উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী একটি তীর্থ স্থান শ্রী শ্রী নির্মাই শিববাড়ী। গত পাঁচশত বছরেরও অধিক কাল হতে এখানে বানেশ্বর শিবের পূজো হয়ে আসছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিকট (বহু শতাব্দী কাল হতে) এটি তীর্থ স্থান হিসেবেই পরিচিত।
আজও এখানে শিব চতুদর্শীতে ভক্তরা মনের আকাঙ্খা পূরনের জন্য প্রার্থনা করতে আসেন। শিবরাত্রি উৎসবের মেলা এ অঞ্চলে ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। শ্রীমঙ্গল উপজেলার আশীদ্রোণ ইউনিয়নের সংকরসেনা গ্রামে এই শিব বাড়ীর অবস্থান। শহর হতে ৫ কিঃমিঃ দণি-পূর্ব কোণে বিলাশ ছড়ার তীরে একটি প্রাচীন মন্দিরে উপবিষ্ট আছেন বানেশ্বর শিব। বিরাট দিঘীর পাড়ে নির্মিত প্রাচীন মন্দিরের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে শিব দর্শন করতে হয়।
১৪৫৪ সালে ত্রিপুরার মহারাজ শিব মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। আসাম গেজেটে উক্ত তারিখের সমর্থন আছে। ঐতিহ্যবাহী এই শিববাড়ীটি প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে নানাবিধ তথ্য ও কিংবদন্তী প্রচলিত আছে। চর্তুদশ শতাব্দী থেকে এ অঞ্চল ত্রিপুরা মহারাজার রাজত্যে অর্ন্তভূক্ত ছিলো। বিস্তৃত গহীন অরণ্য ভূমিতে ছিলো আদিবাসী ‘কুকি’দের বসবাস। এখানে প্রায়ই ‘কুকি’ সামন্ত রাজা ত্রিপুরার মহারাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতেন। এ রকমই এক বিদ্রোহে বালিশীরা পরগণায় তুমুল যুদ্ধে ‘কুকি’ সামন্ত রাজার সৈন্যরা পরাজিত হলেও, ত্রিপুরা মহারাজার সেনাপতি (মহারাজার জামাতা) যুদ্ধস্থলে নিহত হন।
জামাতা নিহত হওয়ায় মহারাজার কন্যা অল্প বয়সেই বিধবা হন। তখন ভারতবর্ষে সহমরণ প্রথা প্রচলিত ছিল। মহারাজার কন্যার সহমরণে যাওয়ার কথা থাকলেও তিনি স্বামী নিহত হবার স্থানে শিবের আরাধনা করে বাকী জীবন কাটিয়ে দেওয়ার মনোবাশনা ব্যক্ত করেন। রাজকন্যার নাম ছিলো ‘নিরময়ী’। তিনি দীর্ঘ সাধনা করে সিদ্ধি লাভ করেছিলেন। তার নামানুসারে উক্ত শিব বাড়ীর নাম রাখা হয় নির্মাই শিব বাড়ী। রাজকন্যা ‘নিরময়ী’ শিব সাধনা করে বাকী জীবন এখানেই কাটিয়ে দেন। ‘নিরময়ী’ রাজপরিবার থেকে চলে আসার সময় সঙ্গে করে যে স্বর্ণলঙ্কার নিয়ে এসেছিলেন তা দিয়ে একটি বৃহৎ দিঘী খনন করিয়েছিলেন।
আজোও তা নির্মাই দিঘী নামে পরিচিত। শিব চর্তুদশী তিথিতে বারোনী ও অষ্টমীর স্নানে ৩০ বিঘা জলকাপ নিয়ে ঐতিহ্যের নিরব স্বাী এই দিঘীতে হাজার হাজার ভক্ত পূর্ণস্নান করেন। পূর্ণার্থীদের সুবিধার্তে ২০০১ সালে তৎকালীন স্থানীয় এমপি উপাধ্য আব্দুস শহিদের সার্বিক সহযোগীতায় সরকার প্রায় দেড়ল টাকা ব্যায়ে দিঘীতে একটি বিরাট পাঁকা ঘাট নির্মাণ করে দেয়। শিব মন্দির প্রতিষ্ঠার পর ত্রিপুরার রাজা কন্যাদের বরণ পোষনের জন্য ৮০ দ্রোণ (বর্তমানে প্রায় ১২ হাজার বিঘা জমির সমতুল্য) জায়গা শিবের নামে দান করেছিলেন। শিববাড়ীর নিরাপত্তার জন্য রাজা সৈন্যবাহিনীও নিয়োগ করেছিলেন।
