুমের খোজে। আফসানা দাঁড়িয়ে থাকল সজলের অপেক্ষায়।
এসময় সজলের ফোন আবার বেজে উঠল।
-হ্যালো, তুই কোথায় এখন?
-আমি আফসানা বলছি। কে বলছেন?
-সজল কোথায়? আমি গালিব বলছি, সজলের মেসের বড় ভাই। আপনি কে?
-আমি সজলের গার্লফ্রেন্ড। একটু পরে ফোন করুন, সজল বাথরুমে।
-গার্লফ্রেন্ড মানে? আজ সকালেই তো ওর দুই বছরের সম্পর্কের ব্রেকাপ হয়েছে, সেই দুঃখেই তো এখন ও কক্সবাজার যাচ্ছে।
ফোনটি কেটে যাওয়ার সাথে সাথে আফসানা রেগে লাল হয়ে গেল। সজল বাথরুম থেকে ফিরে এল উৎফুল্ল ভাব নিয়ে।
-তুমি যে এতবড় ফ্রড এটা আমার আগে জানা ছিল না।
সজল হতভম্ভ হয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
-দুই বছর ধরে প্রেম করছ আর বল যে তুমি এখনো আমাকে মিস কর। তোমার মেসের বড় ভাই গালিব ফোন করেছিল। এই নাও তোমার ব্যাগ আর মোবাইল। আমি চলে গেলাম। তোমার মত ভন্ডের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে ভাল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আগে। থ্যাংকস গড, আমি প্রতারণার হাত থেকে বেঁচে গেলাম আবারো।
এই বলে আফসানা সজলকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়েই দ্রুত প্রস্থান করল। সজল বাকরুদ্ধ হয়ে চেয়ে থাকল তার গমন পথের দিকে।
কিছুক্ষণ পর একটু স্থির হয়ে গালিব ভাইকে ফোন করল।
-হ্যালো, গালিব ভাই............।
-তুই কোন কথা বলিস না, ফাজিল। তুই নাকি ভাঙ্গা হৃদয় জোড়া লাগাতে কক্সবাজার যাচ্ছিস। আর এর মধ্যেই গার্লফ্রেন্ড জুটিয়ে ফেলেছিস। ব্যাটা, গার্লফ্রেন্ড নিয়ে মজা করতে কক্সবাজার যাচ্ছিস আর আমাকে বলিস দুঃখবিলাসের গল্প।
এই বলে ফোন কেটে দিল গালিব ভাই।
সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল। তার মনে হতে লাগল রাশিফলের মত ভুয়া জিনিস দুনিয়াতে আর দ্বিতীয়টা নাই। সিগারেট টানতে টানতে ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে হবে, সব কিছু কেমন যেন জট পাকিয়ে যাচ্ছে। সিগারেট কেনার জন্য মানিব্যাগের উদ্দেশ্য পকেটে হাত দিল সজল।
পকেট ফাকা, মানিব্যাগ উধাও।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জুন, ২০১৪ ভোর ৪:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



