বিশেষত, মধ্যবিত্ত পুরুষের মতো পৃথিবীতে এমন বালাই আর নাই। শোভাও নাই, চাকুরীগিরি ছাড়া কোনো কাজেও লাগে না। স্নেহও উদ্রেক করে না, অনেক মেপে জেপে চলিয়া থাকে বিধায় তাহার সঙ্গসুখও বিশেষ প্রার্থনীয় নহে। তাহার মুখে গরীবদের নিয়ে মানবতার কথাও ন্যাকামি, বিত্তবানদের সমালোচনাও জ্যাঠামি এবং কথামাত্রই প্রগল্ভতা। হঠাৎ অর্থের পরিমাণ রক্ষা না করিয়া কুঁড়ে ছাড়িয়া টিনশেডে উঠে; লোকে সেটা তাহার একটা কুশ্রী স্পর্ধাস্বরূপ জ্ঞান করে। তাহার ভিক্ষুকের ন্যায় নির্লজ্জবোধ ও কন্ঠের মিষ্টতা সহসা চলিয়া যায়; লোকে সেজন্য তাহাকে মনে মনে অপরাধ না দিয়া থাকিতে পারে না। গরীব এবং বিত্তবানের অনেক দোষ মাপ করা যায়, কিন্তু মধ্যবিত্ত পুরুষের কোনো স্বাভাবিক অনিবার্য ত্রুটিও যেন অসহ্য বোধ হয়।
সেও সর্বদা মনে মনে বুঝিতে পারে, পৃথিবীর কোথাও সে ঠিক খাপ খাইতেছে না; এইজন্য আপনার অস্তিত্ব সম্বন্ধে সর্বদা লজ্জিত ও ক্ষমাপ্রার্থী হইয়া থাকে। অথচ এই সময়েই অনুপ্রেরনার জন্য কিঞ্চিৎ অতিরিক্ত কাতরতা মনে জন্মায়। এই সময়ে যদি সে কোনো সহৃদয় ব্যক্তির নিকট হইতে অনুপ্রেরনা কিংবা সখ্য লাভ করিতে পারে তবে তাহার নিকট আত্মবিক্রীত হইয়া থাকে। কিন্তু তাহাকে অনুপ্রেরনা জোগাইতে কেহ সাহস করে না; কারণ সেটা সাধারণে প্রশ্রয় বলিয়া মনে করে। সুতরাং তাহার চেহারা এবং ভাবখানা অনেকটা প্রভুহীন পথের কুকুরের মতো হইয়া যায়।
অতএব, এমন অবস্থায় চাকুরীস্থল ছাড়া আর-কোনো অপরিচিত স্থান ঐ পুরুষের পক্ষে নরক। চারি দিকের অনুপ্রেরনাশূন্য বিরাগ তাহাকে পদে পদে কাঁটার মতো বিঁধে। এই সময়ে সাধারণত অর্থ-বিত্ত কোনো-এক শ্রেষ্ঠ স্বর্গলোকের দুর্লভ বস্তু বলিয়া মনে ধারণা হইতে আরম্ভ হয়, অতএব বসের নিকট হইতে উপেক্ষা অত্যন্ত দুঃসহ বোধ হয়।
(রবীন্দ্রনাথের 'ছুটি' অবলম্বনে)
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা আগস্ট, ২০১৪ রাত ১১:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