জনশ্রুতি আছে ৮০ দ্রোণ জমির নামানুসারে উক্ত জায়গার নাম আশিদ্রোণ ইউনিয়ন ও শিবের সৈন্যদের নামেই গ্রামের নাম শংকর সেনা হয়েছিলো, যা আজোও অব্যাহত আছে। সদাজাগ্রত শিবের সাধনা করে বহু তপস্বী কালোজয়ী হয়েছেন। শিববাড়ীকে কেন্দ্র করে বহু অলৌকিক ঘটনাও প্রচলিত আছে। দীর্ঘ ৮ পুরুষ ধরে শংকর সেনা গ্রামের স্বর্গীয় কাশিনাথ চক্রবর্তীর উত্তরাধীগণ শিববাড়ীর সকল পূজার্চনা করে আসছেন। বর্তমান পূজারী সত্তরউর্ধ্ব রবীন্দ্র চক্রবর্তীর সাথে কথা বলে অনেক অলৌকিক ঘটনা জানা যায়। তিনি বলেন, আজ হতে ৩শ’ বছর আগেও শিব বাড়ীর যে কোন পূজার আগের রাত্রে নির্মাই দিঘীর ঘাটে পান-সুপারী দিয়ে বলে দিলেই পরের দিন সকালে পূজায় ব্যবহßত সকল বাসনপত্র দিঘীর পাড়ে উঠে আসতো।
একই ভাবে পূজার পরে দিঘীর পাড়ে রেখে দিলে চলেও যেত। শিববাড়ী সংলগ্ন কালি বাড়িতে হেম বাবু নামক একজন সিদ্ধ সাধক থাকতেন। তার মুখ থেকে তারা আরোও অনেক ঘটনা শুনেছেন। পূজারীর মুখ থেকে আরোও জানা যায়, তার বয়স যখন ৬ বছর ছিলো তখন তিনিও দেখেছেন শিববাড়ীতে চরক পূজার আগের রাত্রে দিঘীতে বলে দিলেই পূজার জন্য দিঘী থেকে চরক গাছ উঠে আসতো। কাল পরিক্রমায় এসব অলৌকিক ঘটনা আজ না ঘটলেও এখনও হাজার হাজার পূন্নার্থী ভীড় জমান তাদের মনোবাসনা পূরনের জন্য। কিন্তু কালের করাল গ্রাসে দীর্ঘদিন যাবৎ শিববাড়ীটি তার অতিথ গৌরব হারিয়ে ফেলেছিলো।
শিব মন্দির ও কালি মন্দিরের ৩৬ শতক ভূমি ব্যতীত শত শত বিঘা জমি দখল হয়ে যায় নামে বেনামে। প্রাচীন বৃরাজি কেটে উজার করে ফেলা হয়। ২০০০ সালে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সুপ্রীম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবি শ্রী সুব্রত চৌধুরী শ্রীমঙ্গলে এসে শিববাড়ী দর্শনে যান। তিনি শিববাড়ীর ঐতিহ্য ও ইতিহাস শুনে এটি রণাবেনের জন্য উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদকে সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান। এরফলে ২০০০ সালে নতুন কমিটি গঠন করা হয়।
বর্তমান পরিচালনা পরিষদের সভাপতি শ্রী বলাই ভট্টাচার্য ও সাধারণ সম্পাদক শ্রী অর্ধেন্দু কুমার দেব এর সাথে আলাপ করে জানা যায়, নানা প্রতিকুলতার মধ্যে দিয়ে সমাজের ধানশীল ব্যক্তিদের সাহায্যে তারা শিব বাড়ীর উন্নয়ন ও সংস্ড়্গার কাজ করে যাচ্ছেন। এ পর্যন্ত প্রায় ৩১ বিঘা জমি শিব বাড়ীর নিয়ন্ত্রণে এসেছে। গত ২০০৪ সালে শিববাড়ী বৃ রোপনে জাতীয় পুরষ্ড়্গার পেয়েছিলো। দিঘীর উত্তর ও পূর্বপাড় এখনও মন্দির কমিটির নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। উত্তর পাড় দিয়ে আন্ত ইউনিয়নের যে প্রশস্ত রাস্তাটি ছিলো সেটিও এখন সরু হয়ে পায়ে চলার পথে পরিণত হয়েছে।
শিব বাড়ী সংলগ্ন কালি মন্দিরটি নির্মাণ করে দিয়েছিলেন বিশিষ্ট দানশীল ব্যক্তিত্ব শ্রী বিকাশ দেব চৌধুরী। বর্তমানে শিব চতুদর্শী উৎসব, বাসন্তী পূজা, চরক পূজা, অষ্টমী ও বারোণী স্নান অনুষ্ঠিত হচ্ছে এ শিব বাড়ীতে। পূর্ণার্থী ও দর্শনার্থী ছাড়াও প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এসে উপভোগ করছে প্রকৃতির এ অপরুপ সৌন্দর্যø। তাই যুগ যুগ ধরে ইতিহাসে স্বাী হয়ে থাকা ৫৫৪ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই শিববাড়ীটি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পর্যটকদের জন্য একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে গড়ে উঠতে পারতো।
আলোচিত ব্লগ
প্রতি বছর জুলাই আসলেই কি কাউয়া ক্যাচাল লাগতে হবে?

জুলাই মাসটা আবার ঘুরে ফিরে আসতেই দেশের রাজনৈতিক পাড়ায় পারদ চড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে যারা গত দুই বছর আগের আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলেছেন, তাদের কাছে এই জুলাইয়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন
ওরা ভয়ংকর

বাঙালির উদরঘাটতি থাকলেও উৎসবে সদা মশগুল!
দ্যাশ নতুন কইরা স্বাধীন হইছে গো!
রঙবেরঙে পতাকায় বিলুপ্ত স্বজাতির মানচিত্র!
শুধু পতাকায় সীমাবদ্ধ নেই!
মনে হচ্ছে পাল্টে গেছে জাতীয়তা!
মধ্যরাতে ভেঙে যায় সুনিদ্রা কর্কশ... ...বাকিটুকু পড়ুন
জুলাই: বাঙালি জাতির জন্য এক অভিশাপ ও মূল্যায়ন

জুলাই: বাঙালি জাতির জন্য এক অভিশাপ ও মূল্যায়ন
আমাদের দৃষ্টিতে, তথাকথিত "জুলাই" বাংলাদেশের জন্য কোনো গৌরবের অধ্যায় নয়; বরং এটি জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা, অর্থনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ... ...বাকিটুকু পড়ুন
জাপান যেভাবে মাত্র ৭ বছরে অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়

জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হায়াতো ইকেদা ১৯৬০ সালের শেষভাগে তাঁর বিখ্যাত "ইনকাম ডাবলিং প্ল্যান" বা "আয় দ্বিগুণকরণ পরিকল্পনা" চালু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জাপানের অর্থনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন
ভাংগুক অচলায়তন

ভয় পাবেন না
আশার পিদিম জ্বালিয়ে রাখুন
প্রাণের ধুকপুকি জাগিয়ে রাখুন
হেরে যাবেন না।
ঘাবড়াবেন না
নতুন স্বর ও সাহসী উচ্চারণে অনবদ্য হোন
ক্ষুরধার সৃষ্টির ঔজ্জ্বল্যে উদ্ভাসিত হোন
থামবেন না।
নগদমূল্যে বিকোবেন না
ক্লান্ত শিরায় নতুন রক্ত বইয়ে দিন
তাতিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।